গণ-আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার নাটক। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের গণ-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বেশ কিছু নাটক। তবে সেগুলো মূলত পথনাটক। আর তা শুধু রচিতই হয়নি, অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে আন্দোলনকেও প্রভাবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা পথনাটক চর্চার ধারা লক্ষ করলে দেখা যায় স্বাধীনতাপূর্ববর্তী সময় থেকেই তা বামপন্থীদের প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন সেই ধারায় ব্যতিক্রম। কারণ তখন থেকেই পথনাটকে ভিন্ন ভিন্ন স্বর উঠে আসতে লাগল। নাটকের মতো শক্তিশালী গণমাধ্যমে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম উঠে আসায় তৎকালীন রাজ্য সরকার বেশ কিছু নাটকের অভিনয়ে বাধার সৃষ্টি করে। যেমন জর্জ অরওয়েল-এর ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’-এর কাহিনি নিয়ে অর্পিতা ঘোষ ‘পশুখামার’ নাটক অভিনয় করে জনমানসে সাড়া জাগাতে সচেষ্ট হলে সরকারের রোষদৃষ্টি ওই নাটকের ওপর বর্ষিত হয়। এই নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ না থাকেলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধী কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছে। আর সেটা শাসকের দৃষ্টি এড়ায় নি। এতদিন পর্যন্ত যেটা বামপন্থীদের এবং কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এটাকে ব্যবহার করলেও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই প্রথম বামপন্থীদের বিরুদ্ধে দক্ষিণপন্থীরা প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে পথনাটককে বেছে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণপন্থীদের যারা নীতিগতভাবে সমর্থন করে না তারাও বামফ্রন্টের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, শিল্পায়নের পক্ষে এবং শিল্পপণ্ডকারীদের বিপক্ষেও অনেকেই নাটক রচনায় ব্রতী হয়েছেন। নাটকের পসরা নিয়ে পথে নেমেছেন। আসলে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ফলে পথনাটকে বহুমাত্রিক স্বর ধ্বনিত হয়ে উঠেছে।
তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬) ও নকশালবাড়ি আন্দোলনকে (১৯৬৭-৭২) কেন্দ্র করে বেশ কিছু নাটক রচিত হলেও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মতো নাটকে এতটা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অনিল ঘোষের ‘নয়ানপুর’ নাটকটি সাড়া জাগাতে সচেষ্ট হয়েছে, তেমনই নকশালবাড়ি আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও নাটক রচিত ও অভিনীত হয়েছে। কিন্তু পক্ষে-বিপক্ষের চাপানউতোর দানা বাধেনি। সবই আন্দোলনের সপক্ষে সওয়াল করেছে। কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন একুশ শতকের সূচনা দশকে বাংলা নাটক বিশেষত পথ নাটকে বহুমাত্রিক স্বর যেভাবে উঠে এসেছে তা বিস্ময়কর। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের গণ-আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে পথনাটক। সরকারি উদ্যোগে হুগলির সিঙ্গুরে জোর করে কৃষকের বহু ফসলি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আন্দোলন ও পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে সালিম গোষ্ঠীর জন্য জমি অধিগ্রহণের ঘোষণার বিরুদ্ধে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আন্দোলন জনমানসে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। জমি হারানোর আতঙ্কে ভুগতে থাকা মানুষকে সচেতন করতে ও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শাসকের জমি অধিগ্রহণের নামে শাসকের অত্যাচারের প্রতিবাদে ‘জন সংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ্ দি অপ্রেসড্’১ নামক নাট্য গোষ্ঠী সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে গিয়ে প্রথম পথ নাটকের মাধ্যমে প্রতিবাদে সামিল হন। ২০০৭-এর সূচনাতেই যে নাটকটি করেন তার নাম ‘উন্নয়ন?’। আবার কলকাতার পিপলস অডিও থিয়েটার বিখ্যাত নাট্যকার অমল রায়ের ‘সিঙ্গুরের গুড়’(বহুমত পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৭) নাটকটি প্রযোজনা করে ২০০৬ এর ২৮ ডিসেম্বর। ড. সেখ জাহির আব্বাস এটিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম বিষয়ক প্রথম পথ নাটক বলে অভিহিত করেছেন।২ অমল রায়ের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কেন্দ্রিক অন্য একটি নাটক হল ‘উন্নততর লাশ বিপণি’ (প্রথম প্রকাশ : নতুন পথ এই সময়, শারদ ২০০৭)। এছাড়াও অমল রায়ের ‘নাট্যসংগ্রহ– ১৮’-এ সংকলিত ‘মাতৃগর্ভের লজ্জা’ ও ‘ঘরে ফেরার অন্য গল্পে’ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সেই সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. অচিন্ত্য বিশ্বাস কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের পক্ষে কয়েকটি পথ নাটক রচনা করেন। সেগুলি হল ‘নন্দীগ্রাম’ (পরে পরিমার্জিত হয়ে ‘অন্যদিন’), ‘বিজয় উৎসব’ ও ‘গ্রামশহর’। ২০০৮-এ ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার ৪২ বর্ষঃ ২য়-৩য় সংখ্যায় ব্রাত্য বসু সম্পাদিত ক্রোড়পত্র ‘পাঁচটি পথ নাটিকা’র মধ্যে তিনটিতেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সেগুলি হল, অর্পিতা ঘোষের ‘সহজ প্রশ্নের বর্ণমালা’, ব্রাত্য বসুর ‘কমরেড কথা’, রানা সরকারের ‘ওম্ শান্তি ওম্’। প্রতিটি নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঝরে পড়েছে। তবে সরাসরি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে নাটক খুব বেশি না হলেও একেবারেই কম নয়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে গিয়ে মানিক মণ্ডলের ‘বাজে থিয়েটার’ গ্রুপ ‘মা মাটি মানুষ’, ‘বুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ প্রভৃতি নাটক অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনগণকে সচেতন করায় ব্রতী হয়েছেন। অন্যদিকে নাট্যকার চন্দন সেনের ‘শহিদ শিখর’ নাটকে উঠে এসেছে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ। এছাড়াও নির্মল ব্রহ্মচারীর ‘গণ-ধিক্কার’, শচীন মান্নার ‘একশ চুয়াল্লিশ’, ‘লাশকাটা ঘরে’ প্রভৃতি নাটকেও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের কথা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে শিল্পায়নের পক্ষে তথা আন্দোলনের বিপক্ষের কথাও পথনাটকে তুলে ধরতে অনেকে এগিয়ে এসেছেন। এ-বিষয়ে প্রদীপ চক্রবর্তীর ‘আপনপর’ (‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর,২০০৭), রতন ভট্টাচার্যের ‘পরাণ মণ্ডলের গল্প’ (‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৭), শিবংকর চক্রবর্তীর ‘আমরা শান্তির সাথে’ (‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৭), সুখেন্দু বেরার ‘রক্তে ভেজা মাটি’ (‘গণনাট্য’,মার্চ-এপ্রিল, ২০০৮), অভিজিৎ চ্যাটার্জির ‘ভুলভুলাইয়া’, শঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘উল্টোপুরাণ পালা’, জয়ন্ত চক্রবর্তীর ‘লাইট হাউস’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নাটকগুলিতে শিল্পায়নের পক্ষের মত উঠে এলেও এগুলি সেভাবে জনমানসে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনমানসে সাড়া জাগানোর প্রয়াস লক্ষ করা যায় না। অন্যদিকে আন্দোলনের পক্ষের নাটকগুলি অভিনয়ের মাধ্যমে জনমানসে সাড়া জাগানোয় সফল হয়ে উঠেছে।
বুকভরা বিপ্লবের আগুন নিয়ে যিনি বাংলা নাট্য জগতে প্রবেশ করেছিলেন, তিনি নাট্যকার অমল রায়। তাঁর নাটকগুলি লক্ষ্যভেদী বাণের মতোই সমাজের শোষক-শাসক শ্রেণিকে বিদ্ধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নকশালবাড়ির উত্তাল সময়ে তিনি যেমন নাটকের মধ্যে দিয়ে গণচেতনার বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছেন, তেমনই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও সোচ্চারে নাটককেই হাতিয়ার করেছেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের পক্ষে কয়েকটি নাটক তিনি রচনা করেছেন। শুধু রচনাই নয়, অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনমানসে প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছেন। তবে সেগুলি সবই পথনাটক। এবিষয়ে তাঁর ‘সিঙ্গুরের গুড়’ নাটকটির কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। তপন দাস ওরফে অমল রায়ের এই নাটকটি পিপলস অডিও থিয়েটারের প্রযোজনায় তালতলা সংহতি উদ্যোগের সভায় ২৮ ডিসেম্বর ২০০৬-এ প্রথম অভিনয় হয়। নাটকটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বহুমত’ পত্রিকায় ২০০৭-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়। পরবর্তীতে অমল রায়ের ‘নাট্যসংগ্রহ–১৮’ ( ২৩ জানুয়ারি ২০০৮)–তে সংকলিত হয়।
সিঙ্গুরের উর্বর কৃষিজমিতে শিল্পায়নের সুফলকে আলিমুদির দোকানের স্পেশাল গুড় বলে ব্যাঙ্গ করেছেন নাট্যকার। আগে আলিমুদির দোকানে থাকত গরিব মানুষের ভিড়। এখন সেখানে বিরাট শপিংমল হওয়াতে বড়লোকের আখড়া হয়ে উঠেছে। আলিমুদ্দিন স্ট্রীটের সিপিএমের পার্টি অফিসকে আলিমুদির দোকান বলে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে। বন্ধ কারখানার শ্রমিকের জবানীতে নাটকটি বর্ণিত হয়েছে। ব্যঙ্গাত্মকভাবে বর্ণিত হয়েছে ‘সিঙ্গুরের গুড়’-এর মাহাত্ম্য। বলা হয়েছে যারা এই গুড় খেয়েছে তারা সকলেই প্রতিবাদ করতে ভুলে যাবে। অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ‘সিঙ্গুরের গুড়ে’র অর্থাৎ সরকারের শিল্পায়নের বুলি বুলি প্রচার করছেন। বন্ধ কারখানার শ্রমিকের জবানীতে নাট্যকার তাদের মুখোশ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নাটকটিতে প্রত্যক্ষভাবে উঠে এসেছে তাপসী মালিক প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে চাষিদের ওপর অকথ্য অত্যাচারের কথা, উঠে এসেছে জোর করে জমিতে বেড়া দেওয়ার প্রসঙ্গও।
নাট্যকার অমল রায়ের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম বিষয়ক আরেকটি উৎকৃষ্ট পথনাটক হল ‘উন্নততর লাশ বিপণি’। এই নাটকটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৭-এ ‘নতুন পথ এই সময়’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়। পরে এটি অমল রায়ের ‘নাট্যসংগ্রহ-১৮’ (প্রথম প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০০৮)-তে স্থান পায়। নাট্যকার ১৯৭২ আর ২০০৭ কে একই সারিতে বসাতে চেয়েছে, নির্বিচারে গণহত্যার নিরিখে কাশীপুর-বরানগর আর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম এক হয়ে উঠেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শাসকের নগ্নরূপকে তুলে ধরতে অমল রায় ১৯৭৩ সালে রচনা করেন তাঁর ‘লাশ বিপণি’ নাটকটি। সেবছরই সেটি অভিনয়ও হয়। ইউনিট থিয়েটারের এই নাটক সেদিন শাসকের নির্বিচারে গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের প্রেক্ষিতে সত্তরের দশকের ছায়া একুশ শতকের সূচনা দশকে ফিরে এসেছে বলে মনে হয়েছে নাট্যকারের। তাই অতিবামপন্থায় বিশ্বাসী নাট্যকার অমল রায় ‘উন্নততর’ বামপন্থার নামে চাষিদের হাতে ও ভাতে মেরে টাটা-সালিমদের দালালি করা, এস ই জেড এর নামে পুঁজিপতিদের পদলেহন, সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের নৃশংস হত্যা থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামে ১৪ মার্চের (২০০৭) গণহত্যায় প্রতিবাদী মানুষকে লাশ বানানোর শিল্পকেই উন্নততর লাশ বিপণি বলেছেন নাট্যকার। নাটকটিতে ছ’জন পুরুষ চরিত্র ও অন্তত একজন মহিলা চরিত্র কথা উল্লেখ করেছেন নাট্যকার। যে মহিলা চরিত্রটি নাটকে হাজির হয়েছেন নানাভাবে, কখনও সন্তান হারা জননী, কখনও সিঙ্গুরের তাপসী মালিক (যাকে জমি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়), কখনও নন্দীগ্রামের বাসন্তী জানা (নন্দীগ্রামের প্রতিবাদী নারী), কখনও মিছিলে অংশগ্রহণকারী প্রতিবাদী নারী হয়ে উঠেছেন। আসলে নারীদের পরিণতি যে এক তা একই নারীর ভিন্ন রূপে আবির্ভাবেই প্রতীয়মান করতে চেয়েছেন নাট্যকার। বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ বেশি হয়েছেন নারীরাই। নাটকে উঠে এসেছে চন্দনপীড়ি শহিদ জননী গর্ভবতী অহল্যার কথাও। উঠে এসেছে ১৯৫৯-এর খাদ্য আন্দোলনের প্রসঙ্গও।
তবে যাই হোক, নাট্যকার তথাকথিত বামপন্থায় আস্থা হারাননি। তাই কোনো দক্ষিণপন্থায় নিজেকে সঁপে দেননি। কারণ তাঁর মনে হয়েছে এখন চাটুকাররা বামপন্থী সেজেছে। এরা বামপন্থী আন্দোলনের গৌরবময় অতীত আর সংগ্রামী ঐতিহ্য জানে না। নাটকের শেষ সংলাপে পরিচালক চরিত্রের সংলাপে সে কথাই প্রত্যয়সিদ্ধ হয়ে ওঠে — ‘আজ মানুষ আবার জাগছে। তাই উন্নততর লাসবিপণিতে লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আমরা ফিরিয়ে আনবো মানবিক মুখ সম্পন্ন নতুন বামপন্থাকে–এই মানবিক বামপন্থাই আগামীদিনের দিশারি।’৩
অমল রায়ের আরেকটি পথ নাটক ‘মাতৃগর্ভের লজ্জা’য় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ সরাসরি উঠে এসেছে। নাট্যকার সংস্কৃতিবান বামপন্থী নেতাকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে গিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে তাঁদের সংগঠিত অত্যাচারের কথা সিঙ্গুরের তাপসী মালিকের ধর্ষণ থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের (২০০৭) গণহত্যা, ৫ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বরের (২০০৭) নারকীয় তাণ্ডবের কথা তুলে ধরেছেন। স্বপ্নের মধ্যে সেই নেতা দেখে মা তাঁর ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে। কারণ মায়েরই শুধু সাহস থাকে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার। এই মায়ের মুখের সংলাপে সরকার বিরোধী স্বর ধ্বনিত হয়েছে। সেই সময়ের সরকারের মানসিকতাকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন। সরকার বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করতে মাওবাদী তকমা দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সরকার কথিত নন্দীগ্রামে মাওবাদী প্রসঙ্গে মা’র উক্তিতে তীব্র শ্লেষ ঝরে পড়ে : “নন্দীগ্রাম হার্মাদদের দ্বারা পুনরায় দখল হইয়া প্রমাণ করিল– সেখানে মাওবাদীরা ছিল না।”৪ নাটকের শেষে মা’র উক্তিতে নাট্যকারের উদ্দেশ্য প্রকট হয়ে উঠেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই নাটকটা একটা অলীক মিথ্যা মাত্র। যাদের বিবেক থাকে, তারাই শুধু এমন স্বপ্ন দেখতে পারে। এই ভণ্ড জল্লাদেরা শুধু মিথ্যাচারীই নয়, এরা বিবেক বর্জিতও বটে। তাই নন্দীগ্রাম নরসংহারের নব পর্যায়ের এই খলনায়কদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলুন লৌহদৃঢ় প্রতিরোধ। এই নাটকটি প্রথম অভিনয় হয় ‘পিপলস্ অডিও থিয়েটারে’র প্রযোজনায় ২ ডিসেম্বর ২০০৭-এ। নাট্যকার অমল রায় নিজে এই নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন বন্দনা রায়। উপরোক্ত তিনটি নাটক ছাড়াও অমল রায়ের ‘ঘরে ফেরার অন্যগল্প’ নাটকে নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। মহাশ্বেতা দেবীর প্রতিবেদন অবলম্বনে রচিত এই পথনাটকে শাসক কথিত নন্দীগ্রামে নতুন সূর্যোদয়ের কাহিনি ভাষারূপ লাভ করেছে। নাটকের প্রধান চরিত্র সোলেমানের সংলাপের মধ্যে দিয়ে ঘরে ফেরার অন্য গল্প শোনানোর মধ্যেই নন্দীগ্রামের জমি রক্ষার আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতার কথাই ব্যক্ত হয়ে পড়ে।
ড. সঞ্জয় গাঙ্গুলির নির্দেশনায় ‘জনসংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ্ দি অপ্রেসড্’- এর বিভিন্ন শাখাদল ‘উন্নয়ন ?’ নাটকটি ২০০৭-এর সূচনা থেকেই নাটকটি বিভিন্ন জেলায় প্রযোজনা করেছে।৫ নাটকটিতে নানাভাবে সিঙ্গুরের বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। কখনও বিভিন্ন ইমেজ বা সিম্বলের ব্যবহারে আবার কখনও কোরিওগ্রাফিক মুভমেন্টের প্রয়োগের মাধ্যমে সিঙ্গুরকেই জীবন্ত করে তুলেছেন নাট্যকার। কৃষিজমি রক্ষায় কৃষকের অনড় অবস্থান থেকে শুরু করে সরকারের সঙ্গে টাটার গোপন চুক্তি, বৃহৎ পুঁজির কাছে কমিউনিজমের আত্মসমর্পণ সবেতেই সিঙ্গুর প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সরকার বেকার সমস্যার দোহাই দিয়ে শিল্পায়নে কথা বললে, যারা চাকরি পারে না তাদের পরিণতি জানতে চাইলে উত্তরে সরকার জানায়, গাড়ির সিট কভার তৈরি থেকে শুরু করে গাড়ি মোছা ইত্যাদির কাজ বাড়বে। শুধু তাই নয় কৃষিভিত্তিক জীবন থেকে শিল্পভিত্তিক জীবন কতটা সুখের সেটা বোঝানোর চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। নাটকের অন্তিম দৃশ্যে একটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ির মধ্যে দিয়ে মুষ্টিমেয় মানুষের লাভবান হওয়া আর বেশিরভাগের না হওয়ার দৃশ্যের মধ্যেই নাটকের মূল বার্তা প্রতীকায়িত হয়ে ওঠে। এভাবেই নাটকটিতে গণচেতনা জাগরণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়।
২০০৮-এ ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার ৪২ বর্ষ, ২য়-৩য় সংখ্যায় ব্রাত্য বসু (১৯৬৯– ) সম্পাদিত ‘পাঁচটি পথ নাটিকা’ ক্রোড়পত্রের তিনটিতেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সেগুলি হল রাণা সরকারের ‘ওম্ শান্তি ওম্’ বা ‘বিনয়ের সঙ্গে বিমানে চড়ুন’, অর্পিতা ঘোষের (১৯৬৬– ) ‘সহজ প্রশ্নের বর্ণমালা’ ও ব্রাত্য বসুর ‘কমরেড কথা’। রাণা সরকারের ‘ওম্ শান্তি ওম্’ একটি ব্যঙ্গাত্মক পথ নাটিকা। বিগ্রেড ময়দানে ক্যাডারকুল পরিবৃত দুই সেমি কুলপতি পলিটবুড়ো ও পলিটখুড়োর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ‘শ্মশান বাংলা’ চ্যানেলে একজন সাংবাদিক। ক্যাডারকুলের ‘জিন্দাবাদ’, ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে শ্মশান বাংলা চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠান ‘বিনয়ের সঙ্গে বিমানে চড়ুন’-এ সাংবাদিকের কৌশলী প্রশ্নের উত্তরে দুই নেতার অন্তঃসারশূন্য বাগাড়ম্বরপূর্ণ সংলাপে শাসকের কর্মপন্থার প্রত্যক্ষ সমালোচনায় সামিল হয়েছেন নাট্যকার। নাটকে উঠে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাণ্ড থেকে শুরু করে ১৪ নভেম্বর ২০০৭-এ বুদ্ধিজীবীদের মহামিছিলের প্রসঙ্গ যেমন এসেছে তেমনই সেই সময়ের রিজওয়ানুর- তসলিমা – রেশন কাণ্ডের কথাও উঠে এসেছে। সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গের সময়খণ্ডটি সংলাপাত্মকভাবে নাটকের শরীরে ফুটে উঠেছে সহজ ও স্বাভাবিকভাবেই।
ব্রাত্য বসু সম্পাদিত এই ক্রোড়পত্রের একটি বলিষ্ঠ পথ নাটক অর্পিতা ঘোষের ‘সহজ প্রশ্নের বর্ণমালা’। এতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আর রিজওয়ানুর রহমান জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দুটো ছেলে একটি মেয়ে আর একদল কোরাসের সমন্বয়ে এই নাটকের বিন্যাস আবর্তিত হয়েছে। নাটকের এই একটি মেয়েই কখনও সিঙ্গুরের তাপসী মালিক, সমবেত ভাবে কখনও তারাই আবার ১৪ মার্চ ২০০৭-এ নন্দীগ্রামে নিহত গ্রামবাসী, আবার তাদেরই একজন হয়ে ওঠে তিলজলার রিজওয়ানুর রহমান বা নন্দীগ্রামের গণহত্যায় নিহত ৭ নং জালপাইয়ের গোবিন্দ দাস। আবার কোরাসের মধ্যে থেকে উঠে আসে নন্দীগ্রামে শাসকের নতুন সূর্যোদয়ের বলি হরেন প্রামাণিক, যার লাশ পাওয়া উদ্ধার করে সিবিআই পারুলবাড়ির মাঠ থেকে।৬ তার লাশ শনাক্তকরণ নিয়েই রাজনৈতিক চাপানউতোর সক্রিয়তা লাভ করে। আবার কখনও মরিচঝাঁপির মেনি মুন্ডাও স্বরূপও তুলে ধরে কোরাস। সময়চিহ্নিত এই নাটকের শেষে নাট্যকার সমবেত কণ্ঠে গাওয়া ‘আমরা করবো জয়…’৭ গানের মধ্যে দিয়ে অত্যাচারিত জনগণের মনে আশার সঞ্চারে সচেষ্ট হয়েছেন। নাটকটি নাট্যকার অর্পিতা ঘোষ নিজে ১৪ মার্চ ২০০৮-এ কলকাতা শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিনয় মধ্যে দিয়ে আমজনতার দরবারে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হন।৮ অন্যদিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম সমকালীন সময়ে ‘পঞ্চম বৈদিক’ প্রযোজিত অর্পিতা ঘোষের নাটক ‘টোকোলশ’ এর কথা এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের এক ইহুদি রোনাল্ড সেগালের লেখা উপন্যাস ‘টোকোলশ’কে ভিত্তি করে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় অর্পিতা ঘোষ ‘টোকোলশ’ নাটকটি লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, এমনকি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে (লুইজা) অভিনয়ও করেছেন। এই নাটক সম্পর্কে সমালোচক পাচু রায় বলেছেন : “নাটকটি দেখতে দেখতে আপনার মনে হবে আপনি এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের এক কাহিনী দেখছেন, যে কাহিনী নন্দীগ্রামের সিঙ্গুরের রাজারহাটের হলদিয়ার ও আগামী দিনে উন্নয়নকামার্ত এই রাষ্ট্রের শিকার হবে এমন অগণিত গরিব মানুষের এবং নিষ্ঠুর রাষ্ট্র ও তার দাম্ভিক প্রধানের কাহিনী।”৮
‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার ৪২ বর্ষ, ২য়-৩য় সংখ্যায় ২০০৮-এ ব্রাত্য বসু সম্পাদিত ‘পাঁচটি পথ নাটিকা’ নামক ক্রোড়পত্রের পঞ্চম তথা শেষ পথ নাটক ব্রাত্য বসুর ‘কমরেড কথা’। এটি একটি সংলাপধর্মী বিদ্রূপাত্মক পথ নাটক। থানার ওসি থেকে শুরু করে সাব ইন্সপেক্টর, সাংবাদিক, এস.ডি.ও, ডি.এম. সবার নামের আগে কমরেড শব্দটি ব্যবহার করেছেন ব্যঙ্গাত্মক ভাবে। সকলকে কমেরেড সম্বোধনের মধ্যে দিয়ে একই সারিতে বসিয়ে পুলিশ, প্রশাসন এমনকি সংবাদ মাধ্যম কাউকেও আক্রমণের লক্ষ্য করেছেন। কমরেড নিরঞ্জন আসলে একজন গুণ্ডা যে একজন কমরেড চাষিকে গুলি করে হত্যা করেছে। মৃত চাষির ভাই রমেশ থানায় অভিযোগ জানাতে এলে তাকে কথায় কথায় গুণ্ডা ও ও.সি. সকলকে কমরেড সম্মোধন করতে বললে অস্বীকার করে, প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বলে, “বলব না। কমরেড শব্দের মানে জানিস কুত্তা। আমাদের বাবা জানত রে শুয়োর।”১০ তাই তাঁকে থানা মধেই গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমরেড সাংবাদিক পড়ে যায় : “আজ একটি মাওবাদী ইস্তেহারখচিত একটি গুলিতে নিরীহ কনস্টেবল রমেশ সর্দার নিহত হয়েছেন।” এই মিথ্যা খবর পাঠের পরেই কমরেড ও.সি., কমরেড সাব ইন্সপেক্টর এবং কমরেড সাংবাদিকের “মার্কসবাদ আমাদের ভিত্তি, পুঁজিবাদ আমাদের ভবিষ্যত” বলে চিয়ার্স ধ্বনিতে নাটকের সমাপ্তি ব্যঞ্জনাবহ হয়ে ওঠে। এই নাটকটি কৌশিক সেন ১৪ মার্চ ২০০৮-এ কলকাতা শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিনয় করেন। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে এটি ব্রাত্য বসু’র ‘নাটক সংগ্রহ – ২’( আনন্দ, প্রথম প্রকাশ : মে ২০১০)-এ সংকলিত হয়েছে।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের পক্ষে নাটকের মাধ্যমে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অচিন্ত্য বিশ্বাসও কয়েকটি নাটক রচনা করেছেন। সেই নাটকগুলি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন ড. সেখ জাহির আব্বাস তাঁর ‘পথনাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম’ রচনায়। অচিন্ত্য বিশ্বাস রচিত প্রথম পথনাটকটির নামই ‘নন্দীগ্রাম’। নাটকটি রচনা করেন ২০০৭-এর ২১–২৩ এপ্রিল। পরবর্তীতে নাটকটি ৩ মে ২০০৭ পরিমার্জন করে নাম দেন ‘অন্যদিন’।
নাটকে সরাসরি নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গকে তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে গণচেতনার জাগরণে নাটকের ভূমিকা স্পষ্ট করে তুলেছেন। নন্দীগ্রামের পরিস্থিতিকে সরেজমিনে দেখতে ও চুক্তিচাষ নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় নাটকের নান্দীপাঠ। নন্দীগ্রামের অনতিদূরে তিনকড়ির চায়ের দোকানে এই আলোচনা ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দু’জন সাংবাদিক করলে দোকানি জোরের সঙ্গে বলে : “এখানে ঐ সব কথা বলা চলবে নি।”১১ কিছুক্ষণ পরে সেখানে আঠাশ-তিরিশ বছরের যুবক শাসক দলের মদতপুষ্ট মস্তান ফজল আলি এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মিলু বাবুর আগমনে এবং পারস্পরিক উত্তপ্ত সংলাপে নাটকের কাহিনির অগ্রগতি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আর চুক্তিচাষ নিয়ে কথা বলায় পার্টি কর্তৃক নিষেধাজ্ঞায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে। পরবর্তীতে সেটা জনগণের মধেও সঞ্চারিত হয়েছে। নাটকে নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের (২০০৭) গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে শুরু করে মরিচঝাঁপিতে ১৯৭৯-এর ৩১ জানুয়ারি উদ্বাস্তু হত্যা সবই শাসকের মুখোশ খুলে দিতে তুলে ধরেছেন নাট্যকার। অন্যদিনের দুই সাংবাদিক তপোজা ও অভ্যুদয়ের সরকারবিরোধী সাহসী ভূমিকা জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। ফলে নাটকের শেষ তিনকড়ি থেকে শুরু করে মস্তান ফজলু ও দীর্ঘদিনের পার্টি কর্মী মিলু বাবু সরকারি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। তাই যারা একসময় তপোজা ও অভ্যুদয়কে চুক্তি চাষ আর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে কথা বলায় নিষেধাজ্ঞার কথা জানায় তারাই সেই নিষেধাজ্ঞার প্লে কার্ড উপরে লাগায় ‘নন্দীগ্রামে গণহত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’। নাটকটিতে নন্দীগ্রামের মানুষদের সাহস যোগাতে বহিরাগত সাংবাদিক তথা নাট্যকর্মীদের ভূমিকার কথা সহজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। নাট্যসংলাপের সাংবাদিকদের মুখে শুদ্ধ বাংলা আর গ্রামবাসীদের সংলাপে মেদিনীপুরের আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগে চরিত্রগুলি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।
অচিন্ত্য বিশ্বাসের লেখা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন কেন্দ্রিক একটি কাব্যনাট্য ‘গ্রাম-শহর’। এটির রচনাকাল ২৫ বৈশাখ ১৪১৪ বঙ্গাব্দ। নাটকে শাসককে কাপালিক বেশে উপস্থাপিত করেছেন। শাসকের নির্মম পীড়নে শ্রমিক ও কৃষকের বিপর্যস্ত জীবনের ছবি যেমন ফুটে উঠেছে তেমনই নাটকের শেষে শ্রমিক-কৃষকের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ছবি ফুটে উঠেছে।
সোচ্চার হয়েছে ‘মুখ্যমন্ত্রীর শাস্তি চাই / পদত্যাগ চাই’ ধ্বনিতে। আবার তাঁরই লেখা অন্য একটি পথনাটক ‘বিজয় উৎসব’-এ (রচনাকাল : ১৩-১৪ নভেম্বর ২০০৭) বামফ্রন্ট সরকারে বিরূপ সমালোচনা উঠে এসেছে। কীট, পতঙ্গ, উচ্চিংড়ের মধ্যে দিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনাকে প্রতীকায়িত করেছেন। নাটকে সিঙ্গুরে কারখানার জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করে প্রাচীর দেওয়া, নন্দীগ্রামে শাসক কথিত সূর্যোদয়ের রক্তাক্ত ছবি উঠে এসেছে কাব্যিক সংলাপে। তাই সমালোচকের অভিমত : “ড. বিশ্বাস প্রতিটি পথনাটকেই পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন।”১২
ড. সেখ জাহির আব্বাস তাঁর ‘পথনাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম’ (‘পূর্বাশা এখন’, বিশেষ শারদ, দীপাবলি ও ঈদ সঙ্খ্যা-১৪২২) নিবন্ধে কলকাতার ‘পিপলস্ অডিও থিয়েটার’ প্রযোজিত অমল রায়ের ‘সিঙ্গুরের গুড়’ (প্রথম অভিনয় ২৮/১২/২০০৬) নাটকটিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম বিষয়ে প্রথম পথ নাটক বললেও সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েই যায়। কারণ ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন মঞ্চে মানিক মণ্ডলের(১৯৬৪– )‘মাটি’ নামে একটি নাটক অভিনয় করেন। যা পরবর্তীতে মমতা ব্যানার্জির কথা মতো নাম পাল্টে নাট্যকার সেটির নাম দেন, ‘মা-মাটি-মানুষ’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মমতা ব্যানার্জির এই অনশন আন্দোলন চলে ৪ ডিসেম্বর ২০০৬ থেকে ২৬ ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত । এর মধ্যেই লেখক যে এই নাটকটি অভিনয় করেছেন তা উল্লেখ আছে তাঁর রচনায়।১৩ সেদিক থেকে দেখলে মানিক মণ্ডল ওরফে মানিক ফকিরের ‘মাটি’ বা ‘মা-মাটি-মানুষ’ নাটকটি ‘সিঙ্গুরের গুড়’ নাটকের পূর্বেই অভিনীত হয়। তবে ২০০৬-এর আগস্টে রবীন্দ্র সদন চত্বরে ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’ প্রযোজিত অভি চক্রবর্তী পরিচালিত ‘দিবারাত্রির পদ্য’ নাটকটিই বোধহয় জমি অধিগ্রহণ প্রশ্নে প্রথম প্রতিবাদী উচ্চারণ বলে মনে করেছেন সমালোচক পাচু রায়।১৪ যখন এই নাটকটি অভিনীত হয় তখন নন্দীগ্রাম এজেন্ডায় আসেনি, সিঙ্গুরে ‘স্বেচ্ছায়’ জমি অধিগ্রহণ নিয়ে চাপান উতোর চলছে। সেরকম পরিস্থিতিতে তরুণ পরিচালক অভি চক্রবর্তী এবং ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’ এর তারুণ্য অধ্যষিত কুশীলবরা সে সময় ‘স্বেচ্ছায় জমি দান’ মার্কা সিপিএম রচিত নাটকের বিরুদ্ধে দিবারাত্রির পদ্য’ মঞ্চস্থ করেছিলেন রবীন্দ্র সদন চত্বরে। গোলমাল শুরু হওয়ার পর তাঁরা নাটকটা তুলে নেন নি বা অভিনয় বন্ধ করেন নি। ২০০৬- এর আগস্টের পর ২০০৭ এর মে মাসে নাটকটি আবার ‘বিভাবন’-এর নাট্যোৎসবে অভিনীত হয়।১৫ এই সময়ে শুধু ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’ই নয় আরও অনেক নাট্যগোষ্ঠীই পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে পাশ কাটিয়ে বিপ্লবী বুলি কপচানোর মসৃণ পথ পাল্টে সরাসরি সরকার এবং তার পাণ্ডার সমালোচনায় সামিল হয়েছেন। যেমন পশ্চিমবঙ্গের শাসক বনাম গরিব মানুষের লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে ‘পঞ্চম বৈদিক’ এর ‘টোকলশ’-এ। সিঙ্গুর প্রসঙ্গ এসেছে ‘তৃতীয় সূত্র’ প্রযোজিত ‘আগুনমুখো’তে, নন্দীগ্রামের ‘সেজ’-এর কথা এসেছে ‘নান্দীপট’ প্রযোজিত ‘কঃ’ নাটকে, ‘রংরূপ’ প্রযোজিত ‘মুখোশ নৃত্য’ তে সিপিএমের দ্বিচারিতার কথা তুলে ধরা হয়েছে, ‘গণকৃষ্টি’র প্রযোজনা ‘ঝরা সময়ের কাব্য’তে সিপাহী বিদ্রোহের সময় নিয়ে নাটক করতে গিয়ে উন্নয়নকামার্ত এই সময় ও দেশকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সিপিএম মার্কা ক্ষমতার বলয়ের একটা যন্ত্রণাকাতর রূপ তুলে ধরা হয়েছে ‘সন্দর্ভ’ প্রযোজিত ‘গহ্বর’ নাটকে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের প্রশ্ন বা নন্দীগ্রাম গণহত্যার প্রশ্ন বা সিপিএম যে আদৌ কমিউনিস্ট পার্টি নয় সে প্রশ্ন সরাসরি উঠে এসেছে ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’-এর ‘দিবারাত্রির পদ্য’ এবং ‘টোটাল থিয়েটারে’র ‘রঞ্জন সেন’ নাটকে। ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’ শুধু যে সাহসী তাই নয়, তাঁরা পরীক্ষা নিরীক্ষায় পরাঙ্মুখ নন এবং তাঁরা প্রযোজনার শৈল্পিক উৎকর্ষ সাধনেও যথেষ্ট যত্নবান। সেই কারণে ‘দিবারাত্রির পদ্য’ একটি চিরকালীন সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবিদার।১৬
আবার শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘টোটাল থিয়েটার’-এর ‘রঞ্জন সেন’ নাটকে নন্দীগ্রামের গণহত্যার কথা সোচ্চারে আসে কোনোরকম আবডাল ছাড়াই। এই নাটকে সিপিএমের দ্বিচারিতার কথা পরিষ্কার উচ্চারণে শোনা যায় কোনো ভ্যানতারা ছাড়াই। শুধু তাই নয়, এই সিপিএমের ‘কমিউনিস্ট’ নাম বহন করার যে কোনো হক নেই আদৌ, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয় এই নাটকে। কৃষকরমণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করে পুলিশ ও সিপিএম বাহিনী। রমণীর শববাহকরা হেঁটে যায় দর্শকদের মাঝখান দিয়ে, সামনে প্ল্যাকার্ড ঝোলানো : ‘দুঃখিত শিল্পায়ন চলছে’। এই নাটকে ব্যবহৃত হয়েছে ‘রক্তকরবী’র সংলাপ (আসলে ‘রঞ্জন’ নামটি ‘রক্তকরবী’ থেকেই নেওয়া), লড়াকু কৃষক রমণীর আদলে ‘আন্তিগোনে’ চরিত্রটি চিত্রিত। রঞ্জন-সর্দার-ক্রেয়ন-আন্তিগোনে লড়াইয়ের আদর্শ হয়ে উঠেছে। পুলিশ-সিপিএম ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী, নাটের গুরু মুখ্যমন্ত্রীজী এমনকি গুলির মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো কৃষক রমণী যেভাবে সূক্ষ্মতা বর্জিত স্থূল অথচ বাস্তব শরীর নিয়ে শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এই নাটকে হাজির হয়েছে তা প্রশংসার দাবি রাখে।
মানিক মণ্ডলের (১৯৬৪– )‘মাটি’ নাটকটি জুন, ২০১২-এ কলাভৃৎ পাবলিশার্স প্রকাশিত মানিক মণ্ডলের ছয়-টি দিনবদলের সরস ব্যঙ্গ ছোট নাটকের সংকলন ‘বুঝবে খুড়ো বেলা হলে’ তে সংকলিত হয়েছে। এটি সংকলনের তৃতীয় নাটক। এই নাটকের প্রথমেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষার বিষয়ে এই নাটকটি। নাটকের সূচনা হয়েছে জগদীশ নামে একজন বৃদ্ধ চাষির জমির আলে বসে স্বপ্ন দশর্নের মধ্যে দিয়ে। জমি হারানোর চিন্তায় চিন্তিত জগদীশ স্বপ্ন দেখে যে অনেকদিন আগে মারা যাওয়া অনন্ত মহাজন তার সামনে হাজির হয়েছে জমি কেড়ে নিতে। তরুণের কথায় তার হুশ ফিরলেও আতঙ্ক তার কাটেনি। কারণ তার মনে হয়েছে অনন্ত মহাজনরা ভাইরাস মরে গিয়েও তারা ফিরে আসে। আসলে এক অনন্ত মারা গেলেও অন্য অনন্ত হাজির হয় সেকথাই বোঝাতে এই সংলাপ। শাসকের রং পাল্টায় কিন্তু শোষণ প্রকৃতি বদলায় না। আর সেটাই প্রত্যয়সিদ্ধ হয়ে ওঠে ঢেঁড়াদারের ঢেঁড়ি পিটিয়ে জমি অধিগ্রহণের ঘোষণায় : “আগামী সাত দিনের মধ্যে যার যার জমির দলিল পরচা খাজনার রসিদ আছে তা নিয়ে পার্টি অফিসে হাজির হবেন। ওইখানে জমির প্রমাণ দিয়ে হাতে হাতে টাকা দিয়ে জমির দখল নেওয়া হবে। যারা জমি দেবে না তাদের জমি জোর করে খুঁটি দিয়ে ঘিরে দখল নেওয়া হবে।”১৭ তবু নিচু তলার পার্টি কর্মী তরুণ জগদীশকে ভরসা জোগায়, পার্টির উপরমহলে গিয়ে কেন এই জমি অধিগ্রহণ তা জানার কথা বলে। শুধু তাই নয় তার সততা, আদর্শ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শক্তিই তার অস্ত্র, তার ওপরেই ভরসা করেই সে এর প্রতিকার করতে পারবে বলে জগদীশকে জানায়। কিন্তু উঁচু তলার কর্মী শুভঙ্করের কথায় তার সম্বিত ফেরে। উন্নয়নের ধুয়ো তুলে চাষিদের কাজের লোভ দেখিয়ে জমি অধিগ্রহণের সুফল বোঝানোর জন্য তরুণকে নিয়োজিত করতে চাইলে তরুণ সহজে মেনে নেয় না। আর তখনই উঁচুতলার নেতা শুভঙ্করের আসল মুখোশটা বেরিয়ে পড়ে। যে আদর্শের জন্য তরুণের মতো নিচুতলার কর্মীরা কমিউনিস্ট পার্টি করে সেই আদর্শকে ডাস্টবিনে ফেলে শুভঙ্করের মতো নেতার আখের গোছায় এই ভয়ংকর সত্যটিকে এই নাটকে সরাসরি তুলে ধরেছেন নাট্যকার।
অন্যদিকে মানিক মণ্ডলের ‘বুঝবে খুড়ো বেলা হলে’ সংকলনের দ্বিতীয় নাটক ‘লালগড়ের লাল মাটি’-তে লালগড়ের পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটির আন্দোলনের কথা মুখ্য হলেও এতে প্রসঙ্গক্রমে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা এসেছে। নাটকের অন্যতম চরিত্র সহিদুলের কাছে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আর লালগড় একাকার হয়ে উঠেছে। তাই হিরন্ময় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে লালগড়কে আলাদা করতে চাইলে সহিদুল জোরের সঙ্গে বলে : “সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ না এলে, লালগড়ের কথা আসতে পারে না স্যার। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের পর পথ দেখালো লালগড়।”১৮ একদল সাংবাদিকের ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের লালগড়ে গিয়ে প্রকৃত সত্য তুলে আনার কাহিনির মধ্যে যেভাবে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ও লালগড়কে নাট্যকার উপস্থাপন করেছেন তা অনবদ্য। পুকুরে একটি ঢিল ছুঁড়লে যেমন গোটা পুকুরে ঢেউ খেল যায় তেমনই এরকম একটি নাটক সমকালীন সব বিষয়ে জনমানসকে আলোড়িত করে। এছাড়াও সিঙ্গুরের গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানিক মণ্ডলের ‘বাজে থিয়েটার’ গ্রুপ ‘রাম রাবণের যুদ্ধ’, ‘বুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ প্রভৃতি নাটক অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনগণকে সচেতন করায় ব্রতী হয়েছেন। আবার শচীন মান্না (১৯৫২– ) তাঁর ‘একশ চুয়াল্লিশ’ (রচনা কাল : ৩১/০১/২০০৭) পথনাটকের মধ্যে সিঙ্গুর আন্দোলন ও ‘লাশকাটা ঘরে’ (রচনা কাল : ০৪/০৪/২০০৭) নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রসঙ্গ সরাসরি উপস্থাপন করে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।
নাট্যকার চন্দন সেন (১৯৪৪– ) সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অনেকটা সময় পেরিয়ে জমি অধিগ্রহণ বিষয়ে নাটকে রচনায় ব্রতী হয়েছেন। ওড়িশার চিল্কা শহরের স্বাস্থ্য নিবাস, গোবিন্দপুর, পসকো বহুজাতিক কোম্পানির কারখানার বিস্তীর্ণ জমি প্রভৃতির প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক দুই হাজার বত্রিশ সালের পটভূমিকায় ‘শহিদ শিখর’ (প্রথম প্রকাশ : ২০১২) নাটকটি রচনা করেছেন। কল্পধর্মী এই নাটকে জমি হারানো মানুষের সঙ্কট ফুটে উঠেছে। জোর করে জমি বিক্রি, সঙ্গে চাকরির খেঁচাকলে পৃষ্ট হয়ে ভেঙ্কটেশ দু’মাস দাঁতে দাঁত কামড়ে লড়াই করে, দক্ষ চাষি তাড়াতাড়ি অদক্ষ মজুর হয়ে ওঠে, শেষ অবধি টিকতে পারে না। জীবনযুদ্ধে হেরে যায়। দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর কোমায় থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রন্তিদেবও খেই খুঁজে পায় না। মেনে নিতে পারে না এই আগ্রাসন। তাই সে বলে : “আবার আমরা শুরু করি। আবার, আর একবার–মারতাম্মা, আর একবার…”১৯ এই নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ না এলেও জমি অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে মানুষের সঙ্কট তুলে ধরায় আমাদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে লেখা বেশিরভাগ নাটকই মূলত পথনাটক। সেখানে নির্মল ব্রহ্মচারী ব্যতিক্রম যিনি পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা করেছেন। তাঁর ‘গণ-ধিক্কার’ (২০১১)২০ নাটকটি এযাবৎপ্রাপ্ত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নাটক। এতে কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তার পরিচয় বিভিন্ন চরিত্রের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। নাটকের অন্যতম চরিত্র সাহানার কথা বলার মধ্যে দিয়ে ঘটনার তালগোল পাকালেও শাসকের মিথ্যাচার ফুটে ওঠে। নাটকের শেষে শাসকের এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে গণ-ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছে। অরুণের উক্তিতে নাট্যকারের মনোভাব ফুটে উঠেছে স্পষ্টভাবে : “আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এই সামাজিক ফ্যাসিস্তরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছে। অনতিবিলম্বে উৎখাত হবে এই অত্যাচারী একনায়কের দল। প্রতিষ্ঠিত হবে নয়া জমানা।”২১ এভাবেই নাটকে পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করেছেন নাট্যকার।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের পক্ষে তথা শাসকের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নাট্যকাররা যেমন গর্জে উঠেছেন, তেমনি শাসকের পক্ষে অর্থাৎ কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের বিপক্ষেও অনেকেই নাটক রচনায় সামিল হয়েছেন। ‘গণনাট্য’ পত্রিকার ২০০৭-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত প্রদীপ চক্রবর্তীর ‘আপনপর’, শিবংকর চক্রবর্তীর ‘আমরা শান্তির সাথে’, রতন ভট্টাচার্যের ‘পরাণ মণ্ডলের গল্প’ এবিষয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রদীপ চক্রবর্তী রচিত ‘আপনপর’ পথনাটকটি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে শাসকদলের হয়ে সওয়াল করেছে। এই নাটকে কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি আন্দোলনকারীদের হয়ে মিডিয়ার অতিসক্রিয়তা তথা খবর বানানোর প্রসঙ্গ এনে মিডিয়াকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে। মোট পাঁচটি চরিত্র ও একটি নেপথ্য কণ্ঠের সমন্বয়ে নাটক আবর্তিত। নাটকে নন্দীগ্রামকে নন্দগ্রাম হিসেবে তুলে ধরে একটা রূপকের আড়াল নেবার চেষ্টা করলেও নাটকটি যে সরাসরি নন্দীগ্রামের আন্দোলনের বিপক্ষের স্বর ধ্বনিত হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। এই বিরুদ্ধ পরিস্থিতির মধেও নাট্যকার বাংলার মানুষের প্রতি আস্থা হারাননি। ১ম চরিত্রের সংলাপে সেটাই তুলে ধরেছেন স্পষ্টভাবে : “এত দুর্বল ভেব না বাংলার মানুষকে । সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা করে কারা তারা বোঝে। তোমাদের চেনে।”২২
অন্যদিকে পূর্বোক্ত ‘গণনাট্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত শিবংকর চক্রবর্তীর ‘আমরা শান্তির সাথে’ একাঙ্ক নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শাসকের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজের অতিসক্রিয়তাকে তীব্র ব্যঙ্গে বিদ্ধ করেছেন। নাটকে পাঁচটি চরিত্রের সংলাপে নাট্যকাহিনি বিবর্তিত হয়েছে। সেগুলি হল আভাসবাবু(বুদ্ধিজীবী), রিপোর্টার, দিনু মণ্ডল (গ্রামের বৃদ্ধ), শান্তি (দিনুর নাতনী), সুজন (শহরের যুবক)। কলকাতা শহরে বুদ্ধিজীবীদের বিশাল মিছিলের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ আভাস বাবু চরিত্রের মধ্যে দিয়ে নাট্যকার যে বিভাস চক্রবর্তীকে ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন তা সহজেই বোঝা যায়। বামপন্থী নাট্যকার বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদী চরিত্র তুলে ধরে আন্দোলনের বিপক্ষের মতকেই তুলে ধরায় সক্রিয় হয়েছেন। তাই নাট্যকর্মী আভাসবাবুকে একজন প্রচারবিলাসী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রতিনিধি করে তুলেছেন। একটি সংলাপ তুলেধরলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিপোর্টার গড়ভবানীপুরে শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণ জানতে চাইলে নাটকের অন্যতম বুদ্ধিজীবী চরিত্র নাট্যকর্মী আভাসবাবু বলেন : ‘আমরা বুদ্ধিজীবী–আমরা সমাজের জাগ্রত বিবেক– আমাদের কাজ সরকারের কাজে প্রতিবাদ করা। যা করছে তারই প্রতিবাদ করা। আরে সমর্থন করে তো হাজার হাজার লোক। দু-চারজন প্রতিবাদ করি বলেই তো আমরা সবার চোখে পড়ি–কাগজে, টিভির পর্দায় ছবি হই।”২৩ শুধু বুদ্ধিজীবীদেরই ব্যঙ্গ করেননি, নাট্যকার শিল্পায়নের সপক্ষেও সওয়াল করেছেন। বেকার যুবক সুজনের সংলাপে সেকথাই উঠে আসে : “আমি চাকরি চাই – চাকরির জন্য শিল্প চাই – শিল্প গড়তে শান্তি চাই।”২৪ নাটকে নাম না করে নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ যেমন এসেছে তেমনি নন্দীগ্রামে এগারোমাস ঘরছাড়া মানুষের যন্ত্রণার কথাও শান্তির সংলাপে তুলে ধরেছেন। সেক্ষেত্রেও ভূমি উচ্ছেদ কমিটির আন্দোলনকে নেতিবাচক তুলে ধরেছেন নাট্যকার।
আবার রতন ভট্টাচার্যের ‘পরাণ মণ্ডলের গল্প’ নাটকে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রসঙ্গ সরাসরি এসেছে। গল্পধর্মী এই নাটকে পরাণ মণ্ডল নামের এক প্রান্তিক চাষির সঙ্কট ফুটে উঠেছে। সূত্রধরের জবানীতে পরাণ মণ্ডলের জীবনকাহিনি নাটকের শুরুতে তুলে ধরেছেন
নাট্যকার । ছাপ্পান্ন বছর বয়সী পরাণ মণ্ডল প্রান্তিক চাষি। সে কৃষক সমিতির নীচুতলার কর্মী। ১৯৮০ সালে বামফ্রন্টের ভূমি সংস্কারের ফলে বিঘে কয়েক জমি পায়। সে তেভাগার কৃষক লড়াইয়ের গল্প বাবার কাছে শুনেছে। তাই বামফ্রন্ট সরকার তাকে জমি দিলেও সেই জমি যখন শিল্পের জন্য বেচে দিতে বলা হয়, সে রাজি হয় না। জমি রক্ষা কমিটির নেতাদের ভাষণ তাকে আরও বিভ্রান্ত করে। পুরনো ধ্যান ধারণা নিয়ে আজকের সময়টাকে বুঝে উঠতে পারে না। পরানের বন্ধু করিম ও ছেলে বাবলু ও বাবলুর বন্ধু সমর তাকে শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানোর চেষ্টা করে এবং জমি রক্ষা কমিটির অত্যাচারের কথাও তুলে ধরে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পরাণ মণ্ডল জমি দিতে রাজি হয় আর সে সময়ই রাতের অন্ধকারে অজানা দুষ্কৃতীর হাতে তার ছেলে বাবলু খুন হয়। নাটকের শেষ দৃশ্যে সূত্রধর ঘোষণা করে : “গ্রামে শিল্প হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাবলু লড়াই করছিল তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি, এস.ইউ.সি., নকশাল, জামাত-এ-উলমায়ে হিন্দের গুণ্ডাদের সঙ্গে, তার মুণ্ডহীন দেহটা পাওয়া গেল নদীর জলে। বাবলু শেষ পর্যন্ত জানতে পারল না পরাণ মণ্ডল কী সিদ্ধান্ত নিল। পরাণ মণ্ডলের গল্প নাটকের শেষ এখানেই। এখান থেকেই শুরু হবে–আর একটা নাটক … পশ্চিমবঙ্গের কৃষির সাফল্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সার্বিক শিল্পায়নে যারা বিরোধিতা করে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে তাদের জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার নাটক – সেই নাটকের কুশীলব – আপনারা এই গ্রামের সমস্ত মেহনতী মানুষ।”২৫ নাটকটিতে নন্দীগ্রামের নাম না থাকলেও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম দিন ৭ জানুয়ারি কথা আছে। আছে শঙ্কর সামন্তর হত্যাকাণ্ডের কথাও। নাটকটি যে একপেশে তা এই একটি মাত্র ঘটনার মধ্যেই ধরা পড়ে। এই ঘটনার আগের দিন শাসকের সন্ত্রাসের বলি হয় তিন জন । তারই পরিপ্রেক্ষিতে জনরোষে শঙ্কর সামন্তকে পুড়িয়ে মারে ভূমি উচ্ছেদ কমিটি। সেকথা নাটকে না তুলেধরে শুধুমাত্র শঙ্কর সামন্তর হত্যা তুলে ধরায় নাট্যকারের একপেশে মনোভাব ফুটে উঠেছে। শিল্পের নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারেনি। ফলে নাটক হয়ে উঠেছে পক্ষপাত দুষ্ট।
আবার ‘গ্রুপ থিয়েটার’ পত্রিকায় ২০০৭-এ আগস্ট-অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত নিখিলরঞ্জন দাসের ‘মুক্তাঞ্চল’ নাটকে নন্দীগ্রামের জমিরক্ষার আন্দোলনের বিপক্ষের মত উঠে এসেছে। দশটি দৃশ্যে নিয়ে গঠিত এই নাটক সম্পর্কে নাট্যকারের অভিমত : “সভ্যতার অগ্রগমনকে রুদ্ধ করে, মুক্তাঞ্চলের নামে জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে একদল বিকৃত মানসিকতার লোকজন। এর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আসছে মানুষ, যাদের সংগ্রাম, রক্ত, অশ্রু ব্যর্থ হবার নয় কোনও ভাবেই।”২৬ নাটকে অন্যতম চরিত্র রেখার মনে হয়েছে একদল জমি রক্ষার অজুহাতে একদল শিল্প গড়ার ব্যাপারটাই ভণ্ডুল করতে চায়। আর অন্যরা – শিল্প গড়ে উঠবে, এই আশ্বাস পেয়েই জমি ছেড়ে দিতে চায়। সমগ্র নাটকটিতে দু’পক্ষের সংগ্রাম মুখর সন্ত্রস্ত পরিবেশের ছবি তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে জমি রক্ষাকারীদের আন্দোলনকে যেমন নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে তেমনি তাদের পাশে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীদের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক মনোভাব ফুটে উঠেছে। গ্রামের শিক্ষিত যুবক বীরেশ তার প্রেমিকা রেখার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রায় ভূমিহীন সন্তান হয়েও জমি রক্ষা কমিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। জমি রক্ষা কমিটির কার্যকলাপ সরেজমিনে দেখে সবিষয়ে বিস্তারির তথ্যের জন্য সাংবাদিক নন্দিতা বীরেশদের গ্রামে গেলে জঙ্গিরা বর্ডি সার্চ করে তবে যাওয়ার অনুমতি দেয়। অবশ্য সেটাও কমিটির মাথা চাঁদু অধিকারীর অনুমতি পাওয়া পর। নাটকে আরও দেখানো হয়েছে জমি রক্ষার আন্দোলনকারীদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্য ঝাড়খণ্ড থেকে মাওবাদীদের আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম মাথা চাঁদু অধিকারী যে শিল্পায়নের জন্য জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক চাষিদের জোর করে আন্দোলনে যোগ দিতেই বাধ্য করেনি তাদের নামে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করেছে। এই জরিমানা দিতে অস্বীকার করায় মদনের কপালে জুটেছে মার। চাঁদু লোকজনদের হাত থেকে বাদ যায়নি রেখার পরিবারও। তার বাবার নামে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হলে রেখার প্রেমিক তথা জমি আন্দোলনের কর্মী বীরেশও বিস্মিত হয়েছে। জমি রক্ষা কমিটির মাথা চাঁদর নির্দেশে সাংবাদিক নন্দিতাকে এলাকা ঘুরতে সাহায্য করলে একসময় প্রেমিকা রেখার মনে ঈর্ষা দেখা দেয়। কিন্তু তার উদ্দেশ্য কথা বীরেশ যখন জানায়, ‘এখানে শিল্প স্থাপনের কথা হতেই, কেমন করে এত ভয়ঙ্কর প্রতিরোধ রুখে দাঁড়াল, এর পিছনে কী এবং কারা, মস্তিষ্ক কোথায়, শক্তিই বা কতখানি– এসব কিছু খুঁজে বের করতে চাইছে ও মেয়ে।’২৭ –তখন রেখা তাকে সাবধান করলে বীরেশ জানায় পরিণতি যাই হোক তাকে যেতেই হবে। এর পরেই জমি কমিটির মস্তানদের হাতে রেখা ধর্ষিতা হলে বীরেশ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিশোধ নেবার। বীরেশের রিভলবার নিয়ে কানের পাশে গুলি চালিয়ে রেখা আত্মঘাতী হলে ডুকরে কেঁদে ওঠে বীরেশ । রেখার পরিণতি ও বীরেশের পরিবর্তনে নাটক শেষের মধ্যে দিয়ে জমি রক্ষার আন্দোলনের প্রতি নাট্যকারের নেতিবাচক মনোভাব যেমন ফুটে ওঠে তেমনি শিল্পায়নই যে অগ্রগতির পথ সেটা বোঝাতে চেয়েছেন।
‘গণনাট্য’ পত্রিকায় ২০০৮-এর মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি নাটক। সেগুলি হল অভিজিৎ চ্যাটার্জির ‘ভুলভুলাইয়া’, মৃদুল সেনের ‘অন্য নাটক’, সুখেন্দু বেরার ‘রক্তে ভেজা মাটি’, শঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘উল্টোপুরাণ পালা’, জয়ন্ত চক্রবর্তীর ‘লাইট হাউস’। এই পাঁচটি নাটকের প্রত্যেকটিতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি রক্ষার আন্দোলনের বিপক্ষের মত উঠে এসেছে। প্রথমেই আলোচনা করা যাক ‘ভুলভুলাইয়া’ নাটকটির কথা। এটি অভিজিৎ চ্যাটার্জির লেখা সংলাপধর্মী পথনাটক। নাটকের শুরুতেই চটুল হিন্দি গানের আবহে দুজন অদ্ভুত মুখোশ পরা অভিনেতা নাচের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ভুলভুলাইয়ার গল্প শোনানোর কথা বলার মধ্যে দিয়েই নাট্যকারের অভিসন্ধি ফুটে ওঠে। তাই আন্দোলনের নামে ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের একজোট হওয়াকে ব্যঙ্গত্মক ভাবে সমালোচনা করেছেন। তৃণমুলী বিদ্যুৎ, জামাতি ইকবাল আর মাওবাদী সোমেনের কথোপকথনের সংলাপ লক্ষ করলেই নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন প্রসঙ্গে নাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিচয় ফুটে ওঠে। নন্দীগ্রামে আন্দোলনের জন্য একজোট হওয়ার নেপথ্যে যে ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতির রসায়ন তুলে ধরে তাদের লড়াইকে খাটো করে দেখানোর মধ্যেই নাট্যকারের মনোভাব লুকিয়ে আছে।
“বিদ্যুৎ : আমরা একজোট হয়েছি কারণ–
ইকবাল : হার্মাদ নেতৃত্বাধীন ফ্রন্টের বিকল্প ফ্রন্ট গড়ার লক্ষ্যে।
সোমেন : টার্গেট – এবারের লড়াই – ওয়ান-ইসটু-ওয়ান-”২৮
পুরো নাটকে আন্দোলনকারীদেরকে চক্রান্তকারী হিসেবে নাট্যকার তুলে ধরেছেন। আর একাজে তাদের সহায়ক হিসেবে টিভি চ্যানেলের ভূমিকাকে ব্যঙ্গাত্মক ভাবে তুলে ধরেছেন। তৃণমূল, জামাতি আর মাওবাদীদের কার্যকলাপে মানুষ ভুলভুলাইয়া বা গোলোকধাঁধায় পড়েছে এটাই নাটকে দেখাতে চাইলেও নাট্যকারের অভিসন্ধি মূলক কৃত্রিম ভুলভুলাইয়ার পরিবেশ তুলে ধরার চেষ্টা ততটা সফল হয়নি।
মৃদুল সেনের লেখা নন্দীগ্রাম বিষয়ক একটি পথনাটক ‘অন্য নাটক’। নন্দীগ্রামের গণহত্যার জন্য আন্দোলনকারীদের প্ররোচনাকেই নাটকে দায়ী করা হয়েছে। নাটকের একটি চরিত্র কবি সে অন্য একটি চরিত্র বুড়োকে ১৪ মার্চের চোদ্দ জনের হত্যা কেন হল তা জানতে চাইলে সেকথাই প্রত্যয়সিদ্ধ হয়ে ওঠে। বুড়ো বলে, ‘… ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা দুঃখজনক। … কিন্তু কারা উস্কানি দিয়েছিল। কারা তাদের বিভ্রান্ত করে পুলিশের সামনে এগিয়ে দিয়েছিল? নিজেরা তো ছিল পিছনে।’ শুধু তাই নয় নাটকে বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজের ভূমিকাকে তীব্র ভাবে সমালোচনা করেছেন। নাটকের শেষ দৃশ্যে উদয় নামে এক যুবকের সংলাপে তৎকালীন শাসকের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সে বলেছে, “… চাষের পাশাপাশি আমদের কারখানাও চাই। … কৃষকের ছেলে বলে সারা জীবন চাষ করে যাব আর ওরা জ্ঞান দিয়ে যাবে তা হবে না। তাই সিঙ্গুর হবে। নয়াচরে ক্যামিক্যাল হাব হবে। আর নন্দীগ্রামে যেখানে ওরা মানুষগুলোকে ভুল বুঝিয়েছে, দুদিন বাদে ওই মানুষগুলিও বলবে নন্দীগ্রামে শিল্প চাই।”২৯
আবার সুখেন্দু বেরার ‘রক্তে ভেজা মা-টি’ নামক পথনাটকেও নন্দীগ্রাম আন্দোলনকারীদের সমালোচনা উঠে এসেছে। পূর্বোক্ত নাটকের মতোই এতেও ১৪ মার্চের ঘটনার ঘটনার জন্য আন্দোলনকারীদের উস্কানিকেই দায়ী করেছেন। নাটকে একটি চরিত্রের (২য় জন) সংলাপে সেকথাই উঠে আসে, “রীতিমতো প্ল্যান ছকে এটা করা হয়েছিল। তারা চেয়েছিল, কিছু মরুক। তাতে তাদের প্রচুর ফায়দা। এরা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। কিন্তু সরকার কোনো অবস্থাতেই চায়নি, মানুষের প্রাণ যাক।”৩০ শুধু তাই নয় রাস্তা কেটে নন্দীগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা থেকে শুরু করে মহিলা ও শিশুদেরকে সামনের সারিতে দাঁড় করিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ যে পরিকল্পিত এবং এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা যে দেশের পক্ষে ক্ষতিকারক তাই নাট্যকার তুলে ধরতে চেয়েছেন। নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আন্দোলনকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরতে শঙ্কর সামন্তর হত্যাকে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু তার প্রেক্ষিতকে সামনে আনা হয়নি। তেমনি আধুনিক যুগের প্রেক্ষিতে বেকার সমস্যার সমাধানের জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে তুলে ধরেছেন নাট্যকার।
গান, ছড়া আর কথার সংমিশ্রণের রচিত একটি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকেন্দ্রিক পথনাটক হল শঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘উল্টোপুরাণ পালা’। গায়েনের গানে নাটক শুরু হয়েছে। এতে গায়েনের গানের মধ্যে দিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উঠে এসেছে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভূমিকার কথা। এমনকি নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে রাজ্যপালের সক্রিয়তাকেও ব্যঙ্গ করা হয়েছে। গায়েনের একটি গানে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে :
“শুধু, পত্রিকা নয়, নয় টেলিভিশন
আছে, সুশীল সমাজ আর মেধাবী মহান
রাজ্যের, রাজ্যপাল হায়রে কপাল আছেন স্বয়ং
তারা, সুযোগ বুঝে জুড়ে বসেন – আসেন উড়ে।
তখন, সত্য কাঁদে মিথ্যা কথার আড়ালে রে।।”৩১
নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের পিছনে বিদেশি পুঁজির একটা বড় চক্র কাজ করেছে এই রকম নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে সক্রিয় হয়েছেন নাট্যকার। সেটা গায়েনের আরেকটি গানে উঠে এসেছে :
“সাগরপাড়ের ইচ্ছাময়ীর হাতে ধরা সুতো
সেই সুতোর টানে নাচছে হেতা নেতা নেত্রী যত।
নাচছে কাগজ টেলিভিশন, নাচছে রেডিয়ো
তাদের নাচন দেখে তোমরা যেন ভুল না বুঝিয়ো।”৩২
নাটকে ‘উল্টোপুরাণ’ বলতে বামফ্রন্টের সাফল্যগুলোকে উল্টে পাল্টে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের জোটবদ্ধ আন্দোলনকে তীব্র সমালোচনা বিদ্ধ করেছেন নাট্যকার। নাটকের শেষ দৃশ্যে গায়েনের একটি গানে বিরোধীদের এই জোটকে পাঁচভুতের জোট বলে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।
‘গণনাট্য’ পত্রিকার ২০০৮-এর মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত পথনাটকগুলির মধ্যে শেষ নাটকটি হল জয়ন্ত চক্রবর্তীর ‘লাইট হাউস’। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ তৎকালীন শাসকের সমালচনায় মুখর হয়ে ওঠে। ‘লাইট হাউস’- হল বুদ্ধিজীবীদের এই ভূমিকারই সমালোচনা। এই নাটকে দেখি দীর্ঘদিনের বামপন্থী কবি অধ্যাপক অমল সান্যাল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার সমকালে মনে হয়েছে তাঁদের প্রিয় বামফ্রন্ট সরকার আজ পুঁজিবাদের তল্পি বাহক হয়ে পড়েছে, তাই তিনি মনে করেন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটার প্রতিবাদ করা দরকার। তাই তার কলমে উঠে এসেছে প্রতিবাদ :
“… এসো প্রতিরোধ গড়ি,
নাগরিক সুশীল বন্ধুর দল –
অস্ত্র তুলে ধরো, করো প্রত্যাঘাত
হার্মাদের লাশ গড়াগড়ি খাক পথে ও প্রান্তরে
বরাভয় পাঞ্চজন্য বজ্রনিনাদে ঘোষণা করুক
পরিবর্তনের আগমনী গান।”৩৩
শুধু তাই নয় বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে টি.ভি.তেও কড়া ভাষায় ইন্টারভিউ দিয়েছেন। জামাইবাবুর এই স্খলন মেনে নিতে পারেনি অমলের ছোট শ্যালক অনু। তাই সে ছুটে এসেছে অমলের কাছে। বুঝিয়েছে এই তাঁর এই বামফ্রন্ট বিরোধী ইন্টারভিউতে কাদের লাভ। লাভ হচ্ছে তাদেরই যারা সরকার ফেলে দিতে চায়, যারা পার্টির সর্বনাশ চায় তাদের। আরও বুঝিয়েছেন বিশ্বায়নের যুগে সমাজের অগ্রগতির জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা। অনুর যুক্তি পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত কবি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। নিজের অজান্তেই কখন যে নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন তা বুঝতে পারেন নি। অনুর কথায় সেটা অনুধাবন করেই নিজেকে দিশেহারা মনে হয় অমলের। মৃত শ্যালক শহিদ রণদেব মিত্রের(যে পার্টির জন্য বিরোধীদের গুলিতে প্রাণ হারান) ছবিই তখন হয়ে ওঠেন তাঁর প্রেরণা, পথভ্রষ্ট নাবিকের ‘লাইট হাউস’।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সমকালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ, রিষড়া শিল্পী শাখার প্রযোজনায় ৬ মার্চ, ২০০৮-এ সাধনা রায়চৌধুরী মেলাপ্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ করে বিদ্যুৎ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা পথনাটক ‘রক্তে রাঙা পলাশপুর’। নন্দীগ্রাম আন্দোলন কেন্দ্রিক এই নাটক আলোচনায় ফাল্গুনি সেনগুপ্ত বলেছেন : “এই নাটক আসলে নন্দীগ্রাম ঘিরে শয়তানি এবং সেই শয়তানিকে পর্যুদস্ত করার এক জীবন্ত নাট্যআলেখ্য। শান্ত পলাশপুরকে কীভাবে শিল্পায়ন ঘিরে অশান্ত করে তোলা হল, কীভাবে গুজবের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হল এক অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ জনপদের আর্থিক, সামাজিক উন্নতির স্বর্ণালী সম্ভাবনা তাই দেখানো হয়েছে বলিষ্টভাবে, কলমের নিপুণ মুন্সিয়ানায়।”৩৪ রতন ভট্টাচার্যের পরিচালনায় অভিনীত এই নাটকে কেমিক্যাল হাব ঘিরে যাবতীয় অপপ্রচারের জবাবে এই নাটক সোচ্চার হয়েছে। ‘রক্তে রাঙা পলাশপুর’ নাটকে পলাশপুর আসলে নন্দীগ্রামকেই ইঙ্গিত করেছে। বামফ্রন্টের ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যত’কে যারা ভুল বাখ্যা করে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে বিরোধ বাঁধাতে অপপ্রচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে সোচ্চারের সচেষ্ট হয়েছেন নাট্যকার। শিল্পায়নের সপক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। এমনকি নাটকের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বার্তাও দিয়েছেন নাট্যকার।
এছাড়াও নাট্যকার দেবেশ ঠাকুরের ‘মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে’ (২০০৮) পথনাটকেও নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ বর্ষিত হয়েছে। তেমনি রমেন দাসের ‘দূরদর্শনের বঙ্গদর্শন’ নামক পথ নাটকেও মিডিয়ার সরকারের সমালোচনার প্রসঙ্গকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে মিডিয়া কীভাবে সরকারের সাফল্যকে আড়াল করে বেশি করে সামান্য ব্যর্থতার কথা গুলো প্রচার করে। সেটাই নাটকে তুলে ধরে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করে দেখাতে চেয়েছেন নাট্যকার। অন্যদিকে অশোক মহান্তের ‘স্বর্গ বিচিত্রা’ নামক পথনাটকে স্বর্গপুরীর চরিত্রের ভগবান, যম, চিত্রগুপ্ত, বলরাম এছাড়াও মর্তের বালক ও লোকটি এই কয়েকটি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে যেমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে তেমনি নন্দীগ্রামের এগারো মাস ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরার চিত্র তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্যের খতিয়ান। আবার বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভোটমঙ্গল’ নাটকে বিরোধীদলের কার্যকলাপের সমালোচনা উঠে এসেছে। সেই প্রসঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সমালোচনা করা হয়েছে। আসলে উপরোক্ত ‘মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে’, ‘দূরদর্শনে বঙ্গদর্শন’, ‘স্বর্গ বিচিত্রা’ ও ‘ভোটমঙ্গল’ পথনাটক গুলি ২০০৮–এর পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। এই নাটকগুলি একত্রে ২০০৮-এ পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক-শিল্পী সংঘের বর্ধমান জেলা কমিটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয় পঞ্চায়েত নির্বাচনী গান ও পথনাটিকার সংকলন ‘যখন জীবন জাগে’তে। আবার অশোক মুখোপাধ্যায় সরকারের পক্ষে থেকেও তাঁর ‘কতটা পথ পেরোলে’ নামক নাটকে আত্মসমালচনার সুর তুলে এনেছেন। তেমনি প্রবীর গুহ’র ‘মেঘ ক্ষণিকের’ নামক নাটকটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ (১৮৯০) নাটকের ছায়া অবলম্বনে সরকার বিরোধিতার বিরুদ্ধে রচিত একটি শিল্পশ্রীমণ্ডিত উল্লেখযোগ্য পথনাটক।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন প্রসঙ্গ বাংলা নাটকে মূলত পথনাটকে অতিদ্রুততার সঙ্গে এসেছে। নাটক হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। শুধু আন্দোলনের পক্ষেই নয় আন্দোলনের বিপক্ষের স্বর নাটকে যেভাবে উঠে এসেছে তা ইতিপূর্বে লক্ষ করা যায়নি। বাংলা পথনাটকের ইতিহাসে একই বিষয় নিয়ে পথনাটক রচনা ও প্রযোজনা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের আগে কখনও হয়নি।৩৫ তবে প্রতিবাদ যেহেতু পথনাটকের মুলশক্তি তাই সরকারের বিরুদ্ধে তথা আন্দোলনের সপক্ষে লেখা নাটকগুলি যতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, আত্মপক্ষ সমর্থনকারী সরকারের অনুগত নাট্যকারদের নাটকগুলি ততটা আবেদনক্ষম হয়ে ওঠেনি। জনমত গঠনের হাতিয়ার হিসেবে তথা রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের জন্য বামপন্থীরা পথনাটককে দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে ব্যবহার করেছে। সেক্ষেত্র একুশ শতকের প্রথম দশকে বামফ্রন্ট বিরোধীরা যেভাবে পথনাটককে ব্যবহারে সামিল হয়েছেন তা শুধু বিস্ময়কর নয় বাংলা পথনাটক তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপ অতিক্রম করে পথনাটকের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আন্দোলনের সমকালেই এর ধারা ক্ষীণ হয়ে পড়েনি। আন্দোলনের পরবর্তীতেও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের ছায়া নাটকে কায়ারূপ লাভ করেছে।
তথ্যসূত্র :
১. ড. সঞ্জয় গাঙ্গুলীর পরিচালিত একটি নাট্য গোষ্ঠী, যাঁরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে গিয়ে নাটকের মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।
২. ড. সেখ জাহির আব্বাস, ‘পথনাটকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম’, পূর্বাশা এখন, বিশেষ শারদ, দীপাবলি ও ঈদ সংখ্যা, ১৪২২ পৃষ্ঠা- ৯১
৩. অমল রায়ের ‘নাট্য সংগ্রহ -১৮’, দিগন্ত বলয়, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০০৮, ‘উন্নততর লাসবিপণি’, পৃষ্ঠা– ১৯
৪. অমল রায়ের ‘নাট্য সংগ্রহ -১৮’, দিগন্ত বলয়, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০০৮, ‘মাতৃগর্ভের লজ্জা’, পৃষ্ঠা– ২৯
৫. ড. সেখ জাহির আব্বাস, ‘পথনাটকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম’, পূর্বাশা এখন, বিশেষ শারদ, দীপাবলি ও ঈদ সংখ্যা, ১৪২২ পৃষ্ঠা- ৯১
৬. অধ্যাপক দিলীপ কুমার মান্না ও পীযূষ কান্তি ভূঁইয়া সম্পাদিত, ‘নন্দীগ্রামের শহীদ স্মৃতিকথা’, নন্দীগ্রাম সাহিত্যকুঞ্জ, পৃষ্ঠা– ৪৬
৭. ‘অনুষ্টুপ’ ৪২ বর্ষ, ২য়-৩য়, ২০০৮, অর্পিতা ঘোষ, ‘সহজ প্রশ্নের বর্ণমালা’, পৃষ্ঠা– ৪২৬
৮. তদেব, ‘ক্রোড়পত্র’, নান্দীমুখ, ব্রাত্য বসু, পৃষ্ঠা– ৪০২
৯. পাচু রায়, ‘প্রতিবাদী নাটক ও তথ্যচিত্র’, ‘উৎস মানুষ’, সেপ্টেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা – ৪
১০. ‘অনুষ্টুপ’ ৪২ বর্ষ, ২য়-৩য়, ২০০৮, ব্রাত্য বসু, ‘কমরেড কথা’, পৃষ্ঠা– ৪৩১
১১. অচিন্ত্য বিশ্বাসের ‘নন্দীগ্রাম’ নামক নাটকের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, পৃষ্ঠা– ৪
১২. ড. সেখ জাহির আব্বাস, ‘পথনাটকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম’, পূর্বাশা এখন, বিশেষ শারদ, দীপাবলি ও ঈদ সংখ্যা, ১৪২২ পৃষ্ঠা- ৯৩
১৩. ‘নিজের ঢাক’, মানিক ফকির, ‘পাঁচ টুকরো মানিক’ কলকাতা প্রকাশন, কলকাতা, মার্চ ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫৭০
১৪. পাচু রায়, ‘প্রতিবাদী নাটক ও তথ্যচিত্র’, ‘উৎস মানুষ’, সেপ্টেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা – ৪
১৫. তদেব
১৬. তদেব
১৭. মানিক মণ্ডল, ‘বুঝবে খুড়ো বেলা হলে’, ‘মা মাটি মানুষ’, কলাভৃৎ পাবলিশার্স , কলকাতা, ২০১২, পৃষ্ঠা– ৮২
১৮. মানিক মণ্ডল, ‘বুঝবে খুড়ো বেলা হলে’, ‘লালগড়ের লাল মাটি’, কলাভৃৎ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০১২, পৃষ্ঠা– ৫৫
১৯. চন্দন সেন, ‘পঞ্চচন্দন’, ‘শহিদ শিখর’, কলাভৃৎ পাবলিশার্স, কলকাতা, মে, ২০১২, পৃষ্ঠা- ২০৫,
২০. নির্মল ব্রহ্মচারী, ‘গণধিক্কার’, আন্তর্জাতিক প্রকাশন, কলকাতা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা– ৫৭
২১. তদেব, পৃষ্ঠা– ৬৩
২২. ‘গণনাট্য’, ৪৩ বর্ষ : ৬ষ্ঠ সংখ্যা, নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৮৩
২৩. ‘গণনাট্য’, ৪৩ বর্ষ : ৬ষ্ঠ সংখ্যা, নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৮৭
২৪. ‘গণনাট্য’, ৪৩ বর্ষ : ৬ষ্ঠ সংখ্যা, নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৯৬
২৫. তদেব, পৃষ্ঠা – ১০৭
২৬. ‘গ্রুপ থিয়েটার’, ৩০ বর্ষ ১ম সংখ্যা, আগস্ট – অক্টোবর ২০০৭, পৃষ্ঠা – ১৯৮
২৭. ‘গ্রুপ থিয়েটার’, ৩০ বর্ষ ১ম সংখ্যা, আগস্ট – অক্টোবর ২০০৭, পৃষ্ঠা – ২২২
২৮. ‘গণনাট্য’, ৪৪ বর্ষ : ২য় সংখ্যা, মার্চ-এপ্রিল ২০০৮, পৃষ্ঠা- ২৭
২৯. ‘গণনাট্য’, ৪৪ বর্ষ : ২য় সংখ্যা, মার্চ-এপ্রিল ২০০৮, পৃষ্ঠা- ৪১
৩০. তদেব, পৃষ্ঠা – ৪৩
৩১. তদেব, পৃষ্ঠা – ৫৬
৩২. তদেব, পৃষ্ঠা – ৫৬
৩৩. তদেব, পৃষ্ঠা – ৬৪
৩৪. তদেব, পৃষ্ঠা – ১০৮
৩৫. ড. সেখ জাহির আব্বাস, ‘পথনাটকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম’, পূর্বাশা এখন, বিশেষ শারদ, দীপাবলি ও ঈদ সংখ্যা, ১৪২২ পৃষ্ঠা- ৯৪
লেখক : ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম গবেষক ও সহশিক্ষক, মণিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জয়পুর, পুরুলিয়া