৪। ৩ মে ১৬৫৯, মীর জুমলার হার
মীর জুমলা স্পষ্টভাবে জানেন, তাঁর বাহিনী যথেষ্ট পরিমান যুদ্ধনৌকোর অভাবে পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন। তিনি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তাঁর চরিত্র বিরোধী, বিগত যুদ্ধ সাফল্যের কারণে অতিরিক্ত আত্মপ্রসাদ এবং বিপুল আত্মবিশ্বাসে ভর করে বিপক্ষের ওপর আরও বড় হামলার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সুজার বাহিনী নিজেদের ঢিলে ঢালা সুরক্ষা কষে বেঁধে নিয়েছে — সেনানায়ক নুরুল হাসানকে বদল করে দক্ষ সেনানী বারহার সৈয়দ আলমকে (খান-ই-আলম) যুদ্ধ সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। ১০টা কামানের গোছা তীরের উঁচু জায়গায় আলগোছে ফেলে রেখে বিপক্ষ বাহিনীকে আক্রমনের টোপ দেখিয়ে পিছনে সৈয়দ আলম এবং মুথাশাম খানের নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ হাতির সেনাবাহিনী লুকিয়ে রাখলেন। ২ মে রাতে মীর জুমলার একটা বাহিনী টোপ গিলে আক্রমনে গেল কিন্তু সে আক্রমণ স্বাভাবিকভাবে বিফল হল। ৩ তারিখ ভোরে মীর জুমলার ৭৩টি যুদ্ধনৌকো করে কাশিম খান এবং শাহবাজ খানের নেতৃত্বে ২,০০০ সেনার বাহিনী উল্টোদিকের তীরে গিয়ে বাধাহীনভাবে উঠে পরিখায় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে টোপ হিসেবে কয়েকজনকে বসিয়ে রাখা সেনা আক্রমন করে এলাকা দখল নিতে না নিতেই, মওকা পেয়ে সুজার বাহিনী যুদ্ধ হাতি নিয়ে রে রে শদে তেড়ে আসে এবং মীর জুমলার ছোট বাহিনীকে ঘিরে ধরে কচুকাটা করতে থাকে। আক্রমনকারীরা প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করলেও উল্টো দিকে বসে থাকা মীর জুমলা হতাশ এবং আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে থাকেন নিজেদের সেনার ওপরে আক্রমন, এবং সেই আক্রমন ঠেকাতে পারে না। প্রায় অর্ধেক সেনা মারা যায়। ৫০০ গ্রেফতার করে মালদা ফিরোজপুর ও অন্যনায় এলাকায় পাঠানো হয়, কিছু সেনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই হারের ব্যাপকতা হারের থেকেও বেশি হল। নৈতিকভাবে মীর জুমলার বাহিনী ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা হয়। তিনি নিজেও হতাশ হয়ে পড়লেন। এই দুর্বিপাক তাঁর বর্ণময় সামরিক জীবনে চির কলঙ্কের দাগ হয়ে থেকে গেল। কিন্তু মানুষটা তো অদম্য। সব বিফলতা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জেতার পরিকল্পনা নিলেন। এই হার লজ্জাজনক আগামী দিনের লড়াইতে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল, এবং তিনি এর পর থেকে সদা সতর্ক হয়েই তাঁর আগামী যুদ্ধের সব রণনীতি তৈরি করতেন।
সুজার পক্ষের ঐতিহাসিক মাসুম মীর জুমলার হারের কারণ ঠিকভাবেই নিরূপন করেছেন, এই আক্রমন হয়ত সময়োচিত এবং প্রাজ্ঞার প্রকাশ ছিল না। তিনি শত্রুর বহর না আঁচ করেই বেহুদা আক্রমণ করতে মুয়াজ্জম খান বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। আশাছিল শাহী সেনা আরও একবার বিপক্ষকে বেমওকা পেয়ে যাবে। মীর জুমলা কিন্তু সত্যিকারের বিপক্ষের ওজন, রণনীতি আঁচ না করেই আক্রমনের পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। নিজের সেনা আর রণনীতির ওপর অত্যধিক আস্থা এবং নিজের ক্ষমতা আর অহংএর বহিঃপ্রকাশ এই বিফল আক্রমনের জনক। যদুনাথ সরকার বলেছেন বিপক্ষকে তুচ্ছ করতে গিয়ে মীর জুমলা বাহিনীর অনেক ক্ষতি ডেকে আনলেন। রোজবিহানী অনুগামীদের প্রতি স্বগতোক্তির মত করে এক লেখায় মীর জুমলা দুঃখ করে বলছেন, এখন আমার বয়স ৭০। পরিণত বয়সে এই রকম হারের মুখোমুখি হলাম! এ অভিজ্ঞতা না হলেই ভাল হত। ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা বলছে শাহী বাহিনী ছোট ছোট ডিঙ্গিতে আক্রমণে আসছিল আর সুজার বাহিনী ছিল জালিয়ার মত বড় নৌকোয়। সুজার বাহিনীতে ছিল প্রচুর গতিশীল কোষা নৌকোর বহর। তবে আমরা যেন ভুলে না যাই মাত্র ৬টি নৌকোয় ১,০০০ সেনা এনেছিল মীর জুমলার বাহিনী, তাই তাদের সব নৌকো যে ছোট ছিল একথা সত্যি নয়। তাও বলা যায় সত্যই মীর জুমলা বাহিনীর নৌকগুলি তুলনামূলোকভাবে ছোট তো ছিলই এবং কিছুটা সেনাপতির পরিকল্পনা দোষে যে হার যে হয়েছে সেটা না স্বীকার করা মুর্খামি হবে।
৫। নতুন আক্রমণের পরিকল্পনায় মীর জুমলা
পুরোনো হারের হতাশা ঝেড়ে ফেলে নতুন আক্রমণের দাবার গুটি সাজাতে বসলেন মীর জুমলা। নষ্ট হয়ে যাওয়া নৌকোগুলি তাঁর নতুন পরিকল্পনায় বাধ সাধছিল যেমন, তেমনি নতুন রণনীতি তাঁর চরম একাগ্রতা মনোযোগ দাবি করছিল। হুগলি, মুর্শিদাবাদ এবং বর্ধমান থেকে নৌবহরের আরও সরঞ্জাম জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন। নৌকো কারিগর এবং চলতি নৌকো জোগাড়ে আবার নেমে পড়ল তাঁর বাহিনী। নদীতে চলাচল করা যত বড় নৌকো সব হুকুম দখল নেওয়া হল, মুকসুদাবাদ পেরিয়ে কোন নৌকোই দক্ষিণে আর আসতে পারছিল না। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে ইওরোপিয় ডাচ বা ব্রিটিশ সেনানীদের জোগাড়ে বিহার বাংলায় মীর জুমলা তাঁর পদমর্যাদা কাজে লাগালেন। কাশিমবাজার থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাকায় তিনি ডাচে কোম্পানির ডাক্তার এবং গোলান্দাজ বাহিনীকে বাহিনীতে যোগ দিতে বললেন। ব্রিটিশেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল না, কিন্তু ডাচ নির্দেশক ম্যাথায়াস ভ্যান্ডেনব্রোক হুগলী থেকে তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে এলেন। জনশ্রুতি সাম্রাজ্যের সেনাপ্রধান ডাচেদের সহায়তার বিনিময়ে দুলক্ষ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আগে ১৬৫৯র জুলাই মাসে ডাচ প্রধান নির্দেশক মীর জুমলাকে সব ধরণের সাহায্য দেওয়ার এবং তাদের যত শ্লুপ কামান রয়েছে সে সবগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের হয়ে নদী পাহারা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মীর জুমলা এই যুদ্ধের প্রাবল্যের মধ্যে বসে ওডিসায় আওরঙ্গজেবের শাসন বিস্তৃতির পরিকল্পনা করলেন। সাম্রাজ্যকে সাহায্য করার জন্য বালেশ্বর এবং অন্যান্য ওডিয়া শহরের প্রশাসনকে দূত এবং নির্দেশাবলী পাঠালেন। বালেশ্বরে সুজাপক্ষী আধিকারিককে চিঠি লিখে মুহম্মদ সুলতানের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সুজাপক্ষীয় প্রশাসকেরা তখনও সুজার সঙ্গ ছাড়তে ভয় পাচ্ছিল কারণ তখনও সুজার জেতার মিথ্যে খবর পূর্বপ্রদেশে পূর্বে ক্ষমতায় থাকা পক্ষীয়রা ছড়াচ্ছিল। ব্রিটিশরা বিশ্বাস করত ব্যবসায়ী মীর জুমলা খুব শীঘ্রই বন্দর শহর বালেশ্বর দখল করবেন। তখন আর বালেশ্বর শহরের প্রশাসকের মীর জুমলার পক্ষ নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।
মীর জুমলা বুঝলেন যত প্রাবল্য দিয়ে নদীর সামনে ঘাঁটি গেড়ে বসা শাহ সুজার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নামা যাক না কেন, তাদের সহজে হঠনো যাবে না, বরং এই আক্রমণে শাহী বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতিই ভবিতব্য। বহুকালের যুদ্ধ অভিজ্ঞতায় বুঝলেন দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে সুজার বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমন না করতে পারলে সমস্ত উদ্যম বিফলে যাবে। সিংহের গুহায় সোজাসুজি নয়, কায়দা করে ঢুকতে হবে। বিপক্ষকে পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তর দিক থেকে আক্রমন করতে হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়ণ করতে তার একমাত্র সহায়ক হতে পারেন বিহারের সুবাদার দাউদ খান।
সুবাদার দাউদ খানকে চিঠিতে মীর জুমলা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন সেনা জোগাড় করতে লিখলেন। ইঙ্গিত দিয়ে বললেন রণজয়ী হাদি বা আবদুল মাল আলি খান বা কাকারদের মত আভিজাত সেনানায়কের বাহিনীকে দলে টানতে গেলে তাদের সামনে সিন্দুকের ডালা হাট করে খুলে দিতে হবে। তাছাড়া যতগুলো পারা যায় কস্তি এবং ঘুরাব (কামান দাগার নৌকো) যুদ্ধ নৌকো সংগ্রহ করে প্রত্যেক নৌকোয় প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ কামান দিয়ে সাজিয়ে বাংলায় পাঠাতে। বন্যার সময়টা এড়িয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেনা নিয়ে চলে আসতে বললেন। তিনি জানেন নৌকো তৈরি আর তার সমর সজ্জা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে, ফলে বড় নৌকো পরে পাঠালেও চলবে। বাঙলা পানে আসতে গিয়ে কোশি পার হওয়ার সময় তিনি যেন চিরাগ বেগের নেতৃত্বাধীন রোজবিহানী বাহিনী এবং সুতিতে রশীদ আর দেওগাছিতে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে আগামী দিনের কর্তব্য বিশদে আলোচনা করে নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দাউদ খান, রশিদ এবং চিরাগের যুক্ত বাহিনী গঙ্গার বাম পাড়ে সুজার বাহিনীকে আক্রমন করবে এবং তার পরেই দাউদের নৌকোয় মীর জুমলা বিপক্ষের ওপর আক্রমন করে শেষ পেরেকটি মেরে শত্রুর শেকড় উপড়োবার কাজটি নিজের হাতে তুলে নেবেন। (চলবে)