পরপর ষষ্ঠ ত্রৈমাসিকে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্র। আজ, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রক জানিয়ে দিল, কমানো হচ্ছে না স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ। এর ফলে পিপিএফ-এ সুদ মিলবে ৭.১ শতাংশ, এনএসসি-তে ৬.৮, মান্থলি ইনকাম স্কিমে পাওয়া যাবে ৬.৬ শতাংশ সুদ। এই হার বহাল থাকবে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত।
গতবছর ঘনঘোর লকডাউনের সময়ে, ১ এপ্রিল ২০২০ থেকে, নিষ্ঠুর ভাবে কমানো হয়েছিল স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ। আগের দিন, ৩১ মার্চ বেশ রাত্রে কেন্দ্রের এক ঘোষণায় জানানো হয়েছিল সব সঞ্চয় প্রকল্পে সুদ কমছে, কোনো কোনো প্রকল্পে কমছে ১ শতাংশেরও বেশি। স্মরণে রাখা দরকার, তখন খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশ। এর পরে টানা এক বছর সুদের হার একই থাকলেও ২০২১ সালের ৩১ মার্চ কেন্দ্রের একটি নির্দেশিকায় আবার অনেকটাই সুদ কমানোর কথা বলা হয়েছিল। তখন এ রাজ্য সহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট চলছিল। ঘণ্টা বারো পরেই কাক-ডাকা ভোরে খোদ অর্থমন্ত্রী ট্যুইট করে জানান, ওটা ভুল করে বেরিয়ে গিয়েছিল, সুদের হারে পরিবর্তন হচ্ছে না। ১ জুলাই ২০২১ সালেও ওই হার অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ পরপর পাঁচটি ত্রৈমাসিকে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার অপরিবর্তিত থেকেছিল।
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ বেশ বড় সময়ের জন্য অপরিবর্তিত থাকত। ধরে নেওয়া হতো, যেসব গরিব ও মধ্যবিত্তরা এসব প্রকল্পে টাকা রাখে, তারা অত চৌকস নন। প্রতিদিন আর্থিক বাজারের খোঁজখবর রাখা তাদের পক্ষে মুশকিল। তাই ঘনঘন স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার বা অন্য চরিত্র বদলানো উচিত নয়। কিন্তু সে জমানা এখন ইতিহাস। এখন সবই বাজার নির্ভর হয়ে উঠছে। আর স্বল্প সঞ্চয়ের সুদও পর্যালোচনা করা হচ্ছে প্রতি তিনমাস অন্তর। তার মানে, সাধারণ মানুষকেও খোঁজখবর রাখতে হচ্ছে, নিশ্চিন্তে বসে থাকলেই ক্ষতি।

স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্প
সেভিংস অ্যাকাউন্ট (এসবি) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্কের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। একজন একটিই অ্যাকাউন্ট কুলতে পারেন। অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ে ন্যূনতম ৫০০ টাকা জমা রাখতে হয়। পরে কমপক্ষে ১০ টাকা জমা রাখা যায়। জমার উর্ধ্বসীমা নেই। বছরে একবার সুদ দেওয়া হয়।
৫ বছরের রেকারিং (আরডি) ডিপোজিট : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক, সর্বোচ্চ ৩ জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। একজন যতগুলি ইচ্ছে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। প্রতি মাসে ন্যূনতম ১০০ টাকা রাখতে হয়। ৫ বছরে ম্যাচিওরিটি। উর্ধ্বসীমা নেই। প্রতি তিন মাসে সুদ হিসেব করা হয়।
১, ২, ৩, ও ৫ বছরের টার্ম ডিপোজিট (টিডি) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক, সর্বোচ্চ ৩ জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। ৫ বছরের টার্ম ডিপোজিটে আয়করের ৮০সি ধারায় কর ছাড়। চাইলে ম্যাচিওরিটির পরেও টার্ম ডিপোজিটের মেয়াদ বাড়ানো যায়, তবে ম্যাচিওরিটির দিনে যে সুদের হার ছিল, বর্ধিত মেয়াদে সেই সুদ পাওয়া যাবে। ন্যূনতম ১০০০ টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়, উর্ধ্বসীমা নেই। প্রতি তিন মাসে সুদ হিসেব করা হয়, সুদ দেওয়া হয় বছরে একবার।
মান্থলি ইনকাম স্কিম (এমআইএস) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক, সর্বোচ্চ ৩ জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কমপক্ষে জমা ১০০০ টাকা। একজন সর্বোচ্চ ৪.৫ লক্ষ, দুজন ৯ লক্ষ এবং তিনজন সর্বোচ্চ ১৩.৫ লক্ষ টাকা রাখতে পারেন। প্রতি মাসে সুদ দেওয়া হয়। ৫ বছরে ম্যাচিওরিটি, ১ বা ২ শতাংশ পেনাল্টি দিয়ে ১ বছরের পরে প্রিম্যাচিওর ভাঙা যায়।
সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম (এসসিএসএস) : ৫ বছর মেয়াদি। প্রতি তিন মাসে সুদ হিসেব করা হয়, সুদ দেওয়া হয় ৩১ মার্চ, ৩০ জুন, ৩০ সেপ্টেম্বর ও ৩১ ডিসেম্বর। ষাটোর্ধ্ব যে-কোনো ব্যক্তি এই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, অবসর প্রাপ্তরা ৫৫ বছরে এবং অবসর প্রাপ্ত ডিফেন্স স্টাফ ৫০ বছরে এমন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। একা এবং স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে যুগ্ম অ্যাকাউন্ট খোলা যায়, যদিও অ্যাকাউন্টে প্রথম নামের ব্যক্তিরই পুরো টাকা প্রাপ্য। শর্তসাপেক্ষে ১ বছর পর থেকেই প্রিম্যাচিওর অবস্থায় অ্যাকাউন্ট ভাঙা হয়। কমপক্ষে ১,০০০ টাকা, সর্বোচ্চ ১৫ লক্ষ টাকা জমা রাখা যায়।
১৫ বর্ষীয় পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিপিএফ) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ জন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, যুগ্ম অ্যাকাউন্ট হয় না। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। প্রতি অর্থবর্ষে (১ এপ্রিল থেকে পরের বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত) কম পক্ষে জমা ৫০০ টাকা অধিক পক্ষে দেড় লক্ষ টাকা। আয়করের ৮০সি ধারায় কর ছাড়। ঋণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুযোগ আছে।
ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট (এন.এস.সি) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক, সর্বোচ্চ ৩ জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কমপক্ষে জমা ১০০০ টাকা, উর্ধ্বসীমা নেই। আয়করের ৮০সি ধারায় কর ছাড় মেলে। সাধারণ ভাবে, কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া প্রিম্যাচিওর ভাঙা বা অন্য ব্যক্তিকে হস্তান্তর করা যায় না।
কিষাণ বিকাশ পত্র (কে.ভি.পি) : প্রাপ্তবয়স্ক ১ বা একাধিক, সর্বোচ্চ ৩ জন যুগ্মভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ভাবে অসুস্থদের অভিভাবক হিসেবেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। ১০ বছরের বেশি বয়সি অপ্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের নামেই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। কমপক্ষে জমা ১০০০ টাকা, উর্ধ্বসীমা নেই। করযোগ্য। আড়াই বছরের পরে প্রিম্যাচিওর ভাঙা যায়।
সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (এসএসওয়াই) : ১০ বছরের কম বয়সি কন্যা সন্তানের জন্য তার অভিভাবক এমন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। একটি পরিবার এমন অ্যাকাউন্ট সর্বোচ্চ দুই কন্যার নামে খুলতে পারে। প্রতি অর্থবর্ষে (১ এপ্রিল থেকে পরের বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত) কমপক্ষে জমা ২৫০ টাকা অধিক পক্ষে দেড় লক্ষ টাকা। বছরে এক বার সুদ অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়।

সুদের হার (শতাংশ) (৩০.০৬.১৯) ৩১.০৩.২০ ০১.০৪.২০-৩১.১২.২১
সেভিংস অ্যাকাউন্ট ৪ ৪ ৪
৫ বছরের আর.ডি ৭.৩ ৭.২ ৫.৮
১ বছরের টি.ডি ৭ ৬.৯ ৫.৫
২ বছরের টি.ডি ৭ ৬.৯ ৫.৫
৩ বছরের টি.ডি ৭ ৬.৯ ৫.৫
৫ বছরের টি.ডি ৭.৮ ৭.৭ ৬.৭
এম.আই.এস ৭.৭ ৭.৬ ৬.৬
এস.সি.এস.এস ৮.৭ ৮.৬ ৭.৪
১৫ বর্ষীয় পিপিএফ ৮ ৭.৯ ৭.১
এন.এস.সি (৫ বছর) ৮ ৭.৯ ৬.৮
কে.ভি.পি ৭.৭ (১১৩ মাস) ৭.৬ (১২৪ মাস) ৬.৯
সুকন্যা সমৃদ্ধি ৮.৫ ৮.৪ ৭.৬
এ থেকে মনে করা হচ্ছে, সম্ভবত রিজার্ভ ব্যাঙ্কও রেপো রেট ও অন্যান্য হার একই রাখবে। তলানিতে নামা সুদের হার একটু মুখ তোলার আশা আবার পাথর-চাপা পড়ল।