গঙ্গায় যুদ্ধ
১। নতুন যুদ্ধ পরিবেশে মীর জুমলার সমস্যা
বাংলায় প্রবেশ করে শাহজাদা শাহ সুজা গঙ্গার পশ্চিম পাড় দখল নিয়ে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের রশি হাতে তুলে নিলেন।
পূর্বভারতে সিংহাসনের লড়াই এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে। দাদা সুজাকে হারাতে মীর জুমলার ওপর নির্ভর করছেন আওরঙ্গজেব। সুজা হারলে তাঁর সিংহাসনের আর কোনও শাহী বৈধ চ্যালেঞ্জার থাকছে না। বড় ভাই পালাচ্ছে, ছোট ভাই জেলে। এখনও শক্ত প্রতিরোধের দেওয়াল তুলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন মেজো ভাই শাহ সুজা। দিল্লিতে বসে সমস্ত সময় তাঁর মন পড়ে আছে বাংলার রণাঙ্গনের দিকে।
কিন্তু বাংলায় শাহী সেনাপতি মীর জুমলা স্বস্তিতে নেই, বরং তিনি বেশ বেকায়দাতেই পড়লেন। এতদিন মীর জুমলা লড়াই করেছেন শুকনো যুদ্ধ মাটিতে। বিপুল সংখ্যক পদাতিক, দুরন্ত মধ্য এশিয় তীরান্দাজি ঘোড়সওয়ার আর বন্দুকচি সুইভেল আর বিশাল বিশাল কামানওয়ালা গোলান্দাজ বাহিনীর রণনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ জিতেছে শাহী বাহিনী। খাজওয়া যুক্ষেত্রে দেখেছি অসামান্য রণনীতিবিদ মীর জুমলার শুকনো মাটিতে লড়াই করার অভিনব সামরিক পরিকল্পনা সুজাকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দেয় নি, তাকে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে হয়েছে। শাহী বাহিনীর কাছে হারের পরে পালানোর রাস্তায় কোনও সময়ই শাহ সুজা তাঁর পিছু নেওয়া মীর জুমলার নেতৃত্বে শাহী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহস পান নি – একই সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে মীর জুমলা অযথা রক্তক্ষয় এড়াতে ঘুরপথে বাংলায় প্রবেশ করেছেন – কিন্তু মীর জুমলা ঘুর পথ বেছে নিয়েছেন স্বইচ্ছায়, শাহ সুজার চাপে পড়ে নয়। কিন্তু যে মুহূর্তে শুকনো বিহার থেকে সিংহাসনের যুদ্ধ বাংলায় জলজ পরিবেশে প্রবেশ করল, তখনই তিনি বেকায়দায় পড়লেন। শুকনো পরিবেশে যুদ্ধ করে অভ্যস্ত মীর জুমলা বাংলার ভিজে পরিবেশে সেনাপত্য করতে বিন্দুমাত্র তৈরি ছিলেন না। এখানে পদাতিক বাহিনী কার্যকর নয়, ঘোড়সওয়ার বাহিনীও তার গতি হারায় আর বিশাল বিশাল নদী বিশাল বিশাল জলাশয় আর শেষ দেখা না যাওয়া হাওর এলাকায় বড় কামান ততটা কার্যকর নয়। এই বস্তব অবস্থা অনুবাধন করে মীর জুমলার জীবনীকার জগদীশ নারায়ণ সরকার বলছেন বাংলায় ‘যুদ্ধ এক নতুন স্তরে উন্নীত হল’।
মীর জুমলার মত রণবিদ জানেন বাংলায় যুদ্ধ প্রস্তুতি শুকনো অঞ্চলের প্রস্তুতির মত হবে না। যারা শুকনো পরিবেশ থেকে বাংলায় যুদ্ধ করতে আসছেন, তাঁকে আবশ্যিকভাবে নতুন ধরণের, বাংলার পরিবেশের সঙ্গে মানানসই যুদ্ধ প্রকরণ তৈরি করতে হবে। এই তত্ত্ব আকবর বাংলা আক্রমণে হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন। বাবার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাহাঙ্গীর বাংলাজুড়ে বহু কষ্টে মুঘল শাসন বিস্তারে সমর্থ হন। সে সময় থেকে বাংলায় মুঘল বাহিনী যথেষ্ট শিক্ষা পেয়ে নাওয়ারা বাহিনী তৈরির ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু বাংলায় ঢোকার আগেই সুজা জানতেন শুকনো জমিতে যুদ্ধ-দক্ষ মীর জুমলার পক্ষে ভিজে বাংলায় রণনীতি তৈরি এবং রণসাজ সাজানো খুব সহজ কাজ হবে না। বাঙলা মূলত নদীমাতৃক দেশ, যুদ্ধ হবে নদী নির্ভর, বিশাল আকারের গঙ্গা নির্ভর, স্থল নির্ভর নয়। তিনি জানেন তখনও মীর জুমলার বাহিনীর সঙ্গে একটিও যুদ্ধ নৌকো নেই। বাংলায় যুদ্ধ নৌকো না নিয়ে যুদ্ধে নামার অর্থই হল যুদ্ধের আগেই শত্রুর কাছে হার মেনে নেওয়া। বাংলা সেনাবাহিনীর চতুরঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক অঙ্গ নাওয়ারা। এত দিন শুকনো মাটিতে লড়াই করার সময় সুজা, মীর জুমলার রণনীতি অনুযায়ী তাঁর রণনীতি তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন – তিনি মীর জুমলার ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন মাত্র, নিজে উত্তর ছুঁড়ে দিতে পারছিলেন না। কিন্তু বাংলায় নিজের চেনা পরিবেশে ঢুকে তিনি ঘটনার রাশ হাতে নেওয়ার সুযোগ পেলেন। দেড় দশকের বেশি সময় বাংলার ক্ষমতাকেন্দ্রে কাটানো শাহ সুজা এই অঞ্চল নিজের হাতের তালুর মত চেনেন। তিনি জানেন নদী নির্ভর বাংলা জয় করা মীর জুমলার পক্ষে খুব সহজ হবে না। এই মুহূর্তে মীর জুমলা সমস্যায় আছেন। যুদ্ধ জিততে গেলে সেই সমস্যা তাঁকে সমাধান করতে হবে – এবং সেটা সহজ কাজ নয়। এত দিন মীর জুমলা যুদ্ধে তাঁকে নাকানিচোবানি খাইয়েছেন, কিন্তু বাংলায় যুদ্ধের রশি, শুরুর সময়ে অনেকটা শাহ সুজার হাতে চলে এল।
মাঝখানে গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে দুইপাড়ে যুযুধান দুই বাহিনী বাংলার নবাব আর শাহী সেনা মুখোমুখি হল। শত্রুদলের থেকে কিছুটা হলেও সুজা রণনীতিতে এগিয়ে ছিলেন। সুজার জোর ছিল প্রচুর সাধারণ ডিঙ্গি এবং যুদ্ধ ডিঙ্গি (ফ্লোটিলা)। তাছাড়া বাংলায় ঢুকে সুজা আরও নৌকো যেমন জবরদখল করলেন, তেমনি যাতে অন্যান্য যুদ্ধ নৌকো শত্রুপক্ষের কবলে না পড়ে, তাঁর জন্য তিনি পোড়ামাটি নীতি নিলেন — তাঁর বাহিনীতে যত পরিমাণ নৌকো ছিল, মধ্যবঙ্গের আশেপাশে অঞ্চলে তার থেকে অনেক বেশি ডিঙ্গি আর জলযান ডুবিয়ে পুড়িয়ে দিলেন। উল্টোদিকে মীর জুমলার বাহিনীতে শুধু রয়েছে স্থলে যুদ্ধ করার মত পদাতিক বাহিনী, ব্রিটিশদের ভাষায় ‘উড়তা বাহিনী’, পদাতিক, কামান ইত্যাদি যা জলযুদ্ধে খুব একটা কার্যকর নয় — খুব বেশি হলে নাওয়ারার সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে মাত্র। মীর জুমলা বাঙলা অভিযানে আসার সময় নৌবাহিনী সঙ্গে আনার কথা হয়ত ভাবেনই নি। তাছাড়া তাঁর আরও বড় অসুবিধে ছিল নাওয়ারা নিয়ে সুজার পোড়ামাটি নীতি। সুজা যেহেতু তাঁর বাঙলা প্রবেশের আগে থেকে বহু নৌকো দখল এবং ডুবিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন পোড়ামাটির নীতি নিয়ে, সেহেতু মীর জুমলার পক্ষে নতুন করে নৌবাহিনী তৈরি করা প্রবল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। এছাড়াও তার সঙ্গে বলা মত ভারি গোলান্দাজ বাহিনীও ছিল না — সুজাকে দ্রুত ধাওয়া করার রণনীতিতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাত্র ৮টা কামান এনেছিলেন। উল্টোদিকে সুজার বাহিনীতে দক্ষ ইওরোপিয় গোলান্দাজ বাহিনী ছিল; বিশেষ করে পর্তুগিজরা ছিল; আর ছিল হুগলী, তমলুক এবং নোয়াখালির দোআঁশলা(মেস্টিকো) গোলান্দাজ বাহিনী। বিপুল বেতন এবং সুখদ ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখিয়ে বাহিনীতে হাজারো এই ধরণের গোলান্দাজে ভর্তি করান শাহজাদা সুজা। এই গোলান্দাজেদের অধিকাংশ ডাচেদের হাতে জাফনাপাটন এবং শ্রীলঙ্কা থেকে উতখাত হয়ে ফেরা পর্তুগিজ বাহিনী। তাণ্ডাতে তাঁবু ফেলে বিপুল যুদ্ধ ডিঙ্গি এবং গোলান্দাজ বাহিনী সম্বল করে সুজা সাম্রাজ্যের বাহিনীর উল্টোদিকের তীরে রাজমহল থেকে বাকারপুর, ফিরোজপুর থেকে সুতি পর্যন্ত এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেললেন। সুজার হাতে থাকা কামান বাহিনী আর নাওয়ারা ফ্লোটিলা বহর — দুয়ের আক্রমণ বিপক্ষের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। যেহেতু স্থলযুদ্ধের মত গোলান্দাজ বাহিনীকে আর এক জায়গায় বসিয়ে রাখার প্রয়োজন হল না, গোলান্দাজেরা নৌকোয় কামান রেখে জলে ভেসে ভেসে অবাধে যুদ্ধ করতে পারে। খুব কম স্থল বাহিনী নিয়ে তিনি মীর জুমলার মুখোমুখি হতে না পারলেও নৌযুদ্ধে তিনিই সেরা প্রমানিত হলেন। বাঙলার ভৌগোলিক অবস্থা তাকে বিপক্ষের ওপর খবরদারির সুযোগ করে দিল। সুজার রণনীতিতে মীর জুমলার বিশাল বিপুলাকায় শাহী বাহিনীর অগ্রগতি থমকে গেল, দুঃস্বপ্নের দিন বেড়েই চলল গুণোত্তর প্রগতিতে। বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার রণনীতি জানতে পারেন নি। কিন্তু তাদের স্পষ্ট নিদান ছিল (৩০ এপ্রিল ১৬৫৯) এই বছরে যদি মীর জুমলাকে যুদ্ধ জিততে হয়, তাহলে সেটি করতে হবে বর্ষার আগেই। নচেৎ তিনি বিপাকে পড়বেন। কিন্তু মীর জুমলার পক্ষে এই লক্ষ্য পূরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল মীর জুমলার নৌ এবং গোলান্দাজ বাহিনী অপ্রতুলতার জন্য। নৌসেনা অপ্রতুলতার জন্য তিনি পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে যেতে বিপুলাকার গঙ্গা পেরোতে পারলেন না। মীর জুমলা এমনই দয়ে পড়ে রইল যে, শাহী বাহিনীর হাত থেকে সুজার বাহিনী, তাঁর তৈরি রাজধানী রাজমহল ছিনিয়ে নিল। ফলে মীর জুমলা শত্রুকে ধাওয়া করার সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়ে ছেদ টানলেন।
মীর জুমলার রাজমহল দখল করার ১৩ এপ্রিল ১৬৫৯ থেকে ১২ এপ্রিল ১৬৬০ সুজা ঢাকায় প্রবেশ করার এক বছর আদতে মীর জুমলার বিফলতার নিদর্শন। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে সুজার চমৎকার রণনীতির কাছে মীর জুমলার হারের সময়। যদিও শেষ পর্যন্ত অসামান্য রণপণ্ডিত মীর জুমলা অবস্থা বুঝে নিদান তৈরি করলেন, নিজের ভাবনাকেও ঢেলে সাজালেন এবং যুদ্ধ করতে করতে সুযোগ সুবিধের মত তিনি ভাবনা পাল্টলেন বলেই বাংলার শাহজাদা নবাব সুজার রক্ষণ ভাঙতে সক্ষম হলেন সেনানী শ্রেষ্ঠ মীর জুমলা। এই নাটকটি তিন অঙ্কে সমাপ্ত হবে। যুদ্ধ চলার মধ্যেই মাঝে মধ্যে ভাগ্যলক্ষ্মী ঢেঁকির মত কখনো এক পক্ষ কখনো অন্য পক্ষে ঢলে পড়তে থাকেন। প্রথম অঙ্কে সুজা গঙ্গায় আত্মরক্ষামূলক রণনীতি অনুসরণ করয়েছেন। এবং তাঁর রক্ষণাত্মক যুদ্ধ প্রচেষ্টা শেষ হয় ১৬৫৯র ৮ জুন শাহজাদা মহম্মদ সুলতান দল বদল করে সুজার দলে চলে যাওয়ার পর। দ্বিতীয় অঙ্ক অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিম পাড়ে সুজা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে রাজমহল দখল করে নেওয়ায়, যদিও শেষ পর্যন্ত রাজমহল অঞ্চল দখলে রাখতে পারেন নি। তৃতীয় অঙ্কে মীর জুমলা আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠেন এবং যুদ্ধের ঢেঁকির একপ্রান্ত চিরকালের মত হেলে যায় পশ্চিম পাড়ের দিকে, তিন দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে উঠে সুজাকে পূর্ব পাড় চিরতরে ছেড়ে যেতে হয়। (চলবে)