| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স: ছোট গল্প লিখছেন প্রজ্ঞাপারমিতা রায়

Reporter
প্রজ্ঞাপারমিতা রায় / ৩৬২ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১

প্রতিদিন যখন ক্লাস ‘সেভেন — বি’-তে পড়াতে যেতাম, তখন এই কথাটা মনে ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতাম — ‘এমনি বহে ধারা’। ভাবনার তো কোনো হিসেব কষার ব্যাপার থাকে না। যা ইচ্ছা, তাই ভাবনার কোনো দোষ নেই। তখন তো স্কুল চলতো, লকডাউন নেই, করোনা ভাইরাস নেই। তাই এইসব ভাবনা মাথায় থাকলেও লেখার কথা কখনো ভাবিনি।

যে স্কুলে আমি পড়াই, সেই স্কুল সাধারণের জন্য হলেও, একটু নীচের দিকের আর্থিক অবস্থার লোকেদের পক্ষে এই স্কুলের খরচ যোগানো তো স্বাভাবিক ছিল না। সেকথা অবশ্য এই লেখার আলোচনার বিষয় নয়।

আসলে দীর্ঘদিন ধরে, যে কথাটা মাথায় ঘুরছে তা হলো, ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স’। সত্যি সত্যি এই শব্দটার সঙ্গে তো তেমন ভাবে পরিচিত ছিলাম না আগে। এখন তো বলাই বাহুল্য — এমন অনেক কিছু জানি, যা কোনো দিনও জানতাম না, যা ছিল ধারণার বাইরে।

আমাদের স্কুল বিল্ডিং তো বিশাল বড় — চার তলা, বিরাট উঁচু। আর আমাদের স্কুলের পাশেই আছে — একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয় এখানে। দুটি স্কুলের মাঝখানে আছে একটি কাঁটা তারের বেড়া। চারতলায় গিয়ে যখন পড়াতে শুরু করতাম ক্লাস ‘সেভেন — বি’-তে, তখন বার বার চোখটা চলে যেতো পাশের ওই স্কুলটির দিকে। অবৈতনিক ওই স্কুলটিকে দেখলে মনে পড়ে যেতো, অন্য অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা। যার কোনো মানে নেই। ছোট একতলা একটি স্কুল বিল্ডিং, দেওয়ালে প্লাস্টার পর্যন্ত করা নেই। কিরকম যেন ‘ছাল-বাকল তোলা’ মনে হতো। তবুও একটু না তাকিয়ে কিছুতেই থাকতে পারতাম না। যতক্ষণ নিজের ক্লাসে থাকতাম, কোনো না কোনো ছুতোয় বার বার ওদিকে তাকানো, ওদের গতি বিধির প্রতি নজর রাখা — এসব যেন একটা নিত্যকার পালনীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো। বেশিরভাগ দিন বেলা ১২টা বেজে ১০ মিনিটে আমার ক্লাস শুরু হতো ‘সেভেন — বি’-তে, মাঝে মাঝে ‘ফাইভ — সি’-তে। শেষ হতো ১২টা বেজে ৫০ মিনিটে। দুটি ক্লাসেরই বড় বড় জানলা দিয়ে ওই স্কুলের সব কিছু দু-চোখ ভরে দেখতাম আমি।

ওই স্কুলের কাজকর্ম শুরু হতো ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার মধ্যে। পৌনে ন’টা থেকেই দেখতাম ওখানে ছাত্র-ছাত্রীরা আসতে শুরু করেছে। আমাদের স্কুলে তখন প্রথম ঘন্টার ক্লাস শেষের দিকে। কারণ আমরা সবাই স্কুলে ঢুকে যেতাম সকাল ৮টার মধ্যে। আমাদের বড় স্কুল, নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। ওদের তো তেমন কড়াকড়ি নেই, টুক টুক করে সব আসতো, কারো কারো স্কুল ড্রেস থাকতো না, এমনি জামা-প্যান্ট পড়েই আসতো। কিছু ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল ড্রেস পড়েও আসতো। নিজেদের স্কুলের তুলনায় ওদের দিকে মাঝে মাঝে করুণার চোখে তাকানোটা ছিল আমাদের শিক্ষক শিক্ষিকাদের একটা অভ্যাস। আমি নিজেও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না হয়তো। তবুও মাঝে মাঝে মনটা একটু অন্যরকম লাগতো। মনে হতো — ওরা বেশ আছে, ধীরে সুস্থে আসছে, পড়াশুনা শুরু হবে। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

আমাদের প্রেয়ার লাইনে সকালে কত বৈচিত্র্য — গান, কবিতা, খবর, ভাষণ, ক্যুইজ আরও কত কি রোজ থাকে, আর ওরা — রোজ একটাই গান গায় “জন গন মন” আর তা না হলে “ধনধান্য পুষ্প ভরা”। এই দুটো গান ছাড়া অন্য গান ওরা গাইতো না। লাইনে যারা দাঁড়িয়ে থাকে তারা কেউ গায়, আর কেউ গায় না। তার জন্য কেউ ওদের বকে না। আমাদের কিন্তু এসব হয় না। সব ছাত্র-ছাত্রীরাই গান গায়। শিক্ষক শিক্ষিকারা নিয়ম করে বকা দেন, শাসন করেন তাদের। সবাই সব কিছু মেনে চলে। আর ওদের স্কুলে যখন যেমন অবস্থা — যেন সেভাবেই এদের স্কুল চলে। আমাদের কেন যে এমন হয় না — এইসব কথাই ভাবতাম, একতলায় ছিল আর্ট এন্ড ক্রাফট রুম, মিউজিক রুম, স্পোর্টস রুম ইত্যাদি। মাঝে মাঝে কখনও আর্ট এন্ড ক্রাফট রুম-এ যেতাম, এমনিই, ভালো লাগতো তাই। এইসব ঘরগুলি একটা লাইন ধরে ছিল, তার পাশেই ছিল একটি পুকুর — খুবই ছোটো একটি পুকুর। আর পুকুরের ওপারে কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ওদিকে — ওদের স্কুল।

কর্তৃপক্ষ-তো অনেকরকম চিন্তা ভাবনা করে। কখন কোন্ লোককে তারা রাখবে, কাকে তারা আর রাখবে না। সবই তাদের ব্যাপার। যিনি আমাদের স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন — তিনি একটু দোষে-গুণে মিলিয়ে নিজের মতই ছিলেন। ভিতরে কে কি মনোভাব নিয়ে চলে, সে খোঁজে আমার মত সাধারণ কর্মচারীদের প্রয়োজনটাই বা কী? তিনি যখই এখানে ছিলেন, মানে বিদ্যালয়ে — তখন সরস্বতীপূজায় এই সরকারী বিদ্যালয়কে নেমন্তন্ন করা হত — কেউ হয়তো আসতো, কেউ আসতো না। তবে দুটি স্কুলেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা চলতো, পূজার আয়োজন হত। লোকজন আসতো। আমাদের স্কুলের অভিভাবক এবং ওদের স্কুলের অভিভাবক দেখলেই বোঝা যেতো যে — তফাৎ একটা আছে।

আমি যথারীতি চারতলার থেকে দেখতে পেতাম — ওরা জোরে জোরে পড়ছে — ক-ম-ল = কমল। বি-ম-ল = বিমল। মাঝে মাঝে ঘন্টার আওয়াজ। সেই আমাদের ছোটোবেলার মত। মনে পড়ে যেতো — আমার ছোটোবেলায় স্কুলে এমনিই একটা পিতলের থালা ঝোলানো থাকতো — আর সময় সময় তাতে পড়তো কাঠের হাতুড়ি। এই আওয়াজটি মনের মধ্যে একটা অনুভূতি তো আনতোই। আমাদের স্কুলেও তো বেল বাজে। কিন্তু সেটা হলো ইলেকট্রিক বেল, তার আওয়াজ ধাতব।

দিন যায়, বছর যায় — আমি দেখি, ভাবি এই তফাৎ-এর কথা। প্রায় দিনই দুপুরের ক্লাসগুলিতে গেলে দেখতে পেতাম — বাচ্চারা থালা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ওদের তো মিড-ডে-মিল-এর ব্যাপার আছে, আমাদের তো লাঞ্চ টাইম। ওদের গলার আওয়াজ বলে দেয় — খাবার ঘন্টা বেজেছে। সবাই থালা নিয়ে ছুটছে। এক অদ্ভুত পরিস্থিতি চলছে। দেখে মাঝে মাঝে মনটা ছুটে যেতো ওদের কাছে, ইচ্ছে হত যাই একবার ওখানে। ওদের ওই খিচুড়ি একবার খেয়ে দেখি না একটু। আমি কি খিচুড়ি খাই নি জীবনে? কিন্তু ওদের ওই খিচুড়ি খাবার জন্য আমার খুব লোভ হত এক একদিন।

আমাদের তো লাঞ্চ ব্রেক, একটা স্যান্ডউইচ, এক কাপ কফি অথবা এক টুকরো কেক আর ডিমসেদ্ধ একটা, তা নাহলে — একটা আপেল আর কলা। আমাদের তো মিড-ডে-মিল নেই, ওইসব তো নেহাতই ছাপোষা স্কুলের ব্যাপার। আমাদের তো ওদের সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না। কোথায় যেন মন একটু উদাস হতো যখন দেখতাম, জানলা দিয়ে ­­­­কচি কচি ছেলে মেয়েগুলো খাবারের থালা হাতে এদিক ওদিক করছে, খাবার পাবার পর বসারও সময় নেই, ধৈর্য্য নেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাচ্ছে। লাগাম ছাড়া হলেও অনুশাসন একটা তো ছিলই। ওই কাঁটাতারের বেড়ার শেষে ২/৩ ফুট জায়গা ছিল — যেখান দিয়ে এসে ছেলে-মেয়েগুলি তাদের থালা ধুয়ে নিতো, আমাদের এই পুকুরে। আমাদের পুকুরটাতে মাছ ছিল — তারা বোধহয় ওই সময়টায় খুব বেশী লাফালাফি করত, নিয়ম করে ওই সময়টায় তারা খাবার পেতো।

আমি দেখতাম — ওরা খেয়ে পাশাপাশি বসে ৪/৫ জন করে থালা ধুচ্ছে, ধুয়েই দৌড়ে খাবার থালা­­­­ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখছে। কোথাও কিন্তু কোনো অনিয়ম নেই। আমাদের স্কুলে তখন আমরা ব্যস্ত থাকতাম যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে, টিফিনটাও যেন তারা অনুশাসন মেনে পালন করে। সেদিকে নজর দেওয়া ছিল আমাদের বিশেষ কর্তব্য।

অধ্যক্ষ মশাই — মাঝে মাঝে এদিক ওদিক রাউন্ডে যেতেন, তাঁর চোখে সবই ধরা পড়তো। আমার মনে হয় তিনি হয়তো এই সব কিছু উপভোগ করতেন। কারণ তিনি ওই পুকুরটির যত্ন নিতেন — মাঝে মাঝে ওপরে শ্যাওলা বা কচুরিপানা হলে পরিষ্কার করাতেন লোকেদের দিয়ে দেখেছি। কিন্তু বেড়ার ওপারের থেকে যখন ­­­­ছেলে মেয়েরা থালা ধুতে আসতো, উনি কিছুই বলতেন না, দেখতেন কিন্তু।

তারপর একদিন ওপরের লোকেদের ইচ্ছায় তিনি স্কুল ছাড়লেন। তার জায়গায় চলে এলেন অন্য একজন অধ্যক্ষা মহাশয়া। যিনি এই স্কুল-কে সব দিক থেকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যাবার ব্রত নিয়েই চলে এলেন।

আমাদের সকলের চোখের মণি হয়ে রইলেন। প্রথম দিন থেকে শক্ত হাতে হাল ধরলেন। কড়া নিয়মের মধ্যেই যেকুটু ফাঁক ফোকর আমাদের ছিল, তা-ও বন্ধ করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন এবং সফল-ও হলেন। আমাদের স্কুলে টিফিন-এর সময় আর কোনো ছেলেমেয়েরা মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে না। মারামারিও করে না। কারণ শিক্ষক — শিক্ষিকারা তাদের কাজ করেন। স্কুলের প্রবল উন্নতি হয়ে চলেছে। সিসিটিভি বসে গেল, ছাত্রছাত্রীদের মারা তো দূরের কথা, বকাও বন্ধ হয়ে গেল। উল্টে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা কাউকে বকা দিলে, তার বাড়ীর লোক আসতে লাগলো, অধ্যক্ষার ঘরে সেই সব অভিভাবকদের সামনে মাথা নিচু করে বলতে হল যে, “ক্ষমাপ্রার্থী আমি, অন্যায় করেছি, ওকে বকে, আর করব না কখনও।” বোঝা যাচ্ছে আমাদের স্থানটা ধীরে ধীরে কোথায় চলে গেল! নতুন অধ্যক্ষার আসার পরে হয়ে গেল প্রায় এক বছর। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরাও অনুশাসন, শৃঙ্খলার জালে আটকা পড়ে গেলাম। এমনকি একজন আর একজনের সঙ্গে ভালো করে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিলাম। নিয়ম মেনে যে কথাও বলা যায় তখনই প্রথম বুঝতে পারলাম।

আগে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর সময় আমরা কখনও দাঁড়াতাম, কখনও বসতাম। এখন যদি পর পর আমাদের তিন ঘন্টাও ক্লাস থাকে, তবুও আমরা বসি না একদম — দাঁড়িয়েই থাকি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা হয়ে গেল সামাজিকভাবে অসামাজিক মানুষের শ্রেণী। যাদের কোনো বক্তব্য থাকবে না কোনো ব্যাপারে, সকলেই পুতুলের মত হয়ে শিক্ষকতার পেশাকে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে বয়ে নিয়ে যাবেন।

সরস্বতী পূজা ফিরে এল — খিচুড়ি বন্ধ হয়ে চালু হল প্যাকেট সিস্টেম, যাতে থাকল কচুরি — আলুরদম — একটা মিষ্টি। এ কেমন সরস্বতী পূজা কে জানে। যে উদ্যম নিয়ে সকলে এতকাল কাজ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশী পরিশ্রম করল শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কিন্তু আনন্দের ঘরে ভাটা পড়ল সবার। সবাই বুঝে গেলাম — মানুষ আর থাকা চলবে না, হয়ে যেতে হবে যন্ত্র। আচ্ছা, না হয় তাই হল। যন্ত্রই হলাম। এরই ফাঁকে স্কুলে নানারকম কাজকর্ম চলতে থাকলো। স্কুল রঙ হল — নতুন রূপে প্রকাশ পেল — স্কুলের সৌন্দর্য। স্কুলের প্রবেশদ্বার এমন হল যে নিজেরাই চমকে গেলাম। তারপর শুরু হল পরীক্ষার নতুন বছর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হাতে হাতে নতুন রুটিন, নতুন ক্লাস — কে, কি পড়াবো, তিনতলা না কি চারতলা? এদিকে না ওদিকে? এই সব ভাবতে ভাবতে চলে এলাম আমার পুরোন ক্লাস — “সেভেন বি”-তে। কারণ এবছর এই ঘরটা হয়ে গেছে ‘সিক্স-সি’। এখানে সারাবছর আমাকে পড়াতে হবে। মন খুব খুশী হল, ক্লাস নিতে নিতে জানলা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি তো দেখা যাবেই, তার সঙ্গে দেখা যাবে — সেই সরকারী স্কুলের যাবতীয় কাণ্ড-কারখানা, মজা পাবো, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে হৈ হৈ করে, কথা বলে, পড়িয়ে, আনন্দেই দিন কাটল।

আজ ওই স্কুলের দৃশ্য তেমনভাবে দেখা হয় নি — যাক, কাল তো আবার ক্লাস আছে। কেটে গেল বেশ কিছু দিন। পরের সপ্তাহে আবার ক্লাসে গেলাম। বুঝতে পারছি ওই স্কুলে হই-চই চলছে, খাওয়া শুরু হচ্ছে ওদের। আমি আমার ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীদের একটু লেখার কাজ দিলাম, যাতে আমি একটু অন্যদিকে মন দিলে ওরা যেন বুঝতে না পারে। আমি যে এই ফাঁকিটুকু দিচ্ছি ছাত্র-ছাত্রীদের এর জন্য মনের মধ্যে একটু কোথাও খচ খচ করছে, তুবও ধীর পায়ে — এগিয়ে জানলার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালাম — ওদের দৌড়ানো আর থালা ধোওয়া দেখব — পুকুরের পাশে। কিন্তু এ কী? সেই কাঁটাতারের বেড়া তো আর নেই। ওখানে এক বিরাট পাঁচিল উঠে গেছে যে! কী মুশকিল! বাচ্চাগুলো কি করবে? দেখি, ওরা — ওদের স্কুলের যে টিউবয়েল ছিল তাতে থালা ধুচ্ছে। একই নিয়ম মেনে পর পর এক জায়গায় থালা ধুচ্ছে এবং রাখছে। ওদের হাসি-খুশী-চিৎকার সব একই রকম আছে। আমি পড়ালাম ছাত্র-ছাত্রীদের ঠিকই, কিন্তু কী পড়িয়েছিলাম জানি না। ক্লাস থেকে নীচে নেমে যখন স্টাফ রুমে এলাম, আমার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু অদ্ভুত একটা কষ্ট হতে থাকল — সারাদিন। কেন যেন মনে হল দুটি স্কুল সব দিক থেকে আলাদা হয়েও কোথায় যেন একটু মিলে যেতো, দু-চোখে নোনা জলের উপস্থিতি সযত্নে আড়াল করতেই হল অন্যদের কাছ থেকে। সবাই তো কারণটা জানলে হাসবে — হয় তো আমার মনের যন্ত্রণাটা বুঝতেই পারবে না। মাছগুলো খেতে পাবে না, সেই কষ্ট? না কি এই অদ্ভুত আলাদা হয়ে যাবার কষ্ট? কোনটা? আজ যখন চারিদিকে এই শব্দটা শুনি — “সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স”- তখন আমার কেবলই মাঝখানে ওই দেওয়ালটার কথা মনে পড়ে যায়। সত্যিই যে কথা কোনোদিন বুঝি নি, ভালো করে বুঝলেও অনুভব করতে পারি নি। গত কয়েক বছর ধরে সরস্বতী পূজায় আমাদের স্কুল থেকে ওদের নিমন্ত্রণ করা বন্ধ হয়েছে। কারণ ওরা আর আমরা তো আলাদা। আমরা কত বড়! আর ওরা! ওদের সঙ্গে আমরা নিয়ম মেনেই দূরত্ব রক্ষা করে চলেছি। সামাজিক দূরত্ব — কাকে বলে? তা এতদিনে আমার কাছেও স্পষ্ট হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev