দারার জীবনের শেষ পর্ব
[পলাতক দারার মৃত্যুমুখী স্ত্রী নাদিরা বেগমকে পরীক্ষা করছেন মানুচি]
মুঘল হিন্দুস্তানে ফিরে আসার মানসিকতা নিয়ে জয় সিংহ যখন সিন্ধুর তীর ধরে ভক্ষরের দিকে আসছেন, জুনের মাঝামাঝি তাঁর কাছে দিল্লি থেকে খবর এল ৯ তারিখে দারা ধরা পড়েছেন, শাহী সেনাপতিকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তিনি যেন অবিলম্বে দারাকে নিজের অধিকারে নিয়ে দিল্লি আসেন।
পারস্যে পালিয়ে যাওয়া নিয়েও দারা মনস্থির করতে পারছিলেন না। সিন্ধু নদ উপত্যকায় চণ্ডী গোষ্ঠী তাঁর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে নি। কিন্তু তার পরের ভৌগোলিক অঞ্চলের মাঘাসি গোষ্ঠী তাঁকে আশ্রয় দিল। গোষ্ঠীপতি মির্জাই মাঘাসি তাঁর বাহিনীকে কান্দাহারের সীমান্তের একটু দূরে নিজের জমিদারির সীমান্ত পর্যন্ত নিরাপদে এগিয়ে দিলেন। আর মাত্র ১২ দিন বাকি মুঘল হিন্দুস্তানের সীমান্ত থেকে কান্দাহার ঢুকতে। কিন্তু দারার জেনানা মহল আগের মতই ‘অসভ্য’ বালুচ দেশ পেরোতে নারাজ। তাছাড়া স্ত্রী নাদিরা বানু বেগম মৃত্যুমুখে। আফগানদের প্রবাদ সিন্ধুর সূর্য গোরাকে কালা বানায়, রোদে ডিম ভাজতে আঁচ লাগে না। তিনি জানেন অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বন্ধুর বোলান গিরিপথ পেরোনো সমস্যার। তখনও সিংহাসনের আশা ছাড়েন নি। তিনি যেখানে আছেন, সেটা একদা তাঁর অনুগত বালুচ গোষ্ঠীপতির জমিদারি। সম্ভব হলে তাঁর সাহায্যে ভক্ষর কেল্লায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করবেন। অনুগামী খোজা বসন্ত এখনও ভক্ষর কেল্লা মুঘল বাহিনীর হাতে তুলে দেয় নি। সেখানে পৌঁছে কিছু দিন অপেক্ষা করে, সম্পদ সংগ্রহ করে দিল্লি অভিযান করবেন। খুব খারাপ হলে পারস্যে পালিয়ে যাওয়ার দ্বার তো খোলাই থাকল।
বোলান গিরিপথে যেখানে মুঘল হিন্দুস্তানের সীমান্ত শেষ হচ্ছে, তার ন মাইল আগে, অঞ্চলের গোষ্ঠীপতি, দাদারের জমিদার, মালিক জীবনের কাছে কিছু দিন বিশ্রামের পরিকল্পনা করলেন দারা। বহু আগে দারা যখন মুঘল সাম্রাজ্য ক্ষমতার শেষ বাক্য ছিলেন, সে সময় জীবনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন শাহজাহান। জীবনকে সম্রাটের রোষ থেকে বাঁচিয়ে জীবন দিয়েছিলেন দারা। এখন জীবনের থেকে যোগ্য প্রতিদান চান। তিনি জীবনের থেকে তাঁর আর তাঁর পরিবারের জীবন সম্মান বাঁচানোর উপায় দাবি করবেন। ৬ জুন জীবনের প্রাসাদে পৌঁছবার আগেই দারার স্ত্রীর মৃত্যু হল। দারা ভেঙে পড়লেন। ঐতিহাসিকেরা লিখছেন দারাকে যেন মৃত্যু তার দিকে হাত বাড়িয়ে ডেকে নিচ্ছিল; তাঁর আর বাঁচার ইচ্ছে ছিল না। শুধু সিংহাসন দখলের অদম্য ইচ্ছে তাঁকে এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি দিল্লি সিংহাসন উদ্ধারের পরিকল্পনা বাতিল করলেন। ইচ্ছে, কিছু দিন জীবনের প্রাসাদে কাটিয়ে পারস্যে রওনা হবেন। স্ত্রীর মরদেহ লাহোরে মিঞা মীরের কবরের পাশে গোর দেওয়ার জন্যে পাঠালেন।
জীবনের প্রাসাদে তিন দিন কাটিয়ে ৯ জুন যখন তিনি বোলান গিরিপথের দিকে রওনা হলেন, পথে তাঁকে জীবনের সেনা গ্রেফতার করে। সিপিহর কিছুটা ব্যর্থ লড়াই করলেন। জীবন দারাকে গ্রেফতার করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে জয় সিংহকে গ্রেফতারির খবর পাঠালেন। জয় সিংহ দারার গ্রেফতারির সংবাদ প্রথম দিনই পেয়েছিলেন। দারাকে আশ্রয় না দেওয়ার হুঁশিয়ারির নিশান মির্জা রাজা কাজি ইনায়েতুল্লার হাত দিয়ে স্থানীয় জমিদারদের জন্যে পাঠিয়েছিলেন সেই অঞ্চলে। দারা গ্রেফতারের মুহূর্তে কাজি ইনায়েতুল্লা ঘটনাস্থলে ছিলেন। দারার গ্রেফতারির সংবাদ তুরন্ত জয় সিংহকে পাঠালেন। ২৩ জুন দারাকে জীবন, বাহাদুর খানের বাহিনীর হাতে তুলে দিলেন। দারার স্বাক্ষরে খোজা বসন্তর অধিকারে থাকা ভক্ষর কেল্লার আত্মসমর্পণের চিঠি পাঠানো হল। দারার গ্রেফতারিতে মুঘল বাহিনীর তিন মাসের ধকল শেষ হল। জয় সিংহ আর বাহাদুর খানের বাহিনী দারাকে নিয়ে পঞ্চআবের দেশ পেরিয়ে দিল্লি পৌঁছলেন ২৩ আগস্ট।
মালিক জীবনের লেখা ভক্ষরের ফৌজদারের স্বাক্ষর করা চিঠিতে আওরঙ্গজেব দাদা দারার পতনের সংবাদ পেলেন ২ জুলাই। হফত আনজুমান সূত্রে জানতে পারছি আওরঙ্গজেব দরবারে দারার গ্রেফতারের চিঠি পড়লেন কোনও রকম ইমোশন দেখালেন না, নাকাড়াও বাজাতে বললেন না। ১৫ জুলাই বাহাদুর খানের ডেসপ্যাচ আসার পর তিনি দাদার গ্রেফতারি বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে দারার গ্রেফতারির সংবাদ প্রকাশ্যে জানানোর নির্দেশ দিলেন।
দারার মৃত্যুদণ্ড
“আওরঙ্গজেবের আত্মীয়-হত্যা আধুনিক পাঠকের বিবিমিষা উদ্রেক করবে, কিন্তু প্রশ্ন হল তার ভায়েরা ক্ষমতায় এলে কি অন্য কোন পথ নিতেন? দারার সঙ্গী মানুচি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে এই বিষয়টা ধরেছেন। মৃত্যুদণ্ডের দিন আওরঙ্গজেব দাদাকে প্রশ্ন করলেন, তিনি কি করতেন যদি পাশার দান পাল্টে যেত? দারা উত্তর দিলেন তিনি আওরঙ্গজেবের দেহ খণ্ড খণ্ড করে কেটে দিল্লির সদর দরজায় ঝুলিয়ে রাখতেন। আওরঙ্গজেব দাদার মৃতদেহ হুমায়ুনের সমাধি পাশে কবর দেন।” — অড্রে ট্রুস্কে, আওরঙ্গজেব, দ্য ম্যান এন্ড দ্য মিথ
দারা বন্দী অবস্থায় দিল্লি পৌঁছলেন ১৬৫৯-এর গ্রীষ্মে। দিল্লিতে পৌঁছে দারাকে আওরঙ্গজেবের দাস নজর বেগের হাতে তুলে দেওয়া হল। সম্রাট দারা আর তার পুত্রকে গ্রীষ্মের দুপুরে দিল্লির রাস্তায় বস্তা পরিয়ে মিছিলের নির্দেশ দিলেন। ২৯ আগস্ট দারা আর তার চৌদ্দ বছরের বালক পুত্রের হাতে পায়ে শৃঙ্খল বেঁধে ছাউনি ছাড়া কাদা লেপা মাদি হাতির হাওদায় বসিয়ে, পিছনে উদ্যত খড়গ হাতে ঘাতক দাস নজর বেগকে দাঁড় করিয়ে দিল্লির রাস্তায় প্যারেড করালেন। হাতির ওপরে চড়ে বাহাদুর খান তাঁর ধনুকধারী সেনা বাহিনীকে রাস্তার দুপাশে পাহারা দিয়ে শাহজাদাকে শাস্তি দেওয়ার মিছিলটাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কঠোর নজরদারিতে তিনি ঢিলে দেন নি। প্রখর গ্রীষ্মেও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখা মানুষের মধ্যে অনেকেই আছাড়িপিছাড়ি কাঁদল। তাদের কাউকে কাউকে দেখে দারা হাত তুলে সম্মান জানালেন। কাউকে তাঁর ছেঁড়া কাপড় দেখালেন। শেষে এক ভিখারিকে তার ছেঁড়া জামা ছুঁড়ে দিলেন। এক বছর আগে দারা, শাহ সুজার কিছু বন্দী অনুগামীকে অপমানজনকভাবে আগরায় ঠিক এইভাবেই হাঁটিয়েছিলেন। মুঘল শাহজাদাকে রাজধানীর পথে এইভাবে মিছিল করে নিয়ে যাওয়া, জনগণের মনে অন্য মানে বয়ে নিয়ে এল। বার্নিয়ে বলছেন দারা আর তার পুত্রকে এই রকম অচিন্ত্যনীয়ভাবে হাঁটতে দেখে বহু নাগরিক ভয়ে অপমানে কুঁকড়ে গিয়েছিল। আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন জনগণ দারার অবস্থা দেখে তুমুল ভয়ে কুকড়ে যাক। ঘটল উল্টোটা। যারা দারার দান-ধ্যানে উপকৃত হয়েছিল, তারা চিৎকার করে পুরনো দিনের কথা প্রিয় শাহজাদা জানান দিচ্ছিল। কিন্তু একজনও দারাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এল না। মিছিল ধীরে ধীরে শাহজাহানাবাদের বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে লাহোর দরজা, চাঁদনি চক, শাহুল্লা খান বাজার, কেল্লার পাদদেশের এলাকা হয়ে পুরনো দিল্লির খিজিরাবাদে পৌঁছল। দারাকে কঠোর নিরাপত্তায় খাওয়াসপুরা প্রাসাদে রাখা হল বিচারের দিনের অপেক্ষায়।
দেওয়ানিআমওখাসে বিচারসভায় দানিশমন্দ খান দারার প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন। কিন্তু শায়েস্তা খান, মহম্মদ আমিন খান, বাহাদুর খান আর হাকিম দাউদ ইসলাম রাষ্ট্রের পক্ষে মৃত্যুদণ্ড দাবি করলেন চোখের পলক না ফেলে। বোন রোশেনারা চিৎকার করে দারার বিপক্ষে সাক্ষী দিলেন, বারবার উল্লেখ করলেন, কীভাবে দারার জামানায় তিনি আর তাঁর ভাই আওরঙ্গজেব বারবার লাঞ্ছিত হয়েছেন। ইন্টারেস্টিং হল আওরঙ্গজেবের জীবনীকার যদুনাথ সরকার একবারই আওরঙ্গজেবের পক্ষে কলম ধরলেন। দরবারে দারার বিচার চলছে। আওরঙ্গজেব দারাকে শুধু ইসলাম বিরোধী বলছেন না, তাকে ক্ষমতা দখলদারও বলছেন, মিসচিফমেকারও বলছেন। যদুনাথ বলছেন দারাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় আওরঙ্গজেবের কী মনে পড়ছিল দারার হাতে ষোল বছর ধরে দরবারে তাঁর তীব্র লাঞ্ছনার কথা?
দারা উকিলের মাধ্যমে আওরঙ্গজেবের দরবারে শেষ বারের মত ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আওরঙ্গজেব তাঁর আবেদনপত্রের পাড়ে আরবিতে নিজের হাতে লিখলেন ‘প্রথমে আপনি জোর করে সিংহাসন দখল করেছেন, তারপরে একের পর এক অপকর্ম করেছেন’। সম্রাটের আসনে বসে মৃত্যুদণ্ড লিখতে লিখতে হয়ত তার মনে পড়ে যাচ্ছিল ষোল বছর ধরে দাদা তাঁকে কীভাবে বাবার কাছে ঘেঁসতে দেন নি’; তিনি বারবার দরবার থেকে এমন দূরের চাকরিতে পাঠিয়েছেন যাতে আওরঙ্গজেব সহজে দরবারে পৌঁছতে না পারেন; তাঁর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ, প্রত্যেকটা প্রস্তাবকে দারা আতস কাঁচের তলায় রেখে দুরমুশ করেছেন, বহু প্রস্তাব সম্রাটকে প্রভাবিত করে বাতিল করিয়েছেন; তাঁর রোজগার কমিয়েছেন; আওরঙ্গজেবের প্রত্যেক বিরুদ্ধপক্ষ দারার অযাচিত পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে; দারার প্রভাবে সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতি সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলেন; দারার আমলারা সুযোগ পেলেই আওরঙ্গজেবকে গালিগালাজ, অপমান করেছে, কিন্তু তাদের শাস্তি হয় নি; বিজাপুর গোলকুণ্ডায় যুদ্ধ জেতার মুহূর্তে দারার নির্দেশে সমঝোতা করতে হয়েছে; দারার ছেলেরাই সাম্রাজ্যের সমস্ত সুযোগ দখল করেছে, আওরঙ্গজেবের সন্তানেরা বঞ্চিত থেকেছে।
অথচ মুঘল প্রথা অনুসরণ করে আওরঙ্গজেব দারা শুকোর সমর্থক এমন কি তার অন্য ভায়ের সন্তানের প্রতি ধৈর্য এবং বিবেচনা প্রদর্শন করেছেন। ভায়ের সেনাপতি, পরামর্শদাতাদের মুঘল প্রশাসনে যোগ দিতে সাদরে আহ্বান জানালেন। মুরাদ যে গুজরাটি ধনী জৈন সওদাগর শান্তিদাসের থেকে যুদ্ধের বাহানায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নিয়েছিলেন, সে ধার আওরঙ্গজেব শোধ করেন। ১৬৭০-এ আওরঙ্গজেব কন্যা জুবদাতুন্নিসা সাথে দারার ছোট ছেলে সিপিহার শুকোর, আর সুলেইমান শুকোর কন্যার সঙ্গে শাহজাদা আকবরের বিবাহ দেন। দারার ধর্মগুরু শরমাদএর মত আরমেনিয় ইহুদি, যিনি অভক্ত নামে পরিচিত, তার মত কয়েকজন মাত্র হাতে গোনা আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণ্য পান নি। ইনি আওরঙ্গজেবের দাদার জয়ের দৈববাণী করেছিলেন। ১৬৬১-তে আওরঙ্গজেব শরমাদকে হত্যা করেন।
মালিক জীবনকে লবণের মূল্য মনে করাল দিল্লির জনগণ
যদিও পণ্ডিতেরা বলছেন সাম্রাজ্যে দারার ‘বদনাম’ ছিল ইসলাম বিরোধিতার। কিন্তু দারার দণ্ডের পরে তাঁকে কাদা মাখা মাদি হাতিতে চড়িয়ে সম্রাটের নির্দেশে দিল্লিতে যে মিছিল বেরকরানো হয়, সেই মিছিলের বর্ণনায় দারাকে দেখতে রাস্তার দুপাশে জড়ো হওয়া জনগণের মধ্যে দণ্ড পাওয়া শাহজাদার প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখি। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অধিকাংশই চুপ ছিলেন, অনেকে দারার সমর্থনে চিৎকার করে গলা তুলেছেন, কেউ নীরবে চোখের জল ফেলেছেন। কিন্তু রাজার দণ্ড অমান্য করে দারাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে এগিয়ে আসেন নি একজনও। মোটামুটি বোঝা গিয়েছিল, বন্দী মুরাদের মতই জনগণের একশ্রেণীর মধ্যে দারার ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা শাসকেরা প্রকাশ্যে দেখতে পেয়েছেন।
দারার দণ্ড-মিছিলে, দারার বদান্যতায় জীবন পেয়ে শাহজাদার দুঃসময়ে দারাকে ধরিয়ে দেওয়া, বিশ্বাসঘাতক মালিক জীবনও ছিল। দারাকে নিয়ে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মালিক জীবনের বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিশোধ নিতে দিল্লির এক শ্রেণীর জনগণ একজোট হয়। ২৯ আগস্টের মিছিলে মালিক জীবনের প্রতি কটূক্তি ছুঁড়ে দেওয়ার পরিমান থেকে বোঝা যাচ্ছিল কড়া পাহারা না থাকলে রাস্তার ধারে দারা আর ছেলের দণ্ড মিছিল দেখতে জড়ো হওয়া পাবলিক, মালিক জীবনকে ছিনিয়ে নিয়ে জাহান্নামের ঠিকানা দেখিয়ে দিত। জনগণ দেখেছে বিশ্বসাঘাতকতার পুরষ্কার হিসেবে মালিক জীবন ১০০০ মনসবদারি আর বখতিয়ার খান উপাধি পেলেন।
ভাইদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে লড়াই একটা অন্য ধরণের ইস্যু — যেখানে জনগণ পক্ষ নিলেও অনেকটাই প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করে না — কারন সে সব তার দৈনন্দিনের জীবন স্পর্শ করে না। কিন্তু নিমকের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু — জনগণের দৈনন্দিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মুঘল আমলে নিমক আর দুধের দাম সামাজিকভাবে খুব বড় বিষয় ছিল। মালিক জীবনের দারার নিমকের প্রতি বিশ্বাসঘাত দিল্লি সমাজের একাংশ মেনে নেয় নি। আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে বিশ্বসাঘাতক মালিক জীবনকে পুরস্কৃত করাকেও জনগণ ভালভাবে নেয় নি। সেই হুমায়ুনের সময় থেকেই আফগানদের সম্বন্ধে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করত না। অধিকাংশ মানুষের ধারণা ছিল আফগানেরা সুযোগ সন্ধানী, বিশ্বাসঘাতক, সুযোগ পেলেই ছোবল মারতে পটু। এই গতে ফেলে মালিক জীবনকেও দেখছিল দিল্লিবাসীর একাংশ। ৩০-এর সকালে দিল্লিওয়ালারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জীবনের দলকে এমন শাস্তি দিল যে ৩০-এর রাতে দারার হত্যা নিয়ে দিল্লিতে সেদিন প্রায় কোনও আলোচনাই হল না।
৩০ অগাস্টের সকালে আফগান অনুগামীদের নিয়ে মালিক জীবন ওরফে বক্তিয়ার খান দরবারে যাচ্ছিলেন। শাহী সেনাবাহিনীর জনৈক আহদি, অভিজাত সেনা, হৈবত, সকাল থেকেই জনগণকে মালিক জীবনের কাজকর্ম আর তার পদপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছিলেন। এই কাজে জুড়ে গেল দারাকে পছন্দ করা কিছু বাজারি গুণ্ডা, ভিখারি আর অনুগামীও। মালিক জীবনের নিমকহারামের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সকাল থেকেই দিল্লিওয়ালাদের একাংশ একজোট। দরবারের দিকে যাওয়া জীবনের দলবলের সঙ্গে বাজারের মধ্যে প্রথমে চিৎকার চেঁচামেচি, কটূক্তি, বিশৃঙ্খলা, ধাক্কাধাক্কি শুরু হল। মৌখিক গণ্ডগোল পৌঁছল হাতাহাতিতে। হাতাহাতি শুরু হতে অস্ত্র বেরিয়ে এল নিমেষের মধ্যে। জীবনের কয়েকজন সেনাকে পথেই কোপানো হল। কয়েকজন আহত হল। খবর পেয়ে কোতোয়াল বাহিনী নিয়ে দৌড়ে না এলে জীবনেরও প্রাণ সংশয় ঘটত। সেই রাতে দারার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হল। কাটা মাথা দণ্ড-নিদর্শন হিসেবে আওরঙ্গজেবকে পাঠানো হল। আওরঙ্গজেবের নির্দেশে মৃতদেহটা আবারও হাতির পিঠে চাপিয়ে দিল্লি ঘোরানো হল। দাদাকে দাফন করা হল হুমায়ুনের কবরের পাশে।
দিল্লির মানুষ কিন্তু মালিক জীবনকে লবণের মূল্য মনে করিয়ে দেওয়ার উত্তেজনায় ডগমগ। তাদের অধিকাংশেরই দারার হত্যাকাণ্ডের কথাটা সে দিন আর মনেপড়ে নি। (চলবে)