দুজনেই ফেবু ইউনিভার্সিটির ছাত্র। দুজনের বাড়িই ঝাড়গ্রামে। কিন্তু কেউ কাউকে চেনে না জানে না। ফেস বুকে বন্ধুত্ব—হ্যায়, হেলো, ব্যাশ এতটুকুই। এর বেশি কিছু নয়। ফেসবুকে তো কতো হাজার হাজার বন্ধু তৈরি হয়, কজনের সঙ্গে আমরা কথা বলি। ওই ফেসবুকের পাতাতেই বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। মাঝে মাঝে কারুর স্ট্যাস সেরকম পছন্দ হলে লাইক বা দুটো কথা লিখে দিয়ে এসো।
এই দুই বন্ধুর ব্যাপরটা একটু অন্যরকম। হঠাৎ ফেসবুকের স্ট্যাটাসে একজন বন্ধু লিখে বসলো, এই লক ডাউনে আমি বাইরে পড়ে আছি খাওয়ার জুটছে না। কেউ খোঁজ খবরও নেয় না। কেউ কি আছে আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেন। আর এক বন্ধু লিখলো, কোথায় থাকেন আপনি? ঝাড়গ্রামের বামুন ঝরিয়া। এখন? মুম্বাইতে ১৯ মার্চ থেকে আটকে পড়ে আছি। বাড়িতে কোনও প্রবলেম? মা-বাবা থাকেন, বাবার সুগার, আমি টাকা পাঠাতে পারি নি। নিজেরই পকেট শূন্য, কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমি ফোন করতে পারি না, ভয় হয়। ফোন করলেই বাবা-মা কান্না কাটি করছেন। বাড়িতে কেউ নেই? না। বামুন ঝরিয়ার ঠিক কোথায় আপনার বাড়ি? ঝড়িয়াতে গিয়ে আমার নাম বলবেন স্বদেশ চক্রবর্তী। ওই তল্লাটে একটাই চক্রবর্তী পরিবার যে কেউ দেখিয়ে দেবে।

অনেকক্ষণ কথা চলে দুই বন্ধুর ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে। একজন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, আর একজন মুম্বাইতে মার্কেটিংয়ে কাজ করে কমিশন এজেন্ট। শেষে স্বদেশ, সুদীপ্তকে বলেই ফেলে আমার একটা উপকার করবেন? বলুন চেষ্টা করবো। বাবার পা ফুলে গেছে, সুগারের পেসেন্ট, মনে হয় ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে কিছুতো বলতে চায় না। ফোন করলে শুধু কাঁদে, মা বললো, বাবার পা ফুলেছে। নাম কি ওষুধের? বলতে পারবো না, সুগারের জন্য যে ওষুধটা খায় সকলে। কি করেন বাবা? ঠোঙা তৈরি করে বিক্রি করেন, এখনতো সব বন্ধ কোথায় আর বেরবেন। প্লিজ দাদা একটু যদি সাহায্য করেন, আমি যোমন তেমন করে চালিয়ে নেব, আমার বাবা-মাকে একটু সাহায্য করুন, কেমন আছেন কিভাবে আছেন কিছুই বুঝতেই পারছি না। প্লিজ দাদা, এই অবস্থায় কিছু বলতে পারলে নিজেকে একটু হাল্কা মনে হয় তাই আপনার সাথে শেয়ার করলাম। একটু সাহায্য করুন।
ঠিক আছে, সুদীপ্ত কথা রেখেছিল। স্বদেশের ফোন নম্বর নিয়ে সুদীপ্ত আর তার বন্ধু উজ্জ্বল বামুন ঝরিয়াতে গিয়ে স্বদেশের বাবার হাতে ওষুধ পৌঁছে দিয়েছিল।
সুদীপ্ত চক্রবর্তী, উজ্জ্বল পাত্র প্রথমিক স্কুলের শিক্ষক, দুজনেই প্রথমিক শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন করতে হাসতে হাসতে বলেছিল, আমাদের প্রথমিক শিক্ষকদের কেউ গালাগাল করে, কেউ আবার ভালোও বলে। তবে ভালো বলার লোকসংখ্যাটা কম। আমাদের শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি অশোক রুদ্র একটা কর্মসূচি নিয়েছিলেন ‘সব শোনে মাস্টারমশাই’। কেন জানিনা স্বদেশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হয়েছিল দেখিই না ওর কথাটা শুনে। হাত বাড়ালেই বন্ধু পাওয়া যায় শুনেছি। তবে ফেবুর বন্ধুত্ব, ওর সঙ্গে এর আগে সে ভাবে কথা হয় নি। তবে কথা বলে বুঝেছিলাম ও খুব অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। চোখের সামনে ওর বাবা-মাকে দেখে এসেছি। আশা রাখছি ওনাদের আর অসুবিধে হবে না। এখানকার সংগঠন স্বদেশের বাবা-মার পাশে থাকবে। ও ফিরে না আসা পর্যন্ত।