| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১১০ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪১৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০২২

দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫০ বছরের ভাগ্য ভাল আওরঙ্গজেব মুঘল হিন্দুস্তানের, তার হাতে তৈরি হওয়া মুর্শিদকুলি রাষ্ট্র বঙ্গদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার হাল ধরেছিলেন। দারার মত প্রশাসন পরিচালনায় অযোগ্য, নিকম্মা, বকমবাজ, অহং সর্বস্ব, যৌনতার কারাগারে বন্দী, আগরা দিল্লির বাইরের নিজের সাম্রাজ্যের একটুকরোও ভূখণ্ড না চেনা শাহজাদাকে কীভাবে যদুনাথ, কালীকিঙ্কর, শ্যামল, সুপ্রিয়া, অভীক এবং হাজারো বাম-প্রগতিশীল আইডল বানান, জিনিয়াস আখ্যা দেন, আওরঙ্গজেবের প্রতিস্পর্ধী বানান আর আওরঙ্গজেবকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে দেশ ভাগের জন্যে দায়ি করেন সে যুক্তি লেখকের মোটা মাথায় ঢোকে না। দারা যে বৌদ্ধিক কাজ করেছেন সেই সংশ্লেষী কাজের মূল্য অসীম, কিন্তু মনে রাখতে হবে অতীত থেকে সে কাজ হয়ে আসছে, এমনকি সেই সংশ্লেষী কৃষ্টি তাঁর পূর্বজ আকবর জাহাঙ্গীর শাহজাহান বহন করেছেন। সেখানেও তার জিনিয়াসত্ব, মৌলিকত্বের কিছুই নেই — তিনিই সে কাজের একমাত্র হোতাও নন, তিনি ধারক-বাহক এইটুকু বলা যায়। বাম-প্রগতিশীল-মার্ক্সিস্ট এবং সঙ্ঘীদের কাছে দারা একটা গুরুত্বপূর্ণ হিন্দুত্ববাদী ইওরোপমন্য প্রজেক্ট। তাই আমাদের উপনিবেশিক ইতিহাসকে নতুন ভাবে দেখতে হবে। আমাদের ইতিহাস আমাদেরই লিখতে হবে।

ইতিমধ্যে মাস্টার ট্যাকটিশিয়ান আওরঙ্গজেব মুরাদকে গ্রেফতার করার পরেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সেরে রেখেছেন। তিনি দারাকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে চান না। তিনি জানেন সম্রাটকে বন্দী করলেও জাহানারা তখনও মুক্ত। তাঁর প্রবাদপ্রতীম সম্পত্তি দারার সেনাবাহিনী তৈরি করার কাজে বিনিয়োগ করেছেন। দারার সঙ্গে রয়েছে দিল্লির সম্পদ লাহোরের খাজাঞ্চির ১ কোটি টাকা এবং লাহোরের প্রতাপশালী বণিককুলের অর্থ সাহায্য। তিনি যত বেশি সময় দারাকে ছেড়ে রাখবেন দারা ততবেশি নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ভরা বর্ষাতেও আওরঙ্গজেব দারা গ্রেফতার অভিযান বন্ধ রাখেন নি। লাহোরে পৌঁছবার জন্যে পঞ্চ আবের দেশ পাঞ্জাবে বিশাল বিশাল নদী পেরোতে তার মীর বহরের বা নৌকোর সেনাপতির সাহায্য দরকার। অগ্রগামী বাহিনীকে প্রচুর নৌকো জোগাড়ের ব্যবস্থা করতে বললেন এবং সেগুলোকে ওয়াগান করে পাঠাবারও নির্দেশ দিলেন। শতদ্রুর তীরে তালয়ানে বাহাদুর খান গিয়ে দেখলেন উল্টো দিকে বিপুল সৈন্যের সমাবেশ ঘটেছে। এই বাহিনী এড়াতে স্থানীয় জমিদারের সাহায্যে তিনি ৬০ মাইল দূরে রূপুরে নদী পেরোলেন। সেখানে সেনার একটা টুকরি আলগোছে রাখা ছিল, তারা খুব একটা প্রতিরোধ করতে পারল না। সেখানে তিনি ২৫টা নৌকো জোগাড় করলেন। ৫ আগস্ট নৌকো বেয়ে ৮০০ সেনা আর কিছু গোলান্দাজ নিয়ে বিশালনদী পার হলেন। তীরে বসা দারা বাহিনীকে হাওয়ার মত উড়িয়ে দিলে তারা তালওয়ানে গিয়ে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর পৌঁছনোর ভয়ঙ্কর খবর দিল। অগ্রগামী বাহিনীর পিছন পিছন দ্বিতীয় বাহিনী আসার সংবাদ পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে নদীর সব কটা নৌকো তুলে নেওয়া হল। ৬ আগস্ট খালিলুল্লা খান রূপুরে নদী পার হলেন।

দারা আর আওরঙ্গজেবের বাহিনীর মধ্যে এখন মাত্র বিতস্তা নদীর তফাত। বিতস্তায় আরও কঠিন পাহারা বসানো হল। লাহোর থেকে দাউদ খানকে পাঠিয়ে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর বিরুদ্ধে মহড়া নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। গোবিন্দালে পোঁছে শুনলেন আওরঙ্গজেবের বাহিনী এখন দুগুণাকার ধারণ করেছে — বাহাদুর খানের সঙ্গে খালিলুল্লা খান যোগ দিয়েছেন। দারা বুঝলেন, তাঁর পক্ষে এই বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া বাতুলতা। তিনি সুলতানপুরের বাহিনীকে গোবিন্দালে ডাকিয়ে আনলেন আর দারার দ্বিতীয় ছেলে সিপাহর শুকোর নেতৃত্বে একটি বাহিনী এসে যোগ দিল। খালিলুল্লা খানকে তড়িঘড়ি আক্রমণ না শানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনি নিজে রূপুর পৌঁছলেন ১৪ই। আট দিন ধরে বিশাল বাহিনীকে শতদ্রু পার করালেন সম্রাট। তাঁর নির্দেশে বিতস্তা পর্যন্ত পরের যাত্রাপথ সুরক্ষিত হল। জয় সিংহ, দিলির খান আর সঈফ খানের নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনী পাঠালেন খালিলুল্লা খানের বাহিনীকে জোরদার করতে। ১৮য় গড় সারঙ্গে অগ্রগামী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল গোলান্দাজ বাহিনী। সেখানে খবর পাওয়া গেল বাহিনী গোবিন্দালে আসার সংবাদে দারা সিপাহর শিকোকে বিতস্তা পাহারা থেকে তুলে নিয়ে, দাউদ খানকে সমস্ত ফেরি পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে লাহোর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন। পালাবার আগে তিনি ঘনিষ্ঠজনকে বলেছিলেন, ‘অন্য কেউ হলে দেখে নিতাম, আওরঙ্গজেবকে আমার পক্ষে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়’। দারার তীব্র বাগাড়ম্বরের নমুনায় বিরক্ত নতুন বাহিনীর অধিকাংশ সেনাপতি আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যোগ দিল। আওরঙ্গজেবের জয় তখন সময়ের অপেক্ষামাত্র।

তাছাড়া আওরঙ্গজেবের সেনাপতিরা উদ্যমী হয়ে দারার সেনাপতিদের পক্ষ পরিবর্তনে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা রাজা রাজরূপ, খঞ্জর খানের মত বহু মাঝারি এবং বড় সেনানীকে নিজেদের দিকে টেনে এনেছেন আওরঙ্গজেবের নেতৃত্ব সুবাদে। যে দাউদ খানের উদ্দীপনার তৈরির ক্ষমতার দিকে গোটা বাহিনী তাকিয়ে থাকে, তাকে কৌশলী চিঠি লিখে দারার বাহিনীতে একঘরে করে দিলেন। দারার বাহিনীর ডান দিকের কলামটা স্রেফ উবে গেল। পরিকল্পনা করে সেই কুশলী চিঠি দারার হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হল। দারা সেই মিথ্যা চিঠি পড়লেন, একবারও তার প্রধান সেনাপতির ওপরে যে অভিযোগগুলো ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, সে সব নিয়ে পাল্টা তদন্ত করলেন না। উড়ো অভিযোগ সত্যি ধরে নিলেন।

গোবিন্দওয়াল থেকে দাউদ খান জানালেন তারপক্ষে মুঘল বড় বাহিনী তো দূরস্থান, অগ্রগামী বাহিনীর মত ছোট দলকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই বাহিনীতে বাহাদুর খান, খালিলুল্লা খান, জয় সিংহ, দিলির খানের মত বড় মাপের সেনানায়ক আছে, আর আছে সাফ শিকানের নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনী। এই যুক্ত বাহিনীর সঙ্গে তার পক্ষে মোকাবিলা সম্ভব নয়। হতাশ হয়ে পুত্র সিপাহিরকে ডেকে ১৮ আগস্ট পরিবার, কেল্লার ১ কোটি টাকা, সরকারের নানান সম্পদ, কামান ইত্যাদি নিয়ে লাহোর ছাড়লেন। কিছুটা পথে পশুর পিঠে আর অধিকাংশটাই জলপথে বয়ে নিয়ে মূলতানের দিকে চললেন। ঐতিহাসিকেরা বলছেন সিপাহিরা সম্পদের লোভে পিছু নিল।

খালিলুল্লা খান অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে লাহোরর কাছে পৌঁছলেন ২৯-এ, শহরে না ঢুকে পরের দিন তিনি মুলতানে দারার পিছন ধরলেন। ১৪ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর সর্বাধিনায়ক আওরঙ্গজেব শতদ্রুর তীরে বিশাল বাহিনী পার করালেন, ১১ সেপ্টেম্বর বিতস্তা, পরের দিন হৈবাতপুর পাটিতে পৌঁছলেন। খালিলুল্লা তাঁর মন্তব্য পাঠালেন, ‘আমার মনে হয় দারা মুলতানেই থাকবেন। তাঁকে অনুসরণ করা বাহিনীতে এমন কোনও শাহীবংশে জন্মানো মানুষ নেই যিনি সেনাবাহিনীর আনুগত্য নিয়ে শাহজাদার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। এক্ষুণি যদি যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে আমরা হেরেও যেতে পারি। ফলে আমরা তাড়া করার কাজে একটু ঢিলে দিলাম’।

আওরঙ্গজেব সেনাপতির সমস্যা বুঝলেন। খালিলুল্লা যদিও তাঁদের মেসোমশাই — তিনি সেই জন্যেই খলিলুল্লাকে দাদার পিছনে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজরক্তের মানুষ নন, শাহী পরিবারের সঙ্গে শুধুই বৈবাহিক যোগ – খানজাদা। আওরঙ্গজেব এই কাজে নিজেকে এগিয়ে দিলেন। আজমকে দিয়ে ভারি নানান রসদ লাহোরে পাঠিয়ে প্রায় ঝাড়া হাতপায়ে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিমে মুলতানের দিকে সেনাবাহিনীর মুখ ঘোরালেন। দৈনিক ঝড়ের বেগে ১৪ থেকে ২২ মাইল পেরোলেন। কাসার আর শিরগড় হয়ে তিনি মুমানপুরে পৌঁছলেন ১৭ই। সেখানে শুনলেন ১৩ সেপ্টেম্বর দারা মুলতান থেকে দক্ষিণের দিকে পালিয়ে ভক্ষরের দিকে যাচ্ছেন। দুই বাহিনীর মধ্যে রোজ দূরত্ব কমছে। তিনি কিছুটা ধীরে চলে ৬,০০০ সেনার নেতা সাফ শিকান খানকে নির্দেশ দিলেন মূলতান থেকে দারাকে ঠেলে বার করে দেওয়ার জন্যে। এই কাজে সাফল্য লাভ করলে ২০,০০০ মোহর বিতরণের জন্যে বরাদ্দ হল। খলিলুল্লাকে মুলতানে সম্রাটের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হল। সম্রাট মুলতানের কাছে পৌঁছলেন ২৫-এ। সেখানেই খবর পেলেন পূর্বে সমস্যা পাকিয়ে উঠেছে। তাঁকে সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেই হবে। মনোবল হারিতে পালাতে থাকা দারার বাহিনীকে সামলাতে এখন ফৌজদার স্তরের সেনানীই যথেষ্ট। তিনি বাহিনী ঘোরাতেন।

দারা লাহোর থেকে পালাবার পরে শাহী বাহিনী মাত্র ১২ দিনের দূরত্বে ছিল। প্রতিদিন একের পর এক সেনাপতি দারার বাহিনী ছেড়ে শাহী বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। দারার বাহিনী ছোট হচ্ছে রোজ। ৫ সেপ্টেম্বরে মুলতান পৌঁছলেন দারা। মুলতানেও মন টিকতে চাইল না। তিনি জানেন পিছনে শাহী বাহিনী দ্রুত কাছে আসছে। মুলতানের খাজাঞ্চি খানার ২২ লক্ষ টাকা নদী পথে বিশ্বস্ত সেনাপতি ফিরোজ মিওয়ানিকে ভক্ষরে পাঠিয়ে দিলেন। মুলতানে তিনি বুঝলেন শাহী বাহিনী আর ৮ দিন দূরে। মুলতান ছেড়ে তিনি ভক্ষরের সিন্ধুর উল্টোদিকে পৌঁছলেন ১৩ অক্টোবরে। ১৮ অক্টোবর আবার যাত্রা শুরু করলেন।

২১ সেপ্টেম্বর, দারা মুলতান ছেড়ে যাওয়ার ৮ দিন পরে খালিলুল্লা মুলতান পৌঁছলেন। এর পরে আর দারার পথটা জানা যাচ্ছিল না – দারা রাজপুতানা গিয়েছে না কী সিন্ধে গিয়েছে সে বিষয়ে সংবাদ ছিলনা শাহী সেনাপতিদের কাছে। খবর এল জমিদার হাজি খান বালুচ দারার সম্পদ ভর্তি নৌকো আটকেছেন। ২২-এ মুলতানে সম্রাটের প্রতিশ্রুতি মত ২০,০০০ মোহর হাজির। নজরানা পেয়ে সাফ শিকান খান নতুন উদ্যমে দারার পিছনে ছুটলেন। সম্রাটের নির্দেশে একের পর এক বাহিনী একে যোগ দিতে থাকে। সেনাদল এখন বেড়ে ১৫,০০০। এই দুর্গম পথে এক সঙ্গে যাওয়া মুশকিল। দুটো দল দুটো রাস্তায় ভাগ হয়ে চলল।

লাহোর থেকে বেরোবার সময় দারার ১৪,০০০ বাহিনীর অর্ধেক মুলতানে ছেড়ে গেছে এবং যখন তিনি সক্করের মত দুর্ভেদ্য দ্বীপ কেল্লায় থাকতে চাইলেন না, তখন তার ওপর বিতশ্রদ্ধ হয়ে আরও অর্ধেক ছেড়ে চলে গেল। বর্তমানে তাঁর রক্ষীর সংখ্যা ৩,০০০। কেউ কেউ আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে মনসবদার হলেন। দাউদ খানের মত বিশ্বস্ত সেনানায়কও তাকে ছেড়ে চলে গেল। দাউদের মিত দক্ষ সেনানায়ক পরে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দিয়ে উচ্চপদে আরোহন করবেন। দারা লারকানায় পৌঁছলেন। সেখান থেকে শুরু হয়েছে কান্দাহারের রাস্তা। কিন্তু তাঁর ভৃত্যই হোক বা তাঁর স্ত্রীই হোক, কেউই ‘অসভ্য’ বালুচদের অঞ্চল পেরোতে চায় না। তিনি গেলেন না। তিনি কী জানেন তাঁর ভাগ্য তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলছে? তিনি বাধ্য হয়ে সিউইস্তান, সেওয়ানের দিকে যাওয়া ঠিক করলেন। কান্দাহার হয়ে দ্বিতীয় মুঘল শাসক হুমায়ুনের মত সশরীরে তিনি পারস্যে পৌঁছতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস অন্য পথে ধারত কী না সেটা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল, কিন্তু আওরঙ্গজেব যে খুব একটা স্বস্তিতে থাকতেন না সে তথ্য বলাই বাহুল্য নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ব্যক্তিগতভাবে লেখকের মনে হয়েছে দারার রাজনীতি, যুদ্ধনীতি আর কূটনীতি বিষয়ে যতটুকু জ্ঞান, সেটা অবলম্বন করে তারপক্ষে আদৌ চতুর দক্ষ আওরঙ্গজেবের রাজত্বে আঁচড় কাটার সুযোগ হত কী না, সেটা গবেষণার বিষয়। দিল্লি আর লাহোরে তাঁর কাছে বিপুল সম্পদ ছিল, সময় ছিল — তাও তিনি বাহিনী বানাতে পারেন নি — আওরঙ্গজেবফোবিয়ায় পালানোকেই ভবিতব্য ভেবে নিয়েছেন।

শিকান খান ভক্ষরে পৌঁছলেন ২১ অক্টোবর দারা সক্করে চলে যাওয়ার তিন দিনের পরে। সেখানে এক দিন থেকে শহর দখলে নিলেন। বাহিনী পোস্টিং করলেন। সক্কর কেল্লার দরজায় অবরোধ বসালেন। ২৩ থেকে আবার যাত্রা শুরু করলেন বাকি দলটার জন্যে অপেক্ষা না করে। তারা তিন দিনের পিছনে ছিল। ৩০-এ তিনি ২৬ মাইল দূরের সেওয়ানের কিল্লাদার থেকে সংবাদ পেলেন দারা তখন ১০ মাইলের মধ্যে এসেগেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ১,০০০ জন ঘোড়সোয়ার বন্দুকচি বরকন্দাজ এবং ১৪টা সুতারনল [উটের পিঠে ঘুরন্ত কামান] আর হাউই পাঠালেন দারার বাহিনী মোকাবেলা করার জন্যে। এক রাতেই তিনি ২৪ মাইল পেরিয়ে কেল্লার ১ মাইল দূরে পৌঁছে শত্রুর নৌকোর জন্যে অপেক্ষা করফে রইলেন।

শাহী শিবিরের তিন মাইল দূরে নৌকো থামিয়ে দারা নামলেন। তাদের বাহিনীতে ছিল ১,০০০ ঘোড়সওয়ার, ১০টা হাতি আর কিছু ব্যানার। শাহী বাহিনী দারার ওপর আক্রমণ করলে দারা নৌকো চড়ে পালিয়ে গেলেন। শাহী বাহিনীর নৌকো ছিল না। এটা ছিল তাদের প্রধান দুর্বলতা। দারার নৌকো বহর তীব্র গতিতে ছুটে চলল। শাহী বাহিনী কেল্লাদারের থেকে নৌকো চাইলেন। কিন্তু খুব একটা সুবিধে হল না। তীর ধরেই তার পিছন নেওয়া হল। ২ নভেম্বর আকাশে বাদল ছাইল। দারা চোখে ধুলো দিয়ে আবারও পালালেন। ১৯-এ শিকন খান বাহিনী নিয়ে থাট্টায় পৌঁছলেন। বাহিনী দারার ছেড়ে যাওয়া সম্পত্তি দখল নিল। ২০-তে শিকন আবার দারা বিরোধী অভিযান শুরু করলেও দারার পাত্তা পাওয়া গেল না। বোঝা গেল থাট্টায় শাহী বাহিনীর অপেক্ষার সুযোগ নিয়ে শাহজাদা ২৪-এ কচ্ছের রনের দিকে পালিয়েগিয়েছেন।

গুজরাটে কচ্ছের রাণ খুবই কঠিন এলাকা। সেখানে দারার পিছু নেওয়ার জন্যে বিশেষ তোড়জোড় করা দরকার। সেই মুহূর্তে শাহী বাহিনীর কাছে খবর এল সুজা দিল্লি আক্রমন করার মুখে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের দিল্লি আসা দরকার। তিন মাস দারার পিছু নেওয়া ছেড়ে ৫ ডিসেম্বর তারা ফেরার পথ ধরল। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev