জগন্নাথ কে? স্নানযাত্রা কি এবং কেন করা হয়? আজকের দিনে বেলুড় মঠে স্নানযাত্রায় আত্মারামের কৌটোয় মহা স্নান ও শ্রী শ্রী ঠাকুরের শ্রী বিগ্রহের মহাস্নানই বা কি?
শ্রী রামকৃষ্ণই আমাদের সর্বদেবদেবী স্বরূপ! আবার যেই গৌর, সেই কৃষ্ণ, সেই জগন্নাথ। ভগবান জগন্নাথদেব হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যিনি জগতের নাথ বা জগদীশ্বর। সংস্কৃতি ভাষায় জগত অর্থে বিশ্ব এবং নাথ অর্থে-ঈশ্বর বোঝায়। সুতরাং জগন্নাথ শব্দের অর্থ হলো জগতের ঈশ্বর বা জগদীশ্বর।
স্কন্ধ পুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদুম্ন যখন জগন্নাথ দেবের কাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন তখন থেকে এই স্নান যাত্রার উৎসব শুরু। স্নান যাত্রার দিনটিকে জগন্নাথ দেবের আবির্ভাব তিথি বা জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়। স্নান যাত্রার আগের দিন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা দেবী এবং সুদর্শন দেবকে বেদী থেকে বিশেষ ভাবে তৈরি করা স্নান বেদীতে নিয়ে আসা হয়। পুরীর মন্দির প্রাঙ্গনে বিশেষ ভাবে তৈরি করা এই মণ্ডপকে বলা হয় স্নান মণ্ডপ। এটা এত উঁচু যে মন্দির প্রাঙ্গনের বাইরে থেকেও বেদিতে উপবিষ্ট বিগ্রহ সমূহ অবলোকন করা যায়। অনুষ্ঠানের দিন স্নান মণ্ডপকে ঐতিহ্যবাহী ফুল, বাগান ও গাছের চিত্রকল্প দ্বারা সজ্জিত করা হয়। তোরণ এবং পতাকা দ্বারা সজ্জিত করা হয়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এর পর বিগ্রহের উদ্দশ্যে ধুপ, ধুনা অর্পণ করা হয়।
পুরীতে স্নানের জন্য সোনার তৈরি এক ধরনের কুয়া থেকে জল আনা হয়। জল আনার সময় পুরোহিতরা তাদের মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন যাতে জল তাদের মুখনিঃসৃত কোন কিছু দ্বারা এমনকি তাদের নিঃশ্বাস দ্বারা দূষিত না হয়। স্নান মহোত্সবের পূর্বে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীকে সিল্কের কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয় এবং তারপর লাল এক ধরনের পাউডার দিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়। ১০৮ টি স্বর্ণ পাত্র জল দ্বারা পূর্ণ থাকে। এই জল দ্বারা অভিষেক করা হয়। অভিষেকের সময় বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ, কীর্তন এবং শঙ্খ বাজানো হয়। এরপর জগন্নাথ দেব এবং বলরাম দেবকে হাতি বেশে সাজানো হয়। এই সময় সুভদ্রা দেবীকে পদ্ম সাজে সাজানো হয়। স্নান যাত্রা উত্সবের পর ১৫ দিন ভগবানকে জনসাধারণ থেকে দূরে রাখা হয়। এই ১৫ দিন মন্দিরে কোন অনুষ্ঠান করা নিষেধ।
এই সময় ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীকে রতন বেদী নামে এক বিশেষ বেদীতে রাখা হয়। এই সময়কে বলা হয় অনাবাসর কাল মানে পূজা করার জন্য অযোগ্য সময়। স্নান করানোর ফলে বিগ্রহ সমূহ বিবর্ণ হয়ে যায়। এই ১৫ দিনে জগন্নাথ দেবকে আগের সাজে ফিরিয়ে আনা হয়। লোকমুখে তা জগন্নাথদেবের জ্বর হয়েছে বলে প্রচারিত। ১৬ তম দিনে রথযাত্রার দিনে জগন্নাথ দেবকে আবার সবার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এবং গুচিন্ডা মন্দিরে (জগন্নাথের মাসির বাড়ি) রথে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

আর বেলুড় মঠে আজকে এই জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রায় বিশেষ দিনটিতেই বেলুড় মঠে শ্রীশ্রীঠাকুরের আত্মারামের কৌটোর বিশেষ পূজা সমাপিত হয়ে থাকে এবং ইহাকে জনসমক্ষে আনা হয়। এই আত্মারামের কৌটোতেই শ্রীশ্রীঠাকুরের পবিত্র অস্থি সুরক্ষিত রয়েছে। স্বামী গম্ভীরানন্দ মহারাজজীর স্মৃতিচারণা থেকে একটি খুব সুন্দর সত্য ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়—
আত্মারামের কৌটার (ঠাকুরের ভস্মাবশেষ) প্রতি স্বামীজীর অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল৷ তবুও একদিন যথারীতি আত্মারামকে প্রণাম করে ঠাকুরঘর হতে বের হয়ে আসার সময়ে তাঁর যেন মনে খটকা হলো। সত্যই কি এই আত্মারামে ঠাকুরের আবির্ভাব রয়েছে? আচ্ছা, দেখি একবার প্রার্থনা করে৷ এই ভেবে তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলেন— ‘ঠাকুর, তুমি যদি সত্য সত্যই এই আত্মারামের মধ্যে থাক, তবে তিনদিনের মধ্যে গোয়ালিয়রের মহারাজকে মঠে আকর্ষণ করে আনো’৷ মহারাজা তখন কলকাতায় থাকলেও স্বামীজী জানতেন যে তাঁর তখন বেলুড় মঠে আসা একান্তই অসম্ভব৷ অবশ্য ঐ গোপন প্রার্থনা তাঁর প্রাণেই ছিল, অন্য কারও কাছে তিনি তা প্রকাশ করেননি৷ এমনকি কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেও সে কথা বিস্মৃত হয়ে গেলেন৷ পরদিন কোনো কাজ উপলক্ষে স্বামীজীকে কলকাতা যেতে হলো৷ অপরাহ্নে মঠে ফিরে তিনি শুনলেন যে, গোয়ালিয়রের মহারাজা মঠের কাছে জি.টি. রোড দিয়ে যেতে যেতে গাড়ি থামিয়ে, স্বামীজী মঠে আছেন কিনা, সে খবর নিতে নিজের ভাইকে পাঠিয়েছেন৷ কিন্তু স্বামীজী মঠে অনুপস্থিত থাকায় দুঃখিত চিত্তে ফিরে গিয়েছেন৷ এ কথা শোনামাত্রই স্বামীজীর পূর্বদিনের সঙ্কল্পের কথা মনে পড়লো এবং তিনি তাড়াতাড়ি ঠাকুরঘরে গিয়ে আত্মারামকে মাথায় তুলে বার বার প্রণাম করে বলতে লাগলেন, ‘তুমি সত্য’, ‘তুমি সত্য’, ‘তুমি সত্য’৷
স্বামী প্রেমানন্দ সেসময়ে ঠাকুরঘরে গিয়েছিলেন। তিনি স্বামীজীকে ঐ প্রকার করতে দেখে কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে রইলেন৷ পরে স্বামীজীর মুখে সকল কথা শুনে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলেন৷ স্বামীজী সেদিন হতে সকলকে অতি সাবধানে ঐ কৌটার পূজা করার কথা বললেন। স্বামীজীর দ্বারা বেলুর মঠে শ্রী শ্রী ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনে স্বামীজী আত্মারামের কৌটা নিয়ে এসে মঠে রাখেন এবং স্বহস্তে পায়েস রান্না করে ঠাকুরকে ভোগ নিবেদন করেন। পরে ঠাকুরকে বলেন— ‘বল, তুমি এখানে থাকবে’। স্বামীজী শুনলেন, ঠাকুর বলছেন— ‘থাকব’। স্বামীজী আবার বললেন— ‘বল, জীবকল্যাণে তুমি এখানে থাকবে’। ঠাকুর আবারও বললেন— ‘থাকব’। তারপর স্বামীজীর অশ্রুজলে মাটি সিক্ত হয়ে যায়!
আবার পুরীধামে জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা।
যেই গৌর, সেই কৃষ্ণ, সেই জগন্নাথ। ভগবান জগন্নাথদেব হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যিনি জগতের নাথ বা জগদীশ্বর। সংস্কৃতি ভাষায় জগত অর্থে বিশ্ব এবং নাথ অর্থে-ঈশ্বর বোঝায়। সুতরাং জগন্নাথ শব্দের অর্থ হলো জগতের ঈশ্বর বা জগদীশ্বর। স্কন্ধ পুরানে রথযাত্রার মহিমা বর্ননা করে বলা হয়েছে— যিনি গুন্ডিচা মন্দিরে (জগন্নাথের মাসীর বাড়ী) ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন, তিনি সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করেন।
শঙ্খ বসুর কাছ থেকে সংগৃহীত