| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১০৭ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪৩৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০২২

আগরা কেল্লা দখল, সমুগড় থেকে আগরা

২৯ মে ১৬৫৮ সমুগড়ে যখন তীব্র গতিতে যুদ্ধ চলছে, সারা দিন একটাই প্রশ্নে আগরার বাজার সরগরম — বিদ্রোহ দমনের যুদ্ধে জিতবে কে? বিশাল বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের ওপর হামলা করা দারা, না কী শাহজাহানের অসুস্থতার বাহানায় শাহী বাহিনীর ওপর হঠকারী হামলা করা বিদ্রোহী আওরঙ্গজেব-মুরাদ। দূরে কামানের আওয়াজে ঘন্টায় ঘন্টায় নানা রকম গুজব তৈরি হচ্ছিল সমৃদ্ধ স্বর্ণালী অতীতের ধ্বংসস্তুপ আগরার বাজারে বাজারে — যে সমৃদ্ধি কেড়ে নিয়ে গিয়েছে দুদশক আগে শাহজাহানাবাদ, নতুন দিল্লি। দুপুর ২টোর পর থেকে আগরার তোরণে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা একে একে আহত সেনাকে আবির্ভূত হতে দেখা যেতে লাগল। কিন্তু তারা ছিল প্রথম পর্বের পলাতক – তখনও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ হয় নি। তবুও ঘোড়ার মুখে যুদ্ধের সংবাদ শুনে গুজব আরও উদ্দাম গতিতে ছড়াতে শুরু হরল দিকবিদিক। রাত ৯টা নাগাদ চিত্রিত ঘোড়ায় চড়ে হাতে গোনা কয়েকজন দরজা পেরিয়ে কেল্লায় ঢুকেগেলেন। আগরার বাজারিরা জানেন এরাই দারার দল। তারা যুদ্ধের খবর শাহী ঘোড়ার মুখ থেকে পেলেন — দারার হার হয়েছে। কেল্লার দরজা বন্ধ হল বিপুল শব্দে। শাহী সেনাপতি দারার অন্দরের দরজাও বন্ধ হল। জাহানারা আর সম্রাট দারার ভৃত্যের থেকে হারের সংবাদ শুনলেন। কেল্লার ভিতর থেকে তীব্র স্বরে বিলাপের আওয়াজ ভেসে ছেড়ে গেল আগরার আকাশ-বাতাস। জেনানার মহিলারা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। বিদ্যুৎ গতিতে শাহী বাহিনীর হারার সংবাদ দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ল। প্রত্যেকের প্রশ্ন আগরার এখন কতদূর নিরাপদ?

বিষাদের ভার একটু কমলে, কয়েক ঘন্টা বাদে শাহজাহান খোজা দাস মার্ফত দারাকে বার্তা পাঠালেন ‘তুমি ভাগ্যের ফেরে এই অবস্থায় উপনীত হয়েছ। আমার সঙ্গে এখুনি দেখা কর। আমি তোমায় উপযুক্ত উপদেশ দেব। তারপর তোমার ভাগ্য তোমায় যেখানে নিয়ে যায়, যেও। ভাগ্যে যা লেখা আছে, তুমি যেখানেই যাও, তাকে খণ্ডানোর উপায় তোমার হাতে নেই’।

দারা দেহে, মনে যেন রক্তমাংসের মানব ধ্বংসস্তুপ। ৪০ ঘন্টা যুদ্ধের ক্লান্তি — গ্রীষ্মের রোদে দুদিনের সেনা অভিযান, সারা দিন ধরে তীব্র গরমে যুদ্ধের শ্রান্তি আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসার মর্মবেদনা। ভবিষ্যতের সম্রাটের সিংহাসনে বসার সম্মানটাও যেন লুঠ হয়েগেছে। তাঁর হঠাৎ মনে হল, যুদ্ধের আগে স্বয়ং শাহজাহান চান নি তিনি যুদ্ধে যান; সম্রাট নিজের ব্যক্তিত্বে ভাইদের মধ্যে সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বাবার কথা শোনেন নি, আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝুঁকি তিনিই নিয়েছিলেন সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। বাবা তাঁর ইচ্ছে মান্য করে তাকে মনেরমত বাহিনী সাজিয়ে দিয়েছিলেন — অর্থের অভাব ছিল না, সেনার অভাব ছিল না, রসদেরও অভাব ছিল না। কিন্তু সিংহাসন দখলের যুদ্ধ-জুয়ায় তিনি সব হারালেন। আগরা ছেড়েছিলেন ‘তখত ইয়া তাবুদ’ উচ্চারণ করে। ফিরলেন বিজয় পতাকাকে আওরঙ্গজেবের পক্ষে সঁপে দিয়ে। বাবাকে উত্তর দিলেন, ‘হতভাগ্যতার ক্লান্তি নিয়ে আমার মহামহিমের সামনে উপস্থিত হওয়ার মুখ নেই। আমি যদি এখানে বেশিক্ষণ থাকি তাহলে মৃত্যুর সেনাবাহিনী আমায় ঘিরে ফেলে হত্যা করবে। আমার লাঞ্ছিত মুখ দেখার খোয়াব ত্যাগ করুন। আমার চলে যাওয়ার অনুমতি দিন। এই অর্ধমৃত মানুষটি, দূরে চলে যাওয়ার আগে আপনার কাছে ফাতিহা পাঠের অনুরোধ করছি’। যদুনাথ বলছেন ঈশ্বরদাস যদিও লিখছেন দারা সম্রাটের নাটকীয় সাক্ষাতকারের কথা, কিন্তু অধিকাংশ পারসিক গ্রন্থ তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করছে না। মনে হয় যুদ্ধ থেকে ফেরার পর দারা আর বাবার মুখোমুখি হওয়ার গুস্তাখি করেন নি।

সম্রাট বুঝলেন দারার আগরায় থাকা ঝুঁকির হয়ে যাবে — তাকে শহর ছেড়ে চলে যেতেই হবে। দারার আগরা ছেড়ে চলে যাওয়া যেন সম্রাটের দেহের এক অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়া। জয়ী শত্রু আসার আগেই দারার পলায়নের সব ব্যবস্থা করে দিলেন সম্রাট। দারার সামনে খাজাঞ্চিখানা খুলে দেওয়া হল। কয়েকটা গাধার উটের পিঠে কয়েক বস্তা মোহর দেওয়া হল। জাহানারা তাঁকে যথাসাধ্য সম্পদ দিয়ে সাহায্য করলেন। দিল্লির সুবাদারকে সম্রাট লিখলেন রাতেও দোকান খুলে রাখ — সম্রাট দোকান থেকে যেমন দিনের যে কোনও সময়ে হাত খোলাভাবে পণ্য কেনেন, সে সুযোগটা দারাকে দিতে হবে।

কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দারা আগরা ছাড়লেন। স্ত্রী নাদিরা বানু, বাচ্চারা, হাতে গোণা দাসীকে কাপড়ে ঢেকে হাতিতে তুললেন। দীর্ঘ পথ সহজে যাত্রা করার জন্যে যতটা দরকার ততটা গয়না, অর্থ আরও কিছু দামি সম্পদ আর ঘোড়ায় চড়া কয়েক জন নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে তিনি ভোর ৩টেয় আগরা ছেড়ে দিল্লির দিকে রওনা হলেন শাহজাহানের একটুকরো কলিজা। তাঁর বাহিনীর বহু সেনা এতই ক্লান্ত ছিল যে তারা সে রাতে দারার সঙ্গে আগরা ছাড়তেই পারল না। দুদিনের মধ্যেই ৫,০০০ সেনার ছোট দল তার সঙ্গে পথে যোগ দিল। আওরঙ্গজেবের আগরা অবরোধ না হওয়া পর্যন্ত আর আওরঙ্গজেব দিল্লির পথ বন্ধ না করা অবদি শাহজাহান দারাকে দুহাত খুলে সম্পদ আর প্রয়োজনীয় সব ধরণের রসদ পাঠিয়েছেন।

আওরঙ্গজেব আগরায় এলেন

সমুগড়ের বিজয়ী রাজকুমার হাতি থেকে নেমে যুদ্ধরাঙা মাটিতে হাঁটুমুড়ে বসে সর্বশক্তিমানকে স্মরণ করলেন, কৃতজ্ঞতা জানালেন। দুবার প্রার্থনা জানাবার পর দারার শিবিরে পৌঁছে দেখলেন শাহী সেনারাই সব দামি আসবাবপত্র, সম্পদ লুঠ করে পালিয়ে গিয়েছে। সেনাপতিরা আওরঙ্গজেবের পাশে এসে তাঁকে যুদ্ধ জয়ের শুভেচ্ছা জানালেন। কিছু পরে এলেন আরেক জয়ী ভাই মুরাদ বখশ। তাকেও সানন্দে বরণ করে নেওয়া হল। আওরঙ্গজেব বললেন এই জেতাটা তার ছোট ভায়ের বীরত্বের জন্যেই ঘটল। সে দিন থেকেই মুরাদের রাজত্বকাল শুরু হল। মুরাদের ক্ষত সারাবার জন্যে দক্ষ চিকিৎসক এল। কাফিখান লিখছেন চিকিৎসকেরা যতক্ষণ তার মুখের ক্ষত সারাচ্ছিলেন ভায়ের মাথা আওরঙ্গজেব তাঁর উরুর ওপরে রেখে মুখের রক্ত নিজের জামার হাতা দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিলেন আর তার ক্ষত দেখে কেঁদে চিৎকার করে উঠছিলেন। আওরঙ্গজেবের তাঁবু গুলালবর এখানে তুলে আনা হল। তিনি তাঁবুতে বিশ্রাম নিতে নিতে দরবার বসালেন। যুদ্ধে যারা বীরত্ব দেখিয়েছেন তাদের খেতাব দিলেন, পদ দিলেন। আতসবাজিতে আকাশ রাঙা হয়ে উঠল।

দুদিনের যাত্রা শেষে ১ জুন পবিত্র রমজান মাসে আওরঙ্গজেব আগরা শহরের বাইরে নুর-মঞ্জিল বা ধারায় পৌঁছলেন। বিজয়ী শাহজাদার সঙ্গে মোলাকাত করতে প্রখ্যাত মানুষদের আসার বিরাম নেই। কেউ কেউ যেমন মামা শায়েস্তা খান আর আওরঙ্গজেবের বিশ্বস্ত বন্ধু সহকারী মীর জুমলার পুত্র মহম্মদ আমিন খান তাঁর আগরা পৌঁছবার আগেই, শহরের তোরণের বেশ কিছুটা বাইরে এগিয়ে সানন্দে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। দারার আমলা, সেনাপতিরাও আওরঙ্গজেবকে প্রণতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। হেরে যাওয়া বাহিনীর বহু সেনা দারার বাহিনী ছেড়ে আওরঙ্গজেব আর মুরাদের বাহিনীতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার নতুন সেনাকর্মী বহাল হওয়ায় দুইভায়ের বাহিনীর আকারে আড়ে বহরে বিপুল বাড়ল।

শাহজাহান জানেন অস্ত্রের মুখে পাঠানো বিজয় বার্তা আওরঙ্গজেব সফলভাবে রুখে দিয়েছেন। শান্তি আলোচনা শুরু করার ক্ষেত্রে শাহজাহানের হাত বাঁধা। তিনি যুদ্ধকার্ড খেলে হেরে গেছেন। তাঁর হাতে একমাত্র পথ দৌত্যের পথ ধরা। আমরা দেখেছি কীভাবে মাস পাঁচেক আগে জানুয়ারিতে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে গ্রেফতার করলে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে চিঠি লিখে তিরষ্কার করে উজিরের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। বুরহানপুরে পৌঁছে আওরঙ্গজেব ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সম্রাটকে চিঠি লিখে সম্রাটের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে দারার ক্ষমতা দখল ব্যর্থ করা এবং দারা যেভাবে সরকার চালাচ্ছে তাকে বন্ধ করার বার্তা দিয়েছিলেন। সেই চিঠির মনোমত জবাব আওরঙ্গজেবের কাছে আসে নি। তাছাড়া ধারমতে যশোবন্ত সিংহকে হারাবার পরে তিনি নতুন উজির জাফর খানকে চিঠি লিখে মহামহিমকে জানাতে বললেন, দেশজুড়ে সম্রাটের স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্রী সব গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তিনি লিখলেন সে সব শয়তানি প্রচেষ্টা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এবং দারা চক্রান্ত করে, সম্রাটকে বুঝতে না দিয়ে যেভাবে সম্রাট এবং সাম্রাজ্যের সব ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে, সেসব বিষয় সম্রাটকে বলার উদ্দেশ্যে উদ্বেগ বুকে চেপে দক্ষিণ থেকে দুই ভাই দরবারে আসছিলেন। তার আগরা যাত্রাপথে বাধা তৈরি করার জন্যে যশোবন্ত রাস্তায় তাকে বাধা দেয়। তিনি যশোবন্তকে প্রতিহত করেন। তিনি বিদ্রোহী নন। শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে সম্রাটের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলতে রাজি নন। সেই চিঠি পাঠাবার একমাস পর চম্বল পার হওয়ার সময় দিদি জাহানারার চিঠি পেলেন। চিঠিটা পড়ে তার যেন মনে হল সেটা সম্রাটেরই বার্তা নাও হতে পারে, এতদিন যেমন সম্রাটের বকলমে তাঁর দুই বড় দাদা-দিদি সম্রাটকে চালনা করেছেন, এটাও সেই ধরণের উদ্যম; সম্রাটের নামে দাদার দিদির বার্তা। চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠছেন। নিজেই প্রশাসনে হাল ধরে তার অসুস্থতার সময় যে সব বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, সেসব তিনি নিজে সমাধান করার জন্যে উদ্যোগী হয়েছেন। তুমি যেভাবে সশস্ত্র হয়ে এগিয়ে আসছ সেটা সম্রাটের ওপরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার সামিল। তার এটা যদি বড় ভাই, দারার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে শরিয়ত আইন এবং প্রথাগত আইন অনুযায়ী সে তোমার বাবার মত। এর থেকে লজ্জার আর কিছুই হতে পারে না। নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে চাইলে, তোমার বাবার কর্তৃত্ব মেনে তুমি বাবাকে তোমার আর্জি জানিয়ে, তোমার বাহিনী নিয়ে এক্ষুণি ফিরে যাও’।

আওরঙ্গজেব দীর্ঘ উত্তরে লিখলেন, ‘শাহজাহান সম্রাট তাঁর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্র চালানোর ক্ষমতা হারিয়েছেন। দারা অসীম ক্ষমতা হাতে নিয়ে তিন ভাইকে ধ্বংস করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন। নিজের চোখে যুদ্ধ দেখে এসে লোকে আমায় খবর দিয়েছে তাঁর পরের ভাই শাহ সুজাকে দাদা ভাই, দারা কীভাবে ধ্বংস করেছেন। বিজাপুরে সাফল্য যখন হাতের মুঠোয়, দারার ক্রুর পরিকল্পনায় বিজাপুর দখলের প্রচেষ্টা বানচাল হয়ে যায়। বিজাপুরীরা যাতে আমায়, দক্ষিণের সুবাদারকে না মানে সে চেষ্টা আমার দাদা ভাই, দারা সব সময় করেছে। সে ভাইদের বিরুদ্ধে বাবার কানে সারাক্ষণ বিষ ঢেলেছে। আমার একফোঁটা দোষ না থাকলেও আমার হাত থেকে বেরার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত চলছে, সেই চক্রান্ত রুখতে আমি বাধ্য হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছি। আমার ইচ্ছে, ব্যক্তিগতভাবে সম্রাটের কাছে গিয়ে কদমবুশি করে তার স্বাস্থ্য বিষয়ক কিছু কুশল প্রশ্ন করার। যা কিছু ঘটনা ঘটছে, ব্যক্তিগতভাবে সব কিছু তাকে খুলে বলে তার দৃষ্টি উন্মুক্ত করা। কিন্তু আমার প্রিয় দিদু দেখুন, [আমার আগরা যাওয়ার পথে] যশোবন্তকে দিয়ে কীভাবে আমার বিরুদ্ধে সেনা লেলিয়ে দিলেন আমার দাদা। আমার প্রস্তাব হল দারা সমস্ত চক্রান্ত জাল ছড়ানো বন্ধ করে দরবার ছেড়ে তার জন্যে বরাদ্দ সুবা পাঞ্জাবে ফিরে যাক’।

সমুগড় যুদ্ধের পরেই আর মাধ্যম নয়, আওরঙ্গজেব সরাসরি সম্রাটকে লিখলেন, কীভাবে তাঁর ওপরে শত্রুরা যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। আগরায় নুর-মঞ্জিলে ১ জুন পৌঁছে সম্রাট নিজের হাতে চিঠি লিখে তাঁকে, তাঁর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিয়েছেন। দুই উচ্চপদস্থ আমলা ফাজিল খান, প্রধান কাজি সৈয়দ হেদায়েতুল্লা চিঠির সঙ্গে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার মৌখিক বার্তাও জানালেন। পরের দিন তাঁরা আবার এলেন সম্রাটের পক্ষ থেকে প্রভূত উপহার নিয়ে। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেব খবর পেয়েছেন কীভাবে সম্রাট পলাতক দারাকে পিছন থেকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেচলেছেন। তাঁর মনে হল, আগরা কেল্লায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোটা মৃত্যু ফাঁদও হতে পারে। পরামর্শটা তাঁকে দিয়েছিলেন শায়েস্তা খান – আওরঙ্গজেবের মামা, সম্রাট-দারা-জাহানারা অক্ষের সঙ্গে যার খুব একটা বনিবনা ছিল না। দুই বৃদ্ধ ফাজিল খান আর সৈয়দ হেদায়েতুল্লা আওরঙ্গজেবকে জানালেন আওরঙ্গজেব যেন সম্রাটের বিরুদ্ধে সমস্ত বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলেন। সম্রাট তাঁকে পছন্দ করেন। সম্রাটের আদেশ মান্য করা উচিৎ। ৫ তারিখ ফাজিল খান তৃতীয়বার দৌত্যে এসে সম্রাটের দেওয়া চিঠি আর সম্রাটের মৌখিক বার্তা দিয়ে বললেন যেভাবে সম্রাটের চরিত্রের ওপর কালিমা লেপা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সম্রাট তাঁকে ডেকে তাঁর স্নেহ প্রদর্শন করতে উৎসাহী। ফাজিল খানের সঙ্গে খালিলুল্লা খান ছিলেন। এবারেও তাঁকে সম্রাটের সকাশে নিয়ে যেতে ফাজিল খান ব্যর্থ হলেন। তিনি সম্রাটকে জানালেন, ‘বিষয়টা চিঠি আর ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে সমাধান করার বাইরে চলে গেছে’।

সেই রাত থেকে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে আগরা কেল্লা অবরোধ শুরু হল। আওরঙ্গজেবের কঠোর নির্দেশ উপেক্ষা করে মুরাদের বাহিনী আগরার বেশ কিছু অঞ্চল লুঠ করে বেশ কিছু অঞ্চলে দুর্বিসহ অবস্থা তৈরি করে। ৩ তারিখে আওরঙ্গজেব বড় ছেলেকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে আগরা শহরের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জান-মাল রক্ষার দায়িত্ব দিলেন। কারোর মতে আওরঙ্গজেব আগরার কোতোয়াল সিদ্দি মাসুদকে হত্যা করিয়ে নিজের লোক বসান। আগরা আওরঙ্গজবের নিয়ন্ত্রণে এল। কেল্লায় সম্রাট বন্দী হলেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev