উদ্ধারকারী দলের ১২ দিন কেটে গেলেও আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার না হওয়ায় আরও উদ্বেগ বাড়ল পরিবারগুলোর। উল্লেখ্য, গত ১২ নভেম্বর ৪১ জন শ্রমিক উত্তর কাশীতে টানেলের সুড়ঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ধসের কবলে পড়ে আটকে পড়েন। হুগলির পুরশুড়া ব্লকের ২ জন শ্রমিকও এদের মধ্যে আছেন। উদ্ধারকারী দল বৃহস্পতিবার আশা করেছিল সকলকে উদ্ধার করে বের করে আনবেন। শ্রমিক পরিবারগুলো আশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যায় উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়নি। উৎকণ্ঠা ও নিরাশায় পথ চেয়ে বসে আছেন ৪১টি পরিবারের সদস্যরা।
পুরশুড়ার আটকে পড়া শ্রমিক জয়দেব প্রামানিকের বাবা তাপস পরামানিক জানান, আজ অর্থাৎ বৃহস্পতিবার প্রশাসনের আশায় ছেলে ফিরে আসবে ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। কিন্তু খবর পেলাম আজও উদ্ধার হয়নি। এই ব্লকের সোদপুর গ্ৰামের আর এক শ্রমিক শৌভিক পাখিরা একইভাবে আটকে আছেন। শৌভিকের মা লক্ষ্মী পাখিরা বলেন, ১২ দিন হয়ে গেল। এখনও উদ্ধার হল না আমার ছেলে। একদিনও ঘুমোতে পারিনি। আজ বড়ো আশা করেছিলাম।
এদিকে প্রশাসনিক সূত্রে খবর, আটকে পড়া ৪১ শ্রমিক সবাই সুস্থ আছেন। এর মধ্যে ৩ জন বাংলার শ্রমিক। প্রসঙ্গত, আর মাত্র ১২ মিটার। সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারলেই সিল্কিয়ারায় আটক ৪১ জন শ্রমিকের কাছে পৌঁছে যাবেন উদ্ধারকারীরা। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যায় উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটল। দীর্ঘ ১২ দিন পর সুড়ঙ্গে আটকদের উদ্ধার শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই শ্রমিকদের বের করে আনা যাবে বলে আশাবাদী প্রশাসন। শ্রমিকরা যেখানে আটকে রয়েছেন, গত মঙ্গলবার তার প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে এগনোর কাজ শুরু করে মার্কিন ড্রিল মেশিন অগার। সিল্কিয়ারা প্রান্ত থেকে চব্বিশ ঘণ্টারও কম ব্যবধানে ধ্বংসস্তূপ ফুঁড়ে ২৮ মিটারের বেশি এগিয়েছে এই মেশিন। একেবারে নাগালের মধ্যে চলে এসেছেন আটকরা।
উত্তরাখণ্ডের সড়ক এবং পরিবহণ দপ্তরের প্রবীণ আধিকারিক মহম্মদ আহমেদ বলেন, ‘আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, ধ্বংসস্তূপের ৪৫ মিটার খনন সম্পূর্ণ হয়েছে। আর মাত্র ১২ মিটার বাকি। কোনও বাধা না পেলে খুব শীঘ্রই সুড়ঙ্গের বাইরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে শ্রমিকদের। ‘তাঁদের জন্য ঘটনাস্থলে ইতিমধ্যেই বন্দোবস্ত করা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স এবং উদ্ধারকারী বিমান। ২১ জন এনডিআরএফ কর্মী অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে টানেলে ঢুকেছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে এই সামান্য ব্যবধান অতিক্রমকেই সবচেয়ে কঠিন বলে মানছেন বিশেষজ্ঞরা। আহমেদ বলেন, ‘ড্রিল করতে সময় লাগছে না। তবে ড্রিলের পর সুড়ঙ্গ সিল করাই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা করতেই সময় লেগে যাচ্ছে।’
উল্লেখ্য, এই খননের পরই আরও ২১ মিটারের ছ’ ইঞ্চি পাইপ এগিয়ে গিয়েছে শ্রমিকদের দিকে। তবে ড্রিলিংয়ের সময় পদে পদে বাধা আসছে বলে আহমেদ জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁর কথায়, গত বুধবার ভোরে খনন শুরুর পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি লোহার রড পাওয়া যায়। তবে তাতে কোনও ক্ষতি হয়নি। গত সপ্তাহ থেকেই উদ্ধারকাজে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে অগারকে। মাঝে একটি বোল্ডার এসে পড়ায় তিনদিন অগারের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। তাছাড়া সুড়ঙ্গের ছাদে ফাটলও দেখা দেয়। তবে উদ্ধারের কাজে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ভূমির গঠন সবই প্রতিকূল। তাই বিকল্প পদ্ধতিতেও আটক শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ওএনজিসি-ও উদ্ধারের কাজে হাত লাগিয়েছে। পাহাড়ের মাথা থেকে উল্লম্বভাবে ড্রিল করে শ্রমিকদের বার করার চেষ্টা চালাচ্ছে ওএনজিসি। তাছাড়া প্রস্তাবিত সুড়ঙ্গের বারকোট প্রান্ত দিয়েও ড্রিলিং চলছে। শ্রমিকদের থেকে এই অংশের দূরত্ব প্রায় ৫০০ মিটার। ইতিমধ্যে বারকোটের দিকে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। সেদিক থেকে প্রায় ৮ মিটার সুড়ঙ্গ খনন সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, আটক শ্রমিকদের উদ্ধার নিয়ে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে আর এক দফা আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করণ মাহারা এবং স্থানীয় বিধায়ক প্রীতম সিং। প্রীতমের অভিযোগ, খননের নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয়নি। নিয়ম মানা হলে, এমন ঘটনা ঘটত না। নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, নির্মীয়মান সুড়ঙ্গটি ‘ চারধাম প্রকল্প ‘- র অংশ। যা বদ্রীনাথ,কেদারনাথ, যুমোনেত্রী ও গঙ্গোত্রীর হিন্দু তীর্থস্থানগুলোকে একই রাস্তা দিয়ে জুড়বে। এটি একটি বিতর্কিত প্রকল্প বলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।এই প্রকল্পটি আকস্মিকভাবে ভূমি ধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। যা ইতিমধ্যে এখানে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছবিতে শভিক পাখিরাকে দেখা যাচ্ছে।