গত শতকের আশির দশকের কোন এক শরৎকালের সপ্তমীর সন্ধ্যা। উত্তর কলকাতায় কোন এক পুজো মন্ডপ। দর্শনার্থীদের ভীড়ের কোলাহল, বেলুনওলার বাঁশীবেলুনের প্যাঁপোঁ আওয়াজ, বাচ্চাদের কলরব, খাবারের দোকানের ট্রেডমার্ক হাঁক “গ-অ-র-অ-ম ফিশ ফ্রা-আ-ই”, পাঁচমিশালি শব্দের মিলিত কোলাহল ছাপিয়ে কানে আসছে ভরাট গলায় এক সুরেলা মিনতি — ‘কতদিন পরে এলে, একটু বোসো’। মাইকে বাজছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। ১৯৭৪ সালের পুজোর গান। কিছুক্ষণ পরেই টেক ওভার করলেন মান্না দে। শুরু হল তাঁর মান ভাঙানোর প্রচেষ্টায় “সুন্দরী গো, দোহাই দোহাই মান কোরো না”। ১৯৭০ সালে বেরোন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়-মান্না দের জুটির পুজোর গান।
একটু এগিয়ে গেলেই অন্য আরেক পুজো মন্ডপ। পায়ে পায়ে সেদিকে খানিকটা এগোতেই মান্না দের কণ্ঠ মিলিয়ে গিয়ে অন্য এক সুরের ঢেউয়ে ডুবিয়ে দিল। মায়াবী গলায় আশা গাইছেন, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা রাহুল দেববর্মণের নেশা ধরানো সুরে — “চোখে চোখে কথা বল, মুখে কিছু বল না”। ১৯৮৪ সালের পুজোর গান।

সত্তরের দশক, আশীর দশকের পূজোর পরিবেশের এটাই ছিল চালচিত্র। এ চালচিত্র চোখে দেখার নয়, কানে শোনার। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে জনস্রোতে ধাক্কা খেতে খেতে এগিয়ে চলতে চলতে শব্দস্রোত, সুরের স্রোত পাল্টে পাল্টে যেত।
কোথাও বাজছে কিশোর কণ্ঠে ‘আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে’, ১৯৮০ সালের পুজোর গান। পাশের গলিতে ঢুকতেই শোনা যেত পঞ্চমের গলায় ব্যর্থ প্রেমের আকূতি — মনে পড়ে রুবি রায়! শচীন গুপ্তের কথায় রাহুল দেববর্মনের নিজের সুরে গওয়া গানটি সে সময়ে কলেজ ছাত্রদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল।
আরেকটু এগোতেই আরতী মুখোপাধ্যায়ের মন মাতানো টীন-এজ প্রেমের ‘তখন তোমার একুশ বছর’, বাপ্পী লাহিড়ির সুরে। কোন প্যাণ্ডেল হয়তো তেমন সাজানো নয়, দর্শনার্থীর ভীড়ও কম, কিন্তু পুজোর গানের পছন্দে পিছিয়ে নেই — সেখানে বাজছে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে সুবীর সেনের কণ্ঠে — ‘এত সুর আর এতো গান’। কোথাও আবার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় নচিকেতা ঘোষের সুরে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদাত্ত আহ্বান — ‘চলো রীণা ক্যাসুরীনার ছায়া গায়ে মেখে’। সে গান শুনে অনেক যুবকের হৃদয়ে দোলা লাগত। উত্তর কলকাতার কোনো এক এঁদো গলিতে সাধারণ পুজো প্যান্ডেল, জৌলুশহীন, ম্যাড়ম্যাড়ে। কিন্ত সেই দর্শক-উপেক্ষিত নিঝুম গলিও যেন ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করে উঠত, যখন হঠাৎ ঝমঝম করে মাইকে বেজে উঠত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় সেতারের ঝঙ্কার — নচিকেতা ঘোষের সুরে পুজোর গান — ‘মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা’ — 1962 সালের পুজোর গান।

পুজো হবে, আর পুজোর গানের রেকর্ড বেরোবে না? তা কি হয়! তা হতোও না। প্রতি পুজোয় শ্রোতারা পেতেন কিছু নতুন গানের ডালি। ‘পুজোর গান’ নামেই সেগুলি পরিচিত ছিল। এই পুজোর গান প্রকাশ করার জন্য নামীদামী সব শিল্পীদেরই আগ্রহ ছিল। শুধু এখানকার বাঙলা গানের শিল্পীই নয়, অবাঙালি শিল্পীদেরও প্রবল আগ্রহ ছিল। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সুমন কল্যাণপুর, মহম্মদ রফি, কে গাননি পুজোর গান? সলিল চৌধুরির সুরে মুকেশের গাওয়া ‘মন মাতাল, সাঁঝ সকাল’ গানটি এক সময়ে প্যান্ডেলে প্যাণ্ডেলে মাতিয়ে রাখত। ১৯৭১ সালে শচীন কর্তা মীরা দেববর্মণের লেখা পুজোর গান গাইলেন ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’, ১৯৭৭ সালে কলকাতা-সহ গোটা বাংলার পুজো প্যান্ডেলগুলি মাতিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের শিল্পী রুণা লায়লার গাওয়া ‘সাধের লাউ’। ঐ বছর পুজোর গানে তাঁর চারখানি গান ছিল।
এক স্মৃতিচারণায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “পুজোর গান হবে না — এমন কথা ভাবতেই কষ্ট হতো। তাই বাংলা ও হিন্দি ছবি নিয়ে আমার সেই ব্যস্ততার দিনেও আমি পুজোর গান করেছি।” ১৯৬৪ সালে বিদেশ থেকে ফিরে তিনি তড়িঘড়ি করে দুটি পুজোর গান রেকর্ড করেছিলেন, ভাঙা গলাতেই, কারণ হাতে সময় ছিল না। গানদুটি হল ‘হাজার বছর ধরে কত নদী প্রান্তর’, এবং ‘আরো ভালো হত’।

পুজোর রেকর্ড বার করার এই ঐতিহ্য কিন্তু অনেক পুরোনো। ঠিক কবে প্রথম পুজোর গান বেরিয়েছিল, সেটার কোন তথ্যনির্ভর বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে পেছোতে পেছোতে দেখা যায় যে, ১৯১৪ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও পুজোর রেকর্ড বার করেছিল দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড। বিদেশী কোম্পানী স্বদেশী পুজোর বাজার ধরার উদ্দেশ্যে সেই বছর ১৭টি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল “শারদীয় পূজা উপলক্ষে”। দুপিঠে দুখানি গানের রেকর্ড — ভায়োলেট ও ব্ল্যাক লেবেল দেওয়া। ভায়োলেট লেবেলের রেকর্ডের দাম তিন টাকা বারো আনা, আর ব্ল্যাক লেবেলের তিন টাকা। তার মধ্যে ছিল সেই সময়ের প্রখ্যাত গায়িকা মানদা সুন্দরী দাসীর কীর্তন, আর কে মল্লিকের আগমনী গান। এই কে মল্লিকের প্রকৃত নাম মহম্মদ কাশেম।
এই পুজোতেই দুখানি রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী অমলা দাশ — ‘হে মোর দেবতা’ ও ‘প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী’। শুধু গান নয়, সে বছর গ্রামোফোন কোম্পানী শারদীয় অর্ঘ সাজিয়েছিল হাস্যকৌতুকের নকশা দিয়েও। অভয়পদ চট্টোপাধ্যায়ের রেকর্ডে ছিল — ‘স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আদর’, আর ‘স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সোহাগ’।
১৯২৭ সালে পুজোয় বেরিয়েছিল অহীন চৌধুরির অবিস্মরণীয় অভিনয়ের রেকর্ড ‘কর্ণার্জুন’। ১৯৩০ সালে কমলা ঝরিয়া পুজোর গান দিয়েই প্রথম রেকর্ড করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে বেরোল আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠে নজরুলের গান ‘কুঁচবরণ কন্যারে তার মেঘ বরণ কেশ’, পুজোর রেকর্ড।
১৯৪০ সালে যুথিকা রায়ের পুজোর গান বাজারে এল — প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে দুটি গান, ‘সাঁঝের তারকা আমি’ আর ‘আমি ভোরের যূথিকা’।

ষাট থেকে আশির দশককে বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই কয়েক দশক ধরে যে পুজোর গানগুলি বেরোত, সেগুলি পুজোর আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, অংশ ছিল। কেবল গান নয়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বা মিন্টু দাশগুপ্তর মতো শিল্পীদের কৌতুকনকশা ও প্যারডির রেকর্ডও বেরোত পুজোর সময়ে।
গ্রামোফোন কোম্পানি প্রতি বছর পুজোর গানের তালিকা সাজিয়ে প্রকাশ করত এক রুচিশোভন সংকলন, এইচ এম ভি-র গানের বই, “শারদ অর্ঘ্য”। পুজোর কেনাকাটার মধ্যে নতুন জামা জুতোর সঙ্গে দু একখানি পুজোর গানের নতুন রেকর্ডও থাকত।
সে সময়ে থীম পুজোর মাতামাতি ছিল না, স্পনশরের প্রশ্রয় বরাভয় ছিল না, পুজোর আয়োজনে কর্পোরেট চিন্তাভাবনা ছিল না, উদ্যোক্তাদের মধ্যে গলাকাটা প্রতিযোগিতা ছিল না। কেবল কিছু প্যাণ্ডেল বৈচিত্র্য, কিছু আলোকসজ্জার কারিকুরি, আর প্রতিমার গঠন-বৈচিত্র্য — এই ছিল পুজোর আকর্ষণ । কিন্ত এত ‘ছিল না’, এর মধ্যেও পুজোর এক মস্তো আনন্দ, এক প্রবল আকর্ষণ ছিল প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে বাজতে থাকা পুজোর গানগুলি। সে সব পুজো ছিল দেখার সঙ্গে সঙ্গে শোনারও — দেখা ও শোনার এক মেলবন্ধনের আনন্দ।
সে ছিল এক বড়ো সুরেলা সময়।
ঋণ : সেই আমলের পুজোর গান : অরুণ চট্টোপাধ্যায়, এইচ এম ভি’র শারদ অর্ঘ্য