ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilization বা IVC) এক অনন্য বিস্ময়। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত এই নগরসভ্যতা কেবল নগর পরিকল্পনা, বাণিজ্য, সেচ ব্যবস্থা ও কারুশিল্পেই নয়, বরং পাঠোদ্ধার না হওয়া সিন্ধুলিপির কারণে আজও তা গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, লোথাল, ধোলাভিরা, গণেরিওয়ালা, কালীবঙ্গান ইত্যাদি নগরের মতোই সুতকাগেনদর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী, যা আজকের পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত। এটি মূলত মাকরান উপকূলে আরব সাগরের ধারে এক সময়কার বাণিজ্যকেন্দ্র।
সুতকাগেনদরের বিশেষ গুরুত্ব হলো, এটি ছিল সিন্ধুসভ্যতার সবচেয়ে পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত নগর—ইরান সীমান্তের খুব কাছাকাছি। ফলে ধারণা করা যায়, এখানে সিন্ধুসভ্যতার মানুষদের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সভ্যতাগুলির (যেমন মেসোপটেমিয়া, এলাম বা পারস্যের প্রাথমিক সংস্কৃতি) প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটেছিল। আর এই যোগাযোগের প্রেক্ষিতে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ অনুমান করেছেন যে, একটি দ্বিভাষিক শিলালিপি বা দলিল হয়তো কখনো সুতকাগেনদরে আবিষ্কৃত হতে পারে।
এমন আবিষ্কার হলে তা নিঃসন্দেহে সিন্ধুলিপি পাঠোদ্ধারে মাইলফলক হবে, যেমন রোজেটা স্টোনের প্রাপ্তিতে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফের পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিল। সুতকাগেনদরের ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্যিক গুরুত্ব, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, সিন্ধুলিপির বর্তমান গবেষণা ও সম্ভাব্য দ্বিভাষিক লিপি আবিষ্কারের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করলে ভবি ভুলবে না। অ্যাকাডেমিক গবেষকরা বড় বড় পত্রিকায় জ্ঞানগর্ভ সন্দর্ভ লিখে আর সেমিনারে বক্তৃতা দিয়েই খালাস! মূল বিষয় তথা সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার নিয়ে মৌলিক কাজে তাঁদের বড়ই অনীহা।

সুতকাগেনদরের অবস্থান ও ইতিহাস
সুতকাগেনদর অবস্থিত বেলুচিস্তানের দাশত নদীর মোহনায়, গওয়াদার ও পানজগুর জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে দেখা গেছে এটি একটি সুরক্ষিত দুর্গনগর ছিল, যার চারপাশে ছিল উঁচু প্রাচীর। প্রাচীনকালে এটি ছিল সমুদ্রের কাছেই, অধুনা সমুদ্রতট অনেকটা পিছিয়ে গেছে।
এই নগরটির অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : —
১. পশ্চিমে ইরান মালভূমি ও পারস্য উপত্যকা,
২. পূর্বে সিন্ধুসভ্যতার কেন্দ্রীয় অঞ্চল,
৩. দক্ষিণে আরব সাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ।
এই অবস্থান সুতকাগেনদরকে এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবন্দর হিসেবে গড়ে তোলে। খননকার্যে পাওয়া মনুষ্যনির্মিত কাঠামো, গুদামঘর, ইটের প্রাচীর প্রভৃতি তার সাক্ষ্য দেয়।
সিন্ধুসভ্যতার লিপি সমস্যার সংক্ষিপ্ত পরিচয়
সিন্ধুসভ্যতার অন্যতম রহস্য তার অপাঠিত লিপি। প্রায় চার হাজারের বেশি সিলমোহর ও খোদাই পাওয়া গেছে, যেখানে সাধারণত ছোট ছোট চিহ্ন (৪–৬ অক্ষরের গড় দৈর্ঘ্য) দেখা যায়।
বিভিন্ন গবেষক এই লিপিকে—
হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য দ্বিভাষিক দলিল না পাওয়ায় এখনো পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি।
দ্বিভাষিক শিলালিপির গুরুত্ব
লিপি পাঠোদ্ধারের ইতিহাসে দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক দলিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই, যদি কখনো সুতকাগেনদরে সিন্ধু লিপির পাশাপাশি এলামাইট, আক্কাদীয় বা প্রাচীন পারসিয়ান লিপি সম্বলিত কোনো দলিল পাওয়া যায়, তবে তা রোজেটা স্টোনের সমতুল্য ভূমিকা পালন করবে।
সুতকাগেনদর ও মেসোপটেমিয়ার যোগাযোগ
সুতকাগেনদরের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে—
ফলে অনুমান করা যায়, সুতকাগেনদরে বাণিজ্য চুক্তি, হিসাবনিকাশ বা শুল্ক আদায়ের জন্য দ্বিভাষিক নথি ব্যবহার হত।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারসমূহ
যদিও এখন পর্যন্ত সুতকাগেনদর থেকে সরাসরি দ্বিভাষিক দলিল পাওয়া যায়নি, তবুও —
১. সিলমোহর — সিন্ধুলিপির চিহ্নযুক্ত সিল পাওয়া গেছে, যার কিছু বিদেশি শৈলীর প্রভাব বহন করে।
২. শাঁসের সামগ্রী — উপকূলবর্তী বাণিজ্যের প্রমাণ।
৩. ইটের প্রাচীর — দুর্গনগর প্রতিরক্ষার ইঙ্গিত দেয়।
৪. গুদামঘর — বাণিজ্যকেন্দ্রের সরাসরি প্রমাণ।
এইসব উপকরণ ইঙ্গিত দেয় যে, এখানে বাণিজ্যিক প্রশাসনিক দলিল থাকার কথা, যা হয়তো ভবিষ্যতের খননে প্রকাশ পাবে।

দ্বিভাষিক লিপির সম্ভাব্য উৎস
সুতকাগেনদরে যদি দ্বিভাষিক শিলালিপি পাওয়া যায়, তবে কোন ভাষা এর সঙ্গী হতে পারে?
১. এলামাইট লিপি — সুতকাগেনদরের পশ্চিমে ইরানের এলাম সভ্যতা ছিল। বাণিজ্যে তাদের ঘনিষ্ঠতা থাকায় এলামাইট সম্ভাব্য প্রার্থী।
২. আক্কাদীয়/সুমেরীয় কিউনিফর্ম — মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ছিল নিবিড়। তাই কিউনিফর্ম শিলালিপি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. প্রাচীন ইরানি লিপি — যদিও সময়কাল কিছুটা পরে, তবে স্থানিক নৈকট্যের কারণে একে বাদ দেওয়া যায় না।
পাঠোদ্ধারে সম্ভাব্য ফলাফল
যদি সুতকাগেনদরে দ্বিভাষিক দলিল আবিষ্কৃত হয়, তবে—
প্রত্নতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ
তবে দ্বিভাষিক লিপি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে:
১. সুতকাগেনদরের বড় অংশ এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বালুচিস্তানের দুর্গম অঞ্চলে।
২. রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি খননকাজ কঠিন।
৩. সাগরের তটরেখা পরিবর্তিত হয়ে অনেক নিদর্শন হয়তো বিলীন হয়েছে।
৪. এখন পর্যন্ত পাওয়া নিদর্শন সীমিত, তুলনামূলকভাবে হরপ্পা বা ধোলাভিরার মতো সমৃদ্ধ নয়।
তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
মিশর, মেসোপটেমিয়া ও এলামের মতো সভ্যতাগুলি নিজেদের লিপি বহির্জগতে প্রচার করেছিল। কিন্তু সিন্ধুবাসীরা সম্ভবত সীমিত চিহ্ন ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন, এবং তাদের লিপি মূলত প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক কাজে সীমাবদ্ধ ছিল।
তাই, দ্বিভাষিক দলিল পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বন্দরনগর সুতকাগেনদরের মতো স্থানে। কারণ এখানে বিদেশি বণিকদের জন্য স্থানীয় লিপির পাশাপাশি তাদের বোধগম্য লিপি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ছিল।
সুতকাগেনদর হলো সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এক অনন্য বন্দরনগরী, যা মেলুহা-মেসোপটেমিয়া বাণিজ্যের প্রধান সেতুবন্ধন ছিল। এর ভৌগোলিক অবস্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এবং বিদেশি সভ্যতার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ—সবই ইঙ্গিত দেয় যে, এখানে কখনো না কখনো দ্বিভাষিক শিলালিপি বা দলিল বিদ্যমান ছিল।
যদি ভবিষ্যতের খননকার্যে এ ধরনের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বিশ্ব প্রত্নতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে রোজেটা স্টোনের সমান গুরুত্ব পাবে। তখন সিন্ধুসভ্যতার রহস্যময় লিপি পাঠোদ্ধার হবে, উন্মোচিত হবে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নগরসভ্যতার ভাষা, সাহিত্য ও মনন।
তবে আমাদের তথাকথিত সিন্ধুসভ্যতা-বিশেষজ্ঞরা নিজেদের রিসার্চ পেপারের সংখ্যা বাড়াতেই ব্যস্ত। স্ট্যালিনীয় উপঢৌকন বাগানোর তালে আছেন অনেকে। তাই নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ কেই বা করতে চায়! ঘরের খেয়ে বনের মোষ চরাতে তাঁদের বয়েই গেছে!