বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা, বিশেষত ঘাটাল বন্যাপ্লাবিত। শিলাবতী ও জয়পন্ডা নদীর প্রবল স্রোতের কারনেই এই বিপর্যয়। শিলাবতীর উৎস পুরুলিয়া জেলার হূড়া থানার বড়গ্রাম মৌজার একটি পুকুর! এই গ্রামেই শিলাবতী ও জয়পন্ডার নিত্য পুজো হয় এবং গ্রামবাসীদের মুখে শোনা যায় শিলাবতী নামক প্রাগার্য কন্যা ও তার পালক ব্রাহ্মণ পিতা সম্পর্কে এক অমর কাহিনী।
শিলাবতী নদী (এছাড়া শিলাই নামেও পরিচিত) বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রায় দক্ষিণ-পূর্ব দিকের দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে মিলিত হয়ে পরে রূপনারায়ণ নামে গঙ্গায় মিশেছে।
প্রায় প্রতি বছর শিলাবতী বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে মেদিনীপুরের বাঁকা, ক্ষীরপাই এবং ঘাটাল এলাকায়। খাতড়ার কাছাকাছি শিলাবতী নদীর উপর একটি ছোট জলাধার রয়েছে, যা কদমদেউলী বাঁধ হিসাবে পরিচিত, যেখানে মুকুটমনিপুর কংসাবতী বাঁধ থেকে একটি খাল জুড়েছে।
পুরুলিয়ায় ও সংলগ্ন বাঁকুড়া জেলায় শিলাবতী নদী ছোট নদী হিসাবেই পরিচিত, কেবলমাত্র বর্ষাকালেই নদীটি জলে ভরে ওঠে ও বন্যার কারণ হয়। বাঁকুড়া জেলার ইন্দপুর, হাতিরামপুর, তালডাংরা, সিমলাপাল, ভূতশহর-এর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেদিনীপুর জেলায় প্রবেশ করেছে।
মেদিনীপুরে এই নদী ৬৯ মাইল দীর্ঘ।

লোককাহিনীর শিলাবতী
শিলাবতী ও জয়পন্ডা নদী— এই দুটি চরিত্রকে অবলম্বন করে আজও পুরুলিয়া, বাঁকুড়ায় প্রচলিত আছে এক লোককাহিনী। শিলাবতী ছিল এক প্রাগার্য কন্যা। সে থাকতো জয়পন্ডা নামক এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে। শিলাবতী তাকে জল এনে দিত, বাসন মেজে দিত, রান্নাও করে দিত। অন্তজ হলেও ব্রাহ্মণ জয়পণ্ডা শিলাবতীকে মেয়ের মতই স্নেহ করতেন।
একবার মকর সংক্রান্তিতে ব্রাহ্মণ মনস্থ করলেন তিনি গঙ্গা স্নানে যাবেন। শিলাবতী জেদ ধরল সেও যাবে গঙ্গা স্নানে। তখনকার দিনে গঙ্গা স্নান করতে যাওয়া ছিল অগস্থ্য যাত্রার মতই। পথঘাট বিপদসঙ্কুল। ডাকাতের ভয়, বন্য জন্তুদের ভয়ও ছিল। জয়পন্ডা কিছুতেই শিলাবতীকে সঙ্গে নিতে রাজী হলেন না। দুদিন উপোস দিয়েও শিলাবতী পালক পিতার মন গলাতে পারল না। যাওয়ার দিন সকালে শিলাবতী জয়পন্ডার হাতে একটা পুঁটলি দিয়ে বলল, আপনি এই পুঁটলি গঙ্গা মা-কে উৎসর্গ করবেন।
তাই হবে। এক শিষ্যকে শিলাবতীর দায়িত্ব দিয়ে তিনি গঙ্গা যাত্রা করলেন। পথে যেতে যেতে রাত গভীর হলে ক্লান্ত জয়পন্ডা জঙ্গলের মাঝেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময় একদল ডাকাত আক্রমণ করল জয়পন্ডা ও তাঁর সঙ্গীদের। ব্রাহ্মন পুঁটুলিটা বুকে জড়িয়ে মা গঙ্গার নাম করতে লাগলেন। ডাকাতরা ভয়ে পালিয়ে গেল। ভোর হলে আবার শুরু হল পথ চলা। এবার তাদের সামনে হাজির এক চিতাবাঘ। আর বোধহয় রক্ষা হলনা। জয়পন্ডা ওই পুঁটলি বুকে জড়িয়ে মা গঙ্গার নাম করতে লাগলেন। বাঘ গুটি গুটি চলে গেল।
কি আছে এই পুঁটলি তে? কি এর মাহাত্ম্য ?

এইভাবে তারা এসে পৌঁছলেন গঙ্গার তীর। শিলাবতীর কথা মনে এল তাঁর। তিনি ভক্তি ভরে ওই পুঁটলি ছুঁড়ে দিলেন গঙ্গার বুকে। হঠাৎ দেখলেন দুটি শ্বেতশুভ্র হাত ওই পুঁটলি নিয়ে গঙ্গার জলে লীন হয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে ব্রাহ্মণ জয়পন্ডার দুচোখ বেয়ে আনন্দশ্রু ঝরতে লাগল। মনে প্রশ্ন এল কে এই শিলাবতী ?
বার বার মনে হল শিলাবতীর দেওয়া পুঁটলি বার বার তাদের জীবন রক্ষা করেছে। কেন? কি ছিল পুঁটলি তে ? তিনি ছুটলেন বাড়ির পথে।
বাড়ি পৌঁছেই খোঁজ করলেন শিলাবতীর। শিলাবতী তখন পুকুর থেকে জল নিয়ে আসছেন কুটীরে। পথেই জয়পন্ডা মা মা বলে শিলাবতীর পা ছুঁতে গেলেন। শিলাবতী পিছু হটছেন, এ আবার হয় নাকি, তার পালক পিতা তাকে প্রণাম করলে যে অধর্ম হবে! তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে শিলাবতীর হাত থেকে জলপূর্ণ কলস মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে গেল। জলের ক্ষীণ ধারা স্রোতের আকারে এগিয়ে চলল। শিলাবতীও ছুঁটতে লাগলেন। শিলাবতীকে উদ্দেশ্য করে ছুটছেন জয়পন্ডাও। ছুটতে ছুটতে একসময় শিলাবতী সেই জলধারায় হারিয়ে গেলেন। জয়পন্ডা আর শিলাবতীর দেখা পাচ্ছেন না। না এভাবে হবেনা। তিনি কমন্ডুলের মন্ত্রপূত জল থেকে জলধারা সৃষ্টি করে ধাবিত হলেন শিলাবতীর জলধারার দিকে। অবশেষে মেদিনীপুরের কাছে উভয়ের মিলন হল। উভয়ের মিলিত স্রোত এগিয়ে চলল গঙ্গার উদ্দেশ্যে।

আরেকটি লোকশ্রুতি অন্যতর কাহিনীর কথা বলে। এই কাহিনী আছে যে শিলাবতীকে পুরন্দর নামের এক ব্রাহ্মণকে ভালোবাসতেন। ব্রাহ্মণ রোজ শিলাবতীকে স্নান করে কলসী করে জল নিয়ে যেতে দেখতেন। একদিন পুরন্দর শিলাবতীকে তার সাথে মিলিত হওয়ার আহ্বান জানান। তখনই শিলাবতীর মাথার কলসী ফেটে যায়। পুরন্দর নদী হয়ে স্বামী হিসেবে শিলাবতীতে মিলিত হন।
একালেও মানুষ এই লোককাহিনী স্মরণ করেন। হুড়া ব্লকের বড়গ্রামের কাছে শিলাবতীর উৎসস্থলে পুকুরপাড়ে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিলাবতীর মন্দির। প্রতিদিন পূজিত হন শিলাবতী। পৌষ সংক্রান্তিতে বিশাল মেলা বসে এখানে। শিলাবতী ও তাঁর পালক পিতা জয়পন্ডা লোক-স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন।