সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে এবং দশম বর্ষে পদার্পণ করবে। রাজনৈতিকভাবে নয় বছর দীর্ঘ সময় নয়। কিন্তু সদিচ্ছা নিয়ে, সুপরিকল্পনার মাধ্যমে শাসন করলে ন বছরেই লক্ষ্য স্পর্শ করা যায়, তার উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে যে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার প্রত্যেকটি পূরণ করেছে। সাধারণত মানুষের মধ্যে প্রায়শই ক্ষোভ থাকে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার যেদিন থেকে রাজ্য পরিচালনা করছে সেদিন থেকেই প্রতিশ্রুতি পালন করে এসেছে, যার প্রতিফলন রাজ্যের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর পড়েছে।

একটি রাজ্য পরিচালনা করতে প্রয়োজন রাজ্যের জনগোষ্ঠী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধ্যানধারণা, তাঁদের জীবনের মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা ব্যানার্জী, যাঁর নেতৃত্বে পশ্চিম বাংলা আজ পরিচালিত হচ্ছে, তিনি যেহেতু দীর্ঘ আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন তার জন্য পশ্চিম বাংলাকে ও তার জনজীবনকে হাতের তালুর মতো চেনেন।
স্বাভাবিকভাবেই তিনি ক্ষমতায় আসীন হয়েই দু’টি বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দিলেন। একটি ‘মিশন’ এবং দ্বিতীয়টি ‘ভিশন’। যে নেতা এই দু’টি বিষয় সম্পর্কে গুরুত্ব দেন না তাঁরা কখনোই সার্থক নেতা বা নেত্রী হতে পারেন না।

পশ্চিম বাংলার শাসন ক্ষমতায় মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছিল ১৩ মে ২০১১ সালে। আজ যখন এই লেখা লিখছি, মনে পড়ে যাচ্ছে রাজভবনে শপথ অনুষ্ঠানের কথা। বাংলার মানুষ প্রায় ভাবতে শুরু করেছিল এই বাংলায় জগদ্দল পাথরের মতো ক্ষমতা দখল করে রাখা বামফ্রন্ট কোনওদিনই ক্ষমতাচ্যুত হবে না। গণতন্ত্রে একটি দলের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনও অন্যায় নয়। কিন্তু কমিউনিস্টরা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। তারা কৌশলগত কারণে ক্ষমতায় থেকে বিপ্লব সমাধা করবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের থেকেও দলের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছিল অনেক বেশি। কেরলের প্রথম কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, তাঁরা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু ভোটে অংশগ্রহণ করে ও ক্ষমতায় এসে তাঁরা সংবিধানকে ধ্বংস করতে চান।

আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির নিয়মে দিবা-রাত্রি হয়। সময় থেমে থাকে না। কিন্তু সময়কে কাজে লাগাবার পদ্ধতি জানতে না পারলে ব্যর্থতা নেমে আসে। জনরোষ সৃষ্টি হয়। আমরা জানি যে, ২০১১ সালে বামফ্রন্ট রাজত্বের শেষ সময়ে ভারতবর্ষের ২০টি বড় রাজ্যের মধ্যে সার্বিক উন্নয়নের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল ১৭তম। সেই ভেঙে পড়া অর্থনীতি, চরম সন্ত্রাস, স্বৈরাচার এবং অন্ধকারময় দিনগুলিকে পিছনে ফেলে ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গকে ষষ্ঠ স্থানে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী। প্রথম এক বছরের কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা প্রয়োজন। কৃষিতে ২০তম স্থান থেকে ৭ম স্থানে, শিক্ষায় ১৭তম স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে, সরকার পরিচালনার দক্ষতার ক্ষেত্রে দশম স্থান থেকে দ্বিতীয় স্থানে, স্বাস্থ্যে ১৩তম স্থান থেকে ৭ম স্থানে এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে পশ্চিম বাংলা দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫তম স্থান থেকে উঠে আসে নবম স্থানে। বাংলার ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান ‘এ্যাসোচ্যাম’ বলেছিল, ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলা দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে ২০১২ সালেই। পাঠকের জ্ঞাতার্থে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার প্রথম এক বছরের পরিসংখ্যান বলে দেয়, পরবর্তীকালে সেই সরকারের অগ্রগতি কতটা ও কীভাবে হয়েছে। আরও কয়েকটি অগ্রগতির তথ্য (এক বছরে) তুলে ধরতে চাই। সারা দেশের গড় বৃদ্ধি যেখানে ৪.৯৬ শতাংশ ছিল তখন পশ্চিমবঙ্গে গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৬ শতাংশ। কৃষি ও সহায়ক ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় গড় বৃদ্ধির হার যেখানে ১.৭৯ শতাংশ ছিল সেখানে পশ্চিমবঙ্গে গড় বৃদ্ধির হার হয় ২.৫৬ শতাংশ। সারা দেশে শিল্পে অগ্রগতির গড় হার ছিল ৩.১২ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৬.২৪ শতাংশ। পরিষেবার ক্ষেত্রে যেখানে দেশে গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫৯ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে গড় বৃদ্ধির হার হয় ৯.৪৮ শতাংশ।

ইংরাজিতে একটা কথা আছে “Morning shows the day” অর্থাৎ সকালই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে। আজ সরকারের নবম বর্ষপূর্তিতে গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, যে মঙ্গলদীপ সেদিন প্রজ্জ্বলন করেছিলেন বাংলার কর্ণধার মমতা ব্যানার্জী, আজ বাংলা তার আলোকে উদ্ভাসিত। এই প্রসঙ্গে কৌটিল্য-র এক বচন যা তার অর্থশাস্ত্রে লেখা আছে তার উল্লেখ করতে চাই। “প্রজাসুখে সুখং রাজ্ঞঃ প্রজানাং চ হিতে হিতম নাত্মপ্রিয়ং হিতং রাজ্ঞঃ প্রজানাং তু প্রিয়ং হিতম।” অর্থাৎ প্রজার সুখে রাজার সুখ, প্রজার হিতে রাজার হিত। রাজার প্রিয় জিনিস বা কাজ হিত নয়, প্রজাদের প্রিয়ই হিত। এই কথা মনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক পরিকল্পনা করেছেন এবং প্রকল্প করেছেন বিগত নয় বছর ধরে এবং যার ফল আমরা পাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে।
২০১১ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত রাজ্যে প্রতিটি দফতরের কাজে ব্যাপক উন্নয়ন করার জন্য নেত্রী প্রত্যেক বিধানসভার প্রার্থীদের জানিয়ে দেন, বিরোধীদের সমালোচনার থেকে রাজ্যের উন্নয়নের কথাই ভালো করে বলতে হবে। কতটা নিজের প্রতি আস্থা থাকলে এই নির্দেশ দেওয়া যায়, যা লক্ষ্যণীয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তার ফলও পাওয়া যায় এবং ইতিহাস সৃষ্টি করে পশ্চিমবঙ্গে একক দল হিসেবে ২১১টি আসন লাভ করে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস শুধু অটুট নয়, তাঁরা পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জীর কর্মযজ্ঞের প্রতি।

৯ বছরের পূর্তিতে প্রথমে উল্লেখ করতে চাই উন্নয়নের মাপকাঠিতে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি বৃদ্ধির হার যখন ১০.৪ শতাংশ এবং একই সময়ে সর্বভারতীয় বৃদ্ধির গড় মাত্র ৫ শতাংশ। শিল্প বৃদ্ধির হার পশ্চিমবঙ্গের ৩.১ শতাংশ, সর্বভারতীয় শিল্প বৃদ্ধির গড় মাত্র ০.৬ শতাংশ।
এই ৯ বছরে পশ্চিমবঙ্গ একশো দিনের কাজে, ক্ষুদ্র শিল্পে, গ্রামীণ গৃহ নির্মাণে, গ্রামীণ রাস্তা তৈরিতে, মাইনরিটি স্কলারশিপ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ই ও ডি বি এবং ই টেন্ডারিংয়ে দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে আছে। এ ছাড়া দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের বড়ো রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।

রাজ্যে ৫০টির বেশি প্রকল্প চালু রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলির কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দিলেও মমতা ব্যানার্জী রাজ্য সরকারের টাকায় চালাচ্ছেন। কতকগুলি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন কারণ প্রকল্পগুলি শুধু শুধু মানুষকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার জন্য নয়। এর মাধ্যমে শ্রমদিবস সৃষ্টি করে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করা সম্ভব হয়েছে। সময়ের সাথে তাল রেখে সবুজসাথী, খাদ্যসাথী, সুফল বাংলা, গীতাঞ্জলি, নিজ গৃহ নিজ ভূমি, কন্যাশ্রী, সবলা, রূপশ্রী, মুক্তির আলো, স্বাবলম্বন স্পেশ্যাল, শিক্ষাশ্রী, যুবশ্রী, গতিধারা, লোক প্রসার, জয় জোহার, স্বাস্থ্যসাথী, শিশুসাথী, মাভৈঃ, স্বামী বিবেকানন্দ স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প, পশ্চিমবঙ্গ স্বনির্ভর সহায়ক প্রকল্প, মুক্তিধারা, জল ধরো জল ভরো, সবুজশ্রী, সমব্যাথী, কৃষক বন্ধু, শস্য বিমা, বার্ধক্যভাতা, মানবিক, বাংলাশ্রী, কর্মসাথী, বিনামূল্যে সামাজিক সুরক্ষা, হাসির আলো, চা সুন্দরী, স্বপ্নভোর, সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ, বৈতরণী, সদ্যঘোষিত মাটির সৃষ্টি প্রভৃতি প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জীবনে আলোর দিশা দেখিয়েছেন মানবিক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

নয় বছরের সামগ্রিক উন্নয়নের খতিয়ান এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা অসম্ভব। সেই জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা কথা বলে শেষ করবো। তা হলো ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ৫০টি কলেজ, ৮টি মেডিক্যাল কলেজ, ১১৭টি ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান, স্কুলে ১ লক্ষ ৮৭ হাজার নতুন ক্লাসরুম, ১০৮ লক্ষ ছাত্র ছাত্রীদের বিনামূল্যে পোষাক, ১১৩ লক্ষ পড়ুয়াকে মিড ডে মিল দেওয়া হচ্ছে, প্রচুর সংখ্যক কর্মতীর্থ, ৯ লক্ষ ১১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ইত্যাদি। বামফ্রন্ট সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা শোধ করতে এ বছর লাগবে ৫২ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি না হলে আজ পশ্চিম বাংলা অচল হয়ে যেত। শুধুমাত্র পরিকল্পিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে রাজ্যে সম্পদ সৃষ্টি করে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। এফ আর বি এম আইন যা বামফ্রন্ট লাগু করে গিয়েছে তার জন্য বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমানা বাঁধা আছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যকে দেয়নি। ফলে চূড়ান্ত সংকটের মধ্যে দিয়েও রাজ্য পরিচালনা করছেন এবং করোনা সংক্রমণের মতো কঠিনতম সমস্যার মোকাবিলা করছেন মমতা ব্যানার্জী।
বিগত নয় বছরে একদিকে যেমন পশ্চিমবঙ্গকে সব বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে এক কঠিন সংগ্রাম, অন্যদিকে ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন সকলের প্রিয় এবং দেশের অনুকরণীয় চরিত্র মমতা ব্যানার্জী।