| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অতুলনীয়া নিবেদিতা : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৮৭৫ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

স্বামী বিবেকানন্দের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে নিবেদিতা যখন এদেশে এসেছিলেন, তখন তাঁর বয়স আঠাশ বছর। আর স্বামীজির মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স বত্রিশ বছর। সেদিক থেকে বয়সের বিশেষত্বেই নিবেদিতা তখনও মুক্ত বিহঙ্গ। বন্ধনহীন পরিসরে অনায়াসেই নিবেদিতা দেশে ফিরে যেতে পারতেন। তাছাড়া তাঁর সমকালীন পরিসরে যে-কয়েকজন স্বামীজির অনুরাগী ও অনুরাগিনী এদেশে এসেছিলেন, তাঁরাও একে একে দেশে ফিরে যান। কেউই তাঁর মতো স্থায়ী হননি। বিশেষ করে অকালে স্বামীহারা অগাধ বিত্তের অধিকারিণী সারা চ্যাপম্যান বুল তথা ‘ধীরা মাতা’, মিস জোসেফীন ম্যাকলাউড তথা ‘জয়া’ প্রমুখের দেশে ফেরার বিষয়টি নিবেদিতার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গতায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিদেশ বিভুঁইয়ে এভাবে সঙ্গিনীর অভাববোধ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে স্বামীজির অকাল প্রয়াণে সেই নিঃসঙ্গতা আপনাতেই প্রকট মনে হয়। সেই নীড় ভাঙা পরিসরে তিনি ইচ্ছা করলেই দেশে ফিরে অন্যভাবেও সেবাকাজে আত্মনিয়োগ করতে পারতেন এবং তাঁর বহুমুখী প্রতিভায় নিষ্ঠা ও সততার মাধ্যমে আত্মপ্রতিষ্ঠাও ছিল সহজসাধ্য। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভগিনী নিবেদিতা’ নিবন্ধে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সেকথা, ‘তাঁহার সর্বতোমুখী প্রতিভা ছিল’। তিনি তাতে আরও জানিয়েছেন, ‘এ কথা মনে রাখিতে হইবে ভগিনী নিবেদিতার যে ক্ষমতা ছিল তাহাতে তিনি নিজের দেশে অনায়াসেই প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারিতেন।’ সে তো গেল তাঁর প্রতিভার আনুকূল্য।

অন্যদিকে এদেশে তাঁর প্রতিকূলতাও স্বামীজির অবর্তমানে অনুকূল হয়ে উঠবে, তা সহজেই অনুমেয়। আত্মীয়স্বজন ছেড়ে যাঁকে পরমাত্মীয়বোধে আপনার করে নিয়েছিলেন, সেই স্মামীজিও তাঁকে আকস্মিকভাবে ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে মঠ ও মিশনের সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব বেড়ে চলে। সেই রিক্ত পরিসরে নিবেদিতার স্বদেশে ফেরার অবকাশ অপ্রত্যাশিত মনে হবে না। অথচ তারপরেও তাঁর অবিচল প্রকৃতিই বলে দেয় তাঁর প্রাণশক্তি কত সবুজ, কত সজীব। কিছুতেই তাঁকে স্বদেশব্রত থেকে বিরত করা যায়নি। সেকথা রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেনঃ ‘নিজেকে এমন করিয়া সম্পূর্ণ নিবেদন করিয়া দিবার আশ্চর্য শক্তি আর-কোনো মানুষে প্রত্যক্ষ করি নাই। সে সম্বন্ধে তাঁহার নিজের মধ্যে যেন কোনোপ্রকার বাধাই ছিল না। তাঁহার শরীর, তাঁহার আশৈশব য়ুরোপীয় অভ্যাস, তাঁহার আত্মীয়-স্বজনের স্নেহমমতা, তাঁহার স্বদেশীয় সমাজের উপেক্ষা এবং যাহাদের জন্য তিনি প্রায় সমর্পণ করিয়াছেন তাহাদের ঔদাসীন্য, দুর্বলতা ও ত্যাগস্বীকারের অভাব কিছুতেই তাঁহাকে ফিরাইয়া দিতে পারে নাই।’ প্রসঙ্গত স্মরণীয়, স্বামীজির মৃত্যুর পর নিবেদিতা বছরদুয়েক (১৯০৭-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯০৯-এর ১৬ জুলাই) এদেশ ছেড়ে পাশ্চাত্যে ছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মা-ভাইবোনের সঙ্গে মিলন হয়েছিল তাঁর। সেদিক থেকে তাঁর ঘরে ফেরার পরিসর আপনাতেই তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে উঠতে পারত। অথচ তা হয়নি। কেননা তাঁর নিজস্ব ঘরটি ১৭নং বোসপাড়া লেনেই অবস্থিত। এজন্য ক্ষণিকের অতিথি হিসাবে তাঁর স্বদেশের কিছু উপহার তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেগুলির মধ্যে ছিল মাটির প্রদীপ, ধূপ, ধূপদানী, নানা রকমের মালা, কবচ, পাথরের নুড়ি, ছোট ছোট বেতের বাক্স, কৃষ্ণ, গোপালের পট আর বোতলে গঙ্গাজল প্রভৃতি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বোসপাড়া লেনের ঘরে ফেরাটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। ফলে পারিবারিক মায়ামমতাও যে তাঁকে আটকাতে পারেনি, তা সহজেই অনুমেয়। সেই সহজতার মধ্যেই তাঁর নীরবে দুরূহ সাধনা যেখানে স্বেচ্ছায় স্বকীয় অস্তিত্ব বিপন্ন করে সর্বজনীনে আপনাকে বিলীন করার গৌরববোধ আজীবন সক্রিয় থেকেছে। বলা বাহুল্য, পাশ্চাত্যে গিয়েও তিনি এদেশের স্বার্থে নিজেকে কর্মমুখর রেখেছিলেন। তাঁর জীবনাদর্শই নবজন্মভূমি পরাধীন ভারতবর্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেদিক থেকে সাধনার লক্ষ্যে সহজতার আভিজাত্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে নিবেদিতার এদেশের জন্য আত্মোৎসর্গ কি শুধুমাত্র স্বামীজির অপূর্ণ কাজের দায়িত্বপালনেই সীমাবদ্ধ, নাকি নিজেকে খুঁজে ফেরার বাতিকই তাঁকে সক্রিয় রেখেছিল, তা নিয়ে ভেবে দেখার অবকাশ আপনাতেই প্রকাশমুখর। তাঁর সেই মহৎ আত্মত্যাগ ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে, অথচ তাঁকে ব্রতচ্যুত হওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় করেনি। বরং এদেশের মধ্যে নিবেদিতার স্বদেশচেতনা তীব্র থেকে তীব্রতর স্বপ্নরঙিন হয়ে উঠেছে। জীবনদীপ নিভে যাওয়ার মুহূর্তেও তাঁর সুগভীর আত্মপ্রত্যয় বর্ণরঙিন মনে হয়। ১৯১১-এর ১৩ অক্টোবর দার্জিলিং-এ জীবনের অন্তিম সময়ে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে : ‘The Boat is sinking. I shall see the Sunrise.’

নিবেদিতার আত্মনিবেদিত প্রকৃতির সঙ্গে অন্যকোনো ব্যক্তিত্বের পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে যে-সব দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনাদর্শের সঙ্গে উঠে আসে, সেগুলোও যথেষ্ট মনে হয় না। বিশেষ করে বাস্তবের সঙ্গে না হলেও সাহিত্যের পরিসরে মহৎ জীবনাদর্শের পরিচয় বর্তমান। সেখানে অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য হ্যাপী প্রিন্স’(১৮৮৮)-এর ছোট সোয়ালো পাখির ভূমিকা স্মরণে আসতে পারে। মৃত্যুর পর মূর্তিতে সুশোভিত রাজপুত্র রাজ্যের প্রজাদের করুণ অবস্থার নিরসনে তাঁর শরীরে যা-কিছু বহুমূল্য রত্নাদি ছিল, সবই একে একে ছোট সোয়ালোকে অনুরোধক্রমে তার মাধ্যমে প্রদান করেন। এদিকে শীত থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মিশরে যাওয়ার দিন ফুরিয়ে যায়। অন্যদিকে রাজপুত্রের আত্মত্যাগে রত্নাদির সঙ্গে তাঁর চোখের মণিও নিঃশেষ হয়ে পড়ায় অন্ধত্ব নেমে আসে। শেষে মিশর যাওয়ার চেয়ে সর্বস্ব ত্যাগী রাজপুত্রের সঙ্গী হয়ে থাকাই সোয়ালো কাছে শ্রেয় মনে হওয়ায় সেখানেই তার মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে স্বামীজির ব্রত উদযাপনের সঙ্গে নিবেদিতার আত্মত্যাগে ছোট সোয়ালোর ভূমিকাটি স্মরণীয় হয়ে উঠলেও তা প্রথমেই বাতিল হয়ে পড়ে। কেননা ছোট সোয়ালো শুধুমাত্র সুখী রাজপুত্রের সঙ্গী হয়ে থাকতে চেয়েছিল, তার বেশি নয়। সেখানে নিবেদিতার জীবনসংগ্রাম কল্পনাতীত। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসের ‘উপক্রমণিকা’য় ঔপন্যাসিক আত্মত্যাগের চেয়েও মহত্ত্বর মহার্ঘের পরিচয় তুলেধরেছেন। নির্জন গভীর অরণ্যানীর নিশীথে নীরবতার মধ্যে মনুষ্যকণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘“আমার মনস্কাম কি সিদ্ধ হইবে না?”’ অবশেষে ঔপন্যাসিকের ভাষায় : ‘এইরূপ তিন বার সেই অন্ধকারসমুদ্র আলোড়িত হইল। তখন উত্তর হইল, “তোমার পণ কি?”

প্রত্যুত্তরে বলিল, “পণ আমার জীবনসর্বস্ব।”

প্রতিশব্দ হইল, “জীবন তুচ্ছ ; সকলেই ত্যাগ করিতে পারে।”

“আর কি আছে? আর কি দিব?”

তখন উত্তর হইল, “ভক্তি।”’

সেই ‘ভক্তি’ দিয়েও নিবেদিতার আত্মোৎসর্গকে মেলানো যায় না। স্বামীজির নিবেদিতায় তাঁর জীবন ভক্তির পরাকাষ্ঠায় উপনীত হয়েছে। সেক্ষেত্রে ‘ভক্তি’র পরিসর ছেড়ে তাঁর জীবনাদর্শ সুদূর প্রসারিত। ব্যক্তিসত্তাকে অতিক্রম করে কীভাবে আত্মনিবেদনে সক্রিয় হয়ে স্বকীয় সত্তাকে সর্বজনীনে একাত্ম করে তোলা যায়, তার বিরলপ্রায় দৃষ্টান্ত রচনা করেছেন নিবেদিতা। সেখানে বহুমুখী প্রতিভাশালিনী হয়েও তাঁর শিক্ষিকার আত্মপরিচয়কে বহন করে ত্যাগ ও সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত করে শুধু তার পরিসরকে সম্প্রসারিতই করেননি, গড়ে তুলেছেন জাতীয় শিক্ষার মহান আদর্শকে। স্বামীজির সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে শিক্ষিকার পরিচয়ে তাঁর স্বতন্ত্র আভিজাত্য বর্তমান। সেখানে য়োহান হাইনরিখ পেস্তালোৎজি (১৭৪৬-১৮২৭) ও ফ্রিডরিখ ভিলহেলম ফ্রোয়েবেল (১৭৮২-১৮৫২)-এর শিক্ষা আন্দোলনের শরিক হয়ে নিবেদিতা যেভাবে জীবনের মূলে শিক্ষার ভূমিকাকে সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন, তাতে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন। স্বামীজি তাঁর প্রিয়তম শিষ্যার শিক্ষিকাসত্তাকে এদেশ গঠনে সবচেয়ে ব্রাত্য পরিসরে তথা নারীশিক্ষার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে নিবেদিতার জীবনবোধের শিক্ষাভাবনা কতটা ব্যক্তিসত্তার বিকাশের সঙ্গে জাতিগত নৈপুণ্যে ঐতিহ্যমুখর, তা রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম সাক্ষাতেই উপলব্ধি করেছিলেন। সেদিক থেকে স্বামীজির জীবনাদর্শে দীক্ষিত হয়ে নিবেদিতা যে তাঁর শিক্ষিকাসত্তাকে এদেশের জাতীয়তাবোধের জাগরণে সক্রিয় করে তুলেছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়। আর তা করতে গিয়ে তাঁর দেশভক্তি শুধু বিস্ময়কর মনে হয় না, সেইসঙ্গে তাঁর দেশঅন্তপ্রাণ প্রকৃতিও তুলনারহিত।

নিবেদিতা স্বামীজির নিবেদিতায় আত্মোৎসর্গ করেই ক্ষান্ত হননি, এদেশের জাতীয়তাবোধে আত্মসমাহিত করতেও দ্বিধা করেননি। এজন্য শুধু হিন্দুত্বের আদর্শকে আপন করে নেননি, তার সংস্কারচেতনার আলোকে এদেশকে স্বদেশ করে তুলেছেন। ক্রমশ তিনি এদেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, আপনার খোলস ত্যাগ করেছেন। জ্যোতিষে বিশ্বাস থেকে বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজা করা সবেতেই তাঁর সমান আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এদেশের দীন-হীন নারীদের সংস্কারাচ্ছন্ন জীবনের মধ্যেও নিবেদিতা মহত্ব খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে অগাস্ত কোঁতের অতীতকে অবলম্বন করে বর্তমানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে উপনীত হওয়ার ( ‘By the past, through the present, to the future’) ভাবাদর্শকে পাথেয় করেছিলেন নিবেদিতা। এজন্য স্বীকারের ঔদার্যে তাঁর পথে নেতির আবাহন না থাকায় ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্ববোধে তাড়িত না হয়ে এদেশে তাঁর স্বদেশভাবনার সংকট অচিরেই কেটে যায়। সেদিক থেকে দেশের ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা বা অস্বীকার করে নয়, বরং আত্মগরিমার সঙ্গে স্বীকার করেই তাঁর দেশগঠনের ব্রত যেভাবে উদ্‌যাপিত হয়েছে, তাতে শুধু তাঁর গুরুভক্তির পরিচয় উঠে আসে না। বরং সেই ভক্তির স্তর অতিক্রম করে দেশের বৃহত্তর ও মহত্বর স্বার্থে আত্মসমর্পণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার আদর্শ অতুলনীয় পরিসর বয়ে এনেছে। স্বামীজির লাগামহীন জীবনাদর্শে নিবেদিতা আপনাতেই যেভাবে ধরা দিয়েছিলেন, তাঁর অবর্তমানে সেই মুক্ত পরিসরই তাঁকে আবার দায়বোধে আবদ্ধ করেছিল। অন্যদিকে তাঁর শিক্ষাশোভন মনের মধ্যে গোঁড়ামির অবকাশ না থাকায় তিনি অনায়াসেই সবকিছুকে সহজসুন্দর করে নিতে পেরেছেন। সেক্ষেত্রে স্বকীয় সত্তায় আস্থাশীল থাকায় যে-কোনোরকম প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য যেমন বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয় তাঁর সহযোগী হয়ে উঠেছে, তেমনই সত্যনিষ্ঠায় তাঁর যুক্তিসিদ্ধ মননের সক্রিয়তাও তাঁকে প্রাণিত করেছে। সেখানে এদেশের স্বার্থই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে। স্বামীজির কথাও তাঁর কাছে সবসময় বেদবাক্য হয়ে থাকেনি। ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে নিবেদিতাকে বিরূপ ধারণা দিয়েছিলেন স্বয়ং বিবেকানন্দ। মিস ম্যাকলাউডকে লেখা চিঠিতে সেকথা স্মরণ করেছেন নিবেদিতা। তাতে ঠাকুরবাড়ির বিরূপতায় আদিরস প্রবাহের দায় নিবিড় হয়ে উঠেছে : ‘Remember that family has poured a flood of erotic venom over Bengal.’ সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কবিতায় যে আদিরসের পরিচয়ে স্বামীজি তাঁর শিষ্যাকে মেলামেশায় বিরত করতে চেয়েছিলেন, তা যে ফলপ্রসূ হয়নি, সময় তার পরিচয়বাহী। শুধু তাই নয়, নিবেদিতাই ঠাকুরবাড়ির যোগসূত্র রক্ষা করেছিলেন। আবার স্বামীজির নির্দেশে ব্রাহ্মদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে তাঁর ব্রাহ্মবিরোধী মানসিকতাও দেশের স্বার্থে উবে গিয়েছিল।

আমেরিকায় অর্থসংগ্রহের সময় নিবেদিতার ব্রাহ্মবিরোধিতার সূত্রক্রমে বরেণ্য দেশনেতা বিপিনচন্দ্র পালের তিক্ত অভিজ্ঞতাই সময়ান্তরে সুমিষ্ট হয়ে উঠেছে। বিপিনচন্দ্রের ভারতের আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে প্রশংসাজ্ঞাপক বক্তৃতা শুনেই বিমুগ্ধ নিবেদিতাই বক্তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। দেশের প্রতি তাঁর এই প্রগাঢ় ভালোবাসাই তাঁর কাছে স্বধর্ম হয়ে উঠেছিল। সেই ভালোবাসার ব্যাপ্তি ও গভীরতায় তাঁর স্বধর্মকে আজীবন শিকড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই শিকড় উপড়ে তাঁর প্রাণের সজীবতা বিনষ্ট না করাই তো দস্তুর। বাগবাজারের বোসপাড়া লেনের সেই অস্বাস্থ্যকর পুরনো বাড়িতে বারবার অসুস্থ হওয়া সত্বেও তা ছেড়ে দিতে যার তীব্র অনীহা (জীবনের পড়ন্তবেলাতেও তাঁর শিকড়ের টান, ‘এই গলি আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, একে ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’), সেখানে স্বধর্ম ত্যাগ করে স্বদেশচ্যুত হওয়া তাঁর পক্ষে যে সম্ভব ছিল না, তা সহজেই অনুমেয়। কেননা জীবনের সবকিছু দিয়েই নিবেদিতা তাঁর স্বদেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সেখানে স্বদেশমাতার পূজার নৈবেদ্যই ছিল তাঁর জীবনের সাধনা। অথচ তাঁর সেই আত্মনিবেদন স্বামী বিবেকানন্দে সীমায়িত হয়ে থেকেছে, আত্মসমর্পণ প্রচলিত ধর্ম ও রাজনীতির ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেখানে হিন্দুধর্মের সন্ন্যাসিনীর পরিচয়ে তাঁর অস্তিত্ব যেমন আত্মগোপন করেছে, তেমনই রাজনৈতিক পরিসরে বিতর্কের আধারে তাঁকে আঁধার করে রাখা হয়েছে। অথচ দল বা সংগঠন অথবা সঙ্ঘ করে অনায়াসেই নিবেদিতা নিজের নামাবলিটি অন্তত সুরক্ষিত করে যেতে পারতেন। যিনি নিজের নামকেই নিবেদিতায় সামিল করেছেন এবং সে-নামে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ সচেষ্ট ছিলেন, তাঁর পক্ষে আত্মসমর্পণে আত্মবিলোপ অনিবার্য ছিল। এজন্যই তিনি নিবেদিতা থেকে সমর্পিতা হতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘দল বাঁধিয়া দলপতি হইয়া উঠা তাঁহার পক্ষে কিছুই কঠিন ছিল না, কিন্তু বিধাতা তাঁহাকে দলপতির চেয়ে অনেক উচ্চ আসন দিয়াছিলেন, আপনার ভিতরকার সেই সত্যের আসন হইতে নামিয়া তিনি হাটের মধ্যে মাচা বাঁধেন নাই। এ দেশে তিনি তাঁহার জীবন রাখিয়া গিয়াছেন কিন্তু দল রাখিয়া যান নাই।’ সেই অমূল্য ‘জীবন’কে উপলব্ধি করার মতো নির্দলীয় পরিসর আপনাতেই সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিবেদিতার নীরব সাধনার পরিচয়ে রয়েছে নিরাসক্ত প্রকৃতি। সে-সম্পর্কে দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’ বইয়ে সশ্রদ্ধায় জানিয়েছেন : ‘এরূপ নিঃস্বার্থ, আত্মপর-ভাব-বিরহিত, প্রতিদান সম্পর্কে শুধু সম্পূর্ণরূপে উদাসীন নহে, একান্ত বিরোধী, কার্যে তন্ময় লোক আমি জীবনে বেশী দেখিয়াছি বলিয়া জানি না। তিনি আমাকে নিষ্কাম কর্মের যে আদর্শ দেখাইয়াছেন, তাহা শুধু গীতায় পড়িয়াছিলাম–তাঁহার মধ্যে এই ভাবটি পূর্ণভাবে পাইয়াছিলাম।’ সে-সবদিক থেকেই স্বেচ্ছায় উপেক্ষিতা নিবেদিতার আত্মসমর্পিতার বিরল প্রকৃতির পরিচয় আপনাতেই অন্তরালে সংগোপনে আপন আভিজাত্য বজায় রেখে চলে। তার পরিচয় প্রচারে নয়, প্রকাশে। সেই প্রকাশেও বহুমুখী প্রতিভাশালিনী নিবেদিতার অনুপম প্রকৃতিই বলে দেয় তিনি শুধু অনর্বচনীয় নন, অতুলনীয়াও।

প্রবন্ধে অনুল্লেখিত তথ্যঋণ : ১। ভগিনী নিবেদিতা, প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, ২। ভারত-উপাসিকা নিবেদিতা, রচনা ও সংকলন রামেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, ৩। রবীন্দ্রনাথ ও নিবেদিতা (প্রবন্ধ), নিতাই বসু, কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শারদ ১৪১৪, ৪। বইয়ের দেশ, জানুয়ারি-মার্চ ২০১৮।

লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিভ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “অতুলনীয়া নিবেদিতা : স্বপনকুমার মণ্ডল”

  1. সুখেন দাস says:

    সোয়ালো,আনন্দমঠ, বিপিন চন্দ্র পাল, রবীন্দ্রনাথ ও স্বামীজীর নিবেদিতাকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ…

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev