আমতলি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ১২৬ নম্বর বুথে নিরাপত্তায় থাকা সিআইএসএফ-এর গুলি চালানোর ঘটনায় কোচবিহারের পুলিশ সুপার ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর তরফে যতই ‘আত্মরক্ষার তত্ব’ খাড়া করার চেষ্টা করুন না কেন, কট্টর মমতা বিরোধীরাও কিন্তু প্রশ্ন তুলছেন, কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে পুলিশ লাঠি অথবা কাদানে গ্যাস না ছুড়ে একেবারে সরাসরি গ্রামবাসীদের শরীর লক্ষ্য করে গুলি চালালো? নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুলিস পর্যবেক্ষক বিবেক দুবের রিপোর্ট বলছে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে গ্রামবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই বুথ আক্রমণ করেছিল। তারা ভোটকর্মীদের মারধর ও বাহিনীর জওয়ানদের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনায় দু’জন পোলিং অফিসার, এক হোমগার্ড ও এক আশা কর্মী আহত হন। কিন্তু গ্রামবাসীরা হটাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন কেন? তবে কি জওয়ানরা ভোট দিতে আসা গ্রামবাসীদের সঙ্গে এমন আচরণ করল যাতে তাদের ক্ষোভ চরম সীমায় পৌঁছায়?
প্রশ্ন; যদি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর গ্রামবাসীরা চড়াও হয় কিম্বা আক্রমণ ঘটায়, তাদের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তা হলে সেই ফুটেজ কোথায়? প্রশ্ন, উন্মত্ত গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ করতে সরাসরি শরীর লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার আগেও তো কয়েকটি ধাপ থাকে। কেন সেগুলি প্রয়োগ না করেই জওয়ানরা অব্যর্থ নিশানায় গুলি ছুড়ে দিল, কার নির্দেশে এটা করা হল? ক্ষুব্ধ মানুষের জমায়েত ও বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর তো কিছু পর্যায়ক্রম রয়েছে। প্রথমে লাঠি চালানো, তাতে কাজ না হলে কাদানে গ্যাসের শেল ফাটানো। তারপর শূন্যে গুলি। কিন্তু শীতলকুচিতে সরাসরি ভোটারদের বুক ও পিঠ লক্ষ্য করে গুলি চলেছে। গ্রামবাসীদের পায়েও গুলি চালানোর চেষ্টা করা হয়নি!
উল্লেখ্য; সিএএ বা এনআরসি নিয়ে যখন রাজ্যে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তখন বিজেপির রাজ্যসভাপতি দিলীপ ঘোষ বা দলের সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু একাধিকবার বলেছিলেন, ‘পুলিশ গুলি চালিয়ে মারবে’। তাঁদের ওই অমানবিক ও চূড়ান্ত উস্কানিমূলক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় এবং রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত।
শনিবারের ওই ঘটনার পরও দিলীপ ঘোষ বরানগরে ভোট প্রচারে এসে শাসিয়ে গেলেন, ‘…এত দুষ্টু ছেলে এল কোথা থেকে? বাংলায় এত দুষ্টু ছেলেদের রাখা যাবে না। সবে শুরু হয়েছে এবার সারা বাংলায় হবে। বাহিনি বন্দুক শুধু দেখাতে আসেনি, ১৭ তারিখ ভোট দিতে এসে বাহিনি দেখবেন। শীতলকুচিতে কী হয়েছে দেখেছেন তো, জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে…’
এদিন শিলিগুড়ির সভা মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শীতলকুচির ঘটনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি দায়ী করে বললেন, ‘দিদির উসকানি’। এদিনের আরেকটি ঘটনা, স্থানীয় লালবাজার গ্রাম পঞ্চায়েতের পাঠানটুলির ২৮৫ নম্বর বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় আনন্দ বর্মন নামে ১৮ বছর বয়সি এক নতুন ভোটারের। ওই ঘটনার জন্য বিজেপি’র দাবি, তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই গুলি চালিয়েছে।
নির্বাচনে মানুষকে যারা নিরাপত্তা দিতে এসেছে সেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতেই ভোটারদের প্রাণ হারাতে হল, অতীতেও এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। লক্ষ্যনীয়; রক্তাত্ত নির্বাচন নিয়ে প্রায় আর কোনও কথাই নির্বাচন কমিশন বলছেন না। নির্বাচন কমিশনার সুদীপ জৈনের ছকে বাঁধা কথা, বিষয়টি নিয়ে ফোনে প্রাথমিক রিপোর্ট নিয়েছেন। কী কারণে গুলি চালাতে হল, কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেল না, সব সমেত পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করেছেন তিনি।
এটা স্পষ্ট নির্বাচন কমিশন চাপে পড়ে গিয়েছে। চতুর্থ দফার ভোট শেষে হতেই নির্বাচন কমিশন এ রাজ্যের ভোট প্রচারের নিয়মে সাততাড়াতাড়ি পরিবর্তন ঘটিয়েছে। শনিবারই কমিশন জানিয়ে দেয় আর ৪৮ ঘণ্টা নয়, এবার থেকে ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগেই প্রচার বন্ধ করে দিতে হবে। একে নিয়মের পরিবর্তন না বলে কেন্দ্রের নির্দেশ বলাই ভাল। তা না হলে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে একমাত্র জরুরি অবস্থার সঙ্গেই তুলনা করতে হয়।
প্রচারের ক্ষেত্রে নিয়ম বদলের আগেই নির্বাচন কমিশন চতুর্থ দফার ভোটে বেনজির হিংসার কারণে কোচবিহারে আগামী ৭২ ঘণ্টা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে রবিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোচবিহার সফর বাতিল হয়ে যায়।
নির্বাচন কমিশন যতই নিয়ম নীতির রদবদল ঘটাক না কেন, একটা বিষয় কিন্তু স্পষ্ট ফুটে উঠছে; এ রাজ্যে ভোটের যত দফা বাড়ছে ততই কিন্তু হিংসা বাড়ছে। প্রথম দুই দফা আপাত শান্ত থাকলেও, তৃতীয় দফার ভোট ছিল অশান্ত। চতুর্থ দফা রক্তাক্ত হল কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে পাঁচটি মৃত্যুতে।
গতকাল কেবল প্রচারের সময় কমিয়ে কমিশন ক্ষান্ত হননি, রাজ্যে বাকি চার দফার ভোট যাতে আরও শান্তিপূর্ণ হয় তার জন্য আসতে চলেছে আরও কেন্দ্রীয় বাহিনী। রাজ্যের বাকি চার দফা ভোট যাতে সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হয় তার জন্য আরও ৭১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী বাংলায় আসছে। তার মধ্যে থাকছে ৩৩ কোম্পানি বিএসএফ, ১২ কোম্পানি সিআরপিএফ, ১৩ কোম্পানি আইটিবিপি, ৯ কোম্পানি এসএসবি এবং ৪ কোম্পানি সিআইএসএফ। বাকি চার দফার ভোটে বিভিন্ন জায়গায় এদের মোতায়েন করা হবে। একথা জানার পরই সহজ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে কী হিংসা আরও বাড়বে? কারণ দেখা যাচ্ছে, যতই কেন্দ্রীয় বাহিনী বাড়ছে ততই অশান্তি বাড়ছে।
Exclnt lekha
নির্বাচন কমিশন যে বিজেপির একটি দালাল সংস্থা এটা বুঝতে রাজ্যবাসীর বেশি সময় লাগে নি। আর গুলি চালানোর
নেপথ্যে কারা সেটাও, তাদের কবর তারা চারিদিকে খুড়ে রেখেছে নেজেরা গিয়ে শুয়ে পড়বে, আমি আপনি মাটি চাপা
দেব।
যে বা যারা বলছেন বাহিনি বন্দুক শুধু দেখায় না চালায়… জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে… তারা নিজেদের কি প্রমান
চাইছেন? আমরা জানি তারা শুধু একটা শীতলকুচি নয় আরও বহু খুন-দাঙ্গা-লুটের আসামি। সঠিক সময়ে সঠিক লেখা।