| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শ্যামাসংগীতের কলাকুশলীরা : সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়

Reporter
সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায় / ১৩৩৮ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

বহু যুগ থেকে সারা পৃথিবীজুড়ে গীতিকাররা লক্ষ লক্ষ গান রচনা করেছেন। সেই গানের অনেকাংশ রচিত প্রেয়সীর উদ্দেশে। একাংশ বৈপ্লবিক গান, কতকটা দেশাত্মবোধক। খানিকটা সমাজ সচেতনমূলক। কিন্তু সব দেশেই মাতৃবন্দনায় রচিত গান প্রাধান্য পেয়ে এসেছে চিরকাল। রোমান্টিক গান বা বৈপ্লবিক গান কালের স্রোতে ভেসে যায়। প্রেমের গানের আয়ু বড়জোর কয়েক মাস। পাশাপাশি বিপ্লব সমাপ্ত হলে বৈপ্লবিক গানেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

কিন্তু মায়ের উদ্দেশে রচিত গান কখনও পুরোনো হয় না। পৃথিবীর নানা দেশের মায়ের পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-খাবার, গায়ের রং, মুখের আকৃতি, জাতপাত নানা প্রকারের। গীতিকার কমলা চক্রবর্তী সঠিক গানই রচনা করেছেন— ‘শ্যামা মা কি আমার কালো’— পৃথিবীর নানা দেশের মায়ের গায়ের রং শ্বেতবর্ণ, কালো, তামাটে, লালচে। রঙের পার্থক্য যাই থাকুক, বিশ্বের সব দেশের ‘মাতৃহৃদয়’ কিন্তু একইরকম। তাতে কোনও ভেদ নেই। যদিও পৃথিবীর যে কোনও দেশের সন্তানের রচিত মাতৃবন্দনার সঙ্গে পশ্চিমবাংলার মাতৃবন্দনার ব্যবধান সহস্র যোজন। বাংলার গীতিকাররা যেভাবে ‘মা’-কে আকুল হয়ে ভেবেছেন, তাতে এ দেশের মায়ের সঙ্গে সন্তানের চিরন্তন সম্পর্কের এক সুন্দর ঐতিহ্য গভীরভাবে ধরা পড়েছে। তাই আমাদের দেশের পরম্পরায় বলা হয়— ‘নাড়ির টান’। এই নাড়ির টান কথাটায় যে মাতৃবন্দনা ধরা পড়ে তা পৃথিবীর আর অন্য কোনও দেশের সাহিত্য-কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় না।

আমাদের দেশের প্রবাদে বলে—‘মায়ের হাড় যদি মাটিতে থাকে পোতা, কবর থেকে মা বলেন, বাছা তুই কোথা?’ শুধুমাত্র তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের রচিত গান বা কবিতায় নয়, এমনকী মধ্যপ্রদেশের এক আদিবাসীদের প্রবাদ—‘মা আইস্, দুখ্খো ভাগিস্।’ অর্থাৎ মা এলে দুঃখ পালায়। আমাদের অবিভক্ত বাংলায় শ্যামা মায়ের আরাধনায় যে মাতৃবন্দনা প্রকাশ পেয়েছে, তাতে গানকে বিশ্লেষণ করলে মায়ের সঙ্গে সন্তানের যোগসূত্র এবং একটা সময়কে ঘিরে মানুষের অর্থনীতি, সামাজিক চাহিদা, কামনা-বাসনা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

এখন মায়ের কাছে সন্তানের অনেক চহিদা। ভাইকে না দিয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটটা আমার নামে লিখে দাও। সরকারি চাকরির অবসরের পর চাকরি থেকে পাওয়া এককালীন টাকাটা মা যেন বোনকে না দিয়ে ছেলেকেই দেয় ইত্যাদি।

কিন্তু এমনটা আগে ছিল না। বাংলার মায়েরা চিরকালই আটপৌরে। অতীতে গ্রামবাংলার মায়েরা ভোগ-লালসাকে তুচ্ছ করে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে দিন কাটাতে চেয়েছেন। সাধারণ তাঁতের কাপড়, মোটা চালের ভাত, মাথা গোঁজার জন্য আচ্ছাদন এসবের বেশি মায়েদের চাহিদা ছিল না। আমাদের মায়েরা পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য নানা ব্রত—পূজা-পার্বণের মাধ্যমে তাঁদের মনোষ্কামনা পূরণ করার চেষ্টা করতেন। তাঁদের একমাত্র কামনা, পরিবারের সবাই যেন ভালো থাকেন। এর বেশি তাঁদের চাহিদা নেই।

আমাদের বেদ-উপনিষদে বলা আছে— সন্তানের প্রথম গুরু তাঁর মা। যুগ-যুগান্ত ধরে আমাদের মায়েদের সংস্কারই আমাদের রক্তে বয়ে চলেছে। তাই সন্তান মায়ের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছেন—‘চাই না মাগো, রাজা হতে, দু-বেলা যেন পাই মা খেতে।’শ্যামা মায়ের কাছে আকুলি-বিকুলি করে সন্তানের বিনীত নিবেদন—অতিথি দ্বারে এলে যেন মুখ লুকোতে না হয়, কাঁসার থালা-বাটিতে যেন খাবার থাকে, মাটির ঘরের বংশের খুঁটিতে যেন খড় বিছোতে পারি, মাটির ঘরেই আমার সোনার সংসার। গীতিকার তাঁর গানে সেই সঙ্গে সাবধানবাণী করেছেন—যদি মা আমার দালান ঘর হয়, তবে হয়তো মা ডাকতে ভুলে যাবো।

গীতিকারের সাবধানবাণী আজ সত্যি হয়েছে। মায়ের আশীর্বাদে যাঁরাই ঐশ্বর্যের মুখ দেখেছেন, তাঁরাই মা-কে ভুলে গেছেন। ছেলে বিদেশে। মা বাংলার বুকে একাকী কাঁদেন। কখনও ছেলের দয়ায় মায়ের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানও বুঝতে পেরেছেন—ঐশ্বর্য-ভোগ-লালসা পারিবারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে আসে। শেষে জীবন হয়ে পড়ে শুষ্ক, নির্বান্ধব। তাই শ্যামা মায়ের কাছে সন্তানের আকুতি, ‘আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিলো।’ সন্তান মায়ের কাছে আবেদন করছেন—যেথায় আছে শুধু ভলোবাসা-বাসি, সেথায় যেতে প্রাণ চায় মা। সংসারের মধ্যে নানা দ্বেষ-হিংসা-ভোগ-লালসার হাহাকার থেকে সন্তান মুক্তি পেতে চান। চিরন্তন সেই মায়ের কোলেই ফিরে যেতে চান তাঁর সন্তান।

কিন্তু যে মায়ের কাছে আমাদের এত প্রার্থনা, সে মায়ের রূপ কেমন হবে? মা কি কখনও নগ্নিকা হতে পারেন? যদিও এখন এই বাংলায় অজস্র মা আছেন যাঁরা হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ান। ছেঁড়া ফাঁটা জিন্সের প্যান্ট আর শরীরের অনেকাংশ দেখিয়ে তাঁরা চলাফেরা করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, যার সাথে হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িত নেই, তা বেমানান। ইউরোপীয় ছাঁচে ঢালা এখন বাংলার নারীরাও তেমন পোশাক-পরিচ্ছদ পরছেন। কিন্তু সন্তান মায়ের এমন ছিরিছাঁদ কস্মিনকালেও পছন্দ করেন না। তাই আজ থেকে তিনশো বছর আগে গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক রামপ্রসাদ সেন লিখেছেন—‘বসন পরো মা বসন পরো।’ অর্থাৎ মায়ের উদোম শরীর সন্তানের কাছে বিসদৃশ লাগে। আজকের মায়েরা কি রামপ্রসাদ সেনের আকুতিতে সাড়া দেবেন?

শ্যামাসংগীতে রয়েছে মায়ের কাছে সন্তানের সেই আবেদন-নিবেদন। মা ও সন্তানের অভিন্ন হৃদয়। তাদের মধ্যেকার সম্পর্কের সৌন্দর্য ও গভীরতা যাঁরা শিল্পসুষমায় মণ্ডিত করেছেন সেই সমস্ত গীতিকার, সুরকার, গায়ক, গায়িকার সংক্ষিপ্ত ধারণা তুলে ধরতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হলো।

শ্যামাসংগীতের যিনি কিংবদন্তি বা প্রবাদপুরুষ, তিনি সাধক রামপ্রসাদ সেন। রামপ্রসাদকে বাদ দিয়ে শ্যামাসংগীত কল্পনাও করা যায় না। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক। রামপ্রসাদ মা কালীর সাধক। ১৭২০ সালে অবিভক্ত ২৪ পরগনার হালিশহরের কাছে কুমারহট্ট গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। পিতা রামরাম সেন আয়ুর্বেদিক ঔষধের ব্যবসা করতেন। জানা যায়, তাঁর পিতাও নাকি কাব্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন। এবং ঈশ্বরে ভক্তিমান। রামপ্রসাদ পিতার দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান। তাঁর পিতার অদম্য আগ্রহে রামপ্রসাদ টোলে সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দি, বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। অকস্মাৎ তাঁর পিতার মৃত্যু হলে রামপ্রসাদের পরিবারে আর্থিক দুর্দশা নেমে আসে। তখন অর্থ রোজগারের চেষ্টায় তিনি কলকাতার এক ধনী ব্যবসাদারের বাড়িতে হিসেবরক্ষক হিসেবে কাজে নিযুক্ত হন। একদিন তিনি হিসেবের খাতায় একটি গান লিখে বসেন—‘আমায় দে মা করে তোর তবিলদারি।’ সেই গান দেখে ওই ধনী জমিদার তাঁকে গানচর্চায় উৎসাহী করেন। জমিদার বলেন, তুমি নবদ্বীপের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে যাও। তিনি তোমায় প্রভূত সাহায্য করবেন।

জমিদারের কথামতো রামপ্রসাদ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে দেখা করেন। কৃষ্ণচন্দ্র সাধক রামপ্রসাদের গান শুনে ভীষণ খুশি হন। তিনি তাঁর রাজসভায় সভাকবি হিসেবে পদ গ্রহণ করার জন্য রামপ্রসাদকে প্রস্তাব দেন। রামপ্রসাদ অবশ্য সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তখন মহারাজ তাঁকে তাঁর জমিদারিতে বসবাসের জন্য রামপ্রসাদকে করমুক্ত ১০০ বিঘে জমি দান করেন। এবং রামপ্রসাদের গানচর্চায় যাতে আর্থিক কারণে বিঘ্ন না ঘটে তার জন্য মাসিক ৩০ টাকা মাসোহারার বন্দোবস্ত করেন। ফলে রামপ্রসাদ মহানন্দে কালী ভজনা আর গান চর্চা করতে থাকেন। তাঁর কাব্যগান এবং নাট্যচর্চাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—সাধন বিষয়ক, তত্ত্ব দর্শন, মাতৃ বিষয়ক, দেহতত্ত্বতে বিভক্ত রয়েছে। তাঁর কবিত্ব শক্তি এবং প্রাঞ্জল ভাষার প্রকাশভঙ্গিতে ভিন্ন মাধুর্য লাভ করেছে। তাঁর অনেক গান আজ বিলুপ্ত, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ‘কবিরাভজন’ উপাধি দেন। শোনা যায়, মুর্শিদাবাদ থেকে নৌকাযোগে নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা একবার কলকাতায় এসে গঙ্গার তীরে বসে রামপ্রসাদকে গাইতে দেখেন। তখন তিনি তাঁকে নৌকা থেকে ডেকে এনে গান শুনে ভীষণ খুশি হয়ে তাঁকে উপঢৌকন দেন। কথিত আছে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের বেশ কিছু সুরে রামপ্রসাদী সুরের মূর্ছনাকে কাজে লাগিয়েছেন। ১৭৮১ সালে এই সাধকের মৃত্যু হয়। রামপ্রসাদের মৃত্যু নিয়েও খানিকটা রহস্য আছে। শোনা যায়, তিনি নাকি ‘তিলেক দাঁড়াও রে শ্যামা’ গানটি গাইতে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তলিয়ে যান। মৃত্যুর আগে নাকি শ্যামা মায়ের দেখা পেয়েছিলেন। রামপ্রসাদ সেনের গ্রন্থাবলী বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে প্রকাশিত হয়। সুকুমার রায়ের লেখা—‘বাংলা সংগীতের রূপ’ বইটিতে এ ব্যাপারে বিশদ আছে। রামপ্রসাদী গানের মধ্যে ১) মন রে কৃষি কাজ জান না, ২) ডুব দে রে মন কালী বলে, ৩) বসন পরো মা বসন পরো, ৪) মা আমায় ঘুরাবি কতো ইত্যাদি কয়েকশো বছর পরে আজও জনপ্রিয়।

গীতিকার-সুরকার হিসেবে রামপ্রসাদ সেন যদি কিংবদন্তি হন, তবে শ্যামাসংগীতের গায়ক-গায়িকাদের মধ্যে পান্নালাল ভট্টাচার্য হচ্ছেন প্রাণপুরুষ। তাঁর গান— মা, আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিলো— আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যদিও এই গায়কের জীবন খুবই হৃদয় বিদারক।

১৯৩০ সালে উত্তর কলকাতায় তাঁর জন্ম হয়। পান্নালালবাবুর গায়কী জীবন মাত্র ৩৬ বছরের। তিনি ১৯৬৬ সালে মারা যান। পান্নালালবাবুর বড়ো দাদা প্রসিদ্ধ গায়ক, গীতিকার, সুরকার তথা সংগীতকার ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। ধনঞ্জয়বাবু তাঁর ভাইয়ের চাইতে আট বছরের বড়ো। প্রথম জীবনে ধনঞ্জয়বাবুরহাত ধরে তাঁর ভাই পান্নালাল এবং তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সনৎ সিংহকে মঞ্চে গাইবার সুযোগ করে দেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭। পরবর্তী সময়ে পান্নালালবাবু এইচএমভি কোম্পানিতে গান রেকর্ড করার জন্য চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁর অপরিণত কণ্ঠস্বরের জন্য এইচএমভি তাঁকে বাতিল করে দেয়। এরপর তাঁর বন্ধু সনৎ সিংহ তাঁর এক পরিচিতের মাধ্যমে তাঁকে প্রথম রেকর্ড করার সুযোগ করে দেন। তাঁর প্রথম গান—আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিলো—দারুণ জনপ্রিয় হয়ে যায়। পান্নালাল শ্যামাসংগীতকে একটা অন্যরকম গায়কি ঢঙে উপস্থাপন করেন। তাঁর সময়ে দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য মুম্বাই এবং বাংলায় যশস্বী গায়ক হিসেবে পরিণত হন। তাঁর নামডাক—অর্থের জৌলুসে পান্নালাল খানিকটা বেদনাহত হন। কালী মায়ের কাছে পান্নালালের অভিমান ভরা অভিযোগ, ‘মা, আমি তোমায় এতো ডাকি, এতো ভালোবাসি, তবু তুমি দাদাকেই বেশি ভালোবাসো। তাঁকেই তুমি পরিপূর্ণ আশীর্বাদ করেছো।’ এই দুঃখে পান্নালাল একদিন আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুতে শ্যামাসংগীতের জগতে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের পতন হয়।

শ্যামাসংগীতের আকাশে আর এক নক্ষত্র ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সুক্ষ্ম বিচারে তাঁর এবং পান্নালালবাবুর গায়কি ঢঙের বৈচিত্র্য অনন্য। ধনঞ্জয়বাবুর জন্ম ১৯২২ সালে। মৃত্যু ১৯৯২ সালে। তিনি প্রথম থেকেই গানের চর্চায় মাতোয়ারা। তাঁর প্রথম জীবন কেটেছে হাওড়ায়। বালি টমসন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৪০ সালে তাঁর প্রথম গান রেকর্ড হয়। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং কম্পোজার। সেই সঙ্গে ধনঞ্জয়বাবু অভিনেতাও বটে। সাড়ে চুয়াত্তর, পাশের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, নববিধান প্রভৃতি ছবিতে অভিনয় করেন। ‘যাত্রিক’ ছবিতে প্রথম গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। হিন্দি সিনেমাতেও তিনি প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে গান গেয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৫৪ সালে সাধক রামপ্রসাদ ছবিতে ২৪টি গানের মধ্যে ২৩টি গান তাঁর। তিনি ৫ হাজারেরও বেশি গান করেছেন। আধুনিক বাংলা গানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর গাওয়া শ্যামাসংগীত আজও শ্রোতাদের কাছে আদরণীয়।

এর পরে আরও এক দিকপাল অনুপ জালোটার কথা বলতে হয়। যিনি ভজন সম্রাট হিসেবে উপাধি পেয়েছেন। তিনি শ্যামাসংগীত গেয়েও এই বাংলায় যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছেন। ‘৮০-র দশকে তাঁর গান শোনার জন্য বাংলার মানুষ মুখিয়ে থাকতেন। ১৯৫৩ সালে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের নৈনিতালে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ওই রাজ্যের ভাতখণ্ড মিউজিক ইনস্টিটিউট ডিমড্ ইউনিভার্সিটি থেকে গান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কোরাস গায়ক হিসেবে তিনি সংগীত জীবন শুরু করেন। পৃথিবীর ৪০০-র বেশি শহরে সংগীত জীবনকালে ৫ হাজারেরও বেশি সংগীতানুষ্ঠান করেছেন। তিনি ভারতের ৮টি আলাদা আলাদা ভাষায় অনায়াসে গান গাইতে পারেন। এবং বহু বছর ধরে গাইছেন। তাঁর গাওয়া ২০০-র বেশি অ্যালবাম রয়েছে। ২০১২ সালে ভারত সরকার তাঁকে শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম গায়ক সম্মানে ভূষিত করে। তাঁর একাধিক গানে গোল্ডেন ডিস্ক আছে। তাঁর গাওয়া গান—অ্যায়সি লাগি লগন, মীরা হো গয়ী মগন এবং ম্যায় নহি মাখন খায়ো। সেই সঙ্গে রং দে চুনরিয়া গজল-ভজন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। শ্যামাসংগীতে অনুপ জালোটা নিজস্বতা সুন্দরভাবে বজায় রাখতে পেরেছেন।

অনুপ জালোটার মতোই অনুরাধা পাড়োয়াল অবাঙালি হলেও তাঁর কণ্ঠে শ্যামাসংগীতে কোনও জড়তা নেই। অনায়াস সরল ভঙ্গিতে তিনি এত সুন্দর শ্যামাসংগীত গেয়েছেন যে বাংলার নর-নারীদের মন হরণ করে নিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে মুম্বাইতে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৭৩ সালে শচীনদেববর্মণের নির্দেশে তিনি ‘অভিমান’ ছবিতে জয়া ভাদুড়ির জন্য এক লাইন শ্লোক গেয়ে নজর কেড়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে ‘কালীচরণ’ সিনেমায় গান করলেও তেমন সাড়া ফেলতে পারেননি। এরপর লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল-এর সুরে ‘আপ বীতি’ ছবিতে গান গেয়ে হইচই ফেলে দেন। ওই ছবিগুলির জন্য তিনি পরপর তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। অনুরাধা পাড়োয়াল পণ্ডিত যশরাজ, গুলাম আলির সঙ্গে কাজ করেছেন। কুমার শানুর সঙ্গে তাঁর গানের জুটি এক সময় দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। যদিও ভজন-গায়ত্রী মন্ত্র-গজলে তিনি ভীষণ পারদর্শী। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার-হৃষীকেশ নদীমাতৃক এলাকায় অনুরাধাদেবীর গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে দিন শুরু হয়। পশ্চিমবাংলাতেও হিন্দি আধুনিক গানের পাশাপাশি গায়ত্রী মন্ত্র বেশ জনপ্রিয়। মীরা, তুলসীদাসের সমস্ত ভজনই তিনি গেয়েছেন। তাঁর ‘মা গো আনন্দময়ী’ শ্যামাসংগীতের অ্যালবামটি পশ্চিমবাংলার মানুষের কাছে বেশ আদরণীয়। শ্যামাসংগীতের গায়িকা হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

শ্যামাসংগীতের আর এক দিকপাল পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। ১৯৫২ সালে কলকাতার উপকণ্ঠে শ্যামনগরে জন্ম। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বি.এ. এবং এম.এ. পাশ করেছেন। অজয়বাবুই প্রথম ক্ল্যাসিক্যাল গায়ক হিসেবে ভারত থেকে চীনে এবং পাকিস্তানে আমন্ত্রিত হন। ২০১১ সালে তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত হন এবং একইসঙ্গে পণ্ডিত উপাধি পান। ‘ছন্দনীড়’ ছবির প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে তিনি ১৯৮৯ সালে ন্যাশনাল ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। ১৯৯৯-২০০০ সালের জন্য তিনি সংগীত-নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান। পিতার কাছেই তাঁর প্রথম গানচর্চা। তারপর ধাপে ধাপে তাঁর সংগীতজগতের উত্থান। ১৯৭৭ সালে তিনি আইটিসি সংগীত রিসার্চ আকাদেমির দায়িত্বপূর্ণ পদে যোগ দেন।

পিতা বাদে তিনি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। অজয়বাবু ইউরোপের কেনেডি সেন্টার, রয়াল অ্যালবার্ট হল, ফ্রান্সের থিয়েটার ডি লা ভিলে-তে গানের অনুষ্ঠান করেন। যা যে কোনও ভারতীয় গায়ক-গায়িকার কাছে ঈর্ষার বিষয়। মধ্যপ্রদেশ সরকার তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছে। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ উপাধি দিয়ে সম্মান জানান। অজয়বাবু দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে ‘শ্রুতিনন্দন’ নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। ক্ল্যাসিক্যাল গায়ক হিসেবে তাঁর মূল পরিচিতি থাকলেও তাঁর গাওয়া শ্যামাসংগীত মানুষের মন জয় করেছে।

অপর আর এক স্বনামধন্য গায়ক মান্না দে। যিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। মূলত আধুনিক বাংলা গান এবং হিন্দি গান গেয়ে তিনি সারা ভারতবর্ষের মানুষের কাছে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি প্রচুর শ্যামাসংগীত না গাইলেও তাঁর গাওয়া কয়েকখানি গানের মধ্যে ‘আমায় একটু জায়গা দাও, মায়ের মন্দিরে বসি’— গানটি অতি দ্রুত মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। ১৯১৯ সালে কলকাতায় তাঁর জন্ম হয়। প্রবোধচন্দ্র দে তাঁর প্রথম জীবনের নাম। কিন্তু পরে তিনি মান্না দে হিসেবেই পরিচিত হন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত হিন্দি, বাংলা তাঁর গানের সংখ্যা চার হাজার অতিক্রম করেছে। ১৯৪২ সালে এস ডি বর্মণের সুরে ‘তামান্না’ ছবিতে গান গেয়ে শ্রোতাদের কাছে সমাদর লাভ করেন। ভারত সরকার ১৯৭১ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০৫ সালে তিনি পান ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ উপাধি। ২০০৭ সালে পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। তিনি কাওয়ালি, গজল, আধুনিক, রক অ্যান্ড রোল, শ্যামাসংগীত সব ধরনের গানেই তাঁর ব্যুৎপত্তি প্রমাণ করেছেন। একদা কাকার সাহচর্যে তাঁর গানের তালিম হয়েছিল। তারপর তাঁর জমকালো উত্থান সত্যি ঈর্ষার বিষয়। তিনি ভারতের সম্পদ।

মান্না দে-র পরেই আর এক প্রসিদ্ধ গায়ক, যিনি জাতিতে শিখ পাঞ্জাবি অমৃক সিং অরোরা। তিনি জন্মগতভাবে পাঞ্জাবি হলেও কখন যে তিনি কার্যত বাঙালিতে পরিণত হয়েছেন তা বলা যাবে না। কারণ তাঁর সমস্ত গান-ই ভক্তিগীতি আর শ্যামাসংগীত আধারিত। বাংলায় যদিও ‘রূপসী দোহাই তোমার, তোমার ওই চোখের পাতায় আমাকে কাজললতার কালি করো’— এই আধুনিক গান গেয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার শিখরে উত্থান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমস্ত বাংলার মানুষের কাছে তিনি ভক্তিগীতি, লোকগীতি এবং শ্যামাসংগীত গায়ক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে তাঁর সংগীতজীবনে পদার্পণ। মা যশবন্ত কৌর-এর সঙ্গে প্রথম ভজন গান কলকাতায় পাঞ্জাবিদের গুরুদ্বারে। তারপর বিশুদ্ধানন্দ বিদ্যালয়ের ফাংশনে গান করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত। ১৯৬৬ সালে তিনি ব্লু ফক্স রেস্টুরেন্টে নিয়মিত গজল, ভাঙরা, ভোজপুরি গান করতেন। প্রথম থেকেই তাঁর মধ্যে ঈশ্বরীয় শক্তি বিদ্যমান ছিল। তিনি ৪৬ বছরের সংগীতজীবনে আধুনিক, লোকগীতি, ভক্তিগীতি মিলিয়ে ২০০০ গান রেকর্ড করেছেন। ১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে তিনি নিয়মিত শ্যামাসংগীত রেকর্ড করেছেন এবং তাঁর সুনাম এত হয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা-সহ নানা দেশে প্রবাসী বাঙালি এবং পাঞ্জাবিদের অনুরোধে তাঁকে গান করতে যেতে হয়েছে। তাঁর প্রথম শ্যামাসংগীতের হিট গান গীতিকার শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কোনও দিন শোধ করা যায় রে মায়ের ঋণ’।

শ্যামাসংগীত গেয়ে যাঁরা বাংলার মানুষের মনে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে গায়ক পরীক্ষিত বালা অন্যতম। টি সিরিজ-সহ একাধিক নামী-দামি কোম্পানি থেকে এ যাবৎ তাঁর প্রায় ৪০০-র বেশি শ্যামাসংগীতের রেকর্ড বেরিয়েছে। এ ছাড়া ভক্তিগীতি এবং লোকগীতি মিলিয়ে তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় ২০০০ ছাড়িয়েছে।

পরীক্ষিতবাবুর শৈশবও বেশ চমকপ্রদ। তিনি বলেন, যখন তাঁর বয়স প্রায় ৬ মাস সে সময় এক ডাকাতদল তাঁদের বাড়িতে চড়াও হয়। ১৯৫৬ সাল নাগাদ ডাকাত দলের পাণ্ডা গৌরচন্দ্র বালা তাঁকে তুলে আনে। কেন? কী বৃত্তান্ত, তা পরীক্ষিতবাবু জানেন না। এই ডাকাত বাবার কাছেই নবদ্বীপ এবং বর্ধমান জেলার সীমান্তে বড় কোবলা বিদ্যানগরের বাড়িতে তিনি মানুষ হন। ১৯৭০-৭২ সাল নাগাদ তিনি নানান ফাংশনে ভক্তিগীতি, লোকগীতি গেয়ে বেড়াতেন।সেই সময় টালিগঞ্জ আজাদগড়ে গীতিকার নীলকমল রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ-পরিচয়। এই ত্রয়ী মিলে এরপর গানের রেকর্ড বের করেন। পরীক্ষিত বালার প্রথম দিককার সমস্ত জনপ্রিয় গান নীলকমল রায়, পরিতোষ রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কানু বর্মনের লেখা। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষিতবাবুর মাদার টেরিজা এবং রাজীব গান্ধীর স্মরণে গাওয়া গান দারুণ সাড়া ফেলে। শেষে তাঁর শ্যামাসংগীত বাংলার মানুষের মন জয় করে। তিনি গানের সূত্রে আমেরিকা, বাংলাদেশেও ভ্রমণ করেন। বর্তমানে তিনি উত্তর ২৪ পরগনার দুর্গানগর স্টেশনের কাছে থাকেন।

শ্যামাসংগীতের জগতে আর এক জ্যোতিষ্ক কুমার শানু। হঠাৎ ধূমকেতুর মতো তাঁর আগমন। আর আগমনেই বাজার মাত। ধূমকেতুর সঙ্গে তাঁর তুলনা করার পেছনে কারণ হচ্ছে—তিনি বাংলা এবং বিশেষ করে মুম্বাইতে হিন্দি ছায়াছবির জগতে এতটাই ব্যস্ত এবং সুনাম অর্জন করেছেন যে তিনি শ্যামাসংগীত গাওয়ার জন্য সময় দেবেন বা ইচ্ছাপ্রকাশ করবেন তা ভাবাই যায় না। বোধ হয় শ্যামা মায়েরই ইচ্ছা তাই তাঁর বেশ কয়েকটি শ্যামাসংগীতের রেকর্ড বের হয়েছে। আর সিডি বের হতেই হু-হু করে বিক্রি।

কুমার শানুর পূর্বতন নাম কেদারনাথ ভট্টাচার্য। ১৯৫৭ সালে কলকাতায় জন্ম। ১৯৯০-২০০০, সাল থেকে তাঁর সংগীতজীবন শুরু। তিনি যশরাজ ফিল্ম, টি সিরিজ, সোনি মিউজিক, জি মিউজিক, সারেগামা, ভেনাস রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে সমস্ত জীবনভর কাজ করেছেন। মুম্বাই এবং বাংলার সমস্ত নামকরা (১৯৯০ সাল থেকে) হিরোরা তাঁর কণ্ঠে গান করেছেন। মুম্বাইতে ‘আশিকী’ হিন্দি ছবিতে তাঁর গান সুপার-ডুপার হিট হওয়ার পর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯০-তে আশিকী, ১৯৯১-তে সাজন, ১৯৯২-তে দিওয়ানা, ১৯৯৩ সালে বাজিগর এবং ১৯৯৪ সালে ১৯৪২ আ লাভ স্টোরি ছবির জন্য পরপর পাঁচবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়ে রেকর্ড গড়েন। তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের ছবি তিনকন্যা-য় গান করেন। ১৯৮৯-তে কল্যাণজি-আনন্দজির ছবি হিরো হীরালালে প্লেব্যাক সিঙ্গার ছিলেন। এই ছবিতে তাঁর কপাল খোলেনি। বিখ্যাত গায়ক জগজিৎ সিং তাঁকে কল্যাণজি-আনন্দজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে তাঁর জন্য সংগীতজগতের দরজা খুলে দেন। পরে কল্যাণজি-আনন্দজি তাঁদের জাদুগর ছবিতে তাঁকে গাইবার সুযোগ করে দিলেও তাঁর সৌভাগ্য তেমন বিকশিত হয়নি। এই ছবির হিরো ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। কার্যত আশিকী ছবির গান থেকেই তাঁর সৌভাগ্যের সূচনা। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই সময় থেকে তিনি মেলোডি কিং নামে পরিচিত। এ যাবৎ তিনি ভারতের বিভিন্ন ভাষায় সবথেকে বেশি গান করেন। শ্যামাসংগীতে তিনি রাগা মিউজিক  কোম্পানি-সহ বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানিতে— মা গো মা, তুই না কি মা দয়াময়ী, মায়ের পায়ে জবা হয়ে, আমার সাধ না মিটিলো, বসন পরো মা বসন পরো ইত্যাদি গান ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছে।

গানের জগতে শ্রীকান্ত আচার্য আর একটি নাম। শ্যামাসংগীতে তাঁর নিজস্বতা রীতিমতো সাবলীল। এই গায়কের জন্ম কলকাতায়। তিনি যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীতের ওপর তাঁর দখলদারি প্রশংসনীয়। শুধু গান নয়, তিনি ভালো তবলাও বাজাতে পারেন। তাঁর অনেক অ্যালবাম— মুসাফিরা, স্বপ্ন দেখো তুমি, ভালোবাসি, বৃষ্টি তোমাকে দিলাম, পথের সাথী, এক ঝাঁক পাখি ইত্যাদি। ১৯৯৯ সালে সাগরিকা কোম্পানি থেকে কবি নজরুল ইসলামের লেখা শ্যামা মায়ের গানের অ্যালবাম ‘মা আমার’ বের হলে শ্রীকান্ত আচার্য দ্রুত বাংলার মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নেন।

শ্যামাসংগীতের গীতিকারদের মধ্যে একদিকে রামপ্রসাদ সেন, অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম। দুজনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। কাজী নজরুল সম্পর্কে বাংলার মানুষের কোনও কিছুই অজানা নয়। তবু দু-চার কথা অবশ্য বলতে হবে। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে ভারত এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করেছে। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবে তাঁর নাম ছিল দুখু মিঞা। মাতা জাহিদা খাতুন এবং পিতা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি শৈশবে পিতৃহারা হন। যৌবনে তিনি ভারতের হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। যুদ্ধ শেষ হলে কলকাতায় এসে সাহিত্যচর্চায় যোগদান করেন। ‘বিজলী’ সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা বের হয়। কবি নজরুল কলকাতায় ৩২ কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য অফিসে বসবাস করার পাশাপাশি ‘উপাসনা’ নামক পত্রিকায় তাঁর কাব্য ও সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। এই সময় তাঁর বোধন, আগমনী, খেয়া পারের তরণী ইত্যাদি জ্বালাময়ী কবিতা বের হতে থাকে। তিনি একাধারে কবি-সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক এবং গীতিকার। ইংরেজ আমলে বাংলার বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে তিনি যে সমস্ত কবিতা লেখেন তা ইংরেজ সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। যে কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কবিতা বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি করে রাখেন। শেষ জীবনে তাঁর বাক্‌শক্তি হারিয়ে যায় এবং তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পরে বাংলাদেশের হাসপাতালে তিনি মারা যান।

বিদ্রোহী কবিতার পাশাপাশি তাঁর গান নজরুলগীতি নামে পরিচিত। তাঁর লেখা শ্যামাসংগীত আজও অম্লান এবং জনপ্রিয়।

শ্যামাসংগীতে আর এক জনপ্রিয় শিল্পী রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯২১ সালে উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ায় তাঁর জন্ম। বেঁচে ছিলেন ৯০ বছর। বাংলার পুরাতনী গান এবং ভক্তিগীতি-সহ বেশ কিছু শ্যামাসংগীত গেয়ে তিনি বাংলার সংগীতজগতে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। বৈঠকী গানে নিধুবাবুর টপ্পা শুনিয়ে তিনি শ্রোতাদের মজিয়ে রাখতে পারতেন। তাঁর দাদু যতীন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার গায়ক। দাদুই তাঁকে হাতে ধরে গান শেখান। রামকুমারবাবুর সঙ্গে তৎকালীন সংগীতজগতের মানুষের সঙ্গে দারুণ ওঠাবসা ছিল। যেমন—আঙুরবালা, গহরজান। অন্যদিকে ছবি বিশ্বাস, শিশির ভাদুড়ী, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন তাঁর গানের খুব ভক্ত ছিলেন। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের শ্যামাসংগীতও বেশ জনপ্রিয়।

শ্যামাসংগীতের জগতে আর এক ধ্রুবতারা অনুপ ঘোষাল। তিনি হিন্দি এবং বাংলা ছবির প্লে ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে যথেষ্ট সুখ্যাতি পেয়েছেন। তাঁকে নজরুলগীতির স্বর্ণযুগের গায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর গান খুব পছন্দ করতেন। সত্যজিৎবাবু তাঁর ছায়াছবিতে অনুপ ঘোষালের অনেক গান প্রয়োগ করেছেন। তিনি নজরুলগীতির পাশাপাশি লোকগীতি, আধুনিক বাংলা গান এবং শ্যামাসংগীতের রেকর্ড করেছেন। আশুতোষ কলেজ এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পড়াশোনা। ১৯৪৫ সালে এই গায়কের জন্ম। তাঁর অ্যালবামের মধ্যে বাংলার লোকগীতি, সুবর্ণগোলক, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বিখ্যাত। তিনি গান গেয়ে ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।

শ্যামাসংগীতের আর এক স্বনামধন্য গীতিকার শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫১ সালে টালিগঞ্জের আজাদগড়ে তাঁর জন্ম। ১৯৭০ সাল থেকে গাথানি, অশোকা, কিরণবেয়া মিউজিক হাউজ থেকে তাঁর পরপর রেকর্ড বের হয়। বাউল গোষ্ঠগোপাল দাস, পরীক্ষিৎ বালা, কুমার শানু, শক্তি ঠাকুর, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, অমৃক সিং অরোরা-সহ নামী-দামি শিল্পীরি তাঁর একাধিক গান করেছেন। জানা যায়, ১৯৪৩ সালে শিবপ্রসাদবাবুর উৎসাহে অমৃক সিং অরোরা শ্যামাসংগীতে গান রেকর্ড করেন। তাঁর লেখা—‘কোনও দিন শোধ করা যায় কি রে মায়ের ঋণ’গানটি অমৃক সিং অরোরা দরদ দিয়ে গেয়ে জনপ্রিয়তা পান। শিবপ্রসাদবাবু প্রথম জীবনে গণনাট্য সংঘের অনুমোদিত ‘প্রলেট কাল্ট’ গ্রুপের দায়িত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর লেখা শ্যামাসংগীত অনেক শিল্পীই গেয়েছেন।

শ্যামাসংগীত জগতে এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ‘প্রোজেক্ট মায়া’ নামের এক বাংলা ব্যান্ড। সাধারণত এখনও পর্যন্ত বাংলা ব্যান্ড তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের পছন্দসই খুব ধুমধাড়াক্কা, হইচই মার্কা গান গেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রোজেক্ট মায়া বাংলা ব্যান্ড পরীক্ষামূলকভাবে আশা অডিও কোম্পানির সহযোগিতায় একটি সিডি বের করেছে, যার নাম ‘রামপ্রসাদী’। এই সিডিতে রামপ্রসাদ সেনের লেখা সুরে একাধিক গান রয়েছে একটু আধুনিক ঢঙে। অর্থাৎ তথাকথিত সুরকে খানিকটা মাদকতায় স্পর্শ করে আধুনিক ছোঁয়া লাগানো হয়েছে। যাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন তাঁরা হচ্ছেন ডোডো (রাজর্ষি বর্মন), গিটারে নীলাঞ্জন মুখার্জি, ড্রামে বান্টি (অভিরূপ দাস), স্যাভি (শৌভিক গুপ্ত) কি বোর্ড বাজিয়েছেন। এ ছাড়া পম (প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী), সঞ্জীব সরকার এঁরা সকলে অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেছেন। কণ্ঠস্বরে কৌশিকী চক্রবর্তী। শ্যামাসংগীত জগতে প্রোজেক্ট মায়া অবশ্যই এক চ্যালেঞ্জ।

শ্যামাসংগীতের জগতে এ ছাড়াও আছেন গায়ক বাউল সনাতন দাস, বনশ্রী ঘোষালের মতো শিল্পীরা। আছেন কৃষ্ণেন্দু ভৌমিকের মতো প্রতিভাশালী গীতিকাররা। আছেন মনমোহন সিং, নির্মল মুখোপাধ্যায়ের মতো গায়করা।

তবে শ্যামাসংগীতের গীতিকার হিসেবে রামপ্রসাদ সেন এবং কাজী নজরুল ছাড়াও যে কয়েকজন গীতিকারের নাম দশকের পর দশক ধরে লোকমুখে প্রচারিত, তাঁরা হচ্ছেন গীতিকার দ্বিজেন চৌধুরী (মায়ের পায়ে জবা হয়ে), গীতিকার রামদুলাল নন্দী (সকলি তোমারি ইচ্ছা), গীতিকার কমলাকান্ত চক্রবর্তী (শ্যামা মা কি আমার কালো), তুই না কি মা দয়াময়ী— গীতিকার ও সুরকার শ্রী অভয়।

লেখার শেষে আবার গোড়াকার কথায় ফিরে আসি। মা ও সন্তান—চিরন্তন সেই নাড়ির টান কি অটুট থাকবে? না কি মা-কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে সন্তান দালানকোঠার সুখে মজে থাকবে?

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “শ্যামাসংগীতের কলাকুশলীরা : সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়”

  1. মামুন পারভেজ says:

    তুমি রামপ্রসাদের মা তুমি গদাধরের মা ভক্তিগীতিটি সম্পর্কে কিছু তথ্যের প্রয়োজন। গানটি কে লিখেছেন ও সুর করেছেন? আদিরেকর্ড বা প্রথম কে কত সালে রেকর্ড করেছেন। দয়াকরে জানালে খুব উপকৃত হব।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev