কেল্লা অবরোধ
যে সম্রাট নিজের ভাই আত্মীয়দের হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন, যে সম্রাট এক শাহজাহার পরামর্শে অন্য শাহজাদার বিরুদ্ধে সৈন্য সজ্জা করান, তাঁর দেওয়া অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করে কেল্লায় প্রবেশ করা বাস্তবজনোচিত সিদ্ধান্ত হবে না সেটা আওরঙ্গজেব জানতেন। ৫ জুন ফাজিল খানের দৌত্যের পরে সম্রাট জানলেন আওরঙ্গজেব বাবার সদিচ্ছা প্রকাশের ওপর আর নির্ভর করছেন না। সম্রাট পাল্টা সুরক্ষা হিসেবে দুর্গের দরজা বন্ধ করলেন। তিনি বিদেশী রক্ষীবাহিনী কালমাক, হাবসি আর তুর্কদের ওপর কেল্লা অবরোধের দায়িত্ব দিলেন। রাতে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি জুলফিকার খান, বাহাদুর খান কেল্লা আক্রমন করলেন। কামান দেগেও খুব একটা ক্ষতি করা গেল না। পাল্টা রণনীতি হিসেবে যমুনা থেকে খিজিরি দরজা দিয়ে কেল্লায় জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হল। কেল্লার নিজস্ব পানীয় আর মিষ্টি জলের ব্যবস্থা ছিল না। সারা কেল্লা নির্ভর করত যমুনার জলের ওপরে। দুদিনেই শাহী পরিবারে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল। অসুস্থ শাহজাহান আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আবারও ফাজিল খান দৌত্যে আওরঙ্গজেবের শিবিরে এলেন। আওরঙ্গজেব পর পর দুটো বিশাল প্রাণঘাতী যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছেন। দুটি যুদ্ধই তার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সম্রাটের জ্ঞাতসারে। দ্বিতীয় যুদ্ধে সম্রাট খাজাঞ্চি খুলে, নিজের হাতে তার অহংকারী বড় ছেলের বাহিনী সাজিয়ে দিয়েছেন। দুটোর একটা যুদ্ধে আওরঙ্গজেব মারাও যেতে পারতেন। সম্রাটের পাঠানো বার্তার উত্তরে আবারও বিনীতভাবে আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, বাস্তব কারনে আমার পক্ষে আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনি যদি কেল্লার দরজা খুলে দেন, তাহলে আমার ভেতরে ঢুকে আপনার ইচ্ছে মত কাজ করতে রাজি। জলের অভাবে শাহী পক্ষ কেল্লার দরজা খুলে দিতে বাধ্য হলেন।
৮ জুন আগরা কেল্লার দখল নিলেন আওরঙ্গজেব। পুরোনো প্রশাসনের প্রত্যেক কর্মী বরখাস্ত করলেন শাহজাদা। প্রত্যেকটা ঘরের দায়িত্ব, নিরাপত্তা বুঝে নিলেন। দেশের অন্যতম সেরা কেল্লা, তার সম্পদ, তার রসদ বিনা যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে এল। আওরঙ্গজেবের পুত্র মহম্মদ সুলতান ঠাকুর্দাকে যথোচিত সম্মান দেখালেন। বোঝা গেল তিনি সম্রাটকে এই কয় দিন চোখে চোখে রাখার দায়িত্ব পেয়েছেন। ভাগ্যহত রাজার রাজা শাহেনশাহ এখন পুত্রের হাতে কার্যত বন্দী। তাঁরই তৈরি দেওয়ানি আমওখাসের চেহেল সেতুনের পিছনের ঘরে সম্রাটকে সাড়ম্বরে রাখা হল। সম্রাটের ঘরে ঢোকা বেরোনো নিয়ন্ত্রিত হল। কেল্লার প্রত্যেক কর্মী নজরবন্দী থাকলেন। আওরঙ্গজেব নিজের হাকিম নিয়োগ করলেন সম্রাটের চিকিৎসায়।
১০ জুন সমঝোতার বার্তা নিয়ে জাহানারা আওরঙ্গজেবের শিবিরে দেখা করতে এলেন। অতীতের মত সম্রাট-দারা-জাহানারা অক্ষের ক্ষমতা ম্যানিপুলেশনের কাজ আবার কী শুরু করবেন দিদি পাদিশা বেগম? কিন্তু পাশার দান পাল্টেগেছে। এবারে তাদের পুরোনো প্যাঁচপয়জারের প্রাবল্য অদৃশ্য। দেখন উদ্দেশ্য সম্রাটের পক্ষ থেকে ভাইদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করার মহান সমাধান প্রস্তাব দেওয়া। গোপন উদ্দেশ্য পলাতক দারা সহ নিজের পুরোনো ক্ষমতা অক্ষকে নিরাপদ রাখা। তিনি জানালেন সম্রাট চান মুরাদ গুজরাট, দারা পাঞ্জাব, সুজা বাংলা আর সাম্রাজ্যের বাকি অংশ বুলন্দ ইকবাল উপাধি নিয়ে আওরঙ্গজেব নিয়ন্ত্রণ করুন। আওরঙ্গজেব প্রথম দিকে নির্বাক থেকে সম্মানীয় দিদির বার্তা শুনলেন। ছল করে দারার মুক্তি চাইতে আসা দিদি জাহানারা আজ ক্ষমতাচ্যুত। দুটো যুদ্ধে হেরে ক্ষমতার অংশীদার শাহজাদা দারা পলাতক। কয়েক মাস আগেও সর্বক্ষমতা সম্পন্ন পাদিশা বেগম জাহানারা এবং স্বয়ং শাহনশাহ আজ ক্ষমতাহীন। প্রত্যেকেই আওরঙ্গজেবের দয়ার মুখাপেক্ষী। আওরঙ্গজেব যখন সুবাদার ছিলেন তাঁকে হাঁটুমুড়ে এই অক্ষের কাছে ন্যায্য দাবি পেশ করে বারবার হকের পাওনা, আপন সম্মান, মুঘল সাম্রাজ্যের সুনাম রক্ষার ভিক্ষা চাইতে হয়েছে। প্রকৃতির পরিহাসে ক্ষমতার রশির হাত বদল হয়েছে। রাজনীতিতে বিশাল কিছু ওলটপালট না হলে ক্ষমতা কেন্দ্রে আওরঙ্গজেবের বসা এখন সময়ের অপেক্ষা এ তথ্য জাহানারা হাড়ে হাড়ে জানেন। অতীত অভিজ্ঞতায় আওরঙ্গজেব, সম্রাট-দারা-জাহানারা অক্ষের ওপর নিয়ন্ত্রণে বিন্দুমাত্র ঢিলে দিতে রাজি নন। বিনীতভাবে জাহানারার দাবি নাকচ করে তিনি দারাকে ধর্মদ্রোহী, হিন্দু-বন্ধু আখ্যা দিলেন, ‘তাকে উচ্ছেদ না করে আমার পক্ষে কোনও প্রস্তাব নিয়েই সম্রাটের সঙ্গে আলাপ করা সম্ভব নয়’। তবুও জাহানারা তাঁর ব্যক্তিত্বে ওজন প্রয়োগ করে বহু চেষ্টায় আওরঙ্গজেবকে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে রাজি করালেন।
পরের দিন বিশাল মিছিল করে আওরঙ্গজেব বাদশাহ দর্শনে চলেছেন। রাস্তার মাঝেই শায়েস্তা খান আর মীর শেখ আওরঙ্গজেবের মিছিল আটকে জানালেন প্রাসাদে তাতার রক্ষী লেলিয়ে তাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হয়েছে। তিনি জেনানায় ঢুকলেই তাতার রুশ মহিলা দাসেদের দিয়ে তাকে হত্যা করা হবে। কেল্লায় তাঁর না যাওয়াই মঙ্গল। তিনি হাতি দাঁড় করিয়ে দোনোমনা করছেন। সেই মুহূর্তে কেল্লা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে জনৈক তাতার দাস নাহির-দিল আওরঙ্গজেবের হাতে সম্রাটের হাতে লেখা একটি গোপনীয় চিঠি দিল। সম্রাট নাহির-দিলকে চোলাই করে, সকলের চোখ এড়িয়ে চিঠিটা দারাকে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সম্রাট বড় ছেলেকে লিখছেন, ‘দারা শুকো! দিল্লিতে গ্যাঁট হয়ে বসে থাক। দূরে যেও না। দিল্লিতে সম্পদ আর সেনার অভাব নেই। আমি আগরার মামলা সামলে নিচ্ছি’।
শায়েস্তা খানের আশংকাই সত্যি প্রমাণিত হল। সেই মুহূর্তে হাতি ঘুরিয়ে দৃশ্যত বিরক্ত ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব শিবিরে ফিরলেন। ইত্তেফাকসে তাঁর প্রাণ বাঁচল। সম্রাটের ঘরে পাহারা জোরদার হল – বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্রাটের যতটুকু যোগাযোগ ছিল তাও বিচ্ছিন্ন করা হল। কালিকারঞ্জন কানুনগো লিখছেন, ‘এক খাসিকৃত[খোজা] বাঙালি মুসলমানকে ‘এতেবার খাঁ’ উপাধি দ্বারা সম্মানিত করিয়া আওরঙ্গজেব আগরা দুর্গে বৃদ্ধ শাহজাহানের প্রহরী নিযুক্ত করিলেন’। খোঁজ নেওয়া যাক, বন্দী সম্রাটের পাহারাদারদের মাথা এই ‘এতেবার খাঁ’ পরিচয়টুকু।
কালিকারঞ্জন উল্লিখিত বাঙালি খোজা ‘এতেবার খাঁ’র পরিচয় পেয়েছি গাভিন হাম্বলির আ নোট অন দ্য ট্রেড ইন ইউনকস ইন মুঘল বেঙ্গল প্রবন্ধে। হাম্বলি বলছেন সুলতানি আমল থেকেই বাংলা [হয় সিলেট না হয় ঘোড়াঘাটের] ছিল খোজা সরবরাহকারীদের ঘাঁটি। খোজা ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ মুসলমান। তারা খোজা করার জন্যে বালকদের কিনত হয় পিতামাতা থেকে, না হয় তারা ছেলেধরাদের থেকে বালক জোগাড় করত। আর ব্যবসায়ী যদি খোজা বালক না পেত, তাহলে তাকে বালকটিকে খোজা করার ব্যবস্থা করতে হত। খোজা করার কাজ করত অমুসলমান হিন্দু বৈদ্যরা। খোজা করে বা খোজা করার জন্যে বাচ্চাদের বিক্রি করে দেওয়ার জন্যে পরিবারের প্রণোদিত হত সে যুক্তি আজ ৪০০ বছর পর বোঝা মুশকিল — হয়ত গরীবি থেকে মুক্তি, হয়ত খোজাদের প্রশাসনের উচ্চপদে ওঠার পরের সামাজিক সম্মান অর্জনের হাতছানি, হয়ত বা রাজস্ব দিতে না পারার অক্ষমতা। সে সময় খোজারা যেহেতু বিপুল সামাজিক সম্মান এবং অর্থ উপার্জন করত, ফলে পরিবারের এক সদস্যকে খোজা করার অর্থ ছিল সম্ভাব্য লটারির প্রথম পুরষ্কার জেতার সুযোগ নেওয়া। এরকম একটা উদাহরণ মুসাফির মানুচি সূত্রে পাচ্ছি কালিকারঞ্জনের ভাষায় ‘এক খাসিকৃত[খোজা] বাঙালি মুসলমান এতেবার খাঁ’ বা ইতিবর খান। বাঙালি খোজা। আওরঙ্গজেবের খুবই প্রিয়পাত্র। ষষ্ঠ মুঘল সম্রাটের সময় উচ্চপদের আমলাদের অন্যতম। বিশাল প্রাসাদে একা থাকতেন। আওরঙ্গজেব খোজা মুতামিদ বা ইতিবর খানকে শাহজাহানএর কারাবাসের সময় কারাগার পাহারা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সে সময় ছিলেন আগরা কেল্লার শাহী কারাগারের সুপারিন্টেনডেন্ট। ইতিবর খানের জন্ম বাংলায়। বাল্য বয়সের খোজা হয়ে মুঘল শাহী প্রশাসনে তিনি ঢুকে ক্রমশ উচ্চপদে আরোহন করেন। আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণের উত্তর সময়ে তিনি দরবারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত হিসেবে গণ্য হতেন। খোজা পুত্রের নাম সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে, বাঙালি পিতামাতার কানেও পুত্রের খ্যাতি কানে গেল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর এই প্রথম খোজা ইতিবর বা মুতামিদের বাবা-মা বাংলা থেকে আগরায় এলেন পুত্রের সঙ্গে দেখা করতে। পিতামাতা যেহেতু তাকে শৈশবের সব থেকে দামি অনুভূতি, পরিবারের সদস্যদের ভালবাসা থেকে বিচ্যুত করেছেন, তাই তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রাসাদের দরজায় বহু দিন অপেক্ষা করিয়ে চাবুক মেরে তাড়িয়ে দেন — ‘ খোজা হওয়ার পর যে মানুষেরা বাচ্চাটার দায়িত্ব নেয় না, আমি স্বচ্ছল হতে তারাই আমার অনুগ্রহ পেতে ছুটে এসেছে’। হয়ত অতিরঞ্জিত, কিন্তু বাচ্চাদের খোজা করার তাগিদের একটা যুক্তি পাওয়া গেল।
যাই হোক যমুনা পারের দারার প্রাসাদ দারা কি হাভেলি, যেখানে দেড় দশক আগে আওরঙ্গজেবকে অপমান করে তাকে দরবার থেকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল বলেই সন্ত জীবনযাপন করেছিলেন, সেই ৪৫ লক্ষ টাকার হাভেলি আওরঙ্গজেব দখল নিলেন। একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল।
মুরাদ কাঁটা
সমুগড় থেকেই আওরঙ্গজেব সম্রাটের ভূমিকা নিয়েছেন। নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা না করলেও, সম্রাটের জন্যে সংরক্ষিত কাজগুলোর অন্যতম পদ বিতরণের দায় কাঁধে তুলে নিয়ে প্রকাশ্যে বিপক্ষের দল ছেড়ে আসা সেনানায়ক, সেনাদের উপাধি আর পদ বিতরণ করা শুরু করলেন। তিনি জানতেন নিজের সীমাবদ্ধতা। তাই অনুগ্রহ বিলিয়েছেন সীমিতভাবে, সেই মুহূর্তে যতটুকু প্রয়োজন ছিল ততটুকুই। আগরা কেল্লা হাতে চলে আসার পরে মুঘল প্রশাসনের রাশ নিজের নিয়ন্ত্রণে পেলেন। জাহানারা যে দিন ভায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন, ১০ জুন, সে দিন থেকে তিনি শিবিরের গুলালবর তাঁবুতে পুরোদমে দরবার শুরু করয়েছেন। ১১, ১২য় আরও বহু সেনানী আমলা পদ পেলেন। ১৩য় আওরঙ্গজেব দারাকে গ্রেফতার করার লক্ষ্যে আগরা থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। খুব দ্রুত নয়, কারন মুরাদ ইতিমধ্যে উল্টো সুরে গান গাইতে শুরু করেছে। তার লক্ষ আওরঙ্গজেবের পতন এবং সাম্রাজ্যের প্রধান মুর্সি দখল। মুরাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হওয়ার আগে তার ডানা কাটার ব্যবস্থা করলেন আওরঙ্গজেব।
সমুগড়ের যুদ্ধের পরে মুরাদের শারীরি ক্ষত তাকে বেশ কিছু কাল নিজের শিবিরে আটকে রেখেছিল। অন্তরঙ্গদের ধারণা হচ্ছিল ক্ষমতা ক্রমশ মুরাদের হাত থেকে বেরিয়ে আওরঙ্গজেবের হাতে সংহত হচ্ছে। মুরাদের অহংকে সুড়সুড়ি দেওয়া শুরু হল, চাটুকারেরা বলল দুটো যুদ্ধে মুরাদ যোগ না দিলে আওরঙ্গজেবের জেতা অসম্ভব ছিল। মুরাদের অহং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুলতে থাকে। আওরঙ্গজেবের বিরোধিতায় কোমর বাঁধলেন তিনি। সম্রাটের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি সবার আগে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। সেই যুক্তিতে তিনিই সম্রাট পদের একমাত্র দাবিদার। চোখে তাঁর মুঘলেশ্বর হওয়ার স্বপ্ন। মুরাদের ধারণা হল শাহজাহান জীবিত থাকা অবস্থায় আওরঙ্গজেবের পক্ষে দিল্লির সিংহাসন দখল অসম্ভব।
মুরাদ খোলাখুলি আওরঙ্গজেব বিরোধী অবস্থান নিলেন। সমস্যা হল মুরাদ নিজের অনুগামীদের চটিয়ে দিলেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান অহং ক্রমশঃ অনুগামীদের বিরক্তিতে পরিণত হল। তারা হররোজ বিনম্র আওরঙ্গজেবের বিনম্রভাব দেখছেন; তাঁরা দেখছেন, আওরঙ্গজেব কীভাবে নিজেকে সংযত রেখে নিজের এবং অন্য বাহিনীর শ্রদ্ধা কুড়োচ্ছেন। সেই নম্রতার ধাত মুরাদের নেই। কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধায় এবং আওরঙ্গজেবের প্ররোচনায় বেশ কয়েকজন সেনাপতি আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দিলেন। মুরাদ বাহিনী ছোট হতে হতে ২০,০০০-এ পৌঁছেছে। তবুও মুরাদের হম্বিতম্বি কমে নি। মুরাদের পরিকল্পনা ছিল আওরঙ্গজেবহীন আগরা দখল নেওয়া। আওরঙ্গজেব আগরা ছেড়ে দিল্লি যাত্রা করা মাত্র মুরাদের পারিষদেরা বলতে শুরু করল আওরঙ্গজেব দিল্লিতে পৌঁছে সবার আগে সিংহাসন দখল করবেন। আগরা দখল করলেও মুরাদের সিংহাসনে ওঠা হবে না। একমাত্র সমাধান আওরঙ্গজেবকে কাবু করে দিল্লি দখল নেওয়া। কান পাতলা মুরাদ আগুপিছু না ভেবে দিল্লি রওনা হওয়া আওরঙ্গজেবের পিছু নিলেন। পথে এমন ভাব করছিলেন যেন তুড়ি মেরে আওরঙ্গজেবকে যে কোনও মুহূর্তে উড়িয়ে দেবেন। আওরঙ্গজেব মুরাদের সমস্যা বুঝলেন। তিনি জানেন মুরাদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই। খুব শীঘ্রই মুরাদ ইস্যুকে নিউট্রালাইজ করতে হবে, না হলে বিপদ বাড়বে। আওরঙ্গজেবের মুরাদ বধ পালা পরিকল্পনা শুরু হল। বিচার দাতা আওরঙ্গজেব মুরাদ বাহিনীর আগরা লুঠ ভোলেন নি। তার শাস্তি মুরাদকে পেতেই হবে।
পিছন নেওয়া মুরাদকে বাবা-বাছা করে শিবিরে ডাকিয়ে নিলেন আওরঙ্গজেব। প্রথম আলাপেই মুরাদ অভিযোগ জানালেন তিনি এতই গরীব হয়ে পড়েছেন যে বাহিনীর জন্যে ঘোড়া কেনার অর্থ নেই। মুহূর্তের মধ্যে মুরাদকে ২৩৩টা ঘোড়া আর ২০ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ উপহার দিলেন। তাছাড়া যুদ্ধ জয়ের লুঠের রোজগারের একের তিন ভাগেরও প্রতিশ্রুতি দিলেন। মুরাদ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুস্থতার উপলক্ষ্যে আওরঙ্গজেব ভোজের নেমন্তন্ন জানিয়ে মুরাদকে আমন্ত্রণপত্র পাঠালেন। মুরাদ আওরঙ্গজেবের ভাবনার চলনটা হয়ত আঁচ করতে পারছিলেন। নম্র অজুহাতে রোজ পাঠানো ভোজের ডাক এড়িয়ে যেতে থাকেন মুরাদ। তিনিও আওরঙ্গজেবের কাছাকাছি মাপের দরবারী রাজনীতি করা মানুষ। আওরঙ্গজেবের উদ্দেশ্য তাঁর না বোঝার কারন নেই। আওরঙ্গজেবও কম নন, তিনি মুরাদের ব্যক্তিগত ভৃত্য খাওয়াস নুরুদ্দিনকে হাত করলেন। ২৫ জুন শিকার থেকে ফিরে নুরুদ্দিনের আশ্বাসে অকুতোভয় মুরাদ ভায়ের শিবিরে ঢুকবেন। মুরাদের আমলারা, সেনাপতিরা হুঁশিয়ারি জানালেন। তাদের হুঁশিয়ারি মুরাদ পায়ে ঠেললেন। মুরাদের কপালে মৃত্যু নাচছিল।
২৫ জুন আওরঙ্গজেব গুলালবরের দরবার থেকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে ভাইকে অভ্যর্থনা করলেন। মুরাদের দেহরক্ষীদের গুলালবরের বারান্দায় বসানো হল আওরঙ্গজেবের রক্ষীদের সঙ্গে। ভাইকে দরবারে নিয়ে আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত ভৃত্য বশরতের হাতে তুলে দিলেন শিকারের শ্রান্তি অপনোদনের জন্যে। শুরুর আপ্যায়নের পর দুইভাই গালিচায় বসলেন। আওরঙ্গজেব মুরাদকে সেরে ওঠার শুভেচ্ছা জানালেন। স্বাস্থ্য কামনা করলেন। উপহারে উপহারে ভরিয়ে দিলেন ভাইকে। উপহারের পরিমান, গুণমান দেখে মুরাদ চমৎকৃত। আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর রাত খাবার দেওয়া হল। বিশ্বাস জাগাতে মুরাদের পাত্র থেকে প্রথম গ্রাসটি আওরঙ্গজেব মুখে তুললেন। চনমনে খিদে নিয়ে আগ্রাসী শিকারী রাত খাওয়ার শুরু করলেন। কেউ কেউ বলে আওরঙ্গজেব মুরাদের প্রিয় সিরাজি দিয়ে রাত খাবার শুরু করেছিলেন — ‘আমার সম্মানে পান কর প্রিয় ভাই’। পানের পর বিধিবদ্ধভাবে শুরু হল রাত খাবার। ঠিক হল বিশ্রামের পরেই আগামী অভিযানের পরিকল্পনা হবে। ক্লান্ত মুরাদ ঘুমে ঢলে পড়তে থাকেন। আওরঙ্গজেবও ঘুমের দোহাই দিয়ে নিজের ঘরে চলেগেলেন। প্রায় অর্ধঅচৈতন্য মুরাদকে পাশের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হল।
বিছানায় শুইয়ে বশরত হুজুরের কোমরের খঞ্জর, তরোয়াল খুলে রাখলেন। ফাঁস খুলে জামা, পাজামা ঢিলে করে দিয়ে পা পরিচর্যা করতে লাগলেন। মুরাদ স্বস্তিতে আড়মোড়া ভাঙলেন। খোজা বশরতের পা পরিচর্যার ফাঁকেই সুন্দরী দাসী ঢুকে মুরাদকে শ্যাম্পু করানো শুরু করল। নরম হাতের স্পর্শে মুরাদের নিদ্রা কালনিদ্রায় পরিণত হল। দাসী কাজ শেষ করে বালিশের পাশে রাখা মুরাদের অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে নিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দিতেই শেখ মীর ঘুমন্ত মুরাদের দখল নিলেন। মুরাদ জেগে উঠে বুঝলেন তিনি সমস্ত কিছু হারিয়েছেন। অসহায় মুরাদ নিশ্চুপ। আওরঙ্গজেবের কারাগারে বন্দী হলেন তিনি। সালাম দিয়ে শেখ মীর শাহজাদার হতে পায়ে বেড়ি পরালেন। শেখ মীর আর দিলির খান মাঝ রাতেই তাকে কাপড়ে মুড়ে হাতিতে তুলে দিল্লির সেলিমগড়ে চালান দিলেন। সঙ্গে চলল বিশাল ঘোড়সওয়ার বাহিনী। পিছনে পড়ে রইল মুরাদের নিরাপত্তা রক্ষী দল। মুরাদের বাহিনী পরের দিন সকালে যখন ঘটনা আন্দাজ করতে পারল, ঘটনাক্রম তাদের হাতের বাইরে। দ্বিরুক্তি না করে মুরাদের বাকি সেনাপতি আওরঙ্গজেবের সেনায় ঢুকলেন। আমলাদের আওরঙ্গজেব নিজের প্রশাসনে নিলেন। মুরাদের পুত্র ইজিদ বখশকে বাবার মতই বন্দী করা হল। নুরুদ্দিনের সঙ্গে মিলে যারা মুরাদকে ভুল পথে যেতে বাধ্য করেছিলেন, তাদের হাত সম্পদে ভরল।
মুরাদের পর্ব মাথা থেকে ঝেড়েফেলে তিনি প্রাথমিক লক্ষ্য দারাকে ধরার জন্যে অভিযান নতুন করে শুরু করবেন ২৭ মার্চ। দিল্লির বাইরে পৌঁছলেন ৫ জুলাই। (চলবে)