পুরুষশাসিত সাহিত্য সংসারে নিজের এক নির্দিষ্ট স্থান করে নেবার জন্য বাংলা নারীসমাজ দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রাম করে এসেছেন। তাঁদের ঐ সংগ্রাম ফলশালী হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে স্ত্রীশিক্ষার আধুনিক অধ্যায়ের সূচনার সঙ্গে। উনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই তাই কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য স্ত্রী-রচনা আমরা পেয়েছি। অবশ্য এর পূর্ণ ফসল আমরা পেয়েছি উনিশ-বিশ শতকের সন্ধিক্ষণ থেকে শুরু করে একাল পর্যন্ত বিন্যস্ত কাল-পরিধিতেই। এই কাল পর্যায়েই জন্মেছিলেন সীতাদেবী― তাঁর জন্ম হয়েছিল কলকাতায় ১০ এপ্রিল ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে। সীতাদেবীর বংশ পরিচয় উল্লেখ করার মত। কারণ তিনি প্রবাসীর বিশ্রুত সম্পাদক রামনন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা। তাঁর দিদি শান্তাদেবীর (নাগ) কথাও এই প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। তাঁর কথা সীতাদেবী প্রসঙ্গে এসে পড়বে― তবুও তাঁকেও পৃথকভাবে স্মরণ করার প্রয়োজন আছে।
সীতাদেবী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে। দুদশকও পার হয়নি। কিন্তু সীতাদেবী বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছেন। মৃত্যুর ঠিক আগেই রবীন্দ্রসদনের এক মঞ্চে অন্যান্যদের সঙ্গে তাঁকেও সম্বর্ধনা জানানো হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দেখেছিলেন কেবল এক বৃদ্ধ, যিনি সম্ভবত যৌবনকালে তাঁর উপন্যাসের পাঠক ছিলেন, একটি অটোগ্রাফ খাতা নিয়ে সই করাতে গেছেন― বর্তমান প্রজন্মের কোনো পাঠক নয়। ‘পরভৃতিকা’ ও ‘পুণ্যস্মৃতি’ ছাড়া তাঁর অন্যান্য রচনার কথা সম্ভবত তাঁর জীবনকালেই পাঠকগণ ভুলতে শুরু করেছিলেন― এটা আক্ষেপের কথা।
দুই.
সীতাদেবী রামানন্দ-মনোরমার তৃতীয় সন্তান। কলকাতায় জন্ম হলেও পিতার তত্কালীন কর্মস্থল এলাহাবাদেই সীতার বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। লখনউ এলাহাবাদে তখন বাঙালিদের এক সংগঠিত সমাজ ছিল। ফলে প্রবাসিনী হয়েও সীতা বাঙালিই রয়ে গেছিলেন। এলাহাবাদে মেয়েদের পড়াশুনোর তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় কন্যাদের পড়াশুনোর ব্যবস্থা স্বগৃহেই করেছিলেন। গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধান ছাড়া মনোরমাদেবী নিজেই সন্তানদের শিক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি নিজে ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত জানতেন― মেয়েদের তাই গেয়ে শোনাতেন। আর পড়ে শোনাতেন রবীন্দ্রকাব্য। অস্বীকার করে লাভ নেই, ব্রাহ্মপরিবারগুলিতেই প্রথম মেয়েদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে আধুনিক যুগে। অতএব বাল্যকালেই একটি রবীন্দ্র পরিবেশে সীতাদেবীরা বড়ো হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তাছাড়া সঙ্গ-পরিবেশও বেড়ে ওঠার পক্ষে একটা বড়ো ব্যাপার। ছোট থেকেই সীতাদেবীরা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া মেজর বামনদাস বসু, মদনমোহন মালব্য, দেবেন্দ্রনাথ সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। এদের সঙ্গ ও স্নেহ তাঁদের উত্তর-জীবন গঠনে খুবই সহায়ক হয়ে উঠেছিল সন্দেহ নেই।
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফিরে আসার পর সীতাদেবী দিদির সঙ্গে ভর্তি হলেন বেথুন বিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করলেন ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে। ঐ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি. এ পাশ করলেন ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। তখন মেয়েদের এম. এ পড়ার ব্যাপারে নানা অসুবিধা ছিল। শান্তাদেবী বিশেষ অনুমতি নিয়ে এম. এ পড়লেও সীতাদেবীর পড়া হয়ে ওঠেনি।
তিন.
বিদ্যালয়ে-মহাবিদ্যালয়ে পড়ার বিধিবদ্ধ পাঠ সাঙ্গ হলেও সীতাদেবী ছিলেন আমৃত্যু পাঠিকা। বাংলা-ইংরেজি সাহিত্যের মুখ্য বিষয়গুলির সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ পরিচিত ছিলেন, ফরাসি সাহিত্যেও তাঁর যাতায়াত ছিল সহজ। পাঠিকা সীতাদেবী এবার হয়ে উঠলেন লেখিকা। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় সে সময়ে ‘উদ্যানলতা’ নামে ধারাবাহিক এক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। লেখকের নাম হিসেবে মুদ্রিত হত ‘সংযুক্তাদেবীর’ নাম। এই সংযুক্তা একজনের নাম নয়, দুজনের। শান্তা-সীতা দুইবোন মিলে এই উপন্যাস রচনা করতেন। এ গ্রন্থকারে প্রকাশিত ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে। এর আগেই দুবোনে মিলে শ্রীশচন্দ্র বসুর (ছদ্মনাম শেখ চিল্লী) Folk-Tales of Hindoosthan বইটির অনুবাদ করে ‘হিন্দুস্থানী উপকথা’ নামে প্রকাশ করেন ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে। এটিকে চিত্রশোভিত করেন সুখ্যাত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ‘উদ্যানলতা’ উপন্যাস দুবোনের লেখা হলেও কোন অংশ কার লেখা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণেও তা ধরা সম্ভব নয়― এমন এর লিখন শৈলীর সূক্ষ্মতা। সীতাদেবী এককভাবে এর ইংরেজি অনুবাদ করেন। ৩৩২ পৃষ্ঠার এই ইংরেজি অনুবাদ Garden Creeper নামে প্রবাসী প্রেস থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। J.D. Anderson ‘The Times Literary’ পত্রিকায় উপন্যাসটির প্রশংসা করেন।
প্রধানত প্রবাসী পত্রিকার পৃষ্ঠাতেই সীতাদেবীর সাহিত্য রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। তবুও ‘কল্লোল গোষ্ঠী’ থেকে তিনি একেবারে বিচ্যুত ছিলেন না। কল্লোলের অগ্রদূত ফোর আর্টস ক্লাবে তিনি আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে যেতেন। ‘কল্লোল’-এ তাঁর অন্তত একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল― মনস্কামনেশ্বর (মাঘ ১৩৩০)। তবুও তিনি ‘কল্লোলীয়’ বা ‘ভারতীয়’ ছিলেন না― ছিলেন ‘প্রবাসীয়’। ভারতী গোষ্ঠীয় লেখিকাদের মতোও তাঁরা অবশ্যই আধুনিকতা ও প্রগতিকে সাহিত্যে অঙ্গীকার করেছিলেন।
সীতাদেবীর ছোটগল্প সংকলন তিনটি― বজ্রমণি (১৯১৮), ছায়াবীথি (১৯১৯) এবং আলোর আড়াল (১৯২১)। বহু ছোটগল্পের রচয়িত্রী হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসেই তাঁর অনায়াসচারিতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর বৃহদায়তন ছোটগুলির অনেকগুলিই উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত। গল্পগুলি আকারে বড় হলেও বহুজটিলাক্রান্ত নয়। কিন্তু বেশির ভাগই গল্প রস-স্নিগ্ধ, কয়েকটি অবশ্য tale-এর বৈশিষ্ট্যকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। চিরন্তনী নারীর আত্মোন্মোচন, নারী হৃদয়ের সহজ আবেগময়তার সংহত প্রকাশ, মমতাস্নিগ্ধ নারী-ব্যক্তিত্বের নাতিমৃদু কাব্যসৌরভে সীতাদেবীর গল্পগুলি অনবদ্য। ‘আলোফুল’ গল্পের জীবনায়নের সংকেত, ‘শাশ্বতী’ গল্পের ভালবাসার অর্ঘ, ‘আলোর আড়াল’ গল্পের রূপহীনার প্রেমবিজয় কাহিনী ভোলার নয়।
তবুও উপন্যাসেই সীতাদেবী স্বচ্ছন্দ এবং স-ছন্দ। তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে পথিকবন্ধু (১৯২০), রজনীগন্ধা (১৯২১), সোনার খাঁচা (১৯২৭), পরভৃতিকা (১৯৩০), বন্যা, মাতৃঋণ (১৯৩৪), মাটির বাসা (১৯৪৫), সবার উপরে (১৯৬১), জন্মস্বত্ব (১৯৩৬), ক্ষণিকের অতিথি (১৯৩৫), মহামায়া (১৯৬১) প্রভৃতি স্মরণযোগ্য।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও লিখেছেন যে সীতাদেবীর ‘পরভৃতিকা’ উপন্যাস ‘উত্কর্ষের দিক দিয়া সর্বনিম্নস্থান অধিকার করে’ তবুও এটিই তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস। এর গার্হস্থ্য আবেদন, কাহিনী বিন্যাসের মনোরম আবেষ্টনী সুধীর-কৃষ্ণার প্রেমের গভীরতাকে প্রত্যায়িত করতে না পারলেও জনচিত্ত জয়ে সমর্থ হয়েছিল। এরমধ্যে বর্মাদেশের বিবরণ যে লেখিকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফসল পাঠক তা যেন বুঝতেই পারেন না। সীতাদেবীর ‘পথিকবন্ধু’ একসময় যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তবে তাঁর বিশিষ্ট উপন্যাস বলতে ‘রজনীগন্ধা’ই উল্লেখযোগ্য। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়― ‘স্ত্রী-জাতির পক্ষ হইতে, তাহাদের অন্তর্দৃষ্টির বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত করিবার জন্য উপন্যাস লিখিলে কিরূপ নূতন আর্টের সৃষ্টি হইতে পারে, ‘রজনীগন্ধা’ তাহার এক চমত্কার দৃষ্টান্ত।’ তিনি এই উপন্যাসে শার্লট ব্রন্টির উপন্যাসের রোচেস্টার ও জেন আয়ারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে চমত্কৃত হয়েছেন। বাস্তবিকই উপন্যাসিক সীতাদেবীর রচনা সমূহের পূর্ণ মূল্যায়নের যথেষ্ট প্রয়োজন আছে।
সীতাদেবীর সাহিত্যচর্চার আর এক অংশের স্বাদু পাঠক হলেন ছোরা। তাঁদের জন্য অনূদিত ‘হিন্দুস্থানী উপকথা’র কথা আগেই বলেছি। এছাড়া আরও উল্লেখযোগ্য ‘নিরেট গুরুর কাহিনী’ (১৯১৪), ‘আজব দেশ’ (১৯১৯) এবং সাতরাজার ধন (শান্তাদেবীর সঙ্গে একযোগে―এর ‘রাজকন্যার স্বয়ম্বর’ এবং ‘গুপ্তধন’ গল্প দুটি সীতাদেবী রচিত) ‘নিরেট গরুর কাহিনী-র’ সঙ্গে হয়তো ‘হিন্দুস্থানী উপকথার’ কিশোর পাঠক অপরিচিত নয়। এ আসলে ত্রিচিনাপল্লীর নবাবচন্দা সাহেবের দেওয়ান ইতালীদেশীয় পাদরী বেস্কীর তামিল ভাষায় লেখা ‘গুরু পরমার্তন’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ “The Adventures of the Gooroo Noodle’ (বেঞ্জামিন ব্যাবিংটন-কৃত অনুবাদ)-এর বাংলা অনুবাদ। এক নিরেট গুরুর নানা মজার মজার কাহিনীতে এই বই পরিপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে বলার প্রয়োজন ইংরেজি ভাষায় সীতাদেবীর অধিকারের প্রমাণ আমরা একাধিকবার পেয়েছি। শান্তাদেবীর সঙ্গে অনূদিত “Tales of Bengal’ গ্রন্থের ৬টি গল্পের মধ্যে তিনটি গল্প―The Letter, The Broken Lily, The Wedding Dress― সীতাদেবীর রচনা। বইটির ভূমিকায় E. J. Thompson বিশেষ করে The Letter গল্পটির বিশেষ প্রশংসা করেন। এ ছাড়া তিনি নিজের ‘পথিক বন্ধু’ (The Knight Errant), পরভৃতিকা (His Mother’s Image) ক্ষণিকের অতিথি (Travellers in The Night) ―‘বন্যা’ প্রভৃতি উপন্যাসের অনুবাদও করেন। এগুলি পিতৃ-সম্পাদিত Modern Review পত্রিকায় পত্রস্থ হয় ও পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ বইগুলির প্রকাশক R. Chatterjee হলেও Tales of Bengal বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেন Oxford University Press, London ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। এছাড়া তাঁর ‘সোনার খাঁচা’ উপন্যাসটির অনুবাদ করেছিলেন A. E. Brown ২০০ পৃষ্ঠার এই অনুবাদও প্রকাশ করেছিলেন পিতা রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। অনুবাদক হিসাবে সীতাদেবীর কৃতিত্ব ছিল অসামান্য ―মূল্যের রসকে তিনি বহুলাংশেই অনুবাদের মধ্যে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।
চার.
সীতাদেবীর জীবনে তাঁর পিতা ছাড়া আর যে দুজন পুরুষের প্রভাব অনতিক্রমনীয় ছিল তার একজন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যজন তাঁর স্বামী কবি সুধীরকুমার রায়চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের অনুপুঙ্খ বিবরণ আজকের পাঠক পুণ্যস্মৃতির মাধ্যমেই পাবেন। সীতাদেবী যদি অন্য কোনো বই না লিখতেন, শুধুমাত্র এই বইটির জন্যই চিরস্মরণীয়া হয়ে থাকতে পারতেন। পুলিনবিহারী সেনের যত্নে এ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় শ্রাবণ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে। পরে শ্রাবণ ১৩৭১ বঙ্গাব্দে এর এক অনবদ্য সচিত্র সংস্করণও প্রকাশিত হয় (প্রাপ্তিস্থান জিজ্ঞাসা, কলকাতা)। গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে এটি রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের পর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে (কার্ত্তিক― চৈত্র ১৩৪৮, বৈশাখ ১৩৪৯) পত্রস্থ হয়। অনবদ্য এই বই ‘রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক অমূল্য দলিল বিশেষ। কারণ এখানে লেখিকা নন, রবীন্দ্রনাথই সর্বব্যাপী হয়ে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির নানা সংবাদও পাঠক এখানে পাবেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের বিবাহে উপস্থিত থেকেছেন, বর্মা প্রবাসে একধিকবার তাঁদের বাড়ি গেছেন। কবির নানা অনুষ্ঠানে কাব্যপাঠের আসরে লেখিকা উপস্থিত ছিলেন। সে এক অনবদ্য জীবনের ইতিহাস।’
‘পুণ্যস্মৃতি’ ছাড়া ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় সীতাদেবী নানা রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এদের মধ্যে The Venture পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত্কারের ইংরেজি অনুবাদ ‘বিলাতে রবীন্দ্রনাথের সহিত সাক্ষাৎ (আষাঢ় ১৩২৮)’, ‘গোরা’ উপন্যাসের আলোচনা ‘সাহিত্যের ভাষা ও বস্তু (অগ্রহায়ণ ১৩৪১),’ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্রনাথের জন্মোত্সবের বিবরণ ‘মানসপটে রবীন্দ্রনাথ’ (বৈশাখ ১৩৪৮) উল্লেখযোগ্য।
এলাহাবাদ বাসকালে ৪/৫ বছর বয়সে সীতাদেবী রবীন্দ্রনাথকে দেখেন তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ ঘটে কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের পাশের বাড়িতে বসবাসকালে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে। বস্তুতপক্ষে এই সময় থেকেই সীতাদেবীর সাহিত্য জীবনের শুরু। এরপর পিতা রামানন্দের সঙ্গে এসে শান্তিনিকেতনে তিনি ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাস পর্যন্ত থাকেন। এসময়েই রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে তিনি আসতে পেরেছিলেন। আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথ রামানন্দের এই কন্যাটিকে স্নেহ করে গেছেন। উপস্থিত থেকেছেন তাঁদের বিবাহে, গেছেন ব্রহ্মদেশের বাড়িতে। ঈশ্বরাধিক রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’র পাণ্ডুলিপি সীতাদেবীকে প্রদান করে তাঁর স্নেহ প্রীতির সীলমোহর অভিজ্ঞান রেখে গেছেন।
পাঁচ.
সীতাদেবীর বিবাহ হয় কবি সুধীরকুমার চৌধুরীর সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। ৮ এপ্রিল ১৯২১ তারিখে সুধীরকুমারের সঙ্গে নমস্কার বিনিময়ের পর প্রথম আলাপ হয় প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের বাড়ির ছাদে একটি Mixed Club প্রতিষ্ঠার দিবসে। সুধীরকুমার তখন ‘প্রবাসী’র সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে ‘সোস্যাল ফ্রেটারনিটি নামক সাপ্তাহিক অধিবেশন মাঝে মাঝে একসঙ্গে হত এবং তারই ফলে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। সুধীরকুমার সীতাদেবীর কাছে বিবাহের প্রস্তাব করলে তা মঞ্জুর হয় এবং মা-বাবার অনুমতি নিয়ে বিবাহ সম্পাদিত হয়। রবীন্দ্রনাথ বিয়েতে উপস্থিত হন, তাঁর ‘কাব্য-গ্রন্থাবলী’ উপহার দেন এবং বৌভাতে এসে একটি পাতিলেবু সীতাদেবীর হাতে দিয়ে বলেছিলেন― সফলতা লাভ কর।’
তারপর স্বামীর তত্কালীন কর্মস্থলে সীতাদেবী ব্রহ্মদেশে গিয়ে রেঙ্গুনে প্রায় ছ’বছর কাটিয়ে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পুনশ্চ কলকাতায় ফিরে আসেন। এসময়ের মধ্যে সীতাদেবী প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। ‘একান্তা’, ‘জলের লিখন’ কাব্য গ্রন্থ দুটির কারণে সুধীরকুমারও কবি হিসাবে সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মদেশে যাবার আগে সীতাদেবীকে বলেছিলেন ‘তোমার কবিটিকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে এস, ব্রহ্মদেশে এসে কি লাভ হবে?’ সে কথা না শুনে ব্রহ্মদেশে চলে গিয়েছিলেন বলে পরবর্তী জীবনে দম্পতির ক্ষোভের অভাব ছিল না।
ক্ষোভ ছিল, দুঃখও কম ছিল না এঁদের জীবনে। অর্থকষ্ট একসময় চূড়ান্ত হয়েছিল। এগারো বছর বয়সের একটি মেয়েকে আর এক বছরের একটি ছেলেকে চিরতরে হারনোর বেদনাও সীতাদেবীকে বহন করতে হয়েছিল। তবুও হয়তো দুঃখকে তাঁরা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। সুধীরকুমারের ভাষায়― ‘সীতা ছিল আমার সর্বক্ষণের বন্ধু। সীতা আমার চেয়ে আড়াই বছরের বড় ছিল। অথচ রাজনীতি সাহিত্য ধর্ম ও সংসার জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে আমাদের দুজনের ছিল গভীর মিল।’ হয়তো দুঃখ বহনের সামর্থ্য তাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের ঈশ্বরাধিক দেবতা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই।