| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১০৯ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩৬৫ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০২২

মুরাদ বধ পালা

মুরদ বধ পর্ব শেষ হতে এখনও অনেক দেরি, প্রায় তিন বছর। ১৬৫৯-এর জানুয়ারিতে মুরাদ আর মুরাদ পুত্রকে গোয়ালিয়র কারাগারে পাঠানো হল। বন্দী অবস্থায় মুরাদ মুক্তির আশা হারান নি। শাহজাদার জন্যে বরাদ্দ অর্থ বিতরণ করে দিল্লির বাজারি মানুষদের মধ্যে তিনি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন। বাজারে বাজারে ফকিরেরা তার নামে গান বাঁধছিল, কিছু কিছু মানুষ মুরাদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছিলেন। তাঁরা ক্রমশ এক জোট হয়ে কারাগারের রক্ষীদের হাত করতে শুরু করেন। আওরঙ্গজেবের দরবারে গোপনে কিছু মুরাদ পার্ষদও বন্দী মুরাদের মুক্তি পরিকল্পনায় জুটলেন। আওরঙ্গজেবের কানে মুরাদ মুক্তির পরিকল্পনা পৌঁছতেই তিনি ভাইকে দিল্লি থেকে সুদূর গোয়ালিয়রে বদলি করলেন। মুরাদ সেখানে ৩ বছর কাটাবেন। গোয়ালিয়রে দিল্লির ফকির এবং অন্যান্য সঙ্গী গোপনে পৌঁছলেন। ঐতিহাসিক মহম্মদ হাশিম কাফিখানের বাবা, খাজা মীর মুরাদের দরবারে কাজ করতেন। তিনিও লুকিয়ে সেখানে পৌঁছলেন। মুরাদের বন্দীদশা কাটাতে বন্ধু, অমাত্য, অনুগামীরা পরিকল্পনা ফাঁদলেন। বহু মাসের চেষ্টায় বহু অর্থ খরচ করে বন্দী মুক্তি পরিকল্পনা তৈরি হল। বন্দীগৃহের দেওয়ালে কাছির সিঁড়ি ঝোলানো হল। সিঁড়ির নিচে রাখা হল তাজা ঘোড়া। গারদ ফাঁকা করে রাতে শুধু মুরাদের বেরোনোর অপেক্ষা। বেশ কয়েক বছর ধরে মুরাদ বন্দীগৃহে আওরঙ্গজেবের অনুমতি নিয়ে দেহ পরিচর্যার জন্যে জনৈকা সরস্বতী বাঈকে রেখেছিলেন। পালাবার আগে দীর্ঘ দিনের সাথীকে বিদায় জানাতে গেলেন। পালানোয় উদ্যত মুরাদকে দেখে সরস্বতী উচ্চস্বরে বিলাপ করে ওঠায় মুরাদের পালানো মাটি হয়ে গেল। মুরাদ আবার গ্রেফতার হলেন।

আওরঙ্গজেব আর মুরাদ কাঁটা জিইয়ে রাখতে চাইলেন না। তাঁর বড় অভিমান, তিনি বিচারদাতা। বিচার কক্ষেই তিনি তাঁকে তাঁর প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবেন। বিদ্রোহের প্রথম জোটসঙ্গী ভাই মুরাদকে অভিযুক্ত করলেন গুজরাটের উজির আলি নাকির হত্যাকাণ্ডে। সম্রাট আওরঙ্গজেব গোয়ালিয়রের কাজিকে নির্দেশ দিলেন প্রমান জোগাড় করে বিচার প্রক্রিয়া চালু করার জন্যে। উদ্ধত স্বরে মুরাদ বিচারালয়ে বললেন ‘সম্রাট আমায় যে প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস দিয়েছিলেন সে সব ভুলে যান তাতে আমার কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু সম্রাট আওরঙ্গজেব যদি অপ্রয়োজনে এই অসহায় প্রাণীর জীবন নিতে চান, তাহলে এই সব নিচুস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেই বা লাভ কী? তোমাদের যা ইচ্ছে, কর’। কাজি মুরাদকে উজির আলি নাকির হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন। আলি নাকির উত্তরাধিকারীরা পূর্বজর মৃত্যুর জরিমানা হিসেবে অর্থ নিয়ে মুরাদকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করলেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর হল। ১৬৬১, ৪ ডিসেম্বর, দুই জল্লাদ ‘দেহের বন্দী দশা থেকে’ শাহজাদাকে মুক্তি দিল। গোয়ালিয়র কেল্লার বিশ্বসাঘাতকদের গোরস্থানে ভাইকে গোর দিলেন সম্রাট। ৪০ বছর পরে আওরঙ্গজেব তখন বৃদ্ধ। তিনি ভাইএর হত্যাকণ্ডের স্মৃতি স্মরণ করেছেন অনুশোচনা না করে দরদ না দেখিয়ে। পারসিক কহবত রাজার ভাই নেই, রাজার ভালবাসাও নেই।

দারা শুকোর খোঁজে

৫ জুন ৫,০০০ সাথী সৈন্য নিয়ে দারা দিল্লি পৌঁছেছেন। আগরা আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া সত্ত্বেও, আগরা-দিল্লি রাস্তায় কড়া পাহারা বসা সত্ত্বেও বাবা আর জাহানারার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন দারা। পুরোনো শহরে বাবরের তৈরি ভেঙে পড়া কেল্লায় আশ্রয় নিলেন। সেখানেই সরকার দরবার সাজালেন। বাবার পালানোর সংবাদে বড় ছেলে তখন বাংলা থেকে বাহিনী নিয়ে ছুটে বাবার সাহায্যে আসছে। আশা ছেলের বাহিনী এলেই নতুন করে লড়াইএর ময়দানে আওরঙ্গজেবের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন সুলেইমান শুকো তাঁর আশা করা সময় পৌঁছতে পারবেন না।

৮ জুন আওরঙ্গজেব আগরা কেল্লা দখল নিয়েছেন। তাঁর পরের লক্ষ্য দাদার সন্ধানে দিল্লি যাত্রা। সামনে বর্ষা। দিল্লিতে সময় নষ্ট করা প্রাণঘাতী হবে বুঝে পাঞ্জাবে পালানোর পরিকল্পনা করলেন দারা। আশংকা আওরঙ্গজেব তাঁর পরিকল্পনা আন্দাজ করে তার রাস্তায় বাধা তৈরি করবেন। তাহলে কী তিনি পূর্বের দিকে পালিয়ে ২০,০০০ বিজয়ী সেনা নিয়ে দিল্লির দিকে ধেয়ে আসা আর ছেলের সঙ্গে যোগ দেবেন? কিন্তু সুজা আওরঙ্গজেব-মুরাদের জোট সঙ্গী। পূর্বের দিকে এগোলে হয়ত এলাহাবাদেই তিনি আওরঙ্গজেব আর সুজার বাহিনীর শাঁড়াশি আক্রমনে পড়বেন। তাঁকে টানছে পাঞ্জাব। পাশেই আফগানিস্তানের লড়াই দেওয়া গোষ্ঠীদের মুক্তাঞ্চল। সৈয়দ ঘৈরিত খান তার অনুগত। লাহোর কেল্লায় প্রায় ১ কোটি টাকা আছে। রসদও আছে যথেষ্ট। ছেলেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিয়ে লাহোরের দিকে রওনা হলেন। পাঞ্জাবের মাটিতে যোগাযোগ দিয়ে সাহায্য করছেন দিদি জাহানারা।

১২ জুন দারা দিল্লি ছাড়লেন লাহোরে ঘৈরিত খানকে সেনা জোগাড়ের নির্দেশ দিয়ে। সঙ্গে রাখলেন ১০০০০ সেনা। সরহিন্দ পৌঁছলেন। পালিয়ে যাওয়া ক্রোরির বাড়ি থেকে ১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার হল। শতদ্রু পার হয়ে নদীর সমস্ত নৌকো ডুবিয়ে দিলেন। লাহোর পৌঁছলেন ৩ জুলাই। আওরঙ্গজেবকে টক্কর দেওয়ার জন্যে বিশাল বাহিনী চাই। জাহানারার সহায়তায় সমস্ত আদিবাসী গোষ্ঠীকে তার দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্যে চিঠি লিখলেন। মুলতান, পাঞ্জাব, থাট্টার ফৌজদার, জমিদারদের চিঠি পাঠালেন।

লাহোরে খাজাঞ্চির দ্বার খুলে যাওয়ায় জম্মুর জমিদার রাজা রামরূপ, বেহরা আর খুশবের জমিদার খঞ্জর খানের মত জমিদারেরা দারার বাহিনীতে যোগ দিতে আসায় পলাতক শাহজাদার বাহিনীর সংখ্যা দেখতে দেখতে ২০০০০ হয়ে গেল। দারা গোপনে রাজপুত আর আওরঙ্গজেবের সেনাপতিদের তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেন। লাহোরে আসার সমস্ত রাস্তায় পাহারা বসানো হল। শতদ্রুর তীরে দাউদ খানকে বাহিনী দিয়ে বসানো হল। দারার আশা দক্ষিণ থেকে লম্বা রাস্তা, দুটো বড় যুদ্ধ পার হয়ে ক্লান্ত বাহিনী খুব সহজে লাহোরে তাড়া করবে না। তাছাড়া বর্ষাকালের ফুলেওঠা নদী পেরিয়ে লাহোরে আসাও সময় সাপেক্ষ। ততদিনে বড় বাহিনী তৈরি হওয়া সম্ভব।

কিন্তু তার লাহোরে পৌঁছবার এক মাস পর তাঁকে দম ফেলতে না দিয়ে আওরঙ্গজেবের অগ্রগামী বাহিনী ৫ আগস্ট শতদ্রু পেরোল, ১৪ আগস্ট স্বয়ং আওরঙ্গজেবও শতদ্রু পেরোবেন।

আওরঙ্গজেব ১৩ মার্চ আগরা থেকে রওনা হওয়ার দুদিন পরে শুনলেন দারা দিল্লি ছেড়েছেন। ২১ জুন বাহাদুর খানকে তড়িঘড়ি পাঠালেন। হাতের সামনে দুটো জ্বলন্ত সমস্যা সমাধান করতে হবে — ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠা মুরাদের বিরোধিতা সামলানো আর দারা পুত্রের বাংলা থেকে দিল্লির দিকে এগিয়ে আসাকে বন্ধ করা। তিনি খানই দৌরানকে দারার সমর্থকেদের হাত থেকে এলাহবাদ উদ্ধার করতে পাঠালেন। মুরাদের সমস্যাটা সালটালেন তাঁকে গ্রেফতার করে। এবারে তাঁর লক্ষ্য দিল্লি এবং দারা। কিন্তু তার বাহিনী খুবই ক্লান্ত। তারা বিশ্রাম চায়। সুলেইমান শুকোর অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে পরিকল্পনা ভাঁজতে শায়েস্তা খানের বাহিনীকে তিন হপ্তা বিশ্রাম দিলেন। যে সব পদাধিকার ইত্যাদি তিনি বেঁটে দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়িত করতে এবং তাঁর বিরোধীদের চিরতরে দমন করতে তাঁকে সম্রাট হতেই হবে।

সদ্য সম্রাটের দারা সংহার পর্ব

যখন উৎসব নিজেই বেহেস্তের মত সজ্জিত হয় তখন আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মনের মত করে নৃত্য করে — কাফি খান, আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহনের প্রেক্ষিতে মুরাদ কারাগারে, শাহজাহান বন্দী, দারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, সুজার পিঠ দেওয়ালে – এমন সময় আওরঙ্গজেবের দুবারের সিংহাসন আরোহনের প্রথম পর্বের উৎসবটা বেশ দেরি করেই আয়োজন করলেন। ১৬৫৮র ৩১ জুলাই গণক, জ্যোতিষদের ছকে দেওয়া তারিখ অনুযায়ী দিল্লির শালিমারবাগে আলমগির উপাধি নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করলেন আওরঙ্গজেব। তিনি আর এখন শাহজাদা নন, বিধিবদ্ধ সম্রাট — তবে বৈধতা নিয়ে সমস্যা আছে। মুঘল প্রথা অনুযায়ী গান বাজনার নির্দেশ দিয়ে উপহার বিতরণ করালেন কিন্তু মুদ্রা ছড়ানো এবং তার রাজত্বকালের নামে শুক্রবার খুতবার ঘোষণা দেওয়া থেকে অনুগামীদের নিবৃত্ত করলেন। খুবই নিচু স্বরে শুরু হল তার প্রথম পর্বের সিংহাসন ওঠার উৎসব। পারসিক ঐতিহাসিকেরা আওরঙ্গজেবের প্রথমবার সিংহাসনে আরোহনের সারল্যকে ভবিষ্যতে স্মরণ করবেন। যুবা আওরঙ্গজেবের দাড়ি তখনও সাদা হয় নি, সামনে ঝুঁকে বসে রয়েছেন, দরবারে আসা এক মুসাফির সম্রাটের তীক্ষ্ণ নাক এবং অলিভ রঙের চামড়া লক্ষ্য করছিলেন। ছবিটা হয়ত আপতিকও হতে পারে। পরের দিকে ছবিতে তাকে দেখি বরাবরই সোজা শিরদাঁড়ায় বসতে। এই অনুষ্ঠানের মাত্র দুটি ছবি পাওয়া গিয়েছে, তাতে অনুষ্ঠানের গুণমান আর সরলতা প্রমান হয়। আগামী দিনে ঐক্যবদ্ধ ধর্মাচারী মুঘল রাষ্ট্র শাসনের উচ্চাশা আমরা দেখতে পাই একটি অন্ধকার ঘরে বসে থাকা আওরঙ্গজেবের মাথায় এসে পড়া আলোয় মেঘ কেটে যাচ্ছে এবং যেন সর্বশক্তিমানের দোয়া চাইছে।

২১ জুলাই জ্যোতিষীদের মাঙ্গলিক সময় অনুসরণ করে দিল্লির বাইরে শালিমার বাগানে সাধারণ শামিয়ানা খাঁটিয়ে আওরঙ্গজেব নিজেকে সম্রাটের আসনে বসিয়ে আলমগীর (বিশ্বজয়ী) পাদিশা আর গাজি উপাধিতে বরণ করে নিলেন। বিস্তৃত উৎসবের সময় নেই। বেশ কয়েকটা সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আলমগিরের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ততটা নিরাপদ নয়। মুরাদ-সমস্যাটা কিছুটা সমাধান করেছেন। সিংহাসনে ওঠার ছ’দিন পরে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের তিনটে প্রধান রাজধানী আগরা, দিল্লি আর লাহোর। আকবর দিল্লিকে অপয়া মনে করতেন। তাঁর আপ্রাণ উদ্যমে আগরা হয়ে উঠল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা শহর, সেরা বাণিজ্য কেন্দ্র। আগরা কেমন বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল? কালো বিন্দুর (আবলাক) স্পর্শওয়ালা মাছের দাঁত বা দনদনইমাহি দিয়ে তৈরি বাঁট বা হাতলওয়ালা ছুরিকা (এটির দাম উঠেছিল আড়াই লক্ষ ডলার, এটি এখন কাতারের রাজপরিবারের কাছে আছে) পারস্যের শাহ, শাহ আব্বাস ‘ভাই’ জাহাঙ্গিরকে উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। উপহারটিতে সম্রাট এতই প্রভাবিত হন যে সারা দেশে এই ধরণের সাদা দাঁতওয়ালা মাছ খোঁজার নির্দেশ দিলেন। ইরাণেও ২০ দক্ষ কারিগর পাঠানোর নির্দেশ দিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তুচ্ছ মূল্যে আগরার বাজার থেকে এই ধরণের একটি দাঁত পাওয়া গেল। সেটিকে সরকারি কারখানায় নমুনা সহ পাঠিয়ে সম্রাটের চাহিদার পণ্য তৈরির বরাত দেওয়া হল। বিশ্বের হেন পণ্য ছিল না, যা আগরার বাজারে পাওয়া যেত না। আকবরের নাতি শাহজাহান সিংহাসনে আরোহণের এক দশকের মধ্যেই রাজধানী আগরা থেকে দিল্লিতে তুলে আনবেন। আগরার শান শৌকত অস্তাচলে যাবে। কিন্তু লাহোরের পতন হতে সময় লেগেছিল। লাহোর ছিল এশিয় বাণিজ্য রাজপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর।

লাহোরে দারার আশা ছিল আওরঙ্গবেবের আসার আগেই তিনি বাহিনী তৈরি করতে পারবেন। পারলেন না। আওরঙ্গজেবের লাহোর আসার সংবাদে আবার পালালেন।

দারার কাছে অর্থ সমস্যা ছিল না, সমস্যা নেতৃত্বদানের গুণমানের, সমস্যা উচ্চপদাধিকারীদের সেনাপতির ওপর নির্ভরতা। দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় এবং দারার পালাবার সময় কোষাগার হাট করে খুলে দিয়েছিলেন সম্রাট। জাহানারা ১ কোটি টাকার গয়না দিয়েছিলেন। দারা-জাহানারা সম্রাটের বকলমে, সম্রাটকে প্রভাবিত করে মুঘল সাম্রাজ্য চালিয়েছেন বছরের পর বছর — অন্তত দেড় দশক। অন্য ভাইদের কথা জানি না, সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে বসে সুবায় সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি আওরঙ্গজেবের জিনা হারাম করে দিয়েছিলেন বাবা-ভাই-বোন মিলে। তিনজনে মিলে আওরঙ্গজেবের বৈধ রোজগার কমিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে প্রতিপদে অপমান করেছিলেন, জেতার মুখে দাঁড়ানো সেনাপতি আওরঙ্গজেবকে বিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সাম্রাজ্যের সম্মান অন্য রাষ্ট্রের মানুষের কাছে ছোট করেছিলেন দরবারি পাশাখেলার টুইস্টে। মুঘল সাম্রাজ্যের মত বিশাল ধনশালী সাম্রাজ্য চালানোর দক্ষতার কথা ভুলে যান, বিশাল বিশাল পরস্পর বিরোধী জাতিসত্ত্বার, ব্যক্তিত্বের, ভৌগোলিক এলাকার, ধর্মের মনসবদারদের চাহিদা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামলাবার দক্ষতার কথা ভুলে যান, শুধু মনে রাখুন দারা ছিলেন ৬০ হাজারি মনসবদার, রোজগার ছিল ২ কোটি আর আওরঙ্গজেব ছিলেন মাত্র ২০ হাজারি মনসবদার, রোজগার ছিল ৬০ লক্ষ। দারা সম্রাটের বরপুত্র, আর আওরঙ্গজেব প্রতিপদে ঠোক্কর খেতে খেতে দূর সুবার সাম্রাজ্যের স্বার্থে কাজ করা শাহজাদা। সম্রাট দারাকে ভবিষ্যতের সম্রাট ঘোষণা করেছেন। তিনি বিপুল সম্পদ নিয়ে পালাচ্ছেন। সেই দারা আওরঙ্গজেবের থেকে বেশি সম্পদ নিয়ে, অতুলনীয় যোগাযোগ নিয়ে, আওরঙ্গজেবের তুলনায় দ্বিগুণ বাহিনী নিয়ে, সম্রাট আমলাদের সমর্থন বুদ্ধি জ্ঞান নিয়ে, যুদ্ধেক্ষেত্রে, রাজনৈতিক লড়াইতে, কূটনৈতিক দৌত্যে বার বার ব্যর্থ হয়েছেন। একটাও ব্যর্থতা থেকে তিনি নিজের চরিত্র সংশোধন করেন নি, বরং শিয়রে যখন যুদ্ধ, তখনও তিনি সেনাপতিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, জুতোপেটা করছেন [মেসোমশাইকে], নাচনেওয়ালি-গানেওয়ালি গালি দিয়েছেন। আমি এখানে আওরঙ্গজেবের দক্ষতার কথা কথা বললামই না। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev