একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পরিবেশ আগের সব নির্বাচনের তুলনায় আলাদা। তাই জাতীয় নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীনভাবে রাজ্যে ৮ দফায় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে। যেহেতু কমিশন বাংলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায় তাই নির্বাচন ঘোষণার অনেক আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়। রাজ্যের সর্বত্র সেনা বাহিনীর রুট মার্চ শুরু হয়ে যায়। জেলায় জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ ও কার্যকলাপের ওপর নজর রাখতে কমিশনের তরফে নাকি ভিডিও ফুটেজও চাওয়া হয়।
কিন্তু আট দফার মধ্যে মাত্র চার দফাও শান্তিপূর্ণ হল না। উলটে এমন রক্তাক্ত নির্বাচন বাংলায় হয়েছে বলেও কেউ মনে করতে পারছেন না। মাথাভাঙায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের গুলিতে চারজন ভোটারকে প্রাণ হারাতে হল। নির্বাচন কমিশনের দাবি, প্রায় ৩০০ জন ঘিরে ধরে জওয়ানদের রাইফেল কেড়ে নিতে চেয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে গুলি চালান জওয়ানরা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের এই আত্মরক্ষার তত্ত্বটি কিছুতেই মানতে পারছেন না রাজ্যের প্রাক্তন পুলিশ অফিসার, প্রশাসক এমনকি আইনজীবীরাও।
জেলা প্রশাসনের রিপোর্ট অনুযায়ী, সকাল দশটা পর্যন্ত শীতলকুচির ১২৬ নম্বর বুথে ভোটগ্রহণ হয়েছে নির্বিঘ্নে। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের কাছে মানিক মহম্মদ নামে একটি ছেলের অসুস্থ হয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষ ও সিআইএসএফ জওয়ানদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়। জেলা প্রশাসনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এরপর আরও এলাকাবাসী জড়ো হয়। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু মহিলার হাতে ধারালো সরঞ্জামও ছিল। অভিযোগ, সিআইএসএফ জওয়ানদের ঘিরে ধরে তারা হামলা চালায়। জওয়ানদের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করে৷ এতে সিআরপিএফ জওয়ান এবং বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা হোমগার্ড আহত হন৷ কাছেই থাকা ক্যুইক রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। এর পরেই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে শূন্যে গুলি চালান সিআইএসএফ জওয়ানরা৷ কিন্তু তাতেও উন্মত্ত জনতা পিছু না হঠায় আত্মরক্ষায় এবং ইভিএম-সহ সরকারি সরঞ্জাম বাঁচাতে ভিড় লক্ষ্য করেই গুলি চালান সিআইএসএফ জওয়ানরা৷
শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী বা সিআইএসএফ-এর জওয়ান যারা মূলত বিমানবন্দর, স্টিল প্ল্যান্ট, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি পাহাড়া দিয়ে থাকে তাদের এনে নির্বাচন কমিশন ভোটে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। ভাবনাটা, হাতে বন্দুক থাকলেই শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা যায়। শান্তি কিংবা শৃঙ্খলা খুবই সংবেদনশীল বিষয়। যে গ্রামে সেই বাহিনি মোতায়েন হচ্ছে সেখানকার ভাষা থেকে শুরু করে গ্রামবাসীদের রীতিনীতি একটু বুঝতে হয়, তা না হলে প্রতিমুহুর্তেই ভুল বোঝাবুঝির সম্ভবনা থাকে। এসব কথা কি নির্বাচন কমিশনের জানা ছিলনা, নাকি জেনে বুঝেই এমন ব্যবস্থা?
বিশ্বাস করতে হবে অত বড় একটা বাহিনির কারও হাতে মোবাইল ছিল না। ৪৮ ঘণ্টা হয়ে গেল, এখনও কোনও ফুটেজ জমা পড়ল না। কেন্দ্রীয় বাহিনী কিন্তু জানে, গুলি চালালে তার তদন্ত হয়। তদন্তের সার্থে হোক কিম্বা যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাকে সামলাতেও কিছু একটা প্রমাণ সামনে আনতেই হবে।
নিরাপত্তার কারণেই কমিশন প্রতিটা বুথের ভেতরে ও বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছেন। গ্রামবাসীদের অস্ত্র সমেত ঘিরে ফেলা, বন্দুক কাড়ার চেষ্টা রেকর্ড হয়েছে। সে ফুটেজ কোথায় গেল? অশান্ত গ্রামবাসীদের রুখতে ক্লোস রেঞ্জ থেকে গুলি যে চালানো হল, সেই নির্দেশ কে দিল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে? সিআইএসএফেকে গুলি চালানোর নির্দেশ যদি জেলা শাসকও দিয়ে থাকেন, তাহলেও তাঁর লিখিত অর্ডার থাকবে। কারণ মৌখিক নির্দেশে কিছু হয় না। সিআইএসএফ তো অর্ডার ছাড়া গুলি চালাতে পারে না।
পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল যে লাঠি চালিয়ে, টিয়ার শেল ফাটিয়ে, শূন্যে গুলি ছুড়ে গ্রামবাসীদের ছত্রভঙ্গ করা যেত না? সে ট্রেনিং তো কেন্দ্রীয় বাহিনীতে মাসের পর মাসে ট্রেনিং চলে। যদি বিক্ষোভকারীরা সত্যিই সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন গুলি চালানোর দরকার হয়। কিন্তু হাঁটুর নীচে, বড়জোর কোমরের নীচে, তার ওপরে কখনই নয়। আহত হলেও প্রাণহানি কিছুতেই নয়। তার মানে গুলি চালানো হয়েছে কোনও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি, তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঘিরে ধরা হয়। অথচ সিআইএসএফ-এর বা পুলিসের কেউ আহত হলেন না। এমনকী যেসব ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের ঘিরে ফেলা হয় সেগুলি গেল কোথায়? আসলে গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দিলে কেউ না কেউ মারা যাবেই। প্রাণ গেলে পরের চার দফায় ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে।
যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন তুলেছেন এই লেখায়, উত্তর যখন নেই তার মানে অপরাধী ধরা পড়েছে।
খুবই ভাল প্রতিবেদন। প্রশ্নগুলি অত্যন্ত সঠিক ও মূল্যবান।
লেখায় যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে তার একবিন্দু অযৌক্তিক বা মনগড়া নয়, উত্তর দিতে পারবে না কোচবিহার জেলা পুলিশ
প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন কিংবা কেন্দ্রীয় বাহিনি। আর গেরুয়া শিবির, এদেশে তাদের গণ কবরের ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে,
এখন শুধু মাটি চাপা দেওয়ার অপেক্ষা।
পড়লাম । অত্যন্ত যৌক্তিক কথা লিখেছেন।
নির্বাচন কমিশন নিজেই কোনও নিয়ম নীতি মানছে না, যা খুশি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে।
শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালিয়েছে ভোটার লক্ষ্য করেই। কয়েকটা মানুষের লাশ ফেলে দিতে পারলে রাজ্যজুড়ে
সন্ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে, পরের দফায় মানুষ সহজে ভোট দিতে বেরবে না, এলোমেলো ভোট হবে। গেরুয়া শিবিরের এই
ছককে কার্যকর করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে নির্বাচন কমিশন।