শুরু হল সম্রাট আলমগির আওরঙ্গজেবের উপাখ্যান
আওরঙ্গজেব
ভূমিকা
“সম্রাট শাহজাহানের প্রথম পুত্র দারা, মর্যাদাপূর্ণ চরিত্র, সৌন্দর্যপূর্ণ আনন্দদায়ক চেহারা, কথাবার্তায় বিনয়ী, অধিকাংশ সময় যেন তিনি প্রভাবশালী বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে তাঁর পক্ষে নিয়ে আসার জন্যে তৈরি, অসামান্য উদার, সদয় এবং সহানুভূতিশীল, কিন্তু নিজের মতামতের প্রতি অসম্ভব আস্থাবান, তিনি মনে করতেন, পরামর্শদাতাদের সাহায্য ছাড়াই যে কোনও কাজ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সম্পাদন করতে একার বুদ্ধিই যথেষ্ট। পরামর্শদাতাদের তিনি পাত্তাই দিতেন না। ফলে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই বহু প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁকে জানাত না… তিনি মনে করতেন, ভাগ্যদেবী একমাত্র তাঁকেই জয়মাল্য অর্পণ করার জন্যে বেছে নিয়েছেন এবং তাঁর ধারণা প্রত্যেকেই তাঁকে পছন্দ করে… [কিন্তু সমস্যা হল] রগচটা উদ্ধত দারা কথায় এবং কাজে প্রত্যেকটি অভিজাত আমীরকে চটিয়ে রেখেছিলেন, তিনি কাউকেই পছন্দ করতেন না …দরবারে প্রত্যেকটি অভিজাতকে তিনি খেপিয়ে রেখেছিলেন, সব থেকে বেশী খেপেছিলেন সেনাপতি এবং সেনানির্দেশকেরা… [যাঁদের] দেখেই মনে হয় তাঁরা [দারার ওপর] ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। এই সবকটা সমস্যা এক জোট হয়ে দারার পতন এবং মৃত্যুকে ডেকে আনে। তিনি যদি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার মন্ত্র জানতেন, তাহলে হয়ত দেশের সম্রাট হলেও হতে পারতেন”। [The first-born son of King Shahjahan was the prince Dara, a man of dignified manners, of a comely countenance, joyous and polite in conversation, ready and gracious of speech, of most extraordinary liberality, kindly and compassionate, but over-confident in his opinion of himself, considering himself competent in all things and having no need of advisers. He despised those who gave him counsel. Thus it was that his dearest friends never ventured to inform him of the most essential things…. He assumed that fortune would invariably favour him, and imagined that everybody loved him… [but] the haughty Dara scorned the nobles, both in word and deed, making no account of them… [he] depreciated all the nobles at the court, above all the generals and commanders… [who] showed themselves aggrieved and disgusted. All these things united were the chief causes of Dara’s ruin and death. He might have been King of Hindustan if he had known how to control himself — Niccolao Manucci, Storia do Mogor]
নিকোলো মানুচি, স্তোরিয়া দো মোগর
শাহজাদা আওরঙ্গজেব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার পর দরবারি কবি আলভি তাঁর নামে স্তুতিকাব্য ইফতিতাইসুলতানি (রাজত্বকালের সূচনা) লিখলেন। কাব্যে আলভি শাহজাদার পৌরুষত্ব, সাহস, চকিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আক্রমনে মাথা ঠাণ্ডা রাখার দক্ষতা, এবং তাঁর রণনৈতিক যোগ্যতা বিভিন্ন প্রশংসাসূচক বাক্য তুলে ধরেন। আওরঙ্গজেবের অসাধারণ কর্মদক্ষতা দেখে আলভি মনে করতেন, স্বয়ং সর্বশক্তিমান এবং নবি মহম্মদ তাঁদের হাত শাহজাদার মাথায় রেখেছেন মুনিস ফারুখি, প্রিন্সেস অব মুঘল ইন্ডিয়া [When Aurangzeb returned from this fight, the court-based imperial poet ‘Alvi wrote a panegyric he named Iftitah-i Sultani or “The Beginning of Kingship.” In it ‘Alvi lauded the prince for his manliness, his bravery, his quick judgment, his steadiness under attack, and his military skills. Aurangzeb’s marvelous performance, ‘Alvi suggests, was a sign that God and the Prophet Muhammad were on his side.]
আধুনিক এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাস দারার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে দাঁড়িয়েছে — তাঁকে নায়ক এবং আওরঙ্গজেবকে খলনায়ক বানিয়েছে। তাসত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষ করে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার দারার ব্যর্থতার যুক্তি খুঁজতে, তাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর চরিত্রের সমস্যা নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। যদুনাথ চরমতম আওরঙ্গজেব বিরোধী। তিনি মনে করেন দারার পতনের কারণ তার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আছে। মুঘল সাম্রাজ্যে আকবরের পরেই দারাকে শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে গণ্য করেন যদুনাথ সরকার। অথচ তিনি দারার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখছেন, ‘দারা হিন্দুস্তানের ধর্মান্ধ শক্তিগুলোর সক্রিয় বিরুদ্ধাচরণ করে হিন্দুত্ব আর ইসলামের মৌল বিশ্বজনীন চরিত্র মিলিয়ে মিশিয়ে একটি সংশ্লেষী সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যম নিয়েছিলেন। কিন্তু বড় ছেলের [দারা শুকো] প্রতি বাবার [সম্রাট শাহজাহান] অন্ধ ভালবাসা তাঁর চরমতম ক্ষতি করেছে। তাঁকে চিরকালই দরবারের চার দেওয়ালের সুরক্ষায় আগলে রেখেছেন শাহজাহান — একমাত্র ব্যতিক্রম কান্দাহারের তৃতীয় যুদ্ধ — সেখানেও দারা চরম ব্যর্থ হন। তিনি নিজের হাতে যুদ্ধের শিক্ষাগ্রহণ করেন নি এবং দরবারের বাইরে থেকে নিজের সাহসে, নিজের বলে, নিজের প্রজ্ঞায় সরকার চালানোর রণনীতি শেখার সুযোগ গ্রহণ করেন নি; চরমতম রাজনৈতিক, সামাজিক বিপদে এবং আতান্তরে পড়লে পাশে থাকা বন্ধুবান্ধব, সহকারী, সাহায্যকারীরা পক্ষে বিপক্ষে কী কী ধরণের আচার আচরণ করতে পারে, সেটা বোঝার পরীক্ষাও তাকে কোনও দিন দিতে হয় নি; তিনি যুদ্ধের জন্যে তৈরি সেনাদলের সঙ্গে কাজ করারও সুযোগ পান নি। ফলে সিংহাসনে লড়াইকে যদি আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীদের যোগ্যতমের উদ্বর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করি, সেই চরম পরীক্ষাতে তিনি নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলেন দরবারি পরিবেশের বাইরে শুধু হাতে কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকার জন্যে। অতুলনীয় সম্পদের অধিকারী হয়ে, রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রে বছরের পর বছর কাটানোর প্রভাব তাঁর চরিত্রে পড়েছিল। চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে বসে থাকায় তার মধ্যে মিতাচার, সংযম এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ক্ষমতার বিকাশ ঘটে নি। বরং চারপাশের চরম চাটুকারিতার পরিবেশ তাকে গর্বিত করেছে এবং বাবার অনুগ্রহে নিজেকে দিল্লি সিংহাসনের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হিসেবে ভেবে নিয়েছেন, আমলাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। মানুষের চরিত্র আন্দাজ করার যোগ্যতা তার মধ্যে তৈরি হয় নি বলেই স্বাভিমানী এবং সবল চরিত্রের মানুষেরা, চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মত অকম্মা এবং নিরর্থক নেতাকে ত্যাগ করে যান। দারা অসামান্য স্বামী, অনুরক্ত পিতা এবং উতসর্গিত সন্তান; কিন্তু শাহী পরিবারের প্রধানতম কাজ হল দুর্যোগের সময় মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়া, সেই প্রাথমিক কাজে তিনি চরম ব্যর্থ। দীর্ঘকালীন স্বচ্ছল, নিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়া তাকে ভঙ্গুর চরিত্রের মানুষ তৈরি করেছে। বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক পরিবেশের চাহিদাক্রমে সুচতুর পরিকল্পনা করে এগোনোর জন্যে যে মানসিক চরিত্র বিকাশের দরকার ছিল, সেই অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে তিনি যান নি; ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া বিপক্ষের চোয়াল থেকে, নায়কেরমত চরম প্রত্যাঘাত করে জয়মাল্য ছোঁ দিয়ে কেড়ে আনার দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা তার ছিল না। আওরঙ্গজেবের মত অসামান্য সেনাপতি সাধারণ সেনার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে যুদ্ধ করেছেন, সেনার মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশেও যুদ্ধ জয় করার প্রণোদনা জন্মেদিয়েছেন। কিন্তু সেই শিক্ষা,দক্ষতা গ্রহণের সুযোগটাই সম্রাট তাঁকে কোনও দিন করে দেন নি। সৈন্যদলের ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত সমন্বয় করার ক্ষমতা তার বিকশিত হয় নি। সত্যকারের সেনানায়ক মাথা ঠাণ্ডা করে চরমতম হিংস্র যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে চলন্ত যুদ্ধের গতিশীলতা বুঝে, বিপক্ষের রণনীতি আগেই আন্দাজ করে তৎক্ষণাৎ দলকে চালনা করেন। সমস্যা হল স্বয়ং সম্রাটের অনুগ্রহেরর জন্যে, শাহী রাজকীয় নিরাপত্তার জন্যে, জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের এই সব শিক্ষা গ্রহণের সুযোগটাই তার হয় নি। যুদ্ধশিল্প শেখার কাজে শিক্ষানবিশি থেকে যাওয়ায় তিনি বিপক্ষের হাতে সিংহাসন তুলে দেওয়া নিশ্চিত করলেন’। — যদুনাথ সরকার, হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব
আওরঙ্গজেব মারা যান পলাশী চক্রান্তের ঠিক ৫০ বছর আগে ১৭০৭-এ। ‘বাবার হইল আবার জ্বর সারিল ঔষধে’ টাইপে মোঘল পাহশাহীর ধারাবাহিকতার সূত্র শেখা আম-শিক্ষিত নাগরিক মহলে একটা ধারণা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে যে ৬ জন মুঘল সম্রাট বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহানের রাজত্ব ধারাবাহিকতায় আওরঙ্গজেবই শেষ মুঘল পাদশাহ, যাঁর মৃত্যুতে ভারতেবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষজুড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় নেমে আসে, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইওরোপিয় ঔপনিবেশিকদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে এবং এই অন্ধকার অফলা সময়ের শেষ হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পত্তনে। উপনিবেশিক ইতিহাস প্রমান করার চেষ্টা করেছে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে উপমহাদেশ অভিভাবকহীবন ছিল; ৬ দশকের মাৎস্যন্যায় শেষে, ১৭৫৭-য় সিরাজকে হত্যা করে দ্বৈত শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তার সাত দশক পরে ১৭৬৫-তে দিল্লি সম্রাটের থেকে বাংলা-বিহার-ওডিসার রাজস্ব আদায়ের দেওয়ানি লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের হাল ধরে ভারতবর্ষকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে দিল। তাদের দাবি ভারত রাষ্ট্রের যতটুকু অর্জন, তার ভিত তৈরি করে দিয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমল। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলা তথা ভারতবর্ষ যে পিছিয়ে পড়া এলাকা ছিল, এই অনৃত ধারণা তৈরিতে প্রখ্যাততম ইতিহাসবিদদের গুরুত্বপূর্ন অবদান রয়েছে। (চলবে)