৪২ দিনের চন্দনযাত্রা পালনের পর জৈষ্ঠ পূর্ণিমাতে আসে জগন্নাথ দেবের মহাস্নানযাত্রা। ঐদিন ধরণীতে নেমে আসেন স্বর্গের সকল দেবতাগণ। তারা ‘পারিজাত সুবাসিত সুরতরঙ্গিনী’র পুণ্য পবিত্র জল এনে ব্রহ্মার আদেশে শ্রীভগবানকে স্নান করান। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার স্তুতিবন্দনায় শ্রীক্ষেত্রকে মোহিত করেন।
স্নানযাত্রার দিন মন্দিরের ভিতরে অবস্থিত ‘স্বর্ণ কুণ্ড’ থেকে জল আনা হয়। জলে সুগন্ধি মিশিয়ে ‘পাবমানী মন্ত্র’ পাঠের দ্বারা সেই জল শুদ্ধ করা হয়। তারপর সোনার কলসে করে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শনের মাথা থেকে জল ঢালা হয়। শ্রী জগন্নাথ দেবের জন্য ৩৫ কলস, শ্রী বলভদ্রের জন্য তেত্রিশ কলস, মা সুভদ্রার জন্য বাইশ কলস ও সুদর্শনের জন্য আঠারো কলস অর্থাৎ মোট ১০৮ কলস জল লাগে।
চতুর্দশীর রাতের মধ্যেই ভগবানের অধিবাস হয়ে যায়। ভগবানের শ্রীঅঙ্গে যাতে কোন আঘাত না লাগে তাই খুব সাবধানতার সঙ্গে চতুমূর্তিকে ধীরে ধীরে স্নানমন্ডপে আনা হয়। রাজার কাছ থেকে সম্মান ও সমাদর পাওয়া ব্রাহ্মণ চামর ও তালপাতা দিয়ে পহন্ডি সময়ে ভগবানকে বাতাস করেন। ভগবানের সারা শরীর লিপ্ত থাকে সুগন্ধীতে। রাজার মত পরিচর্যা করে দেবতাদের স্নানমঞ্চে নিয়ে যেতে হয়। ত্রয়ী দেবতার স্থানবেদী নানান মনি মুক্তা মালা চামরে সাজানো হয়। চারিদিক চন্দন, কর্পূর, ধুপ-ধুনোর সুগন্ধে মোহিত হয়ে থাকে। আকাশের দিকে মুখ করে জগন্নাথ দেব যখন স্নানমঞ্চে আসেন, চারিদিক ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

জ্যেষ্ঠ পূর্ণিমাতে স্বয়ম্ভু মনুর যজ্ঞের প্রভাবে জগন্নাথের আবির্ভাব ঘটে। তাই এটি হলো জগন্নাথদেবের পূণ্য পবিত্র জন্মদিন। স্নান ও কর্পূর আরতির পর শুরু হয় দেবতাদের ফুলসাজের পালা। বড় বড় কাপড় দিয়ে প্রচুর তুলসীপাতা দেবতাদের মাথায় বাঁধা হয়। নানা রংয়ের মালায় দেবদেবী সজ্জিত হন। জগন্নাথদেবকে ফুল মালা সুগন্ধি ছিটিয়ে চন্দন লেপন করা হয়। সুভদ্রাকে অজস্র পদ্মফুল দিয়ে সাজানো হয়।
মহাস্নানে দেবতার গায়ের নানা রঙ ধুয়ে যে জল পড়ে তা পবিত্রতম বলে খ্যাত।
স্নানের পর জগন্নাথদেবের জ্বর আসে। স্নানযাত্রার পরেই দেবদেবীকে নিরোধন গৃহ বা আঁতুড়ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৫ দিন দয়িতা-পতিরা ওষুধ পথ্য অর্থাৎ মিষ্টি রসের পানা বিশেষ পাচন খেয়ে খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই ১৫ দিন দেবতার শরীরে নতুন রংয়ের প্রলেপ পড়ে। এই সময় হলো “অনবসরকাল”।
শ্রীচৈতন্যদেবের লীলাকে অনুসরণ করে গৌড়ীয় ভক্তরা ভগবান দর্শনের জন্য ব্রহ্মগিরির আলারনাথে যান। পুরী চিলকা রোডে ব্রহ্মগিরি থেকে আলারনাথ যেতে হয়। কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখনি থেকে জানতে পারি শ্রীচৈতন্যদেবের আলারনাথের গমনের কথা।
কথিত আছে এই ১৫ দিন শ্রী জগন্নাথ আলারনাথে প্রকট হন। জগন্নাথের অদর্শনে মহাপ্রভু ব্যাকুলভাবে আলারনাথে এসে শ্রীকৃষ্ণ ‘আলারনাথ’কে দর্শন করে ধন্য হতেন।

স্নানযাত্রা শেষ করবে ভগবান গজানন বেশে ভক্তদের সামনে দর্শন দেন। কিন্তু কেন তার এই বেশ ধারণ? কথিত আছে, দক্ষিণ ভারতে গণপতি ভট্ট নামে সিদ্ধিদাতা গণেশের এক পরম ভক্ত ছিলেন। তিনি শুনেছিলেন শ্রীধাম পুরীতেই তাঁর ইষ্টদেবতার বসবাস। তিনি এসেছিলেন ভগবানের স্নানযাত্রার সময়। স্নানমণ্ডপে তখন তিন দেবতার শ্রীঅঙ্গে কলসি কলসি জল ঢালা হচ্ছে। জগন্নাথের সেই রূপ দেখে গণপতির মন ভরলো না। তার ধারণা ছিল তাঁর রূপ হবে হাতির মতো। সেই রূপের দর্শন না-পেয়ে দুঃখপূর্ণ হৃদয়ে অনেক অভিমান নিয়েই তিনি পুরী ত্যাগ করছিলেন। এমন সময় রাজপ্রতিনিধি স্বপ্ন পেলেন স্বয়ং জগন্নাথদেব বলছেন, ‘বহুদূর থেকে আমার ভক্ত এসেছে আমার হস্তিমুখ দর্শনে। দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে চলে যাচ্ছে ওকে ডেকে আনো।’
গণপতি ভট্টকে ডেকে আনা হলো। অবাক কান্ড জগন্নাথের দিকে এবার গণপতি তাকাতেই দীর্ঘ শুন্ড ও গজোদন্ত শোভিত শ্রীমুখের দর্শন পেলেন। জীবন ধন্য হয়ে গেল গণপতি ভট্টর।
ইতিহাস বলে জগন্নাথদেবের এই গজানন বেশ আরম্ভ হয়েছিল মারাঠা শাসনের সময়। মারাঠাদের আরাধ্য দেবতার সিদ্ধিবিনয়ক গণেশ। তার ভক্তরা তাকে এই রূপেই দর্শন পেতে চান আর তাই ভক্তবৎসল ভগবান এই বেশেই দর্শন দেন। গীতায় ভগবান বলেছেন, “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম।” ভক্তরা তাকে যে রূপে আরাধনা করেন, তাকে তিনি সেই রূপেই দর্শন দেন। ভক্তের বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি নিজের রূপ বদলে নেন। কারণ শ্রীজগন্নাথদেব জগতের নাথ। তিনি কোন নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতির দেবতা নন, তিনি গণধর্মের গণদেবতা। তিনি বৈষ্ণবের বিষ্ণু, শৈবদের শিব, বৌদ্ধদের বুদ্ধ, গাণপত্যের গণপতি। তাইতো তিনি শ্রীচৈতন্যকে শ্রীকৃষ্ণরূপে, তোতাপুরীকে দক্ষিণাকালী রূপে, গণপতি ভট্টের মানসলোকে সিদ্ধদাতা রূপে দর্শন দেন।

গণপতি ভট্ট দারুব্রহ্মর সেই রূপ দর্শন করতে ধ্যানমগ্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। উপস্থিত সকলেই দেখলেন গণপতির আত্মা বিদ্যুৎ ঝলকের মতো শ্রী জগন্নাথদেবের দেহে লীন হয়ে গেল। সেই থেকে স্নানাভিষেকের শেষে শ্রীজগন্নাথ, শ্রী বলভদ্রকে গজানন বেশে সাজানো হয়।
স্নানযাত্রার পর জগন্নাথদেবের দর্শন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জগন্নাথদেবের নবমূর্তি নানা বেশভুষায় সুসজ্জিত হয়ে দর্শন দেন। এই উৎসবকে বলা হয় নেত্রোৎসব বা নবযৌবন উৎসব।
নেত্রোৎসব বা নবযৌবন উৎসবের পর জগন্নাথদেব রথে চড়ে বাইরে আসেন। তিনি শ্রীধামের রাজাধিরাজ। তাঁর সব সময় যৌবনকাল। স্নানযাত্রার পর চন্দনের পিষ্টলেপে শ্রী জগন্নাথ মূর্তি নতুন ভাবে সেজে ওঠে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যে নিয়মে ভগবানের শ্রীঅঙ্গ-লেপন করেছিলেন। সেই নিয়মেই এখনো জগন্নাথের অঙ্গে চন্দন, কর্পূর, অগুরু, কস্তুরী ও কুমকুম লেপন করা হয়।
লোককথা বলে, শ্রীকৃষ্ণকে যখন চন্দন চর্চিত করা হচ্ছিল, এক রাজকুমার চন্দনের মায়াবী গন্ধে মোহিত হয়ে সেই লেপনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। রাজপুত্রকে খুশি করতে গিয়ে ভগবানের অঙ্গ থেকে ‘চন্দন বিলেপণ’ তুলে তার হাতে দেওয়া হয়। রাজার পুত্র অতিলোভে সেই চন্দন গায়ে লাগিয়ে নিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে রাজপুত্রের বুকে ও যেসব জায়গায় চন্দন লাগিয়েছিলেন সেই সমস্ত জায়গায় শ্বেতকুষ্ঠ রোগ দেখা গেল। ভগবানের যে সেবক রাজপুত্রের হাতে চন্দন তুলে দিয়েছিল তার হাতেও কুষ্ঠ রোগ দেখা গেল। তাই বলা হয় শ্রীবিষ্ণুর শরীরের রঙের প্রলেপের অংশ কখনো গায়ে মাখতে নেই। কিন্তু এক বছর পর সেই প্রলেপই হয়ে ওঠে মহানির্মাল্য। উৎকলখন্ডম যাকে বলেছে বিষ্ণুরঙ্গসম্মত।
বৈশাখের শ্রীজগন্নাথের চন্দন যাত্রা, জ্যৈষ্ঠে মহাস্নানযাত্রা, আষাঢ়ে রথযাত্রা—পুরীতে এই তিন মাস একটি পর্ব হিসেবে পালিত হয়।
খুব সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ উপস্থাপনা। আনন্দ পেয়েছি।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ❤️
জয় জগন্নাথ প্রভু,,, জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা সম্বন্ধে খুব সুন্দর তথ্য সহকারে লিখেছেন
অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????
সুন্দর করে জগন্নাথদেবের পবিত্রতা প্রকাশিত
হলো সুন্দর প্রতিবেদনে।সামান্য কিছু জানতাম
আপনাদের *বৈশাখের চন্দন যাত্রা—* আমার
অজ্ঞানতাকে জ্ঞানের আলোকে পরিপূর্ণ করলো।
ধন্যবাদ পেজ ফোর* ধন্যবাদ ম্যাডাম সামন্ত।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয় ????