একদিকে করোনা আতঙ্ক অন্যদিকে তাকে রুখতে টানা লকডাউনে মানুষের দুর্গতির শেষ নেই। এই সময় নানভাবে বিপর্যস্ত মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তাদের সেই সহযোগিতাই আজ মানুষের বেঁচে থাকার সম্বল। এমনই একজন মানুষ উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি এলাকার ১৪ নং ওয়ার্ড কোয়ার্ডিনেটার শ্রাবনী দত্ত।
তাঁর ওয়ার্ডের বহু মানুষ লকডাউনে কাজ হারিয়ে বেকার। কিভাবে পরিবারের মানুষের পেট ভরাবেন ভাবতে না পেরে শ্রাবনীদেবীর সরনাপন্ন হয়েছেন। কারও ব্যবসা লাটে উঠেছে। কিংবা কারখানা বন্ধ হওয়ায় এক বছর ঘরে বসে আছেন, তিনিও সাহায্যের আশায় এসেছবেন। সবার ক্ষেত্রেই সেই একই প্রশ্ন কিভাবে চলবে সংসার। নিজের এলাকার এইসব মানুষের দুর্দশা দেখে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন নি শ্রাবণীদেবী। কিভাবে কি করা যায়; তার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়।

তনিমা ঘোষ
শুরু করেছিলেন নিজের ঘর থেকে যতটা সম্ভব সাহায্য দিয়ে। কারণ বহু মানুষ সরাসরি চলে এসছেন তাঁর বাড়িতে। তাদের খালি হাতে ফেরাতে পারেন নি। অন্যদিকে শিলিগুড়ি পুরসভা থেকে ঠিকমত সাহায্যই পাননি তিনি। কিন্তু পিছিয়ে না গিয়ে চেষ্টা করেছেন। তাঁকে এই কাজে সহযোগিতা করেছেন ওই ওয়ার্ডের সেক্রেটারি বিশ্বময় ঘোষ। এরপর তাঁরা দুজনে মিলে যতটা সম্ভব টাকা যোগার করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন।
এখন তার ৭০ উর্দ্ধ মানুষ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য টিকার ব্যাবস্থা করছেন। প্রচুর মানুষ আসছেন ভ্যাকসিনের খোঁজ নিতে আসেন তাঁর কাছে, যাতে তাঁরা ঠিকমতো ভ্যাকসিন পান তার চেষ্টা চালাচ্ছেন শ্রাবনী দত্ত।
অন্যদিকে শিলিগুড়ির কলেজপাড়ার গৃহবধু তনিমা ঘোষ পেশায় শিলিগুড়ির একটি মহাবিদ্যালয়ে কাজ করলেও তাঁর নেশা মানুষের সেবা করা। তিনিও এই করোনাকালে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। নিজের সামান্য সম্বল থেকেই মানুষের হাতে সাহায্য তুলে দিচ্ছেন। লকডাউনে কাজ হারিয়ে বহু মানুষ প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন প্রতিদিনের খাবার যোগার করতে পারছেন না। তনিমাদেবী জানালেন বাড়িতে রোজ বহু মানুষ আসছেন সাহায্যের আশায়, তাদের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। এছাড়া প্রচুর সংস্থা আছে যারা এইসব কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের কাছে গিয়ে নিজের সাধ্যমত প্রয়োজনীয় জিনিস পৌছে দিচ্ছেন।

পেশায় স্কুল শিক্ষিকা সুনন্দা সরকার, তিনিই এখন অন্য ভূমিকায়। প্রতিদিন কয়েকশো লোকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। মে মাস থেকে শুরু করেছেন। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার সময় থেকে। এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন দুপুর ১:৩০টায় উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছলে দেখা যাবে তাঁকে। হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসা করোনা-সহ অন্য রোগে আক্রান্তদের পরিবারের দুপুরের খাবারের ভরসা বলতে “দিদিমণির ক্যান্টিন”!
টোটোতে খাবার নিয়ে চলে আসেন শিলিগুড়ির হায়দরপাড়া জিএসএফপি স্কুলের এই শিক্ষিকা। শুরুতে বাড়ি থেকেও এসেছিল চাপ। কোভিডের মোকাবিলায় যখন ঘরবন্দি থাকার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য দপ্তর, তখন মেডিকেলে ছুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা এসেছিল পরিবার থেকে। তখন ক্রমেই বাড়ছিল সংক্রমণ। সঙ্গে মৃতের সংখ্যাও। কিন্তু দমানো যায়নি তাঁকে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে নেমে পড়েছিলেছন তিনি। কারণ; মেডিকেলের আশপাশের সব হোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীর আত্মীয়রা কি খাবেন? ওদের পাশে দাঁড়াতেই “দিদিমণি”র এই উদ্যোগ।
নিজের ঠাকুমা প্রয়াত আশালতা দত্তের নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরী করে নেমে পড়েছেন। ‘আশালতা ফাউণ্ডেশন’-ই এখন উত্তরবঙ্গ মেডিকেলের কয়েকশো রোগীর আত্মীয় এবং কিছু স্বাস্থ্য কর্মী থেকে এম্বুলেন্স চালকদের দুপুরের খাবারের ভরসা। প্রতিদিন রান্না করা খাবার নিয়ে মেডিকেলে চলে আসেন ‘দিদিমণি’। মেনুতে থাকে কোনও দিন ফ্রায়েড রাইস, চিকেন। আবার ডিম-ভাত থেকে সোয়াবিন বা অন্য কোনও সবজি। সঙ্গে পেয়ে যান সংগঠনের কয়েকজনকে।