| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১১৩ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩০৬ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২২

আবারও দারা, কচ্ছে দারা

আমরা দেখেছি দারা দিল্লি থেকে লাহোর হয়ে থাট্টা আর নিম্নসিন্ধু উপত্যকা হয়ে ১৮ নভেম্বর ১৬৫৮ কচ্ছের রণের দিকে পালিয়ে যান। সে বছর বর্ষা না হওয়ায় কচ্ছ জুড়ে বিপুল জলের অভাব ছিল। দারার বাহিনীকে জলের অভাব ভোগাচ্ছিল। বাহিনীর প্রচুর ভারবাহী জন্তু জলের অভাবে রাস্তাতেই মারা যেতে থাকে। তিনি রণ অঞ্চলে ঢুকলেন ২৭ নভেম্বর। রাজার সহায়তায় কাথিয়াবাড় পার হয়ে আহমেদাবাদের বাইরে ৩,০০০ সেনা নিয়ে পৌঁছলেন। তখন আহমেদাবাদের শাসক শাহ নাওয়াজ খান। বুরহানপুরে থাকতে তিনি শাহজাহানের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবকে সাহায্য না করায় দক্ষিণের সুবাদার তাঁকে বন্দী করেন। তিনি আওরঙ্গজেবের শ্বশুর হলেও তাঁর কন্যা দিলরাস বানু বেঁচে নেই। তাছাড়া তাঁর দ্বিতীয় জামাই মুরাদ বখশকেও আওরঙ্গজেব হত্যা করেছেন। প্রাক্তন জামাই সম্রাটের সঙ্গে তার পুরনো বৈরিতা মেটাতে দারার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাপতি পাঠিয়ে দারাকে অভ্যর্থনা জানালেন। ৯ জানুয়ারি ১৬৫৯ দারা কেল্লায় এসে আহমেদাবাদ দখলে নিলেন। মুরাদের সময়ের খাজাঞ্চির ১০ লক্ষ টাকা খরচ করে ২২,০০০ সেনা জোগাড় করলেন। দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেবকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ হল। সব রাজস্ব দারা আদায় করলেন। শাহ নাওয়াজকে নিচু আসনে বসিয়ে দারা উঁচু আসনে সম্রাট সেজে দরবার চালালেন। বাবার অনুসরণে ঝরোখা দর্শনও শুরু করলেন।

দেওরাই-এর যুদ্ধ

ইতিমধ্যে দারার কাছে সংবাদ এল এলাহাবাদে আওরঙ্গজেবের বাহিনীকে সমুচিত জবাব দিয়েছেন বাংলার নবাব সুজা। যুদ্ধ শেষে যশোবন্ত সিংহ বিপুল লুঠ সামগ্রী নিয়ে আগরায় ফিরেছেন। সুজা দিল্লি লক্ষ্য করে এগোচ্ছেন, দিল্লি দখল আজ সময়ের অপেক্ষা। তিনি জানেন আওরঙ্গজেব পাঞ্জাবে তাঁর খোঁজে ব্যস্ত। উত্তেজিত দারা আহমেদাবাদে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে, নতুনভাবে দিল্লি দখলের খোয়াব নিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি আজমেঢ়ের দিকে রওনা হলেন। তিন দিন পরে আসল খবর এল, সুজা, আওরঙ্গজেবের বাহিনীর কাছে বিশ্রীভাবে হেরেছেন। পরাজিত শাহ সুজা বাংলার দিকে পলাতক। যশোবন্ত সিংহ দারার পক্ষে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি পাঠালেন। দারা জানেন যশোবন্ত সিংহ পক্ষে থাকলে, তাঁর কাছে যা সম্পদ আছে, সে সব অর্থ বিনিয়োগ করে রাজস্থান থেকে বড় বাহিনী জোগাড় করা খুব কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সেই স্বপ্নও ভেঙে চৌখান হয়ে গেল। খাজওয়ায় যশোবন্তের বিশ্বাসঘাতকতায় বীতশ্রদ্ধ সম্রাট আওরঙ্গজেব, মহম্মদ আমিন খানকে ১০০০০ বাহিনী নিয়ে আজমেঢ় দখলে পাঠালেন। উদ্দেশ্য রাজ্যপাট থেকে যশোবন্তকে উচ্ছেদ করে রায় সিংহ রাঠোড়কে সিংহাসনে বসানো। যশোবন্ত জানেন এই মুহূর্তে সম্রাটের রোষ থেকে সবার আগে নিজেকে বাঁচানো দরকার। শাহী বাহিনীর ভয়ে তিনি সিওয়ানার পাহাড়ি কেল্লায় আশ্রয় নিলেন। হঠাত আওরঙ্গজেবের মতি পরিবর্তন হল। তিনি বুঝলেন মুক্ত যশোবন্ত তাকে যে কোনও সময় বিপদে ফেলতে পারে। তড়িঘড়ি যশোবন্তকে চিঠি লিখে বন্ধুত্ব আর সমস্ত সাহায্যের আশ্বাস দিলেন আওরঙ্গজেব। শর্ত দারার পাশ থেকে যশোবন্তের সরে যাওয়া। এই শর্তে রাজি হলে সম্রাট যশোবন্তের পুরনো মনসব ফিরিয়ে দেবেন। যশোবন্ত সম্রাটের ফরমান পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। দারাকে দেওয়া কথা ভুলে যেতে এক মুহূর্ত ভাবলেন না। দারাকে মিথ্যে জানালেন তিনি আজমেঢ়ে বাহিনী জোগাড় করছেন। দারার সঙ্গে তিনি সেখানেই যোগ দেবেন। দারা বুঝলেন, কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। সত্য জানতে যশোবন্তের কাছে তিন তিনটে দৌত্য পাঠিয়েও ব্যর্থ হলেন। যুবা যশোবন্ত জানেন, হেরো দারার পক্ষ ছেড়ে দিলে, তাঁর জন্যে দিল্লিতে মুঘল সাম্রাজ্যের অনেক বড় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

আওরঙ্গজেবের হাত থেকে দারা মুক্তি নেই। আওরঙ্গজেব আজমেঢ়ে বাহিনী নিয়ে দারার মুখোমুখি হওয়ার জন্যে রওনা হয়েছেন। দারা জানেন আওরঙ্গজেবের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া আত্মহত্যার সামিল। কিন্তু তাঁর পালাবার উপায় নেই। তিনি শহরের একটু বাইরে দেওরাইএর গিরিপথে আওরঙ্গজবের বাহিনীর জন্যে অপেক্ষা করলেন। দুপাশে বিঠালি আর গোকলা পাহাড়, পিছনে আজমেঢ় শহর। সৈয়দ ইব্রাহিম মুস্তাফা খান আর জানি বেগ বরকন্দাজ আর গোলান্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে। পরিখা কেটে পজিশন নিয়ে আছেন সেনাপতি ফিরোজ মেওয়াতি। তৃতীয় স্তরে পরিখা কেটে আছেন শাহ নাওয়াজ খান, মহম্মদ শরিফ কালিচ খান। মাঝখানে দারা। গোকলা পাহাড়ের কাছে পুত্র সিপিহার শুকো। দারার একমাত্র সামরিক সুবিধে, গোলান্দাজদের কামানগুলোকে তিনি পাহাড়ের ওপরে তুলতে পেরেছেন।

রামসর হ্রদ পেরিয়ে ১১ মার্চ আওরঙ্গজেব দেওরাই পৌঁছলেন। দুমাইল দূরে দারার পরিখা আর ৪ মাইল দূরে আজমেঢ় শহর। রাতে শাহী বাহিনীর পুরদিল খান অসামান্য সাহসে ১৫০ জনের বাহিনী নিয়ে দুই সেনা সজ্জার মাঝের একটা টিলায় আশ্রয় নিলেন – উদ্দেশ্য সেখানে গোলান্দাজদের কামান তোলা। সকালে দারার আক্রমণে পুরদিল খানের বাহিনী কিছুটা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলেও, শাহী সেনার অগ্রগামী বাহিনীর ২,০০০ সেনা এগিয়ে গেল। দারার বাহিনী জবাব দিতে দিতেই পুরদিল খানের চেষ্টার ফল ফলল। সেই টিলায় শাহী গোলান্দাজ বাহিনী বেশ কয়েকটা কামান তুলতে পারল। ততক্ষণে শাহী বাহিনী গোকলা পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আওরঙ্গজেবের শিবির শত্রুর বাহিনীর আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। ১২ মার্চ সারা দিন কামানের লড়াই চলল। ১২ মার্চের রাত থেকে ১৩ মার্চের সকাল পর্যন্ত অবিশ্রান্ত গোলাগুলির শব্দে বেহেস্তও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ১৩ তারিখও একই ভাবে গোলা বিনিময়েই সময় কাটল। দারার বাহিনীর অধিকাংশ গোলা শাহী বাহিনীর ওপরে না পড়ে তাদের পরিখায় তৈরি করা দেওয়ালে লাগছিল – ফলে শাহী বাহিনীর খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। ১৪-র রাতে আওরঙ্গজেব সেনাপতিদের, বিপক্ষের ছোট বাহিনীর বিরুদ্ধে তাড়াতাড়ি জিততে না পারার জন্যে বকাঝকা করলেন। আক্রমণের নতুন পরিকল্পনা তৈরি হল। শাহ নাওয়াজ খানের বাহিনীকে মূল চাঁদমারি করলেন। রাজরূপ খান গোকলা পাহাড় হয়ে শাহ নাওয়াজ খানের বাহিনীর ওপরে এসে পড়লেন। অন্য দিকেও একই সঙ্গে আঘাত হানা হচ্ছিল। শাহ নাওয়াজ খানের বাহিনী কিছুটা পিছিয়ে গেল। জয় সিংহের অগ্রগামী বাহিনী ঐ জায়গা দখল নিল। দারার বকশী মহম্মদ মুনসির দেহ বিষাক্ত তীর ফুঁড়ে দিল। মহম্মদ খেসগি আর আবি বকরের মৃত্যু হল তরোয়ালের আঘাতে। রাত নেমে আসছে, দারার একের পর এক সেনাপতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, বেঁচে থাকা সেনারা বুঝছে দারার হারের সময় আর সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তারা দারার অরক্ষিত রসদ শিবির লুঠে পালানো শুরু করল।

শাহ নাওয়াজ খানের পরাজয় আর নিহত হওয়ার পর হতাশ দারা বুঝলেন দেওরাইএর যুদ্ধও জেতা হল না। দেওরাই তার জীবনের শেষ যুদ্ধ। আন্নাসাগর হ্রদের পাশে বিশ্বস্ত খোজা খাজা মাকুলকে দায়িত্ব দিলেন জেনানা মহল আর সম্পদ বাঁচানোর। সিপিহার শুকো সেনাপতি ফিরোজ মিওয়াতির দুহাজার সেনা নিয়ে পরিবারকে পিছনে ফেলে পালালেন। খাজা মাকুল বাধ্য হয়ে ১২টা হাতি, কয়েকটা উট আর খচ্চরে জেনানা আর দারার সম্পদ তুলে টিলাগুলোর গা ঘেঁসে পালালেন। কিন্তু রাস্তায় দারার অধিকাংশ সম্পদ লুঠ করল দারার একদা জোট সঙ্গী রাজপুতেরা।

দারা পালিয়ে যাওয়ায় পিছনে পড়ে থাকা বাহিনী আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। ১৫ মার্চ সকালে আওরঙ্গজেবের কাছে যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমীক্ষা পৌঁছল। কাফি খানকে উদ্ধৃত করে যদুনাথ সরকার লিখছেন তাঁর সেনাপতি, শেখ মীর, সৈয়দ হাসিম আর দারার পক্ষে তাঁর প্রাক্তন শ্বশুর শাহনাওয়াজ খানের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে তাদের সকলকে সন্ত মৈনুদ্দিন চিস্তির দরগায় দফন করার নির্দেশ দিলেন। সম্রাট সশরীরে পরের দিন দরগাতে গিয়ে সম্মান জানালেন এবং ৫,০০০ টাকার উপহার দান করলেন। দারাকে ধরতে জয় সিংহ আর বাহাদুর খানের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী পাঠালেন।

দারার জীবনের শেষ পর্ব

[পলাতক দারার মৃত্যুমুখী স্ত্রী নাদিরা বেগমকে পরীক্ষা করছেন মানুচি]

দারা সব কিছু পিছনে ফেলে ১৪ মার্চ ১৬৫৯ শুধু সেনাপতি ফিরোজ মেওয়াতিকে সঙ্গে নিয়ে পালালেন। আজমেঢ় থেকে দারার পালানোর বিশদ বর্ণনা পাই মুনসি উদয় রাজ [উপাধি তালেবর খান] সম্পাদিত হফত আঞ্জুমানে [এটি কাছোয়া গোষ্ঠীপতি মির্জা রাজা জয় সিংহের আওরঙ্গজেবকে পাঠানো চিঠির সংকলন — The Military Despatches of a Seventeenth Century Indian General সম্পাদনা, অনুবাদ জগদীশ নায়ারণ সরকার]। দারার পিছন নিল জয় সিংহ আর বাহাদুর খানের নেতৃত্বে বিশাল মুঘল বাহিনী।

১৫য় গুজরাটের মাইরতা শহর যখন দারা ছাড়ছেন শাহী বাহিনী তাঁর ছ’দিন পিছনে। শ্বাস নেওয়ার সময় নেই। শাহী বাহিনীর তাড়ার আশংকায় দারাকে রোজ ৩০ মাইল পথ পেরোতে হচ্ছে দূরত্ব বাড়াবার জন্যে। তাড়াহুড়োয় অধিকাংশ ভারি রসদ পিছনে ফেলে আসতে হয়েছে। আগেই বলেছি সে বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় কচ্ছের রণে জলেরও অভাব ছিল। ফলে নুনের দেশে তার বাহিনীর বহু ঘোড়া, উট, মালবাহী জন্তু জল না পেয়ে রাস্তাতে মারা গেল। জয় সিংহ আর বাহাদুর খান ২০ মার্চ মাইরতা ছাড়লেন। সম্রাট দারাকে আশ্রয় না দেওয়ার জন্যে যোধপুরের মহারাজাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে চিঠি লিখেছেন। জয় সিংহ গুজরাটের প্রতিটা জমিদার, রাজ্যের আমলাকে চিঠি লিখে দারাকে আশ্রয় না দেওয়ার হুমকি নিশান পাঠিয়েছেন।

গুজরাটের প্রশাসনিক সামরিক আমলারা বুঝলেন দারার সময় শেষ। আওরঙ্গজেবের নির্দেশ মান্য করে আমেদাবাদে দারার নিযুক্ত প্রশাসক, সৈয়দ আহমদ বুখারিকে গ্রেফতার করে শহরের দখল নিলেন। দারার দূতেরা আহমেদাবাদের হাত বদলের সংবাদ জানালেন – আমেদাবাদে আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। দারার আর দূরে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই। ততদিনে বিশ্বস্ত খোজা খাজা মাকুল দারার জেনানা আর সম্পদ যতটুকু বাঁচাতে পেরেছেন, নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। বার্নিয়ে তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করছেন। তার সঙ্গে কয়েকশ সেনা, তার খাজাঞ্চিখানা বইছে দুতিনটে হাতি। চিকিৎসক বার্নিয়ে ঘোড়ার অভাবে দারার সঙ্গী হতে পারলেন না।

২৯ মার্চ তাঁকে কাড়হি জেলার কাঞ্জি কুলি গোষ্ঠী নেতা পথ দেখিয়ে এগিয়েদিলেন। সেখানেই সুরাটের প্রয়াত ফৌজদার গুল মহম্মদের বাহিনী ৫০টা ঘোড়া আর ২০০ পদাতিক বন্দুকচি তাঁর সঙ্গে জুড়ল। বিরামগাঁও থেকে শুরু হল তীব্র কষ্টের যাত্রা। কচ্ছের রাজধানী ভুজ পৌঁছলেন। কিন্তু ততদিনে জয় সিংহের চিঠির প্রভাব ফলতে শুরু করেছে। প্রত্যেক অঞ্চলের ফৌজদার সসম্মানে শাহজাদাকে জানালেন তাঁদের পক্ষে দারাকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।

মে মাসের প্রথম থেকে শুরু হল তার আবারও সিন্ধুর দিকে যাত্রা। শুনলেন পূর্ব আর উত্তর দিকের পথ রোধ করে আছেন পাঞ্জাবের সুবাদার তাঁর মেসোমশাই খলিলুল্লা খান, যাঁকে তিনি দরবারে একবার পয়জার দিয়ে পিটিয়েছিলেন। বুঝলেন কোনও দিকেই যাওয়ার রাস্তা খোলা নেই। একমাত্র রাস্তা কান্দাহার হয়ে পারস্যের দিকে পালিয়ে যাওয়া, যেভাবে হুমায়ুন পালিয়ে পারস্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দারা উত্তর-পশ্চিমের রাস্তা ধরলেন। সিন্ধু তীরে তাকে ছেড়ে গেলেন ফিরোজ মেওয়াতি, তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি। তিনি আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেবেন।

দারা জানেন তাঁর পিছনে লেগে আছেন জয় সিংহ আর বাহাদুর খান। দারার পিছু নিতে গিয়ে তাদের বাহিনীরও প্রভূত ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। কচ্ছের রণে পৌঁছোবার আগেই বাহিনীর সামনে জলের সমস্যা শুরু হয়েছে – সমসাময়িক ঐতিহাসিকেরা এই সময়কে আখ্যা দিচ্ছেন জল-মন্বন্তর। জলের দাম উঠল টাকায় এক সের। এমন কী এই অর্থ দিয়েও জল মিলল না। জলের অভাবে সে বছর চাষও কম হয়েছে। ফলে জলের সঙ্গে খাবার জোগাড়ও দুর্বিসহ হয়ে উঠল। ১৮ মে সিন্ধুর দক্ষিণে রহিমকীবাজারে, ২৯এ নসরপুর, ৭ জুন হালা, ১১ওয়াই সিন্ধুর তীরে সিসিস্তানে পৌঁছে জয় সিনহ-বাহাদুর খান শুনলেন সিসিস্তান হয়ে দারা মাঘসি গোষ্ঠীর সাহায্যে কান্দাহার পালিয়ে যাচ্ছেন।

জয় সিংহ কী শাহজাদাকে ধরার ক্ষেত্রে একটু ঢিলে দিচ্ছিলেন? সেটা কী তার পুরোনো অভ্যেস! মির্জা রাজা সম্রাটকে লিখলেন দারা যেহেতু ভারতের মাটিতে নেই, তাই তাঁর পক্ষে দারার পিছু নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি দারাকে ধরার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। গুজরাটের রণে তার বাহিনীর প্রভুর ক্ষতি হয়েছে। তাঁর বাহিনী ক্লান্ত, যে বাহিনী নিয়ে পিছু যাত্রা শুরু করেছিলেন, সে সংখ্যা এখন অর্ধেক। তাঁর পক্ষে এখন দৈনিক ৭-৮ মাইল পার করারও সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার শক্তি নেই, ভারবাহী জন্তু রোজ মারা যাচ্ছে জলের অভাবে। তিনি সম্রাটের কাছে আবেদন করে বললেন, তাঁকে অবিলম্বে দরবারে ডেকে নেওয়া হোক। তাঁর এবং তাঁর বাহিনীর এখন কিছুদিনের বিশ্রাম দরকার। মানুচি মন্তব্য করছেন, শাহজাহানের নিমক খাওয়া জয় সিংহ পরিকল্পিতভাবে দারাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছিলেন। জয় সিংহ হয়ত একটু বেশি জোর দিয়ে চেষ্টা করলে দারাকে ধরা সমস্যা হত না। এই সম্ভাবনার দ্বার খোলা রেখেও যদুনাথ বলছেন, সমসাময়িক ইতিহাসে জয় সিংহের বাহিনীর দারার পিছু নেওয়ার দৈনিক যে বর্ণনা পাচ্ছি, যে রাস্তায় যে কষ্ট সহ্য করে তিনি এগিয়েছেন, তাতে মানুচির বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করা যায় না। দারাকে ধরার ক্ষেত্রে জয় সিংহের বিন্দুমাত্র ত্রুটি দেখছেন না যদুনাথ সরকার। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev