বিশ্বসাম্রাজ্য ইতিহাসে অন্যতম দুই বর্ণময় মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন আকবর এবং তাঁর নাতির পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব। এই দুজনে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের মোড় একাহাতে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস আলোচনায় আকবর মহান আর আওরঙ্গজেব খলনায়ক। আকবরকে নিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে বিপুল উচ্ছসিত আলোচনা হলেও আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যা আলোচনা হয়েছে তাতে আওরঙ্গজেবের কৃতি উজ্জ্বল তো হয় নি, তিনি আরও বেশি ঘৃণিত চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। আওরঙ্গজেবকে নিয়ে ১৯২০-তে প্রকাশিত হয়েছিল যদুনাথ সরকারের ৫ খণ্ডের দ্য হিস্টরি অব আওরঙ্গজেব (The History of Aurangzeb.)। এর প্রায় ১০০ বছর তাঁর জীবনী নিয়ে আলোচনায় ইতিহাস নীরব। ২০১৬য় প্রকাশিত হল অড্রে ট্রুস্কের (Audrey Trusk) ব্যতিক্রমী আওরঙ্গজেব দ্য ম্যান এন্ড দ্য মিথ (The Man and the Myth) বইটি। নতুন করে সমাজ জীবনে আওরঙ্গজেরবকে নিয়ে আলোচনা, উথালপাথাল শুরু হল। তার মাঝখানে দুটি বই আওরঙ্গজেবকে একটু অন্য দৃষ্টিতে দেখেছিল প্রথমটি মুনিস ফারুখির দ্য প্রিন্সেস অব মুঘল এম্পায়ার (Munis Farooqi’s The Princess of the Mughal Empire) ১৫০৪-১৭১৯ আর রাজীব কিনরার রাইটিং সেলফ রাইটিং এম্পায়ার (Rajiv Kinra’s Writing Self Writing Empire)। কিন্তু এই দুটি বইতে অন্য ধরণের আওরঙ্গজেব প্রসঙ্গক্রমে এসেছেন, কেন্দ্রিয় চরিত্র নন।
৪৫০ বছর আগে আবির্ভূত হয়ে আকবর টলমলে মুঘল সাম্রাজ্যকে স্থিতি দিয়েছেন; মুঘল সম্রাজ্যকে গড়ে তুলেছেন এক্কেবারে মাটিছেনে প্রায় শূণ্য থেকে। ভারতবর্ষীয় পূর্বাঞ্চলের আফগান সমরবিদ প্রতিভাশালী শের শাহের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এবং অকাল মৃত পিতা মহম্মদ হুমায়ুনের সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার স্বীকার করেছেন বুক চিতিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে। কাঁটার মুকুট মাথায় নিয়ে বাংলার পূব অঞ্চল এবং মুঘল হিন্দুস্তানের দক্ষিণ অঞ্চল বাদ দিয়ে বাকি অঞ্চলে সাম্রাজ্য বাড়িয়েছেন, নতুন শহর তৈরি করেছেন, নতুন ধরণের শাসনের পরিকল্পনা করেছেন, শুলইকুল নীতিতে রাজত্বের প্রত্যেকের জন্যে শান্তি নীতি প্রণয়ন করেছেন, অসামান্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনি দক্ষিণ এশিয়াকে তুলে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তাঁর সময়ে শুধু দক্ষণ এশিয়াই নয় কয়েক হাজার বছরের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল সোনার বাংলা নতুন রূপে প্রতিভাত হল। ২০০ বছরের কাছাকাছি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম ছজন মুঘল সম্রাটের মধ্যে আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিই ৫০ বছর করে রাজত্ব সময় ভাগ করে নেওয়া দুজন ব্যতিক্রমী সম্রাট জালালুদ্দিন আকবর এবং আলমগির আওরঙ্গজেবকে। আওরঙ্গজেব তার শাসনের বিরুদ্ধাচরণ করা ভাইদের হত্যা করেন, জীবিত সম্রাটকে অন্তরীণ করে রাখায় তাঁর শাসনকে স্বীকৃতি না দেওয়া কাজিকে বাধ্যতামূলকভাবে হজ করতে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে নিন্দিত হলেও ঠিক উল্টোদিকে আকবরও ৫০ বছরের রাজত্ব নিষ্কন্টক করতে একে একে আতলিক, সাম্রাজ্যর প্রধান সেনাপতি পিতৃবন্ধু বৈরাম খান, তার দুধ মাতা মহাম আঙ্গা (Maham Anga), ভাই মির্জা হাকিম (Mirza Hakim) এবং আরও বেশ কিছু প্রভাবশালী মানুষকে প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে ধরাধাম থেকে সরিয়ে, অথবা তাদের নিষ্ক্রিয় করেও মহান সম্রাট হিসেবে স্বীকৃত হলেন। আওরঙ্গজেবের সেই সৌভাগ্য হল না।
তো আকবরের প্রায় ৪২৫ এবং আওরঙ্গজেবের প্রায় ৩২৫ বছরের প্রয়াণ উপলক্ষ্যে বাংলার কারিগর চাষী এবং হকারদের পক্ষ থেকে দুই সম্রাটকে নতুন করে ফিরে দেওয়ার আয়োজন করলাম। প্রথমে বছর ধরে ধরে আকবরের জীবন এবং তার পরে আওরঙ্গজেবের জীবন যতদূরসম্ভব বিশদে আলোচনা করব। আকবরের জীবনক্রমের নানান ঘটনা আলোচনায় ঢোকার আগে চুম্বকে আমরা বিশ্বশ্রুত আকবর সম্রাটের জীবনীর সারাংশ আলোচনা করব। তারপরে আসবেন আওরঙ্গজেব।
তৈমুরলঙ্গ এবং চেঙ্গিসখানের যৌথ পারিবারিক উত্তরাধিকার বহন করা আকবরের ঠাকুর্দা, বাবর মধ্য এশিয়ার স্তেপভূমিতে তুতোভাই শাইবানি খানের (Shaibani Khan) বিরুদ্ধে সিংহাসনের লড়াইতে ইস্তফা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় পালিয়ে এসে হিন্দুস্তানে নতুন ধরণের সামরিক পরিকল্পনায় মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। ১৫৩০-এ বাবরের মৃত্যুর দশ বছর পর পুত্র মহম্মদ হুমায়ুন শের শাহের প্রতাপে ক্ষমতা হারিয়ে আত্মীয় স্বজন নিয়ে পারস্য প্রবাসে যাওয়ার সময়, শিক্ষক কন্যা হামিদা বানুর সঙ্গে প্রেম এবং চল্লিশ দিন পরে রাজত্বহীন সম্রাটের সঙ্গে মাথা উঁচু একরোখা সাধারণ কন্যার বিবাহ (১৫৪১) হয়। পরের বছর আকবরের জন্ম। আকবরকে আত্মীয়দের হাতে ছেড়ে সম্রাট-রাজ্ঞী পারস্যে আশ্রয় নিলেন। আকবরের প্রথম তিন বছর কান্দাহার এবং ১৫৪৫ থেকে কাবুলে কাকার অধীনে বড় হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা তার আগামীদিনে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠমো সংস্কারে প্রভাবিত করবে। ভাইদের সঙ্গে হুমায়ুনের তিক্ততার পরিবেশ আমরা আন্দাজ করতে পারি আকবরের বেড়ে ওঠার ঘটনায়। কাকাদের আশ্রয়ে প্রায় অযত্ন অবহেলায় বন্দী জীবন কাটাতে থাকা আকবরকে হুমায়ুন ১৫৪৫-এ কাবুল দখল করে উদ্ধার করলেও ১৫৪৫-৪৬-এ ভাই কামরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে বিজীতভূমি ভাইকে তুলে দিতে বাধ্য হন। এবার থেকে আকবর তার পিতা-মাতার সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। হুমায়ুন তার পুত্রকে শিক্ষিত করেছেন। আকবর যেহেতু কোনও কিছুই নিজের হাতে লিখে যান নি, তাই তাঁকে পশ্চিমি ইতিহাসে ‘অশিক্ষিত’ বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা ভৃত্যদের স্মৃতিকথায় দেখব আকবরের অক্ষর না চেনার যে গল্প রটেছে, তা স্রেফ অতিকথাই। আকবরকে পড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু বাল্যকালে তিনি ঠিকমত পড়াশোনা করেন নি। তাই তাঁকে অশিক্ষিত বলাটা বাড়াবাড়ি। শোনা যায় তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। আকবর কর্মচারী রেখে বই পড়াতেন ঠিকই, কিন্তু হস্তাক্ষরের নানান আঙ্গিক তিনি চিনতে পারতেন, চিত্রকলা তার মত, তার সময়ে খুব কম মানুষ বুঝতেন।
দুর্ঘটনায় শের শাহের মৃত্যুর পরে মহম্মদ হুমায়ুন রাজত্ব দখলে নিলেন। সিংহাসনে বসতে না বসতেই দুর্ঘটনায় ১৫৫৬-য় প্রাণ হারান। মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার দিনই পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলায় কালানৌরে চৌদ্দ বছরের বালক জালালুদ্দিন আকবরকে (Jalaluddin Akbar) সিংহাসনে অভিষিক্ত করা হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি এখন দিল্লি থেকে কাবুল। যে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা আকবরের পিতা হুমায়ুন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই নিরাপত্তা রক্ষার দায় এখন এক অনভিজ্ঞ কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ১৪ বছরের বালকের হাতে ন্যস্ত করা হল। সেই মুহূর্তে আফগানেরা হিমুর নেতৃত্বে মুঘল সাম্রাজ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্যে সংঘবদ্ধ হচ্ছে।
নবীন সম্রাটকে নিরাপত্তা আর সাম্রাজ্য সুরক্ষার দায় পড়ল আকবরের অভিভাবক ‘ইয়ার-ই-ওয়াফাদর’ বৈরাম খানের (হুমায়ুনের বদনাধারকের জৌহর আফতাবাচির বয়ানে বৈরাম বেগ, মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট তাঁকে সম্মানসূচক খান উপাধি দেন) ওপর। প্রথম চার বছর ১৫৫৬ থেকে ১৬৬০ পর্যন্ত বৈরাম খান এবং দাই/সৎ মা মাহাম আঙ্গা সমান্তরালভাবে আকবরের ব’কলমে রাজত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। বৈরাম খাঁ-এর নির্দেশ মান্য করতে করতে বিরক্ত আকবর বিশ বছরে পড়া মাত্রই রাজত্বে অভ্যুত্থান আয়োজন করে, আকবরের এক দাই জিনজি আঙ্গার পুত্র শামশুদ্দিন আতগা খানের মাধ্যমে ক্ষমতাশালী অভিভাবকের খবরদারি কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বৈরাম-বিধবা সালিমা সুলতান বেগমকে বিবাহ করেন এবং পুত্র আবদুর রহিমকে আশ্রিত, পালিত পুত্রের স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যতে তাঁকে তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ উপাধি খানইখানান অর্পণ করে প্রধান সেনায়কের পদে বসাবেন। দরবারে সম্রাটের উকিল শামশুদ্দিন আতগা খানকে ১৫৬৩-তে খুন করান আকবরের আরেক প্রধান দাই এবং ক্ষমতাকেন্দ্র মাহাম আঙ্গার পুত্র আজম খান। হত্যাকাণ্ডের সংবাদে স্বয়ং আকবর দাঁড়িয়ে থেকে আজম খানকে কেল্লার উচ্চ প্রাচীর থেকে তলায় দু-দুবার ফেলে হত্যা করান। প্রায় এক মাসের মধ্যেই পুত্র শোকে আরেক ক্ষমতা-কেন্দ্র মাহাম আঙ্গার মৃত্যু ঘটল। আকবর স্বাধীন হলেন।
তিনি মুঘল রাজ্যের পক্ষে মালওয়া অঞ্চলে বাজবাহাদুরের রাজ্য দখল করা উজবেগ প্রধান আবদুল্লা খান উজবেগের বিদ্রোহ ১৫৬৪-৬৫ এবং তার পরের বছর ১৫৬৬-৬৭-তে মির্জা বিদ্রোহ দমন করেন। যদিও ঐতিহাসিকেরা বলছেন দিল্লির রাজত্বে রাজপুতদের অংশগ্রহন আকবরের কৃতিত্ব, কিন্তু সুলতানি আমলেও রাজপুতেরা দিল্লিতে ক্ষমতার অংশদারি করেছেন। আকবরের জন্মই হয়েছে রাজপুতানায় আশ্রিত এক রাজার আশ্রয়ে। সেই ধারাবাহিকতাতেই আকবর রাজপুতদের মুঘল রাজনীতির অংশ করে নেন। ১৫৬১-তে মালওয়া, ১৫৬৪-তে গণ্ডোয়ানা, ১৫৬৮-তে চিতোর দখলের পরে রাজপুতানাজুড়ে খুব দ্রুত মুঘল নিয়ন্ত্রণ ছড়াতে থাকবে। ১৫৭৪-এ তিনি বিহার এবং বাংলার পশ্চিমপ্রান্ত দখল করবেন। (চলবে)