মুরাদ-আওরঙ্গজেবের ওপরে রাজপুত আক্রমন
আওরঙ্গজেবের বাম দিকে ভীতিপ্রদ যুদ্ধ চলছিল। দারার দলের খালিলুল্লা খান তাঁর উজবেগ বাহিনী নিয়ে অস্থিরভাবে, এগিয়ে আসা মুরাদের বাহিনীর ওপরে তীর ছুঁড়লেন। এ ছাড়া বিশ্বাসঘাতক খালিলুল্লা, তার বাহিনী নিয়ে খুব বেশি কিছুই করেন নি। শাহী বাহিনীর রাজপুত দল ছত্রশালের নেতৃত্বে জুলফিকার খানের গোলান্দাজ আর মুরাদের বাহিনীর মধ্যে ফাঁক খুঁজে বিপুল বেগে ঢুকে পড়ল। তীরের যুদ্ধে আকাশ কালো হয়ে গেল। রাম সিংহ রাঠোড় দারার দিকে বর্শা ছুঁড়লেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। মুরাদের তীর রাম সিংহের দেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। রাম সিংহের পতন হয়। অন্যান্য ঘোড়সওয়ার দল হাতির ওপরে বসা মুরাদের কাছে পৌঁছতে না পারলেও যুদ্ধের প্রাবল্যে মুরাদের মুখে নানান আঘত লেগে তার মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত হয়, মুরাদের হাওদায় গেঁথে যাওয়া তীরগুলোকে দূর থেকে দেখতে যেন সজারুর পিঠের মত লাগছিল। এর আগে কোনও যুদ্ধে না হারা মুরাদ বিপক্ষের বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছিলেন। এবারে এগিয়ে এলেন দাউদ খানের নেতৃত্বে বাহিনী। তারা বেরিয়ে এসে ইয়াহিয়া খান, সরফরাজ নওয়াজ, রাণা গরীব দাসকে হত্যা করল।
রাজপুতেরা এবারে কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে। বাঁদিকে মুরাদকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেখে আওরঙ্গজেব সেই সমস্যা সমাধানে তুরন্ত মুরাদের দিকে এগোচ্ছিলেন। রাজপুত আর পাঠানেরা রণংদেহি স্বরে মুখোমুখি হল। রাজপুতেরা পাঠান দেওয়াল ভেঙে আওরঙ্গজেবের দিকে এগোতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তার একটা বড় কারন হল, এর আগে মুরাদের সঙ্গে লড়াইতে তার বাহিনী তখন প্রায় অর্ধেক হয়েগেছে। রাজপুতদের সেনাপতি ছত্রশাল হাদা, রাম সিংহ রাঠোড়, ভীম সিংহ গৌড় আর শিবরাম গৌড় মারা গেল। রাজা রূপ সিং রাঠোড় ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে খোলা তরোয়াল হাতে আওরঙ্গজেবের হাতির পেটে বাঁধা হাওদার দড়ি কাটার জন্যে দৌড়ে গেল কিন্তু আঘাত করার আগেই তার দেহ খণ্ড খণ্ড হয়ে যুদ্ধেক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ল। হঠাতই দেখাগেল দারার বাঁ এবং ডান দিকের নিরাপত্তা ব্যূহ শূন্য হয়ে গেছে।
সমুগড়ে দারা
যুদ্ধের শুরুতে রুস্তম খান আর ছত্রশাল বাঁ দিকের কলাম আর অগ্রগামী বাহিনীকে আক্রমন করার সময় দারা মধ্যিখানের জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে বিপদে পড়া রুস্তমের সাহায্যে আওরঙ্গজেবের ডান দিকের বাহিনীকে আক্রমন করতে এগিয়ে গেলেন। মুঘল রণনীতিতে প্রশিক্ষিত কোনও শাহজাদা বা খানজাদা ঘনঘোর যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই ধরণের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন না — কারণ তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তিনি সাধারণ মনসবদার নন। তার নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর গোটা বাহিনীর জেতা-হারা নির্ভর করছে। তিনি যেটা করলেন, সেটা চরম অশাস্ত্রীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে এর থেকে খারাপ সিদ্ধান্ত আর কিছুই হতে পারে না।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ধুলোর ঝড়ের মধ্যে নিজেকে ঢেকে রেখে, নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, বিপক্ষের কামানের আওতায় থাকা ঘোড়সওয়ারদের মধ্যে নিজের হাতিকে ঢুকিয়ে নিয়ে, সর্বাধিনায়ক দারা মূলসেনাধ্যক্ষের জায়গা ছেড়ে সাধারণ মনসবদার সেনাপতির মত যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধের মধ্যিখানে বসে থাকলে তিনি সামগ্রিকভাবে যুদ্ধস্থলের কোথায় কী ঘটছে সেটা দেখতে পারতেন, কিন্তু তিনি প্রধান সেনাপতির অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রের রণনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে যাওয়ায় চারিদিকে কী ঘটছে সেটা আর বুঝতে পারছিলেন না। দারার হঠকারিতায় শাহী বিপুল বিশাল বাহিনীর পক্ষে আর যুদ্ধনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হল না। উল্টোটাই ঘটল — যুদ্ধ শাহী বাহিনীর প্রধান সেনাপতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল। তিনি কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলে নিত্য নতুন ঘটনাবলীর প্রতিক্রিয়ায় নিজের বাহিনীকে চালিত করতে পারতেন। তিনি কেন্দ্র থেকে সরে যাওয়ায় কেন্দ্রিয়ভাবে দারার বিশাল বাহিনীর অন্যান্য টুকরি সেনাদলগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে চলাচলের নির্দেশ পাওয়া সমস্যা হয়ে গেল। আরও একটা সমস্যা হল, সেনানায়ক শাহী গোলান্দাজদের সামনে চলে যাওয়ায়, গোলান্দাজেরা দারাকে বাঁচাতে বিপক্ষের দিকে গোলা ছুঁড়তে পারছিল না, আর উল্টো দিক থেকে বিনা বাধায় আওরঙ্গজেবের বাহিনী গোলা ছুঁড়ে ব্যতিব্যস্ত করে চলল বিপক্ষকে। দারা যখন সমস্যাটা বুঝলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, তিনি কামানগুলোকে সামনে আনার নির্দেশ দিলেও কাজের কাজ কিছুই হল না, ততক্ষণে বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। গোলান্দাজেরা নিজেদের বাহিনীর পিছনে সুরক্ষা ঢালের ব্যবস্থা নেই দেখে গোলান্দাজি ছেড়ে নিজেদের রসদখানা লুঠ করতে শুরু করেছে। তাছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রের তাপে আর ক্লান্তিতে ভারবাহী পশুগুলোও ক্লান্ত — তারা বিশাল কামানের ভার বহনের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। এই ভুলটাই দারার ভাগ্য পাল্টে দিল।
মানুচি লিখলেন, ‘দারা কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে, বিজয় নাকাড়া বাজাতে বাজারে তাঁর বাঁ দিকের অক্ষ, আওরঙ্গজেবের ডান দিকের অক্ষের সামনে পৌঁছলেন, যেন মনে হল রুস্তম খানের লড়াইয়ের পরে তিনি যুদ্ধ জিতে গেছেন, বাকি শুধু শত্রুপক্ষকে কচুকাটা করা। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। আমরা দেখেছি আওরঙ্গজেবের গোলান্দাজেরা রুস্তমের ঘোড়সওয়ারদের আঘাত সহ্য করে তাদের পিছনে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের গোলাবারুদ বাঁচিয়ে অপেক্ষা করছিল দারার কাছাকাছি এগিয়ে আসার জন্য। এরপর থেকে পূর্ণদ্যোমে শুরু হল দারার টুকরির ওপর গোলান্দাজ — কামান, মাস্কেট, শুতারনল [উটের পিঠে বসানো ছোট কামান, যাকে চার দিকেও ঘোরানো যেত — সুইভেল] নিয়ে আমাদের ওপর যেন ভেঙে পড়ল। দারা বুঝতে পারলেন তিনি কী গোল্লায় ঢুকে পড়েছেন, সেই মুহূর্তে মাথা ঠাণ্ডা করে বিপক্ষের গোলান্দাজি থেকে বাঁচতে ডান দিকে ঘুরলেন, নিজের বাহিনীকে সংহত করে শায়েখ মীরের বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালালেন। আওরঙ্গজেব সামনের দিকে এত বেশি সেনা এগিয়ে দিয়েছিলেন এবং দারা ঢুকে আসার আগে তার বাহিনী বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিল যে তিনি যেন প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে যদি আওরঙ্গজেবের নিরাপত্তার অভাবের বিষয়টা বুঝে তার ওপর দারা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতেন, তাহলে হয়ত দারাই যুদ্ধ জিতে যেতেন। কিন্তু যুদ্ধ তাকে চালিত করছিল, তিনি যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতি পড়তেই পারলেন না, বিপুল ক্লান্তি যেন তাঁকে ঘরে ধরেছিল। তাঁর বাহিনী মোমেন্টাম হারিয়ে বসল’।
মানুচি যে বলছেন যুদ্ধের শুরুতে আক্রমণের যে মোমেন্টাম পেয়েয়েছিল দারার বাহিনী, সেই গতিশীলতা দারার রণনৈতিক ভুলের জন্যে শাহী বাহিনী হারিয়ে বসল — এর থেকে বড় সত্য আর কিছুই হতে পারে না। আওরঙ্গজেবের ছোট বাহিনীর বিরুদ্ধে জেতার সুবর্ণ সুযোগ মুঘল বাহিনী তার অনভিজ্ঞ প্রধান নেতার জন্যে হাত ছাড়া করল। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেব বাহিনীকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছেন। দারা নিজের ডান দিকের ছত্রশালের বাহিনীর দিকে যাওয়ার জন্যে মুখ ঘোরালেন। তিনিনিজের বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে এক্কেবারে বাঁদিক থেকে এক্কেবারে ডান দিকের দীর্ঘ পথ অতিক্রম যাওয়ার ডাক দিলেন। এই অকম্মা নির্দেশের ফলে শাহী বাহিনীতে যে গোলযোগ তৈরি হল, তাতে যুদ্ধক্ষেত্রের বিপুল গরমে বহু সেনা আর ঘোড়া অসুস্থ হয়ে কাজ করার মত অবস্থায় থাকল না। তিনি যখন অগ্রগামী বাহিনীর কাছে পৌঁছলেন, সেটি তখন তার বাঁদিকের কলমে রূপান্তরিত হয়েছে আর তার গোলান্দাজেরা নিজের বাঁ দিকের কলমে গোলান্দাজি করা শুরু করেছে। বাহিনীতে দাঁড়িয়ে থাকা সেনার তুলনায় মৃতের সংখ্যা বেশি হল।
উল্টো দিকে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর সেনারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি চাঙ্গা, তারা শত্রুকে ক্রমাগত আক্রমন করে চলেছে। বিদ্রোহী আওরঙ্গজেবের দলের সেনাপতিরা, তাদের নেতার নির্দেশ পালন করে অগ্রগামী বাহিনীকে এর আগে এক পাও কোনও দিকে নড়তে দেয় নি। এই বাহিনীকে দারার বাঁদিকের বা দারার অগ্রগামী, কোনও বাহিনীই আক্রমন করে নি। দারার দুটি দিক উজাড় হওয়া, অগ্রগামী বাহিনী ধ্বংস হওয়া এবং দারার কেন্দ্রও স্থির নেই দেখে মহম্মদ সুলতান নিজের তাজা অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে দারাকে আক্রমন করল। একই সঙ্গে আওরঙ্গজেবের ডান দিকের বাহিনীও দারাকে আক্রমন করল — ডানদিকের ব্যাটারির সাফ শিকান খান আর বাঁদিকের ব্যাটারির জুলফিকার খান ভয় না পেয়ে শত্রুকে তীব্র আক্রমন শানাল।
দারার শেষের শুরু
একের পর এক সেনাপতির পতনের খবরে মাথা ঠিক রাখতে না পারলেও প্রকাশ্যে সে দুর্বলতা না দেখিয়ে সেনাদের যুদ্ধ করার জন্যে উৎসাহিত করে চলছিলেন দারা। কিন্তু ঢেউএর মত আওরঙ্গজেবের চাঙ্গা বাহিনী দারার বাহিনীর ওপর আছড়ে পড়তে থাকায় দারার পক্ষে সে ধাক্কা সামলানো মুশকিল হল। দারার সামনে ঢাল হয়ে থাকা একের পর এক সেনা আর ওয়াজির খানের মত অজেয় সেনাপতি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে। ৮ সের, ১০ সেরের গোলা মুহুর্মুহু উড়ে আসতে থাকে দারার সেনার ওপরে।
মানুচি আর বার্নিয়ে বাজারে গুজব শুনেছিলেন দারার হাতে দরবারে জুতোর ছপটি খাওয়া অপমানিত মেসোমশাই খালিলুল্লা খান, দারাকে যুদ্ধেক্ষেত্রে হাতি থেকে নেমে ঘোরায় চড়ে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে বলার পর থেকে শাহী বাহিনী যুদ্ধে হার মেনে নেয়। দারার হাতির হাওদা খালি দেখে যে সব সেনা টুকরির যতটুকু যুদ্ধের ইচ্ছে ছিল, সেটাও নষ্ট হয়ে গেল। যদুনাথ মানুচি আর বার্নিয়ের মন্তব্যকে স্রেফ বাজারি গুজব আখ্যা দিচ্ছেন। খালিলুল্লা খানের বিশ্বাসঘাতকতা সত্যিও হয়, ততক্ষণে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দাদার হাত থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণভাবে আওরঙ্গজেবের দিকে ঢলে পড়েছে। এ সময় দারার মত যুদ্ধ-অনভিজ্ঞ সেনাপতির পক্ষে যুদ্ধের মোড় ঘোরানো অসম্ভব ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে রণনৈতিকভাবে সেনা সামলানোর ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা না থাকায় এক সময়ে দেখা গেল বিশালাকার মুঘল শাহী সেনাবাহিনী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হার আর প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যাচ্ছে।
দারা একা হয়েগেলেন। শাহী পরিবারের নিমক খাওয়া দারার হাতে গোণা কয়েকজন রক্ষী বাদ দিয়ে তার পাশে আর কেউ দাঁড়াল না। দূরে দাঁড়িয়ে ছেলে সিপিহার হাউহাউ করে কাঁদছে। ঘনিষ্ঠ কিছু সহযোগী বাপ-ছেলে দুজনের ঘোড়ার লাগাম ধরে আগরার দিকে টেনে নিয়ে চলল। ৫-৬ মাইল গিয়ে দারা শিরস্ত্রাণ খুলে বট গাছের তলায় বিশ্রাম নিতে বসলেন। অদূরেই বিদ্রোহী দলের নাকাড়ার আওয়াজ এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া গেল। কিন্তু অসম্ভব ক্লান্ত, যুদ্ধে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চরম অবসাদে ভোগ শাহজাদা বললেন, ‘তাদের আসতে দাও, আমায় অসম্মানের জীবন থেকে মুক্তি দিক’। কিন্তু সহযোগীদের অনুরোধে তিনি আবার উঠে দাঁড়ালেন। ছোট্ট বাহিনী আগরা পৌঁছল রাত ৯টায়।
যুদ্ধক্ষেত্রে বাহনহীন রণসাজে সাজানো দারার হাতি একা একা দাঁড়িয়েছিল ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে, সে পালায় নি — দারার বাহিনীর একজনেরও চিহ্ন নেই। সে ধরা পড়ল। আওরঙ্গজেব বিজয়ের নাকাড়া বাজাবার নির্দেশ দিলেন। বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা আওরঙ্গজেবের বাহিনী একে একে একসাথে জড়ো হল। আওরঙ্গজেব পলাতকদের তাড়া করলেন না। তার বাহিনীও দুটো যুদ্ধ কাটিয়ে ভীষণ রকম ক্লান্ত। হয়ত আওরঙ্গজেবের মাথায় অন্য কোনও পরিকল্পনা পাক খাচ্ছে।
ধারমতের যুদ্ধ জয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই আরও একটা বড় যুদ্ধে মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সর্বোচ্চ সম্পদশীল মানুষটির বিশাল বাহিনীকে ধরাশায়ী করে, বিদ্রোহী বাহিনীর বিজয়ের ঘন্টা বাজিয়ে আওরঙ্গজেব প্রমান করলেন যুদ্ধবিদ্যা আর প্রশাসনিক কাজে তার তুল্যমূল্য জ্ঞানী অন্তত সেই মুহূর্তে মুঘল হিন্দুস্তানে আর কেউ ছিল না। দারার বাহিনীর বহু সেনানায়ক প্রাণ দিলেন — দেওয়ান মহম্মদ সালিহ, আলিমর্দান খানের দুই পুত্র, দিলির খান রুহেলার ভাই, বারহার সৈয়দদের মত অনেকেই। আওরঙ্গজেবের ছোট বাহিনী মোটামুটি অটুট রইল — প্রাণ দিলেন শুধু আজম খান অতীতের মুলতাফত খান। দক্ষিণের দেওয়ান এবং মীর খলিলের ভাই সাজাব্বর খান, সৈয়দ দিলাব্বর খান, হাদিদাদ খান, জুলফিকার খান। বাহাদুর খান আহত হলেন। ডানদিকের বাহিনীরই গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল, তাছাড়া অন্যান্য কলামগুলো ক্ষতি সামলে দিতে পেরেছিল।
দারার যুদ্ধ পরিকল্পনাটি পড়েফেলা ছিল খুবই সহজ। পুরোনো ধরণের রণনীতি অবলম্বন করে প্রথমেই বিপক্ষের ওপর তীব্রভাবে গোলাগুলি চালিয়ে শত্রু বাহিনীর মুখটা ফাঁক করে দিয়ে, সেই ফাঁক দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ঢুকিয়ে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর অক্ষহৃদয়, প্রধান সেনাপতির কাছে তাঁর বিশাল বাহিনীকে চালনা করার সহজ সরল পরিকল্পনা ছিল তাঁর। আওরঙ্গজেব ধরা পড়লে বা মারা গেলে তার যুদ্ধ জয় সময়ের অপেক্ষামাত্র। দাবা খেলায় প্রথম কয়েক চালে রাজাকে মাত করার মত ব্যাপার ঘটাতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই শুরু থেকে নিরন্তর গোলান্দাজি আর দুরন্ত মধ্য এশিয় অশ্বারোহী বাহিনীকে চরমভাবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব জানতেন তাঁর বাহিনী শাহী বাহিনীর তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম। তাঁকে শত্রুপক্ষের ভুলের সুযোগ নেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে হবে। বিশাল বাহিনীর নেতা দারা আত্মম্ভরিতায় এবং স্বাভাবিক যুদ্ধ-অনভিজ্ঞতায় একের পর এক ভুল করতে থাকবেন। বিপক্ষের সেনাপতিকে তারই তৈরি করা ভুলের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলে, আওরঙ্গজেব যুদ্ধ জয়ের কাজটা সমাপন করবেন। সমুগড়ের যুদ্ধে শাহী পক্ষ খালিলুল্লা খানকে খলনায়ক বানিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আগেই বলেছি ঘটনাটা যদি সত্যিও হয়, ততক্ষণে যুদ্ধের ভাগ্য তৈরি হয়েগেছে। দারার অহং, নির্বুদ্ধিতা আর যুদ্ধ বিষয়ে অনভিজ্ঞতা যুদ্ধকে আওরঙ্গজেবের দিকে ঢলিয়ে দিল। ধারমতে যুদ্ধের প্রভাব সমুগড়ে বিস্তৃত হল। আওরঙ্গজেবের চোখ এখন আগরায় সিংহাসনের দিকে। (চলবে)