সাড়ে পাঁচশো বছর আগেকার স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। লোকমুখে সেই স্মৃতিকথা এখনো শোনা যায়। সিঙ্গুরের বৈদ্যবাটি-তারকেশ্বর রোডের পাশে পুরুষোত্তমপুর গ্রাম। এই গ্রামের ডাকাতে কালীর নাম সকলেই এক ডাকে চেনেন। তারকেশ্বর তীর্থযাত্রীদের কাছে একটা সময়ের তটস্থ এলাকা। এখন সেই ভয় দূর হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাতের অন্ধকারে বাবার মাথায় জল ঢালতে যাবার সময় এখনো গা ছমছম করে তীর্থযাত্রীদের। কথিত আছে এখানে ডাকাতের হাতে ধরা পড়েছিলেন মা সারদা। রাতে ডাকাতের হাতেই চাল-কড়াই ভাজা খেয়ে মা সারদাকে রাত কাটাতে হয়েছিল। অসুস্থ রামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বরে দেখতে যাবার সময় মায়ের স্মৃতি মানুষ আজও মনে রেখেছে। ডাকাত সনাতন বাগদির কথা মনে পড়লে আজও মানুষ রামনাম করতে ভোলেন না। এমনকী এখনো বাচ্ছাদের খাওয়ানোর সময় দুর্ধর্ষ ডাকাত সনাতনকে স্মরণ করেন। আশপাশের তিনটি গ্রামের মানুষ এই জাগ্রত ডাকাতে কালীর একটি মাত্র পুজোই করে আসছেন। এই জাগ্রত কালীকে ঘিরে আজও মানুষের নানান মিথ ও ভক্তি রয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, সিঙ্গুরের ডাকাতে কালীর সামনে নিয়মিত নরবলি হত। সে কালে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ঘটা করে কালীর পুজো করত ডাকাতেরা। এমনকি মায়ের সামনে নরবলি দিত ডাকাতরা। উল্লেখ্য, রাজ্যের অনেক কালী মন্দিরের সঙ্গে নরবলির গল্প জড়িয়ে রয়েছে ঠিকই কিন্তু এখাকার ঘন জঙ্গলের মধ্যে ডাকাতদের যে পুজো চালু হয়েছিল তা আজও বন্ধ হয়নি। সে সময় ডাকাতদের রমরমা চারদিকে। সিঙ্গুরের ডাকাত সনাতন বাগদীর নামে সে সময় জমিদারদের বুক কাঁপত। তবে সনাতন প্রতিদিনই ডাকাতি করত না। তার ডাকাতির পদ্ধতি ছিল কিছুটা আলাদা। একবার ডাকাতির পর সনাতন বেশ কিছুদিন চুপচাপ থাকত। তারপর ডাকাতির দিন ঠিক করে মায়ের পুজো দিত।

তখনও তারকেশ্বরে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে আসা তীর্থযাত্রীর সংখ্যা কম ছিল না। সিঙ্গুর হয়ে আসা যাওয়ার পথে সনাতন বাগদীর দলের হাতে সর্বস্ব খোয়াতে হত সেইসব তীর্থযাত্রীদের। বাদ যেতেন না সাধারণ পথচারীও। ডাকাতির আগে সিঙ্গুরের ডাকাতে কালীর কাছেও নরবলি দেওয়া হত। কিন্তু এক ভয়ংকর ঘটনার পর সেই নরবলি বন্ধ হয়ে যায়। একবার বড়ো ধরনের ডাকাতির পর বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। ফের ডাকাতির দিন ধরেছে সনাতন। রাত ঘন হয়েছে। পুজোর আয়োজন সম্পূর্ণ। কিন্তু বলির উপকরণ কোথায়? তার আয়োজনই যে হয়নি। বলি না দিলে যে পুজো সম্পূর্ণ হবে না। ডাকাতিতে বিঘ্ন আসতে পারে। সনাতন সঙ্গীদের আদেশ দিলেন, যেখান থেকে পারিস বলি ধরে নিয়ে আয়। মাকে রক্ত দিতেই হবে। কিন্তু তার আদেশ মানতে চাইল না সনাতনের সঙ্গীরা। সর্দারের ওপর তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। সর্দার ডাকাতির পর সঙ্গীদের উপযুক্ত বখরা দিত না। শেষ ডাকাতির ধন সম্পদ সর্দার নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।
ক্ষুব্ধ সঙ্গীরা একজোট হয়ে বলেন, আমরা যেতে পারব না। যেতে হলে তুমি যাও। এত বড় স্পর্ধা! নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া মারামারি চলছে এমন সময় রাস্তায় কোলাহল। দেখা গেল, একদল তীর্থযাত্রী আসছে। সর্দারের চোখ চকচক করে উঠল। সোল্লাসে সনাতন বলে উঠল, — দেখ, মা নিজেই নিজের বলির ব্যবস্থা করে নিয়েছে। কিন্তু ডাকাতদের হুমকিতে তীর্থযাত্রীরা ভয় তো পেলই না, উলটে তারা রুখে দাঁড়াল। তীর্থযাত্রীদলের সঙ্গে লড়াইয়ে পারল না সনাতন ও তার দলবল। সনাতনকে মা কালীর পায়ের তলায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল। এলাকার মানুষের বিশ্বাস, সনাতনের অত্যাচার সহ্য করেননি মা কালী। তাই সনাতনকে তিনিই পাপের জন্য চরম শাস্তি দিয়েছিলেন। পাপের শাস্তির পাশাপাশি জয় হয়েছিল ধর্মের।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর শ্যামাপুজোর দিন আচার প্রথা মেনে এই ডাকাতে কালীর পুজোয় এলাকার ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করতে কারও ভুল হবে না। এমনিতেই প্রতি অমাবস্যায় চাল কড়াই ভাজা দিয়ে পুজো শুরু হয়। মন্দির কমিটির সম্পাদক মদন কোলে জানান, এখানে তিনটি গ্রামের কালীপুজো মানেই সকলের কাছে সনাতন ডাকাতের পুজো। প্রথমে বেশ কিছু বছর ঘটে পুজো হত। এখন মন্দিরে বিগ্রহ এনে মা কালী পূজিতা হবেন। তারই প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে।