আওরঙ্গজেব-মীর জুমলা যুগলবন্দী
বহু আগে থেকেই মীর জুমলাকে গ্রেফতার করার নাটকের খসড়া তৈরি করছিলেন দুই বন্ধু। মীর জুমলা জানতেন তাকে দরবারে ডেকে পাঠানো সময়ের অপেক্ষামাত্র। মীর জুমলার প্রতি দারার প্রতিকূল মনোভাব তাঁকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন দরবারে জামিন থাকা দিল্লিস্থ-পুত্র। মীর জুমলার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের পত্র বিনিময় এবং ডিসেম্বরে বীরএ আওরঙ্গজেবের সচিবের [মুনসি] সঙ্গে পর পর তিনটে বৈঠক (১৬৫৭-র ডিসেম্বর) প্রমান করে, সেই সময় দুই পুরোধা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বহু আগে থেকেই মীর জুমলাকে ডেকে নেওয়ার দারার সম্ভাব্য পরিকল্পনা আঁচ করে সেই দরবারি পরিকল্পনা বানচাল করতে গোপনে পথ খুঁজছিলেন। মীর জুমলার উদ্দেশ্য মুনসি কাবিল খানের দৌত্য থেকে জানতে পারি মুনসি এবং মীর জুমলার আলোচনার বিষয় সচিব মহোদয় এতই গোপনীয়তায় মুড়ে রেখেছিলেন যে পাঠকের বুঝতে কষ্ট হয় না দুজনের মধ্যে এমন কিছু চরম গোপনীয় বিষয় আলোচনা হয়েছে, যার কোনও লিখিত তথ্য বাস্তবে না থাকাই ভাল। যে মুঘল সাম্রাজ্যকে হাইডেন বেলেনয় কাগজের সাম্রাজ্য আখ্যা দিচ্ছেন, যে সাম্রাজ্যে একটি মুঘল নথি কয়েকশ নকল হয়, সেই মুঘল সম্রাজ্যের দুই উচ্চপদস্থ কর্মচারীর বৈঠকের সারাংশ কোনও পক্ষের কোনও মুনসিই লিপিবদ্ধ করেন নি। সেই আলোচনার সারৎসার মুনসি আওরঙ্গজেবকে মৌখিকভাবে জানান। আজ এ তথ্য পরিষ্কার যে মীর জুমলাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল স্বয়ং মীর জুমলার সুপারিশে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির প্ররোচনায়। দুজনের মধ্যে গ্রেফতারির সময় বা স্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু ঘটনাটা যে দুজনের মধ্যে সমঝোতা করেই রূপায়িত হয়েছিল, সে বিষয়ে আজ আর বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। দারার আশংকা ছিল পারস্পরিক স্বার্থবদ্ধ দুজনেই যৌথভাবে (বর সাজিশ ও ইত্তিফাক) কিছু একটা ঘটাবেন। দারা এই সাজানো গ্রেফতারির ঘটনা সম্রাটকে জানিয়ে, মীর জুমলার পুত্র মহম্মদ আমিন খান বক্সীকে ঝুটা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেফতার করার অনুমতি নিয়ে আমীনকে নিজের বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখেন। তবে শাহজাহান সম্রাট মহম্মদ আমিনকে গ্রেফতারের দারাকে অনুমতি দিলেও, এই ঘটনায় মীর জুমলা পুত্রকে নির্দোষ জেনে তিন চার দিন বাদে তাকে মুক্ত করার আদেশ দেন।
আমরা পরিষ্কার বলতে পারি মীর জুমলার কূটনীতিক চাল এক্ষেত্রে অসাধারণ সফল হয়েছিল। তিনি গোটা ব্যাপারটা এতই চতুরতায় ঘটিয়েছিলেন যে দিল্লিতে বসে শাহজাহানের মনে হয়েছিল যে, উজির মীর জুমলার প্রতি আওরঙ্গজেব অবিচার করলেন। অপাপবিদ্ধ, সাম্রাজ্যের কাজে কর্তব্যপরায়ণ দুই সৈয়দীর (অন্যজন আওরঙ্গজেবের হাতে গ্রেফতার হওয়া শ্বশুর শাহ নওয়াজ খান) হয়ে শাহজাহান আওরঙ্গজেবকে একটি চিঠি লেখেন — ‘সে [মীর জুমলা] সম্রাটের নির্দেশেই দিল্লি যাচ্ছিল। কর্তব্যবোধে অবিচল মানুষটির অনৈতিক গ্রেফতারি এবং তাদের সম্পত্তি দখল নেওয়ার বিরুদ্ধে সম্রাট সোচ্চার হচ্ছেন’। তিনি আওরঙ্গজেবকে অবিলম্বে দুজনকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
সাম্রাজ্যের প্রতিবাদপত্র হাতে পাওয়ার আগেই আওরঙ্গজেব সম্রাটকে চিঠি লিখে জানিয়ে দেন, যে তার ধারণা হয়েছিল মীর জুমলা ভেতরে ভেতরে দক্ষিণী সেনানায়কদের সঙ্গে সাঁট করে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্যে ঘোঁট পাকাচ্ছেন। সাম্রাজ্যকে অনাবশ্যক ঝামেলা থেকে বাঁচাতে তিনি মীর জুমলাকে বাধ্য হয়ে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; না হলে মীর জুমলা বাগী দক্ষিণী সেনানায়কদের দলে যোগ দিতেন। স্তরে স্তরে যে যুক্তি সাজিয়ে চিঠিতে আওরঙ্গজেব গ্রেফতারির পক্ষে যে সাফাই গেয়েছেন, সেই ধারণাটি সে সময়ের দক্ষিণের জনগণের মুখে মুখে ঘুরত। ২৬ জানুয়ারি ১৬৫৮ তে জনৈক ব্রিটিশ কুঠিয়াল মন্তব্য করেছিলেন নবাব মীর জুমলা গোলকুণ্ডার রাজার সঙ্গে ষড় করে দিল্লির সিংহাসন দখল করার চেষ্টা করছিলেন। সেই জন্য তাকে সুবাদার গ্রেফতার করেন।
দারার হারের পর যখন ‘মুঘল সাম্রাজ্য আর ধর্মের সংস্থাপন ঘটল’, সরকারি ঐতিহাসিক লিখছেন, সে সময় আর মীর জুমলাকে গ্রেফতার করে রাখা জরুরি ছিল না। পরাক্রান্ত সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মীর জুমলাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করলেন আওরঙ্গজেব। তিনি তাঁকে ছদ্ম-কারাগার থেকে মুক্তি দিলেন। এই সুযোগে মুনসি কাবিল খানকে মীর জুমলার গ্রেফতারি বিষয়ে আওরঙ্গজেবের বয়ানের এক লিখিত কৈফিয়ত প্রকাশ করার দায়িত্ব দেওয়া হল। আওরঙ্গজেব লিখছেন, ‘কোন এক কারণে আমি তোমায় গ্রেফতার করেছিলাম, … সেই ঘটনার ত্রুটি স্বীকারের সময় এসেছে। তোমার মত বন্ধু, শুভচিন্তকের আমার দরবারে উপস্থিত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল’। অন্য একটি চিঠিতে আওরঙ্গজেব লিখলেন ‘বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তোমায় গ্রেফতার করি নি … তোমার চেহারায় বিপুল শ্রান্তি ফুটে উঠছিল … অথচ তুমি [সেই অবস্থাতেই] দিল্লির দরবারে যেতে বদ্ধ পরিকর ছিলে। ভুল সময় দিল্লি যাওয়া তোমার [স্বাস্থ্য আর রাজনীতির] পক্ষে ক্ষতিকর হত। আমি সেটা হতে দিই নি। আমি তোমায় বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি বুঝতে চাওনি। ফলে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে, বাধ্য হয়েই তোমায় গ্রেফতার করতে হয়েছিল। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছেয় আমার চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, নতুন রাজধানী এবং ধর্মের বাগানে নতুন জীবন যাপন কর। আমার শত্রুরা আজ পরাস্ত হয়েছে। তোমাকে এর বেশি সময় বন্দীরাখা অমানবিক কাজ হবে। আমি চাইনা তোমার মত বুদ্ধিমান মানুষ বেকার জীবনযাপন করুক’।
আমরা আজ জানি এই টালমাটাল সময়ের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এই ধরণের প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনার কৈফিয়ত দুটি মানুষের আপোষ-চক্রান্তের ওপর রঙ্গিন পর্দা ফেলার তাগিদমাত্র। লিখিত কৈফিয়ত দিয়ে মীর জুমলাকে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া নয় বরং তার কৃতকর্মের জন্য কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টাকে আজ বেশ ইন্টারেস্টিং রাজনীতি বলে মনে হয়। আওরঙ্গজেব যখন এই কৈফিয়ত দিচ্ছেন, তখন তিনি মোটামুটি মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন – সিংহাসন নিয়ে যুদ্ধ শেষ হতে অনেক বাকি। তখন তার প্রয়োজন ছিল না রণনৈতিকভাবে বিপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে দুজনে সমঝোতা করে যে গ্রেফতার কাণ্ডটি ঘটয়েছেন, তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার। এর আগেও সময়ে মুঘল একচ্ছত্র অধিপতিরাও জনগণের কাছে এই ধরণের সাফাই গেয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য পরিচালনার বৈধতা স্বীকৃতি নিতেন। মুঘল সাম্রাজ্য, বার বার তার আপাত দুষ্কৃতকর্মের জন্যে সাফাই গেয়ে বৈধতা চেয়েছে। ঠিক যে জন্যে ১৭৩৯-এ নাদির শাহ মুঘল সাম্রাজ্যের সম্মান ধুয়ে মুছে দিলেও, ১৮৫৭-য় স্বাধীনতাকামীরা এক ন্যালাখ্যাপা মুঘল সম্রাটকে সামনে রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের এই সম্মানটুকু প্রাপ্য।
মহম্মদ মুয়াজ্জমের মার্ফৎ নিশান পাঠিয়ে দৌলতাবাদের কারাগারে বন্দী মীর জুমলাকে মুক্ত করার নির্দেশ দিলেন আওরঙ্গজেব। একই সঙ্গে বুরহানপুরে তাঁর যত সম্পদ পড়ে রয়েছে সেগুলি তাকে ফিরিয়ে দেওয়ারও নির্দেশ দিলেন তিনি। নতুন করে প্রশাসনিক কাজ শুরু করার জন্যে জন্য একলাখ টাকা নগদ দেওয়া হল। মহম্মদ মুয়াজ্জমকে নির্দেশ দেওয়া হল বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দৌলতাবাদের মহাকোট দুর্গের প্রাকারের নিচের প্রাসাদে তার থাকার ব্যবস্থা করতে।
মীর জুমলাকে ২৯ মে ১৬৫৮ তারিখে তার পুত্রের দক্ষিণে আসার খবর দেওয়া হল। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বললেন, সাম্রাজ্য তাঁর প্রতি যে অনুগ্রহ দেখিয়েছে তার জন্য তাঁর কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। আগামী দিনে আরও বড় উপহার তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। মীর জুমলাকে যুদ্ধ সরঞ্জাম সামলানোর জন্য আরও নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান দিলেন। কাজ সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হল শাহজাদা মুয়াজ্জমকে। মীর জুমলাকে দ্রুত আওরঙ্গজেবের সঙ্গে দেখা করতে বলা হল। ডাক পড়লেও মীর জুমলা কর্ণাটকে কুতুব শাহের কবলে থাকা তাঁর মহালগুলি উদ্ধারের কথা ভাবছিলেন। তার পুত্রের থেকে মীর জুমলার ইচ্ছের কথা জানতে পেরে আওরঙ্গজেব বললেন, মীর জুমলাকে বেশ কিছুদিন কর্ণাটকে থেকে এই কাজ সমাধা করতে হবে। কুতুবশাহকে কর্ণাটক থেকে সেনা তুলে নিতে নির্দেশ দিলেন সুবাদার। ১৬৫৮এ অক্টোবরের শেষের দিকে মীর জুমলাকে বুরহানপুরের ৬,০০০ জাট ৬,০০০ সওয়ারওয়ালা সুবাদার নিযুক্ত করা হল। আওরঙ্গাবাদে বদলি হয়ে যাওয়া ওয়াজির খানের খণ্ডেশের মহাল মীর জুমলার জায়গির হিসেবে দেওয়া হল। মীর জুমলাকে বলা হল কর্ণাটক, বুরহানপুর এবং অন্যান্য যায়গার সঙ্গে তার হিসাব কিতাব বুঝে নিতে, বিভিন্ন যায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার জাহাজ এবং অন্যান্য কিছু সামলাতে, বুরহানপুর এবং কর্ণাটকের মধ্যে ডাকচৌকি নতুন করে স্থাপন করতে, স্থানীয় জমিদার এবং আধিকারিকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করতে, সেনাবাহিনী গড়া এবং সেটি জোরদার করতে আর সব কিছু বিষয়ে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে।
দারা ভাইদের বিরুদ্ধে কোমর বাঁধলেন
১৬৫৭-র শাহজাহান ৬৭ বছর পূর্ণ করছেন। পূর্বপুরুষদের থেকে অনেক বেশিই তিনি বেঁচেছেন। নভেম্বরের মাঝামাঝি দেহে মনে শাহজাহান সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু যে ঘটনাবলী অসুস্থ সম্রাটের কাছে এত দিন গোপন রাখা হয়েছিল, আর গোপন থাকল না। দারা তাঁকে জানাল বাংলার সুবাদার শাহ সুজা নিজেকে মুঘল হিন্দুস্তানের সম্রাট ঘোষণা করে বাংলা থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে বিশাল বাহিনী নিয়ে রওনা হয়েছেন। রাজা জয় সিংহের নেতৃত্বে বাংলা থেকে আসা সেনাদলদের মোকাবিলা করতে দারা শুকোর পুত্র সুলেইমান শুকোর নেতৃত্বে দারার বিশ্বস্ত সেনানায়কদের সমবিব্যহারে ২২,০০০ সেনার বাহিনী পাঠানো হল। সেনা দল আগরা ছাড়ল ৩০ নভেম্বর ১৬৫৮-য়।
গুজরাট থেকে একই রকম সমস্যার সংবাদ পৌঁছল দিল্লিতে। অক্টোবরে মুরাদ বখশ, শাহী দেওয়ান আলি নাকভিকে খুন করে নভেম্বরে সুরাট শহর লুঠ করে ৫ ডিসেম্বর নিজেকে শাহ সুজার মতই দেশের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মুরাদের পরিকল্পনা কাউন্টার করতে দারা মুরাদকে গুজরাট থেকে আওরঙ্গজেবের সুবার অন্তর্গত বেরারের সুবাদার হিসেবে বদলি করলেন। নাদান দারার আশা ছিল তাঁর নির্দেশ মেনে মুরাদ বেরারে বদলি হয়ে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেরার দখল নেবেন। শাহীনামা ফরমান হাতে পেয়ে মুরাদ ব্যাঙ্গের হাসি হাসলেন – তিনি বেরারও গেলেন না, আওরঙ্গজেবকে উত্যক্তও করলেন না।
দারাকে সম্রাট মনোনীত করেছেন সম্রাট। সেই সংবাদে শাহ সুজা বাংলা সুবায় নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেছেন। মুঘল হিন্দুস্তানের অপরপ্রান্তে গুজরাটের সুবাদার ছোটভাই মুরাদও সেই সুযোগে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন। কিন্তু তখনও আওরঙ্গজেব নিশ্চুপ। তিনি দিল্লির বিরুদ্ধে গলাও তুললেন না বা সিংহাসনের দখলের উদ্দেশ্যে সৈন্য সজ্জাও করলেন না। অথচ ভাইদের মধ্যে দারা সব থেকে বেশি চেনেন আওরঙ্গজেবের চরিত্র আর ভয় পান তাঁকে। তাঁর কাছে খবর ছিল আওরঙ্গজেব, সুজা আর মুরাদের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছেন। আওরঙ্গজেব দরবারি অভিজাত এবং পোড়খাওয়া সেনাপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। ডিসেম্বরের প্রথমে মীর জুমলা এবং অন্যান্য সেনাপতিকে দিল্লি ডেকে নেওয়া হল। দক্ষিণ থেকে আওরঙ্গজেবের সম্ভাব্য উত্তর অভিযানের পরিকল্পনা আন্দাজ করে ১৮ ডিসেম্বর একটা বাহিনী দক্ষিণে আর গুজরাট থেকে মুরাদের অভিযান রুখতে মালওয়াতে আরও একটা বাহিনী পাঠানো হল। দিল্লি থেকে পাঠানো বাহিনী মালওয়ায় পৌঁছে সেই অঞ্চলে শিবিরে থাকা বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে।
দারার সমস্যা হল সিংহাসনের লড়ায়ের শুরুতেই তিনি যোগ্য সেনাপতি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই দুই বাহিনীর নেতা খুঁজতে তাঁকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হল। একেরপর এক অভিজাত সেনানায়ককে নেতৃত্ব দিতে ডাকা হল। প্রত্যেকেই বিনীতভাবে প্রধান সেনাপতির পদ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেন। তাঁদের বক্তব্য দারার নেতৃত্বে শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়াই করতে বদ্ধ পরিকর, কিন্তু তাঁরা অন্য শাহজাদার রক্ত ঝরাতে উৎসাহী নন। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে লড়ার প্রস্তাবের পক্ষে একজনমাত্র সেনানায়ক পাওয়াগেল – রাঠোড় গোষ্ঠী প্রধান রাজা যশোবন্ত সিংহ। ১৮ ডিসেম্বর তাঁকে শায়েস্তা খানের পদে মালোয়ার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করে উজ্জয়নীতে পাঠানো হল। শায়েস্তা খান আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুরে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মামা-ভাগ্নের মধ্যে নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান চলত। অন্যদিকে মুরাদও মামাকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে মালওয়া রওনা হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। দারার পরিকল্পনা মামাকে দখল করা। তিনি দিল্লিতে মামাকে ডেকে পাঠালেন। দারার সন্দেহ শায়েস্তা খান গোপনে আওরঙ্গজেবের পক্ষ নিচ্ছেন। অনেক চেষ্টায় গুজরাটের দিকে যাওয়ার বাহিনীর একজন সেনাপতি পাওয়া গেল – কাসিম খান। তাকে গুজরাটের সুবাদার নিযুক্ত করা হল। (চলবে)