কোন এক ইউটিউব চ্যানেলের কথক বলছিলেন যে বিরোধীরা মোদি সরকারের কাজকর্মে ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। চ্যানেলের কথক মজা করে বললেন, এখনও শুধু ছায়া দেখছেন, তাহলে কায়া দেখবেন কবে? মোদি সরকারের মধ্যে ফ্যাসিবাদের কায়াটা দৃশ্যত অস্পষ্ট বটে। কারণ সরকারের দুই প্রধানের কথায় এখনও গণতন্ত্রের দোহাই, সংবিধানের প্রতি লোকদেখানো নতমস্তক ভাব। দৃশ্যত হিটলারি ফ্যাসিবাদের সঙ্গে একটু পার্থক্য আছে বটে। কারণ এঁরা গণতন্ত্র আর সংবিধানের দোহাই দিয়ে হাসতে হাসতে তাদের গলা টিপে ধরেন। আর যাই হোক হের হিটলারের এই ছলনা আর মোহিনী আড়াল ছিল না।
হরবখত নানাবিধ জুমলা করে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি জ্বালিয়ে, বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে, তাঁদের বিরুদ্ধে ইডি আর সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে, একের পর এক সাংসদকে সামান্য অজুহাতে সংসদ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে, গণতন্ত্রের সব কটি স্তম্ভকে হাতের মুঠোয় নিয়ে, নির্বাচন আয়োগকে তোতা বানিয়ে, একের পর এক জনবিরোধী আইন প্রণয়ন করে এই সরকার রবীন্দ্রনাথের ‘গান্ধারীর আবেদনে’র দুর্যোধনের মতো বলেই চলেছেন : ‘আপামর জনে আমি কহাইব আজ/দুর্যোধন রাজা/দুর্যোধন বহে নিজ হস্তে নিজ নাম ’ এবং ‘দুর্যোধন নাহি সহে রাজনিন্দা আলোচনা’। যদি সে আলোচনা হয়, তাহলে দুর্যোধন বলে, ‘নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী।’ এই রাজা আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি একটা দলের সদস্য হলেও কালে তিনি দলকে ছাপিয়ে গেছেন। ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ মূর্তি গড়ে উঠেছে তাঁর। এখন তাঁর মুখে শুধু ‘আমি’ ‘আমি’ ‘আমি’। আদবানি বাদ, মুরলীমনোহর যোশি বাদ, বিনয় কাটিয়ার বাদ, উমা ভারতী বাদ। হবে না কেন? দলের ভাবমূর্তি নয়, তাঁর নিজের ভাবমূর্তিতে দল জিতছে, প্রচণ্ড জনমত নিয়ে গড়ছে সরকার। দলের সদস্য, মন্ত্রী, মন্ত্রীর চামচে, চামচের চামচে, আমলা, পুলিশ, আধিকারিক সকলেই নতজানু। একেই বলে মোদি ম্যাজিক। দেশ তো দূরের কথা, এই ম্যাজিকে বশীভূত সসাগরা বসুন্ধরা। তিনি এখন বিশ্বগুরু। নমো হে নমো।
২০১৪-তে তাঁর উত্থান। ২০১৯-এ তাঁর দুর্দমনীয় বিস্তার। আর ২০২৪-এ? গত বছর তিনি স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যে সামনের বছরও তিনি এখানে দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশ্যে অমৃতবাণী বিতরণ করবেন; আর বেতারে বলবেন ‘মন কি বাত’। গতবছর ১৫ আগস্ট বলেছিলেন তিনি। কিন্তু এই পাঁচ মাসে বাতাসে ভাসিছে গন্ধ। এবং গন্ধটা বড় সন্দেহজনক।
বিজেপির ভিতরে এমন তুষের আগুনের মতো বিক্ষোভ আগে দেখা যায় নি। মোদি-শাহই সব, তাঁরাই কায়া, বাকি সবাই ছায়া; এটা আর মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না অনেকে। পারছেন না রাজনাথ সিংহ, পারছেন না নিতীন গড়কড়ি, পারছেন না যোগীবাবা, মোহন ভাগবতও কি পারছেন? তারপরে এককথায় যাঁদের ঘচাং ফু করে দিচ্ছেন মোদি-শাহ সেই শিবরাজ চৌহান, বসুন্ধরা রাজে, তাঁরাও পারছেন না। মুশকিল এঁদের। গিলতে পারছেন না, আবার উগরে দিতেও পারছেন না। কংগ্রেস ভেঙে আলাদা দল হয়েছে; কিন্তু বিজেপি ভেঙে আলাদা দল করার অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নি। তবে কি না এইসব বিক্ষুব্ধ সদস্যরা সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। গুজরাট লবি, তার মানে মোদি-শাহ যুগলবন্দি, একবার বিপাকে পড়লে লাফিয়ে উঠবেন বিক্ষুব্ধরা। ভেতরে ভেতরে এই তুষের আগুনের ধিকি ধিকি, এই গন্ধও ভাসিছে বাতাসে।
আছে আরও গন্ধ।
শোনা যাচ্ছে মোদি-শাহের গড়ে দেওয়া মন্ত্রীসভা নাকি ভেঙে দেওয়ার কৌশলী খেলায় আছেন বসুন্ধরা রাজে। একবার তা যদি হয়েও যায়, তাহলে মধ্যপ্রদেশের মামাও নেমে পড়বেন সে খেলায়। অনুশাসনের বাঁধ ভেঙে যাবে তখন। লাগ ভেলকি লাগ।
রামমন্দিরের খেলাটা গুজরাট লবি জমিয়ে ছিলেন ভালো। কিন্তু মন্দির তৈরির কাজ শেষ না করে ২২ জানুয়ারি তার উদ্বোধনে আপত্তি জানাতে শুরু করেছেন ‘সনাতন ধর্মে’র প্রবক্তরা। শংকরাচার্যরা তাঁদের অন্যতম। তাঁদের কথা : রামের আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা কিসের? তাহলে এতদিন রাম কি প্রাণহীন ছিলেন? তাছাড়া, সনাতনী নিয়ম অনুষায়ী প্রাণপ্রতিষ্ঠায় সস্ত্রীক থাকতে হয়। কোথায় নরেন্দ্র মোদির ধর্মপত্নী? মোদি-শাহ ভেবেছিলেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হবে রাজনৈতিক মূলধন, ফেব্রয়ারিতে লোকসভার নির্বাচন হয়ে গেলে হিন্দি বেল্টে দারুণ সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু তোতার যে চক্ষুলজ্জা হল অবশেষে। তোতাটা কে মশাই? কেন, ইলেকশন কমিশন। তাঁরা জানিয়ে দিলেন মার্চের আগে নির্বাচন নয়।
নির্বাচন হবে কিসে? কেন, ইভিএমে। কিন্তু দিল্লির যন্তর-মন্তরে সুপ্রিম কোর্টের উকিলরা ইভিএমের ডেমো দেখাতে লেগে গেলেন। বললেন পৃথিবীর ১২০টি দেশে ইভিএমকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। দেখালেন এই যন্ত্র হ্যাক করা যায়। হাতেনাতে প্রমাণ। সেই প্রমাণ দেখিয়ে দেবার জন্য তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ৫০টি ইভিএম চাইলেন। দেবে কেন তোতাপাখি? উকিলদের এই উদ্যোগ প্রভাবিত করতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষকে। মাসখানেকের মধ্যে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে এর বিরুদ্ধে একটা ব্যাপক জনমত তৈরি হয়ে যাবে। মোদি সরকার ইভিএমের বিরোধীদের বিরুদ্ধতা করায় সন্দেহ বাড়ছে।
শাহজির ‘হিট অ্যাণ্ড রান’ কানুনকে কালা কানুন বলে পথে নামল ড্রাইভাররা। রাস্তায় রাস্তায় স্তব্ধ লরির সারি। পেট্রোল পাম্পে বাজছে ডুগডুগি। শেষে উন্নতশির সরকার আলোচনায় রাজি। রাস্তায় আবার চলল লরি। কিন্তু অভিজ্ঞ ড্রাইভাররা অনুভব করল কৃষকদের ক্ষেত্রে যেমন ধাপ্পাবাজি করেছিল, তেমনি তাদের সঙ্গেও হতে পারে। তাই কালা কানুনকে বাতিল করার জন্য তারা আবার আন্দোলন শুরু করার হুমকি দিয়েছে।
আছে আরও গন্ধ।
আছে ব্রিজভূষণের রঙ্গলীলা। মহিলা কুস্তিগীরের সঙ্গে অভভ্যতা করার জন্য রাস্তায় নামলেন তাঁরা। বিশ্বের দরবারে যাঁরা উজ্জ্বল করেছিলেন ভারতের নাম, তাঁদের প্রতিবাদ স্পর্শ করতে লাগল দেশের মানুষের মন। প্রিয় ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে একটু যেতে হল সরকারকে, আর সেটা বুঝতে পেরে কুস্তিগিরেরা পিছু হটতে নারাজ। ব্রিজভূষণদের দোসর আছে। বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির সঙ্গে জড়িয়ে গেল বিজেপির আইটি সেলের তিন যুবকের নাম, গ্রেপ্তার করতে হল তাদের। অনেক টালবাহানার পরে। কি আপশোশ ! সংসদে হঠাৎ ঢুকে পড়ে যে ষুবকরা হট্টগোল বাধিয়ে ফেলেছিল, দেখা গেল তাদের ঢোকার ছাড়পত্র দিয়েছেন বিজেপির এক সাংসদ। কি গেরো !
আরও আরও গন্ধ আছে।
রাজস্থানের বিধানসভায় জিতে ছাতি ফুলিয়ে মোদি-শাহ নিজের দলের বসুন্ধরাকে কোণঠাসা করে দিলেন। কয়েকদিন পরে করণপুর বিধানসভার উপনির্বাচনে জিতে গেলেন কংগ্রেস প্রার্থী। হারলেন কে? চোখ বন্ধ করে জিতবেন বলে যাঁকে সেই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। এবং আগেভাগে যাঁকে মন্ত্রী করে দিয়েছিল গুজরাটের দুই জাদুকর।
আর একটা গন্ধ ছড়িয়ে দিলেন বিলকিস বানু। ২০০২ সালে গোধরা হত্যাকাণ্ডের শিকার বিলকিস। নরেন্দ্র মোদি তখন গুজরাটের রাজা। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে ক্লিন চিট দিয়ে দিলেন। যে ১১জন ‘সংস্কারী ব্রাহ্মণ’ বীর বিক্রমে ধর্ষণ করেছিল গর্ভবতী বিলকিসকে, রামানন্দে হত্যা করেছিল তার পরিবারের লোকজনকে, ২০০৮ সালে মুম্বাই-এর সিবিআই বিশেষ আদালত যাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল, ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট ডবল এঞ্জিনের গুজরাট সরকার তাদের মুক্তি দিল। এই ১৫ আগস্ট লালকেল্লায় বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদি নারীদের সম্মান রক্ষার ভাষণ দিচ্ছিলেন ৫৬ ইঞ্চি বুক ফুলিয়ে। কিন্তু সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট গুজরাট সরকারের জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে সংস্কারী ধর্ষক ব্রাহ্মণদের আবার জেলে পোরার নির্দেশ দিয়েছেন। কি গেরো, কি গেরো!
গন্ধ তো ভাসছে বাতাসে। প্রতিবাদের গন্ধ। ক্ষোভের গন্ধ। ধিক্কারের গন্ধ। নামুনকিনের গন্ধ। এমন কি প্রতিশোধের গন্ধ। তার মানে অবজেকটিভ ফ্যাক্টর বা বাস্তব পরিস্থিতি একেবারে অনুকূলে। কিন্তু কে ধরিবে হাল? কে বলবে, ‘দুলিতেছে তরী ফুলিতেছে জল/কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’? তার মানে সাবজেক্টিভ ফ্যাক্টর ঠিক আছে তো? জোট একটা হয়েছে, যার নাম ‘ইণ্ডিয়া’, কিন্তু এতে যাঁরা আছেন তাঁরা নিজের নিজের অস্মিতা ত্যাগ করে, কিছু কিছু স্বার্থ ত্যাগ করে, সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে এক মন এক প্রাণ হয়ে দাঁড়াতে পারবেন তো?