২। সমধায় মীর জুমলা
১৩ জানুয়ারি দাউদের পুত্র শেখ হামিদ ১৬০টি নৌকোর বহর দোধায় (কদমতলা) নিয়ে পৌঁছল। দোধায় গঙ্গা তিন ভাগে ভাগ হয়ে বয়ে গেছে। ১৫ জানুয়ারি ছোট জলধারাটায় নৌকো সেতু তৈরি করে মীর জুমলা নদী পার হলেন। সেই নৌকোগুলোকে রাজমহলের উল্টো দিকের বড় দুটি নদীতে নিয়ে এসে রাখা হল এমনভাবে, যাতে বিশাল সংখ্যক সেনা ও রসদ নদী পার হয়ে চরে পৌঁছতে পারে। ১৭ জানুয়ারি মীর জুমলা নিজে চরে পৌঁছলেন দ্বিতীয় বড় নদীটি পেরিয়ে।
মীর জুমলার দ্রুততার সঙ্গে সেনা মোতায়নের ফলে, সুজার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেল। সুজা মহম্মদ সুলতানকে কামান এবং নৌকো দিয়ে মহানন্দায় দিলির খান আর দাউদ খানের অভিযানে বাধা দিতে নির্দেশ দিলেন। নিজের সব নৌকো ডেকে নিলেন, শাহজাদার কাছে যে নৌকোগুলো ছিল সেগুলোও চেয়ে পাঠালেন। চরেদের নিয়োগ করলেন সমধার আশেপাশে অঞ্চলের মাঝিদের বাংলার নবাবের বাহিনীতে যোগ দেওয়ানোর জন্যে চাপ দিতে, সম্ভব হলে অপহরণ করতে।
সুজার আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ রুখতে মীর জুমলাও পাল্টা পরিকল্পনা ছকলেন। খুব তাড়াতাড়ি তৃতীয় নদীতে নৌকোর সেতু তৈরি করলেন। সুজার চরেদের মাঝিদের তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা আটকানোর ব্যবস্থা করলেন। স্থানীয় মাঝিরা যাতে সুজার পক্ষে যোগ দিতে না পারে তার জন্য তিনি সমধায় ১০০০ সেনা বাহিনীর একটি থানা তৈরি করলেন। সমধায় যে দিন মীর জুমলা উপস্থিত হলেন, সেই দিন দুপুরেই আকবরপুর (নদীর উল্টো দিক থেকে) থেকে দিলির দাউদ এবং রশিদকে ডাকিয়ে এনে বৈঠক হল। মীর জুমলার সামনে সমস্যা প্রচুর। তার বাহিনীতে শুধু সুজার থেকে কম নৌকোই নেই, তাঁর বিশাল বাহিনীও হাওর, নালা, জঙ্গুলে এলাকায় দ্রুত চলাচল করতে পারছিল না; বাংলার বর্ষায় বিশাল পদাতিক আর ঘোড়সওয়ার বাহিনী মীর জুমলার বোঝা হয়ে দাঁড়াল। তিনি বুঝলেন যুদ্ধ পরিকল্পনার চাহিদা মত বাহিনী দ্রুত এগোতে পারছেনা। তিনি বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করলেন এলাকাটা বাহিনী চলাচলের জন্যে খুবই খারাপ, এরা প্রত্যেক বাঁকে যেন একটা করে নালা গুঁজে রেখেছে।
খোলা মাঠে শাহী বাহিনীকে টক্কর দিতে পারবেন না বুঝে সুজা মীর জুমলার বাহিনীকে অন্য রাস্তায় প্রতিরোধের পরিকল্পনা করলেন। মহানন্দা এবং কালিন্দী ধরে তিনি বিপক্ষকে মাত করার রণনীতি সাজালেন নতুন করে। মীর জুমলাকে তাণ্ডায় ঢুকে পড়া আটকাতে মহানন্দার শাখা কালিন্দিতে দুই সারি পরিখা খনন করলেন এবং সেটির সুরক্ষার দায়িত্ব দিলেন সৈয়দ তাজ এবং মিশকিকে। সমধার উল্টো দিকে চৌকি-মীরদাদপুরের ঘাটে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে সুজা রইলেন।
মীর জুমলা জানেন তাঁকে হুঁশিয়ারও থাকতে হবে আর সাবধানেও পা ফেলতে হবে। শত্রুপক্ষ সমধার মাত্র চার মাইল দূরে কালিন্দিতে ভারি কামান সাজিয়েছে। ফলে তিনি তক্ষুণি আর পূর্বের দিকে এগোনো সমীচীন বোধ করলেন না। এই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার অর্থই হল সমধার পতন এবং রাজমহলকে সরাসরি শত্রুর আক্রমনের নিশানায় নিয়ে আসা। তিনি যদিও তৃতীয় ধারাটি তাড়াতাড়ি পেরোতে চাইছিলেন আগামী কয়েকদিনের মধ্যে, অন্তত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি তার সদরটি সমধায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তা ছাড়াও মীর জুমলা জানেন, তাঁর পক্ষে সুজাদের কাটা পরিখা এবং সৈয়দ তাজ এবং মিশকির তৈরি করা নিরাপত্তা ভাঙতে চাওয়ার পরিকল্পনা রূপায়ন করা আত্মহত্যার সামিল হবে। তার উদ্দেশ্য প্রথমে কালিন্দি আর মহানন্দার মোহনায় কালিন্দি পার হওয়ার চেষ্টা করা; তার পরে অভিজ্ঞ দাউদ এবং দিলির খানের পরামর্শ অনুযায়ী মহানন্দা পার হওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা থেকে শত্রুপক্ষের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরাতে হবে। তিনি দুজন খানকে নির্দেশ দিলেন শত্রুর মুখোমুখি কোনোও একটা জায়গায়, তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে পরিখা কাটার অভিনয় করতে।
পরিখা কাটার কাজ চলতে থাকল। সমধায় মীর জুমলা, চৌকি-মীরদাদপুরের সুজার শিবিরে গোলান্দাজি চালালেন। পরিখা কাটা শেষ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের ওপর গোলান্দাজি এক সপ্তাহ কাল ধরে চলল। তা সত্ত্বেও শত্রুর এলাকা ছাড়ার লক্ষ্মণ দেখা গেল না। গঙ্গার পূর্বপ্রান্তের একটা শাখা নদীতে মীর জুমলা হাঁটু জল খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। পরিখা নিরীক্ষণ করার সময় ডুবুরি দিয়ে গঙ্গার তল খোঁজারও কাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালালেন। কিন্তু নদীর তল পাওয়া গেল না।
হঠাতই মীর জুমলার চরেরা মহানন্দার উপরের উচ্চ অববাহিকায় গুণরাখা নামক একটি এলাকায় হাঁটু জলস্তর আবিষ্কারের খবর আনল। গুণরাখা হল শাহী একটি শিবিরের থেকে ৮ মাইল দূরে, অন্যটির থেকে ৪ মাইল। যাইহোক সামগ্রিক রণনীতিতে এই খবরটির গুরুত্ব অপরিসীম। এলাকাটি জঙ্গলে পরিপূর্ণ, সেই জঙ্গলে বাস করে জংলি কুয়ার গোষ্ঠী এবং সেই এলাকা হেঁটে পার হওয়া সম্ভব। ১৬৬০-এর ৩১ জানুয়ারির রাতে ফারাদ খানের সঙ্গে কারাওয়াল আর বেলদার দিয়ে নদী পার হয়ে সেখানে পরিখা খোঁড়ার কাজ দিলেন যাতে শত্রু পক্ষ তাদের রাস্তা আটকাতে না পারে। পরের দিন ১ ফেব্রুয়ারি জুলফিকার, ফিদায়ি এবং লোদি খান যুদ্ধ করার ভান করলে মীর জুমলা, মুখলিস খানকে নিয়ে দিনের দেড় প্রহরে নৌকোর সেতু বানিয়ে গঙ্গার পূর্বপ্রান্ত পার হয়ে গেলেন।
এবারে মীর জুমলা হাঁটু জলের এলাকা পার হওয়ার জন্য এগোলেন দিলির, দাউদ, মীর্জা, আর রশিদ খানকে সঙ্গে নিয়ে। মীর জুমলার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে বেলদার, কারাওয়ালা, উজবেগ এবং নানান রসদ নিয়ে ৫০ গজ চওড়া মহানন্দা পার হলেন ৩ দিনে ১–৩ ফেব্রুয়ারি। ঘোড়াগুলি সাঁতরে পার হল। মীর জুমলার নির্দেশে ৩০টা ডোবানো নৌকো তোলা হল – কয়েকটা কামান বাহক হিসেবে ব্যবহার হবে, আর কয়েকটাকে সেতু তৈরির কাজে লাগানো হবে। ফারহাদের তৈরি পরিখা কাটা, একই সঙ্গে গোলান্দাজি এবং পীর মহম্মদের লাজবাব কারাওয়ালদের দৌলতে শত্রুদের দূরে থাকা সুজার বাহিনী শাহী বাহিনীকে নদী পার হতে দেখলেও কিছুই করে উঠতে পারল না, যুদ্ধ করতে এলে তাদের নেতা আমীর কুলি মারা গেল।
সৈয়দ তাজ আর মিশকির উল্টোদিকে দিলির আর দাউদের কাটতে থাকা পরিখার দায়িত্ব আবদুল্লা খানসারাই, সৈয়দ সালার খান, মিয়ানা খান, জামাল দিলিজাককে দিয়ে মীর জুমলা স্বয়ং সমধায় এলেন। এখানেই শত্রুকে নদী না পেরোতে দেওয়ার লক্ষ্যে শাহী সেনাবাহিনীর বড় অংশ শিবির গেড়ে ছিল।
মীর জুমলার চালে মাত হয়ে যাওয়া সুজার দুই সেনাপতি সৈয়দ তাজ এবং মিশকি আতঙ্কিত হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি সুজার শিবিরে ফিরে গেল। সুজা শত্রুপক্ষের সহজে মহানন্দা নদী পার হওয়া, চরেদের হাতে ৩ জন সুজাপন্থী সেনা ধরাপড়ার ঘটনায় মর্মাহত হলেন। অথচ তিনি তক্ষুনি তাড়াহুড়ো করে কোন পদক্ষেপ করা বা মুখোমুখি সংঘর্ষে যাওয়া সমুচিত বোধ করলেন না। হতাশ সুজার মনোবল চাঙ্গা হল ঢাকা থেকে সৈয়দ আলম জৈনুদ্দিনের ১,৫০০ রিসালা আর ২০০ কামান পৌঁছনোয়। বর্ষা পর্যন্ত জলে চোবানো দুর্গটি রক্ষা করার পরিকল্পনা করে তিনি সমধার উল্টো দিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে নির্দেশ দিলেন।
৫ ফেব্রুয়ারি দিলির আর দাউদ ছেড়ে যাওয়া পরিখার কাছে এলেন। চিরাগের নেতৃত্বে দিলিরের রোজবিহানী বাহিনী গোলান্দাজির জন্য সেতুটি আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হলেও তারা উল্টো দিকে কিছু নৌকো দেখতে পেল। দিলির এবং দাউদের ২ মাইল দূরের মহানন্দার নালা হেঁটে পার হওয়ার কাজ দেখতে এবং তত্ত্বাবধান করতে মীর জুমলা সেতু তৈরি করে ৭ ফেব্রুয়ারি গঙ্গা এবং মহানন্দার পূর্বপ্রান্ততম শাখাটি পার হলেন। পরের দিন তিনি সৈয়দ সালার খান, মিয়ানা খান, জামাল দিলজাকের নেতৃত্বে ১,০০০ ঘোড়সওয়ার, বহু পদাতিক এবং কামান মালদার দিকে পাঠালেন পূর্ব দিক থেকে সুজাকে ঘিরে ফেলতে এবং তার পূর্ব দিক হয়ে পালাবার পথ বন্ধ করতে। ইতিমধ্যে সুজা বাহিনীর দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তরপ্রান্ত হয়ে পালানোর পথ যথাক্রমে রাজমহল থেকে সুতি এবং সমধা থেকে মহানন্দা পর্যন্ত পাহারা বসিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুজা এখন সর্বনাশের মুখে দাঁড়িয়ে। সুজার বাহিনীকে তড়িঘড়ি মালদা ছেড়ে চলে যেতে হল। মীর জুমলার নির্দেশে দাউদ খান, আমীর খান, রশিদ খান এবং তাদের সবকটি বাহিনী গঙ্গা এবং মহানন্দার মধ্যে পরিখা কাটতে শুরু করল।
৩। শাহজাদা মহম্মদ সুলতান ফিরে এলেন
সুজার বিপদ চরমে দেখে শাহজাদা মহম্মদ সুলতান তার শ্বশুরকে ফেলে সম্রাটের শিবিরে ফেরত এলেন। আলমগীরনামা সূত্রে জানতে পারছি তার ধারণা হয়েছিল সুজা এখন হারা যুদ্ধ লড়ছে, হারার শিবিরের অংশিদার তিনি হতে চান না। ভুল বুঝতে পেরে শাহজাদা তাণ্ডায় তার অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে যাবার ছলে রাজমহলের সাম্রাজ্য শাসক ইসলাম খানকে খবর পাঠিয়ে বললেন দেওগাছি থেকে আসা তার বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু আসল কারণ ছিল অন্য। এর আগে বলা গিয়েছে সুজা যখন পশ্চিম প্রান্ত ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তখন তিনি শাহজাদাকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এবং পূর্বপাড়েও যখন নিজের সুরক্ষায় সুজা লড়ছেন, তখনও কিন্তু আমরা শাহজাদার দেখা পাইনি। সুজার পক্ষে শাহজাদাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া তার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না, কেননা তিনি সুজাকে অনেক সেবা করেছেন, তার বহু আভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা বলা যায় যে সুজার মনে শাহজাদার বিষয়ে কিছু না কিছু সংশয় তৈরি হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি আলমগীরনামা এবং সেই সময়ের ইওরোপিয় ভ্রমণকারীদের রচনা সূত্রে।
শাহজাদার শিবির বদলের নেপথ্যে হয়ত মীর জুমলার কূটনৈতিক চাতুর্যও মিশে থাকলেও থাকতে পারে। শোনা যায় আওরঙ্গজেবের ঠাণ্ডা মাথার পাঠানো একটা চিঠি, মীর জুমলাকে চাতুর্যময় পথ নিতে প্রণোদিত করে। আওরঙ্গজেবের পাঠানো ফরমানের পরামর্শে শাহজাদার উদ্দেশ্যে মীর জুমলা একটি চিঠি লিখলেন। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, তিনি চান শাহজাদা সুজার কাছে আরও কিছু দিন থাকুন যাতে তিনি সেই শিবিরে থেকেই সম্রাটের স্বার্থে কাজ করতে পারেন, সম্রাটের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন। শাহজাদা তার পিতাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিবির ছেড়েছেন, সেই প্রতিশ্রুতি যতদিন না তিনি পূর্ণ করতে পারছেন, ততদিন যেন তিনি সুজার শিবিরেই অবস্থান করেন। চিঠিটি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে প্রথমে শাহজাদার কাছে না গিয়ে সুজার হাতে পড়ার ব্যবস্থা করা হল। সুজা জামাই শাহজাদার কাজকর্ম সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। শাহজাদা হয়ত বুঝলেন এই ঘটনা মীর জুমলা আর বাবার মস্তিষ্ক প্রসূত। তিনি শ্বশুরকে বললেন চিঠিটা তাঁকে বদনাম করতে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে তার নামে যে সব কথা বলা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা। চিঠিটা পাঠানো হয়েছে জাল সাজিস করে। চিঠিটা সুজার সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধাতে লেখা হয়েছে।
যদিও আলমগীরনামা এই ঘটনার সঙ্গে মীর জুমলা বা আওরঙ্গজেবের জড়িত থাকার কোন সূত্র দেয় নি, কিন্তু পরের সময়ের লেখকেরা এই ঘটনায় মীর জুমলারই অদৃশ্য হাত দেখতে পেয়েছেন। আমাদের মনে হয় এই ঘটনায় সম্রাটপুত্রেরও কিছুটা হাত থাকলেও থাকতে পারে। ঈশ্বরদাস লিখছেন, মীর জুমলা তাবির এবং তাজবীর অনুসরণ করে খেলাটা খেলে দিলেন; ফলে শাহজাদাকে শ্বশুরের শিবির ছেড়ে বাধ্য হয়ে বাবার শিবিরে ফিরে আসতে হল। তাড়াহুড়ো করে শিবির বদল করার কয়েক মাস পরে থেকেই সম্রাট পুত্র মহম্মদ আকবর বুঝতে পারছিলেন সুজা, তাঁর শ্বশুর ক্রমশ জেতার অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন। শাহী বাহিনীর হাতে তাঁর হার সময়ের অপেক্ষামাত্র। মাথায় রাখতে হবে শাহজাদার প্রতি সুজার সন্দেহ জাগাটা মহম্মদ আকবরের পক্ষে আশীর্বাদস্বরূপ হল। সুজার সন্দেহ তৈরি হওয়ায়, জামাইও ভাবলেন এই সুযোগে শিবির বদল করা জায়েজ হবে। তিনি আর হেরো দলের সঙ্গে থাকতে চান না। তিন যতদিন সুজার সঙ্গে চৌকি-মীরদাদপুরে ছিলেন ততদিন তার পক্ষে এই ধরণের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু আলমগীরনামা বলছে যখন তিনি তাণ্ডায় সুজার নির্দেশে তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে গেলেন, সেই সময় তিনি দেওগাছি থেকে গোপনে শাহী প্রশাসক ইসলাম খানের সঙ্গে চিঠি আদানপ্রদান করতে শুরু করলেন। ঢাকা থেকে সুজার পুত্র দীন মহম্মদের নির্দেশে খানইআলমের নেতৃত্বে নতুন বাহিনী এসে পৌঁছনোয় শাহজাদার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগল। সম্রাট পুত্রের মনে হল তাকে বাদ দিয়েই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, এবং বাহিনীতে সুজার পুত্রের যোগ দিয়ে মিলিটারি কমান্ডার দলে যোগ দেওয়া মুঘল ঐতিহ্যের পরিপন্থী। ঠিক যে রকম করে তিনি, পিতা সম্রাট আলমগির আর তার পিতার সেনানয়ক, মীর জুমলার ওপর রাগ করে শ্বশুরের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন ঠিক সেই রকম, আবার হঠাতই তার পূর্বের ছেড়ে আসা শিবিরে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শাহজাদা তাণ্ডা ছাড়লেন দেওগাছি যাবার উদ্দেশ্যে। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন সেনানী ইসলাম খান, সঙ্গে ১৮টি ইরাণী সোনার কিংখাব (জরবাফত), মৃগনাভি, ৩৬টা সিন্দুকে সোনা, হিরে এবং একটা নীলকান্ত মণি। সুজা, শাহজাদার এই বিশ্বাসঘাতকতায় গভীর দুঃখ পেলেন। তার মনে হল, তার হাত থেকে গ্রেফতারি এড়াতে শাহজাদা পালিয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে ভাগ্যের চাকা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সুজা বললেন, আমার চোখের জল বয়ে যাওয়া আমার ভাগ্য… যাকে আমি তৈরি করলাম, সেই আমার শত্রু হল।
সেই মাঝইরাতেই প্রথম সংবাদবাহক মীর জুমলাকে শাহজাদার শিবির বদলের সংবাদ দিল। মীর জুমলা মহানন্দার পূর্বপাড় থেকে সমধায় ফিরে এলেন ১২ ফেব্রুয়ারি শাহজাদাকে স্বাগত জানাতে। ঘোড়া থেকে নেমে শাহজাদাকে সম্মান জানালেন। ভেরি বেজে উঠল। তার জন্য সরকারি খাজাঞ্চিখানা থেকে প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করে রাখা ছিল। সম্বর্ধনা শেষে তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হল ৪০ পেটি সোনা, নীলকান্ত মণি, জহরত, ইরাণের ৮টি সোনার কিংখাব, মৃগনাভি, রুম, য়ুনান, ইজিপ্ট এবং সিরিয়ার সোনার জিন সহ ৪০টা আরবি ঘোড়া, আর বাংলার হাতি। শাহজাদাকে এই আড়ম্বপূর্ণ সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্য একটাই, তাঁকে মার্জনাহীন পিতার হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে সম্রাটের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি। ইসলাম খানের পরামর্শে শাহজাদা মীর জুমলার আশ্রয়ে এসেছেন। যতক্ষণ না সম্রাটের থেকে শিবিরে কোন প্রতিক্রিয়া পৌঁছচ্ছে, মীর জুমলার পক্ষে সরাসরি সম্রাটের কাছ এই জটিল মামলা শাহজাদার পক্ষ নিয়ে পাঠানো খুব কঠিন কাজ হবে। মীর জুমলার চেষ্টায় পুত্রের ফেরত আসায় সম্রাট স্বস্তি প্রকাশ করে প্রধান সেনানীকে নির্দেশ দিলেন শাহজাদাকে চোখে চোখে রাখতে। শাহজাদা বাবার মন-মানসিকতা জানেন। তিনি স্বস্তিতে নেই। তবুও মীর জুমলা শাহজাদাকে বললেন তার পিতা বরাবরের মত ক্ষমাশীল। এখুনি তাঁর চিন্তার কারণ নেই। ২৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ফিদায়ি খানকে দিয়ে শাহজাদাকে দরবারের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। (চলবে)