উপনিবেশিক এই অনৃত প্রচারের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে উপমহাদেশিয় ইতিহাসে, কারিগর অর্থনীতি বোঝা এবং উপমহাদেশের জ্ঞান আর সম্পদ লুঠের সূত্র খোঁজার উদ্যমের একজন ছাত্র হিসেবে লেখকের কাছে উপনিবেশপূর্ব মুঘল আমল বিশেষ করে আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দব্যাপী রাজত্বকাল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দু’কারণে ১) সে সময় দক্ষিণ এশিয়া জাগতিক উন্নতি, প্রশাসনিক সুব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিকভাবে বিশ্বের দরবারে অত্যুজ্জ্বলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে – দক্ষিণ এশিয়া ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতি, ২) এই রাজনৈতিক সময় লুঠেরা খুনি গণহত্যাকারী ঔপনিবেশিক ইওরোপিয়দের প্রাবল্যে স্বাধীনতা হারাবার, জ্ঞান আর সম্পদ লুঠ শুরু হবার ঠিক আগের সময়। তাই আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের চর্চা প্রয়োজন পলাশী চক্রান্ত উত্তর বাংলা সহ গোটা উপমহাদেশ ইওরোপিয়দের হাতে অমেয় জ্ঞান প্রযুক্তি সম্পদ লুঠ, ব্যাপক খুন, অত্যাচার, গণহত্যা চালাবার আগের দক্ষিণ এশিয় উদ্বৃত্ত অর্থনীতিতে উপমহাদেশের চেহারা, প্রশাসন, রাজনীতি, সমাজ কেমন ছিল সেটা স্পষ্টভাবে জানার বোঝার জন্যে। মুঘল আমলের শয়ে শয়ে ফরমান, প্রশাসনিক নির্দেশ, চিঠি, চুক্তি ইত্যাদি অধ্যয়নের অন্তে একটা বিষয় পরিষ্কার, এই সময়টি ঔপনিবেশিক কেন্দ্রিভূত কর্পোরেট উতপাদন ব্যবস্থায় সরাসরি প্রতিযোগী সামগ্রিকভাবে চাষী আর কারিগরদের দেশিয় উৎপাদন ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণায় সাহায্য করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে চাষী কারিগরদের সমর্থনের অত্যুচ্চ যে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য উপমহাদেশে তৈরি হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে, যে নীতির বলে ঔপনিবেশিক সময়ের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়া তথা সামগ্রিক এশিয়া ছিল বিশ্বের কারখানা, সেই এশিয় রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করার প্রবাহমানতার উদাহরণ দেখি এশিয়-সন্তান মুঘল আমলেও। মুঘলদের প্রশাসনিক নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলা, দণ্ডসংহিতার বীজ বপন করা সম্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরের ৫০ বছরের বাংলার নবাবি আমলও চাষী আর কারিগরদের পৃষ্ঠপোষক ছিল, সব থেকে বড় কথা বিপুলভাবে সর্বধর্মের অনুগামীদের পালকও ছিল[সূত্র এন এ সিদ্দিকী রচিত মোঘল-রাজত্বে ভূমি রাজস্ব পরিচালন ব্যবস্থা(১৭০০-১৭৫০) [ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পর্যদের সহায়তার পার্ল পাবলিশার্স প্রকাশিত], আবদুল করিমের মুর্শিদকুলী খান ও তাঁর যুগ, অনুবাদ মোকাদ্দেসুর রহমান (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, বাংলাদেশ), বা কালিকিঙ্কর দত্ত’র আলিবর্দি এন্ড হিজ টাইমএ। চাষী কারিগরদের পৃষ্ঠপোষণার নানান ইঙ্গিত সরাসরি পাই আচার্য যদুনাথ সরকারের দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন বইতে)।
তো এই গুরুত্বপূর্ণ-তম সময়ের অন্যতম ঘটক চরিত্র আওরঙ্গজেব। একদা পথব্যবসায়ী এবং বর্তমানে বাংলার কারিগরদের সংগঠনের কর্মী হওয়ার সুবাদে লেখকের কাছে একটা বিষয় স্পষ্ট, পলাশীর চক্রান্তে বিজয়ী হওয়ার পর ব্যপক অনিয়ন্ত্রিত লুঠ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে প্রাতিষ্ঠানিক লুঠ এবং সুশাসিত উপমহাদেশকে চিরস্থায়ী গোলোযোগের আবর্তে ফেলে দেওয়া কাজে ঘোমটা টানতে ব্রিটিশপূর্ববর্তী বিকেন্দ্রিভূত বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান-আদিবাসী জ্ঞানচর্চা প্রযুক্তি উদ্ভাবনা আর হাজার উৎপাদক হাজার বিক্রেতার বাজার দিয়ে যে চাষী-কারিগর নির্ভর উদ্বৃত্ত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তাকে কলঙ্কিত, ঘৃণিত দেখানো প্রয়োজনছিল। ঔপনিবেশিক সময়ের অবর্ণনীয় লুঠ, গণহত্যা অব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে তাকে প্রগতিশীল দেখানোর জন্যে উন্নত দক্ষিণ এশিয়ার আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালকে ঘৃণিতভাবে দেখানো, আওরঙ্গজেবের চরিত্র কলুষিত করার কাজ আবশ্যক হয়ে পড়েছিল সাম্রাজ্যবাদী আর ঔপনিবেশিক শিবিরের কাছে। ততদিনে ইওরোপিয় কেন্দ্রিভূত কর্পোরেট জ্ঞানচর্চা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যতম বেনিফিসিয়ারি হয়ে উঠেছেন বাংলার প্রখ্যাত ইংরেজি শিক্ষিত নবজাগরিত মহামহিমেরা। হিন্দুত্ববাদের নির্ঘোষও শুরু হয়েগিয়েছে নবজাগরণের কল্যাণে, শুরু হয়েছে যবনী মিশেল বর্জনের কর্মকাণ্ডও। তার প্রভাব এসে পড়েছে ইতিহাস চর্চায় বিশেষ করে উপনিবেশপূর্ব সময় বিশ্লেষণে — যার বলি হয়েছেন আওরঙ্গজেব এবং আকবর পরবর্তী অধিকাংশ মুঘল সম্রাট। বলা দরকার আওরঙ্গজেব যেমন পুত-পবিত্র দোষহীন নন, তেমনি প্রণম্য ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক অথবা সাহিত্যিকদের কাছে তাঁর যতটুকু সম্মান প্রাপ্য ছিল ততটুকুও তিনি পান নি।
অভিযোগ আওরঙ্গজেব ছিলেন হিংসাশ্রয়ী। যেন মনে হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ব্যক্তিদের হত্যা করা, হিংসা চাপানোর কাজ চাঘতাই-তৈমুরী বংশে একমাত্র আওরঙ্গজেবেরই হাত দিয়েই ঘটেছিল! আকবর থেকে শাহজাহান এ বিষয়ে ধোয়া তুলসি পাতা ছিলেন। মহান ‘দরদী’শাহজাহানের হাতেও একের বেশি ভাইকে কতলএর রক্ত লেগে রয়েছে তাও ভুলে যাই। ঔপনিবেশিক ভদ্রবিত্তরা গত আড়াইশ বছরের তথাকথিত পশ্চিমি গণতান্ত্রিক দর্শনে জারিত হয়ে উপনিবেশপূর্ব সময়কে দেখতে চাই আমাদের ঔপনিবেশিকতায় জারিত মনের মাধুরী মিশিয়ে। ভুলে যাই তৈমুরী বংশের সিংহাসনে আরোহনের শর্তই ছিল ভাইদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে প্রতিযোগিতা। আদিবাসী গোষ্ঠীর মর্মন্তুদ স্তেপের নিষ্করুণ জীবনযাত্রায় যোগ্যতম নেতার উদ্বর্তন এইভাবেই নিশ্চিত হত। আমরা ভুলে যেতে চাই, ধর্মান্ধ হিসেবে কথিত শাহজাহান আর আওরঙ্গজেবের সময় মুঘল আমলে সব থেকে বেশি অমুসলমান আমলা নিযুক্ত হয়েছিলেন – যার একজন চন্দর ভান ব্রাহ্মণ। তিনি ব্রাহ্মণ উপাধি নিয়েই সম্রাট শাহজাহানের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করে আওরঙ্গজেবের রাজত্বের প্রথম কালে অবসর নেবেন। ঔপনিবেশিক ইতিহাস আওরঙ্গজেবকে হত্যাকারী রূপে চিহ্নিত করে ঠিকই, কিন্তু ‘ঘৃণিত’আওরঙ্গজেব ইওরোপিয়দের মত এই উপমহাদেশে একটাও ছিয়াত্তর বা উনপঞ্চাশ বা তার মাঝে কয়েকশ মন্বন্তর (আমরা যারা কারিগর তারা একে গণহত্যাই বলি) ঘটাতে পারেন নি, একটাও বিশ্বযুদ্ধ ঘটাতে পারেন নি, আমেরিকার দেশজ মানুষদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মত গণহত্যা চালাতে পারেন নি, বিশ্বজুড়ে দাস ব্যবসা চালাতে পারেন নি আর দু’দুখানি বিশ্বযুদ্ধ চালিয়ে কোটি কোটি মানুষ মারতে পারেন নি। এত সব কিছু চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রবাদী, জাতীয়তাবাদী এমন কি প্রগতিশীলেরাও সরাসরি আওরঙ্গজেবকে ঘৃণিত দেখানোর ঔপনিবেশিক প্রকল্পের স্বেচ্ছা অংশীদার হয়ে পড়ে তাঁকে ভারতেতিহাসের খল নায়ক বানিয়ে দেন। বঙ্গ-পাঞ্জাব ভাগের পরেও সেই প্রবণতা কমে নি বরং চোরা ইসলাম বিদ্বেষ বেড়েছে নানান ভাবে সামনাসামনি, প্রগতিশীলদের মাধ্যমে পরোক্ষে আরও বেশি করে ঘোমটার মাধ্যমে।
আমরা মুঘল সময় নিয়ে অসাধারণ গবেষক আচার্য যদুনাথ সরকারের দুটি বই অনুবাদ করেছি – দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন এবং আহকমইআলমগিরি। হতাশার হল ঔপনিবেশিক উপমহদেশিয় ইতিহাসে সরাসরি আওরঙ্গজেবকে ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে দেখানোর অন্যতম প্রতিভূ হয়ে ওঠেন আচার্য স্বয়ং, জেনে না জেনে বা তথ্যকে বিকৃত করার মাধ্যমে, সে বিষয়টির কিয়দাংশ যেমন অড্রে তার আওরঙ্গজেবের জীবনীর কৃষ বইতে উল্লেখ করেছেন, তেমনি দীপেশ চক্রবর্তী মুঘল (বিশেষ করে আওরঙ্গজেব) বিরোধিতার অস্বস্তিকর প্রশ্ন দ্য কলিং অব হিস্ট্রি স্যর যদুনাথ সরকার এন্ড হিজ এম্পায়ার অব ট্রুথ-এ ৩৫ পাতায় সরাসরি এড়িয়ে গিয়েছেন অসামান্য কৌশলে — I have been recently, এবং somewhat hastily, accused of “remaining rather faithful to the position of Jadunath Sarkar” in what I have written about him up to now. I have to clarify again that this is not an intervention in historiographical debates about Mughal India. That task would be beyond my competence: I would need to have a command of his “sources” এবং linguistic competencies that I simply do not have। যদুনাথ সরকার যেহেতু পশ্চিমবিদ্য, পশ্চিমের তাত্ত্বিক পথে তাঁর গবেষণা তাই তাঁর করা আওরঙ্গজেব চরিত্রায়ন প্রায় প্রত্যেক শিবিরেই প্রতিষ্ঠা, মান্যতা পেয়ে যায়। আহকমইআলমগিরির প্রথম সংস্করণের বইতে আচার্যকৃত আওরঙ্গজেবের সংক্ষিপ্ততম জীবনীটি বাদ দিয়ে যাই। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে বাতিল করা আওরঙ্গজেবের জীবনী অনুবাদ করতে গিয়ে দেখলাম তিনি অতি কঠোর বিশেষণে আওরঙ্গজেবকে বিদ্ধ করেছেন। আওরঙ্গজেব এমনকী আকবর ছাড়া সামগ্রিকভাবে মুঘল সময় নিয়ে তাঁর ভাবনাও বেশ সমস্যা সৃষ্টি করে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মত বিষয় লেখার উদ্দেশ্যে সরাসরি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে আওরঙ্গজেবকে দায়ি করে, তাকে অপরাধী, ধর্মান্ধ, পরশ্রীকাতর, ছলাকলায় ভরা সম্রাট হিসেবে দাগিয়ে দেন – যদিও আহকমইআলমগিরিতে বেশ কিছু কাহিনী আছে যা আওরঙ্গজেবকে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়।
আমরা পাঠ্যপুস্তকেই কী অদ্ভুতভাবে জেনেছি বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেব এই ছজনই ছিলেন মুঘল সম্রাট এবং ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অথচ আচার্য যদুনাথ সরকারের গুরু-প্রতীম উইলিয়াম আরভিংএর অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি দ্য ল্যাটার মুঘলস শেষ, সম্পাদনা আর নিজের খরচে প্রকাশনাও করেন (দীপেশ চক্রবর্তীর উপরিউক্ত বইএর ২৮ পাতায় লিখছেন It was difficult not to be moved by what I discovered in the archives about Sarkar’s relationship to the Indian civil servant William Irvine (1840– 1911), whose unfinished book Later Mughals Sarkar completed এবং published after Irvine’s death. In 1915 Sarkar entered into a contract with Margaret Seymour, Irvine’s daughter, whereby he agreed to publish the book at his own expense. To Mrs. Seymour were owed fifteen copies of the book এবং a part of the profits. Sarkar worked hard to add 109 pages এবং many new notes to the book. This was purely a labor of love, as Sarkar considered Irvine to be a sort of mentor to himself. Later Mughals came out in two volumes in 1922. It was twelve years before Sarkar’s expenses were recovered, এবং he then started sending regular checks to Mrs. Seymour every year from 1934 on. Margaret Seymour died on 17 June 1954, when Sarkar was about eighty-four, three years away from his death.), যে বইতে আরভিং ১৭০৭-এর আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ১৮০৩ সালে লর্ড লেকের দিল্লি দখল পর্যন্ত প্রায় একশ বছরের মুঘল সম্রাটদের ইতিহাস ধরেছেন। পরিষ্কার ১৭০৭ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে নি – ভারতবর্ষেরও পতন ঘটে নি, এই প্রচার উদ্দেশ্যপূর্ণ। অড্রে ট্রুস্কে স্পষ্টভাবে বলছেন, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে ভারতবর্ষের যে পতনের বীজ আচার্য দেখেছেন তা মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাসকারদের তাত্ত্বিকতা। মুঘল সাম্রাজ্য পতনে চর্চায় আওরঙ্গজেবকে বেঁড়ে ব্যাটা ঠাওরানো আসলে উদ্দেশ্যমূলক ইতিহাসচর্চার উদাহরণ। আকবর সম্রাটের শুলইকুল নীতি প্রয়োগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখি আওরঙ্গজেবের সময়েই। পূর্বে উল্লিখিত শুধু চন্দর ভান ব্রাহ্মণই নন, মুঘল প্রশাসনে এই বিখ্যাত মুন্সি ছাড়াও সগৌরবে ছিলেন রাজা রঘুনাথ, গোপীচাঁদ শূদ্র, শঙ্কর দাস, সুরত সিং, প্রাণ নাথ, খ্বাজা সাগর মল ইত্যাদি আমলাও। সামগ্রিকভাবে মুঘল এবং আওরঙ্গজেবের আমল যে ধর্মান্ধ ছিল না বরং জ্ঞানচর্চায় বিপুল উৎসাহ দিত তার চুম্বকীয় উদাহরণ পাওয়া যায় মুন্সি চন্দর ভান ব্রাহ্মণের কর্মেতিহাস থেকে। (চলবে)