আমাদের পুজো ছেলেবেলায় ছিল এখনও আছে—বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। এখন তো অনেক জাঁকজমক-থিম-কত পুরস্কার। তখন ছিল সাবেকি, ছিমছাম, ভীষণ নিজের। এখন খুঁটিপুজো করে পুজো উদ্বোধন হয়। আমাদের ছোটোবেলায় শুরু হতো মণ্ডপের বাঁশ পোঁতা থেকে, মানে মনে মনে দুগ্গাপুজো। আর যদি অন্যভাবে বলতে হয়, তো, বাবার পুজোর গান তৈরি করার সময় থেকে। মে-জুন মাস নাগাদ শুরু হতো তার আয়োজন। আয়োজন বলতে—কবে এইচএমভি-র রেকর্ডিংয়ের ডেট পাওয়া গেল। ব্যাস, এটুকুই। রেকর্ডিংয়ের ২-৩ দিন আগে গান তৈরির জন্য ডাকা হতো গৌরীকাকু (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার), কখনও পুলককাকু (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়) বা শ্যামল গুপ্তকে। ২টো গান তৈরি হতে লাগল মোটামুটি ২০-৩০ মিনিট। হয় সুর আগে নয়তো কথার ওপর সুর। এত অনায়াসে করতেন, যেন মনে হতো— এরকম করাটা বোধ হয় খুব সহজ!!! কিন্তু নিজে করতে গিয়ে বুঝেছি বা অন্যদেরও দেখেছি, ভীষণ কঠিন। এই অনায়াস ছন্দের জন্য বা ভাবনার জন্য, গানগুলো মানুষের কাছে এত গ্রহণীয় এবং উপভোগ্য। পুজোর কটা দিন ভীষণ হইচই করে কাটতো। বালিগঞ্জ কালচারাল-এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল আমার মামার বন্ধু। সেই সুবাদে তাদেরও যতায়াত ছিল আমাদের বাড়িতে। কলাবউ স্নান করাতে নিয়ে যেত সজল মামা। বরাবর প্রতিমা শিল্পী যতীন্দ্রমোহন পাল। আমরা ছিলাম স্বেচ্ছাসেবক। পুজোর চারদিন খুব ধুমধাম করে কাটতো। একবার পুজোর সন্ধে লোকে লোকারণ্য— মণ্ডপে অজস্র মানুষের ভিড়। পুজো দেখতে এসেছেন আশা ভোঁসলে। খবর এলো বাবার কাছে। বাড়িতেই ছিলেন। আশা আন্টিকে বাড়িতে নিয়ে এলেন বাবা। সঙ্গে আরও বেশ কিছু লোক। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলেন। আমার দিদি (মনোবীণা) আশা ভোঁসলের ভীষণ ভক্ত। তাই শুনে আশা আন্টি, দিদির সাথে খুব গল্প জুড়লেন। দিদির হাত ধরে বেশ কিছু কথা বলেছিলেন বলে দিদি বেশ কিছুদিন হাত ধুতো না। বলতো আমার হাত ধরে আশা ভোঁসলে কথা বলেছে।
একসময়ে বালিগঞ্জ কালচারালের পুজো হতো লেক টেরাসের একটা মাঠে। সেই মাঠকে সবাই মিলে ভারী লোহার হামানদিস্তের মতো লাঠিতে বেঁধে ঠুকে ঠুকে সমান করা হতো। তারপর সেখানে মণ্ডপ তৈরি শুরু হতো। প্রথমে শাল খুঁটি লাগিয়ে বাঁশ বাঁধা হতো। সেই বাঁশের ওপরে আমরা উঠতাম। কে কত ওপরে উঠতে পারে। তারপরে কাপড়ের কুঁচি করে সেলাই করতো কারিগররা। নতুন কাপড়ের গন্ধে মাতাল হয়ে যেতো আঙিনা।
প্রত্যেক বার দশমীর দিনেই প্রতিমা বিসর্জন হতো। বালিগঞ্জ কালচারালের সমস্ত সদস্যরাই ধুতি-পাঞ্জাবি পরতাম। আমরাও পরতাম। প্রসেশন শুরু হতো। রাস্তার দু-ধারের মানুষরা আমাদের ‘জামাইবাবু’ বলতো। তবে বিসর্জন হওয়ার আগে আমাদের বাড়িতে একটা রীতি প্রচলিত ছিল। বাবা-মাকে প্রণাম করে একটা সাদা পাতায় লাল কালি দিয়ে সবাই লিখতাম— ‘শ্রী শ্রী দুর্গা সহায় নমঃ।’ ৯ বার লিখতে হতো। তারপর কিছু মিষ্টি বা প্রসাদ মুখে দিতাম।
বিসর্জনের পরে মনটা কীরকম ফাঁকা হয়ে থাকতো। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর আগেই ২ দিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ১ দিন গানের জলসা আর ১ দিন প্রোজেক্টার লাগিয়ে সিনেমা দেখানো হতো। সেই জলসায় বাংলার সমস্ত শিল্পীরা গান গেয়েছেন। বাবা এর ব্যবস্থা করতেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। পুজোর কটা দিন বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া খুব যে কিছু স্পেশাল হতো বলে মনে পড়ে না। তবে পুজোর পরে আর ক্রিসমাস অর্থাৎ বড়দিনের সময় বাবার এক বন্ধু এবং তাঁর পরিবার এবং আমরা সকলে KIM-WAH Restaurant-এ খেতে যেতাম। বাবা ফোন করে দিতো আগে থেকেই। আমাদের জন্য টেবিল বুক করা থাকতো। আমরা নির্দিষ্ট টেবিলে বসে চাইনিজ ফুড খেতাম। রেস্তোরাঁর খাবার বলতে চাইনিজ ফুড পছন্দ করতেন বাবা। মাঝে মাঝে পাড়ার একটা ছোটো চাইনিজ টেক-অ্যাওয়ে থেকে চিকেন স্যুপ নিয়ে আসতাম। সেটা খুব ভালোবেসে খেতেন। এ ছাড়া বাড়ির খাবারই পছন্দ ছিল। ভাত, ডাল, পোস্ত বা অন্য কোনও তরকারি আর মাছ। মা খুব ভালো দই ইলিশ রান্না করতো। রাতে রুটি আর মাংস। বৃহস্পতিবার নিরামিষ। সেটা এখনও আমার বাড়িতে পালিত হয়।
পুজোর সময় বাড়িতেই থাকতেন বাবা। মাঝে মাঝে কখনও মুম্বাইতে গিয়ে থেকেছেন, তবে সেটা হাতে গোনা কয়েক বার মাত্র। কলকাতাতে থাকতেই পছন্দ করতেন।
সেই সাবেকি পুজোর গন্ধও নেই। বাবা তো চলে গেছেন প্রায় ৩৩ বছর হলো। পড়ে আছে টুকরো টুকরো স্মৃতি। এরপরে বালিগঞ্জ কালচারালের পুজোটা সরে এলো লেক ভিউ রোডের ওপরে। এখন সেখানেই হয়। প্রথম বার, খুব সম্ভবত ১৯৭৬ সালে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো ফার্স্ট প্রাইজ পায়। সেই একবারই মাত্র দশমীর দিন ঠাকুর বিসর্জন করা যায়নি। কারণ, প্রচুর মানুষ খবর পেয়ে আসতে শুরু করে এবং সন্ধ্যাবেলা মাননীয় রাজ্যপাল এ. এল. ডায়াস পুজো দেখতে আসেন। বাবা গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। পরের দিন অর্থাৎ একাদশীর দিন বিসর্জনে বাবাও ধুতি-পাঞ্জাবি পড়ে প্রসেশনে হেঁটেছিলেন।
এখন আর ওই পাড়ায় থাকি না। কিন্তু আমার পুজো বলতে এখনও ওই পাড়ার ছোটোবেলার স্মৃতিই রয়ে গেছে।