৫২ বছরে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে তার মূলে রয়েছে এদেশের গণমাধ্যম ও শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। ১৯৭১ এর আগে পাকিস্তান আমলে গণমাধ্যমকে শাসকশ্রেণির হাতিয়ার করা হয়েছিল এবং শিক্ষাকে ইসলামিকরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববাংলার গড়ে তোলা হয়েছিল বৈষম্য। পাকিস্তান আমলে ছাত্রসমাজের শিক্ষা আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর সেই আন্দোলনে সম্পৃক্ততা একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষা ও গণমাধ্যম সেক্টরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কিংবা ১৯৭৩ সালের ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৪ সালের প্রাথমিক শিক্ষা টেকিং ওভার অ্যাক্ট, মাদ্রাসা শিক্ষা অর্ডিনেন্স অর্ডার (১৯৭৩), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অ্যাক্ট (১৯৭৩) এবং দ্য বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন অর্ডার (১৯৭২) প্রভৃতির কথা স্মরণে রেখে বলা যায় শিক্ষার রূপ-রূপান্তর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে শুরু হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে তার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। অন্যদিকে মিডিয়াকে বঙ্গবন্ধু নিজের সাধ্যের মধ্যে রেখে প্রসারিত করেন তাঁর শাসনামলে। মুক্তিসংগ্রামে ইত্তেফাক, সংবাদ প্রভৃতি পত্রিকার প্রগতিশীল ভূমিকা তিনি ভালো করেই জানতেন। এজন্য ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশের সংবাদপত্রকে স্বাধীন মতপ্রকাশে সুযোগ তৈরি করে দেন। এমনকি সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণমূলক কাজে সরকারি দৃষ্টি দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা তৈরি করেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন পাস হওয়া ‘নিউজ পেপার ডিক্লারেশন এনালমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ নামে আইনটি করা হয়েছিল তখনকার সাংবাদিক নেতাদের পরামর্শে। এর আগ পর্যন্ত সাংবাদিকদের কোনো বেতন কাঠামো ছিল না। মালিকরা সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন দিতেন না। বঙ্গবন্ধু এসব জানতেন। এজন্য ৭৫ সালের ১৬ জুনের পর যেসব পত্রিকা বন্ধ করা হয় তিনি সেসব সাংবাদিক-কর্মচারীর বেতন নিশ্চিত করেছিলেন। তারা এক তারিখ ট্রেজারিতে গিয়ে বেতন নিয়ে আসতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না।’ গণসচেতনতা তৈরিতে মিডিয়ার ভূমিকা বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকৃত।
দুই
মূলত আধুনিক, বৈজ্ঞানিক, অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন ও যুগোপযোগী গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ঘটে বঙ্গবন্ধুর আমলে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৮ অক্টোবর ১৯৭০ সালে বেতার-টেলিভিশন ভাষণে বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাবার পরিসংখ্যান একটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের দেশের শতকরা ৮০ জন অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লাখেরও অধিক নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষাখাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। পাঁচ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণির জন্য খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিকেল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’ স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বৈষম্যহীন সমাজ তৈরিতে মনোযোগী ছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন পাকিস্তান আমলের সকল বৈষম্যের নিরসনের।ভাবতেন স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হবে যেন একটি সুখী সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের সন্তানরা বেড়ে উঠতে পারে সংস্কারমুক্ত পরিবেশে।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃনির্মাণ করা এবং স্বাধীন দেশের উপযোগী পাঠ্য বই রচনা ও প্রকাশের দায়িত্ব সরকারকে পালন করতে হয়। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য শিক্ষক শহীদ হওয়ার তাদের পদগুলো পূরণ করা, নয় মাস শিক্ষকদের বেতন বন্ধ ছিল— সেই বেতন পরিশোধ করাও ছিল গুরু দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রসমাজ যে নিদারুণ ত্যাগ স্বীকার করেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সকল সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বেতন মওকুফ করা হয়। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সম্মতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য ৫১ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেন। এর অধিকাংশ অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনঃনির্মাণে ব্যয় হয়। ১৯৭২ সালে ভাষার মাসে, ১২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। স্কুল কলেজের বেতনও পুনঃনির্ধারণ করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই প্রদান করবে সরকার। সেই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে চল্লিশ শতাংশ কম দামে বই দেয়া হবে। নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের অবদান আছে। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ফলে নারীশিক্ষার জন্য যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ সূচিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা নিয়ে স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করা হয়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষা সম্পর্কে বলা আছে- রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য; কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷
বঙ্গবন্ধু মনে করতেন-‘শিক্ষার্থীরা যেন শুধু ডিগ্রীধারী না হয়ে বরং সমাজের প্রয়োজনে শিক্ষিত হয়ে দেশের কাজে ভূমিকা রাখতে পারে, এই লক্ষ্যে তাদের পাঠদান করাই হবে শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য।’এজন্য তিনি কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।গণমুখী শিক্ষা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে মিল রেখেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে তিনি এই শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন।কমিশন ১৯৭৪ সালের ৩০ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন শিরোনামে ৩০৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, দেশপ্রেম ও সুনাগরিকত্ব, মানবতা ও বিশ্বনাগরিকত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার রূপে শিক্ষা, প্রয়োগমুখী অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনুকূলে শিক্ষা, কায়িক শ্রমের মর্যাদাদান, নেতৃত্ব ও সংগঠনের গুণাবলি, সৃজনশীলতা ও গবেষণা এবং সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক প্রগতির ক্ষেত্রে শিক্ষা মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি স্বৈরশাসকদের দ্বারা অবহেলিত হয় এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে দেশের মধ্যে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখে ধাবিত হয়।অন্যদিকে গণমাধ্যমকে খুনি মোশতাক-জিয়া গংরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা শুরু করে। আর মিডিয়ার তার স্বাধীনতা হারায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর।
বলা হয়ে থাকে, গণমাধ্যম জনগণের মতামতকে ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ গণমাধ্যমের এজেন্ডা পাবলিক এজেন্ডায় পরিণত হয়। সমাজে নানা ঘটনার মধ্যে কোনটি বেশি আলোচিত হবে বা গুরুত্ব পাবে গণমাধ্যমই তা নির্ধারণ করে দেয়। এর মধ্যে সহজবোধ্য ও দ্রুততম তথ্য প্রাপ্তির উৎস হিসেবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া একধাপ এগিয়ে। অতীত এবং বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে যাবে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে তেমনি স্বাধীনভাবে কাজ করার যাবতীয় দিক উন্মোচন করা দরকার। তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। আর সুশাসন সুমন্নত অবস্থানে পৌঁছালে তার মাধ্যমেই বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ভাল হবে।
তিন
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর এদেশে গণমাধ্যম ও শিক্ষার অগ্রগতি পুনরায় সঠিক পথ অনুসরণ করতে শুরু করে।১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সত্যনিষ্ঠ প্রিন্ট ও টিভি চ্যানেল এবং সামাজিক ন্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনলাইন গড়ে ওঠে। অপরদিকে ২০০৯-২০২২ সাল পর্যন্ত গণমাধ্যমে কর্পোরেট মালিকানার প্রাধান্য পরিলক্ষিত হলেও তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সাংবাদিকতায় উৎকর্ষ অর্জিত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ও সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০১ থেকে ২০০৮ অবধি সেই অগ্রগতি থমকে দাঁড়ালেও ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত গণমাধ্যম ও শিক্ষা সেক্টরে এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত বিশদ।এজন্য ‘‘শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান হবে একটা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণের মাপকাঠি।’’— এই মুখ্য মন্ত্র আজকের শিক্ষার চালিকা শক্তি। একইভাবে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন বেশি জোর দিতে হবে গবেষণার ক্ষেত্রে। তবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান হবে একটা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণের মাপকাঠি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে উচ্চশিক্ষা তথা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার সূতিকাগার।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষায় জিডিপির অন্তত চার শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা আজও তিন শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করতে পারছি না। তবে অন্যান্য যেসব বিষয়ে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, সেগুলো পক্ষান্তরে শিক্ষা খাতেই বিনিয়োগ হচ্ছে। কারণ সেগুলো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করছে। দারিদ্র্য যেন কারও উচ্চ শিক্ষা অর্জনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় আমাদের সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’ শিক্ষামন্ত্রীর প্রত্যাশা এবং বর্তমান বাস্তবতায় ইউজিসি’র বিভিন্ন উদ্যোগ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
বর্তমান সরকারের ১৩ বছরে দেশের ৫৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী ও দক্ষ উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রশংসা অর্জন করেছেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের জীবন বৃত্তান্ত, একাডেমিক সাফল্য পর্যালোচনা করেই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ প্রথমত উপাচার্যরা নিয়োগ পেয়েছেন একাডেমিক যোগ্যতায়। তারপর তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও সংস্কারমুক্ত মুক্তবুদ্ধির অনুসারী কিনা তা বিবেচনায় এনে প্রশাসনিক পদে পাঠানো হয়। এসব চেতনায় অবিশ্বাসীরা কিংবা দুর্বল একাডেমিক রেকর্ড নিয়ে চাকরি প্রত্যাশীরাই মূলত উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে থাকে যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ধরুন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট অনুসারে প্রশাসন পরিচালনায় উপাচার্যকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেখানে সিনেট কিংবা অন্য কোনো পরিষদের (সিন্ডিকেট, ডিন) সদস্যদের জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা নেই। সেক্ষেত্রে সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রাখবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল। প্রশাসন চালিয়েছিলেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে কারো প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে নন। অনেক সময় দেখা গেছে সরকার দলীয় শিক্ষক কিংবা ছাত্র নেতাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিতে অপারগ হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। উপাচার্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বিরোধী দলের সমর্থক কেবল নয় নিজের দলের লাল-নীল শিক্ষকদের ইন্ধনেও হয়ে থাকে, যা ন্যক্কারজনক। নিজেদের স্বার্থ রক্ষা পেলে উপাচার্য ভালো বনে যান আর নিজেদের আনডিউ স্বার্থ হাসিল না হলে তিনি মন্দ হিসেবে গণ্য হন। এ বাস্তবতায় উপাচার্যদের দলীয় আনুগত্যকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের রাজনীতিকে খারাপ বলার মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। কারণ অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পাথেয় ছিল। তার ধারাবাহিকতায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুসারে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরে নির্বাচিত উপাচার্য নিযুক্ত রয়েছেন। সেদিক থেকে দাবি করা যেতে পারে যে, উপাচার্য নিয়োগে গণতান্ত্রিক ধারা, যোগ্যতার মাপকাঠি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এর সবকিছু একীভূত। এ ধরনের ব্যবস্থা চর্চিত হলে উপাচার্যদের ছত্রছায়ায় দলীয় ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ থাকবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। তাছাড়া বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বজায় রাখা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি’র জন্য কোনো ব্যাপার না। অবশ্য একথা ঠিক কোনো শিক্ষকের দলীয় মনোভাবে কাজ করা উচিত নয়। যা কিছু করা দরকার, সব শিক্ষা ও জাতীর স্বার্থে করতে হবে। কিন্তু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের জন্য সকল উপাচার্যকে ঢালাওভাবে দায়ী করাও ঠিক নয়। কারণ কোনো উপাচার্যের দলীয় মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। তবে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কিছু সুযোগ-সুবিধা নিতে চায় এটাই স্বাভাবিক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয়করণের সুযোগ কম। কারণ শিক্ষা নিয়ে দলীয়করণ করলে শিক্ষার মান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ধরে রাখা সম্ভব নয়।
অপরদিকে গত ১৩ বছরে শেখ হাসিনার শাসনামলে এদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ২০১৬ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ এগিয়ে ১৪৪তম হয়েছিল। অথচ ২০১৫ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬তম।
মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভাল হলেও উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল বিশ্বব্যাপী সরকার ও ব্যবসায়ীদের চাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও বেশি খর্ব হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করে অপপ্রচারের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। কর্পোরেট সুবিধার কথা ভেবেও গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করা শুরু করেছে। অর্থাৎ আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ সময়েও দেখা যায় বিশ্বের প্রায় ৭৭টি দেশে এখনও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশেও কায়েমি স্বার্থ বাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও অপকর্মের খবর পরিবেশন করার জন্য অনেক সাংবাদিক প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। অবশ্য বিএনপি-জামায়াত আমলে গণমাধ্যমের করুণ দশা সকলেরই জানা।
চার
মনে রাখতে হবে, মানব জাতির কল্যাণকর, শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ সৃষ্টি শিক্ষার মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা।’তিনি আরো বলেছেন ‘শিক্ষা হলো, বাইরের প্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন।’মানব শিশুর জন্মের পর থেকে ক্রমাগত এবং অব্যাহত পরিচর্যার মাধ্যমে তার দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে নানা সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তার মানসিক বিকাশ হয়। উন্নত মানসিক বিকাশের ক্রমচর্চার মধ্যে দিয়ে নৈতিকতার পরিগঠনের মাধ্যমে আত্মার শুদ্ধি ঘটে। এজন্য বলা হয়ে থাকে দেহ, মন ও আত্মার সুসামঞ্জস্য বিকাশই শিক্ষা। এক কথায় পরিপূর্ণ মানব সত্তাকে লালন করে দেহ, মন ও আত্মার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে, নিজেকে জাতির উপযোগী, যোগ্য, দক্ষ, সার্থক ও কল্যাণকামী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার নামই শিক্ষা। শিক্ষা মানব জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ। এ সম্পদ কখনই খোয়া যায় না বা বিলুপ্ত হয় না। বেঁচে থাকার জন্য, নিজেকে অভিযোজিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যক্তির উন্নয়ন, সমাজের উন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের প্রথম সরকার কর্মকাণ্ড শুরু করে। এখন ২০২২ সাল। এই দীর্ঘ পাঁচ দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, পাল্টে গেছে শিক্ষা-সংস্কৃতি, নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে মানুষের চিন্তাচেতনা। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাপদ্ধতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি করেছিল। একাধিক শিক্ষা প্রণালি ছিল এর মূল কারণ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ‘কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন’-এর রিপোর্টে এ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান নানারূপ বৈষম্য অবসানের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে পাকিস্তানের পুরনো ভূত ভর করে। ১৯৭৩ সালে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তারও মৃত্যু ঘটে পঁচাত্তর-পরবর্তী স্বৈরশাসকদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ব্যাপক উন্নয়নের জোয়ার চলছে। ঢাকায় ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় ভালো সাফল্য দেখাচ্ছে। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজাদপুর-শিলাইদহে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোণার শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর নতুন উৎসাহে একাডেমিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। যুগান্তকারী এসব উদ্যোগ চার দশকের শিক্ষাচিত্রে অনন্য সংযোজন। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইতোমধ্যেই বলেছেন, শ্রমশক্তিতে তারুণ্যের প্রাধান্য বাড়ায় আগামী ১০ বছর বাড়তি সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এ সুবিধা পেতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নতুন কৌশল নিতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা। বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সরকারের তৈরি নানান অসঙ্গতি দূর করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুণগতমান নিশ্চিতকরণ ও তা বিশ্ব পর্যায়ে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর আলোকে ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ফর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ ২০১২’ প্রবিধানমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তা বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। দু’একটি বাদে এতোদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় প্রচলন ছিল না। বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি’র অনুরোধ রক্ষা করেছে অনেকেই; স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বিভাগে বাংলা ভাষা-সাহিত্য পড়ানো হয়। বাংলাদেশে বিদেশি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্থান ও পরিচালনা সংক্রান্ত প্রবিধানমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
‘ইউজিসি’র বদৌলতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে পোস্ট ডক্টোরালে ৫০ হাজার এবং পিএইচডি প্রোগ্রামে গবেষণার জন্য ৩০ হাজার টাকা বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া গবেষণা প্রকল্পেও অর্থ বরাদ্দ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ‘হেকেপ’সহ বেশ কিছু প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা উপ-প্রকল্পে কয়েকশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। দেশের উচ্চ শিক্ষাখাতে গবেষণায় এর আগে এতো বেশি বরাদ্দ আর কখনও দেওয়া হয়নি। গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির সংযুক্তি একটি অনিবার্য দিক। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগে উচ্চ গতিসম্পন্ন ডাটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ইউজিসি ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-এর মধ্যে কোম্পানিটির দেশব্যাপী বিস্তৃত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ২০ বছরব্যাপী ব্যবহার বিষয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি কার্যক্রমে অনলাইন পদ্ধতির ব্যবহার যুক্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ও এসএমএস-এর মাধ্যমে ভর্তির আবেদনপত্র ও ফি গ্রহণ করা হচ্ছে।মিডিয়ার চিত্রটি ভিন্ন।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট, জার্নালিজম এন্ড কমিউনিকেশন (বিসিডিজেসি)’র জরিপে দেখা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে দেশে দু’শতাধিক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হন ২৮৫ জন সাংবাদিক। কেবল ২০০১-এর অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮টি ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক। চরম নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রচলিত আইনের আওতায় দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সময় ও অর্থ অনেক সাংবাদিকের নেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গণ মানুষের তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহুল প্রত্যাশিত ‘তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ’কে আইনে পরিণত করে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। উপরন্তু সাংবাদিক সমাজের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এই সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আসলে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ভাল হবে যদি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমকে কার্যকর ভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার আগে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রদেয় গবেষণা সহায়তা মঞ্জুরী অনলাইনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ ইউজিসিতে আয়োজিত ‘অনলাইন সাবমিশন ফর রিসার্চ গ্র্যান্টস’ সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন। তাঁর মতে, ‘অনলাইন সাবমিশন ফর রিসার্চ গ্র্যান্টস সফটওয়্যারটি ব্যবহার করলে কাউকেই আর ইউজিসিতে গবেষণা সহায়তা মঞ্জুরীর জন্য আসতে হবে না। এর মাধ্যমে সেবা দ্রুত পাওয়া যাবে। এটি ইউজিসি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং কর্ম পরিবেশ উন্নত করবে। সফটওয়্যারটির সুফল পেতে এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি উচ্চশিক্ষার সুফল পেতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও ইউজিসি’র সেবা জনবান্ধব করার জন্য সংশ্লিষ্টদেরকে পরামর্শ প্রদান করেন।’ উল্লেখ্য, ইউজিসি’র গবেষণা সহায়তা ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বিদেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স/ সেমিনার/ সিম্পোজিয়াম/ ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ; উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যাতায়াত খরচ, দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কনফারেন্স/ সেমিনার/ সিম্পোজিয়াম/ ওয়ার্কশপের জন্য সহায়তা এবং এমফিল/ পিএইচডি/ পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষণায় সহায়তা দিয়ে থাকে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে সহজে সেবা প্রদান যেন বিঘ্নিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে ইউজিসি চেয়ারম্যান পরামর্শ প্রদান করেছেন। করোনাকালে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ এবং অনলাইন ক্লাসের জন্য টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে ইউজিসি তাদের কাজের দক্ষতা দেখিয়েছে। ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যাম্পাসভিত্তিক ক্লাস বন্ধ থাকলেও অনলাইন লেখাপড়ার কার্যক্রম পুরোটাই মনিটরিং করে ইউজিসি। এমনকি কোভিড-১৯ এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কার্যক্রমও দেখভালের দায়িত্ব এই সংস্থাটির ওপর বর্তেছে। আসলে চার দশকে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মযজ্ঞ প্রসারিত হয়েছে। এরই পরিণতিতে স্থাপিত হয়েছে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়; নিযুক্ত হয়েছেন ইউজিসিতে বিজ্ঞ চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ। ব্যক্তির জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন বা কলাকৌশল আয়ত্ত করতে সহায়তা করার এসব প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ-প্রসারী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমরা মনে করি। কারণ আওয়ামী লীগের প্রশাসক হলেও মানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাঁরা ক্রমান্বয়ে উচ্চ স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। নতুন নতুন বিভাগ ও মেধাবী শিক্ষকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। জ্ঞানের প্রসারিত দিগন্তে বিশ্বের যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বরেণ্য গবেষকদের সঙ্গে সমান্তরাল মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শনে সক্ষম এদেশের বর্তমান প্রজন্ম।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশিত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ১৩ বছরে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের অশান্ত পরিস্থিতিকে দ্রুত স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে সুস্থ মানসিকতা ও উচ্চ মানসম্পন্ন মনন সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। মুক্তচিন্তার চর্চা, নিরাসক্তভাবে সত্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলাও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্য যার প্রধান অবলম্বন হলো গবেষণা। ডা. দীপু মনির শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহর ইউজিসি প্রশাসনের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথম শ্রেণির বিদ্যাপীঠে পরিণত করতে সহায়ক হবে।
পাঁচ
আমাদের দেশের মতো গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা আর আইনের শাসনকে যারা বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনে ধৃষ্টতা রাখে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম তাদের সমুচিত জবাব দিতে পারে। তবে এটাও সত্য কোনো কোনো গণমাধ্যম কর্মী নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য স্বেচ্ছাচারীর ভূমিকা পালন করেন। তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অপব্যবহার করে ক্ষেত্র বিশেষে গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে কেউ কেউ বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে দেশদ্রোহী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। আজ বিশ্বব্যাপী একথা স্বীকৃত যে, গণমাধ্যমের মাধ্যমেই নিজেদের পরিশীলিত করা যায়। এজন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষের তথ্য প্রাপ্তির অন্যতম উৎস হল গণমাধ্যম। বলা হয়ে থাকে, গণমাধ্যম জনগণের মতামতকে ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ গণমাধ্যমের এজেন্ডা পাবলিক এজেন্ডায় পরিণত হয়।
গণমাধ্যমই সর্বপ্রথম করোনা মহামারিতে শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনাসমূহ ব্যাপকভাবে প্রচার করে জনসচেতনতা তৈরি করেছে। মানুষের ভেতর আতঙ্ক সৃষ্টি না করে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে কোভিড-১৯-কে মোকাবেলায় স্বাস্থ্য কর্মীদের উৎসাহ জুগিয়েছে গণমাধ্যম। এমনকি স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির খবর নির্ভীক ভাবে প্রকাশ করে সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যম সর্বপ্রথম শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। এদেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে দ্রুত বিচারের সক্ষমতা এবং আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় শিশু রাকিবকে পৈশাচিক ভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। রাজন হত্যার চার মাস এবং রাকিব হত্যার তিন মাস পাঁচ দিনের মাথায় ছয় আসামিকে ফাঁসি দেওয়ার দুটি রায় এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় মামলার গতি ত্বরান্বিত হওয়ায় সব মহলই খুশি। গণমাধ্যমের কল্যাণেই এসব মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন হচ্ছে এবং দেশে অপরাধের মাত্রা অনেক কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে করোনার মধ্যে অনলাইন শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে আমাদের কর্মক্ষেত্র এত পরিবর্তন হবে যে বর্তমানে অর্জিত জ্ঞান হয়তো ভবিষ্যতে আর প্রয়োজন হবে না। সেক্ষেত্রে কর্মজীবীদের পক্ষে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যাতে কোনো কর্মজীবী যে কোনো সময় যে কোনো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সে যেন অনলাইনের মাধ্যমে শিখতে পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সে সুযোগ রাখতে হবে। তাঁর মতে, ডিজিটাল শিক্ষার যুগে বাচ্চাদের শেখার উপকরণগুলো সহজেই বোধগম্য এবং উপভোগ্য করে তৈরি করা দরকার। পড়াশোনা সবসময় পরীক্ষাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়, বরং নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল মানুষ গড়তে যেসব শিক্ষা দরকার তার প্রয়োজনীয়তা অনেক, যেমনটা জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন।
অর্থাৎ করোনা পরবর্তী সময়েও দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভার্চুয়াল ক্লাস চলমান থাকবে। ডা. দীপু মনি তখন বলেছিলেন, ‘১০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য সুদবিহীন ঋণ দেওয়া যায় কিনা তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ লোনও দিতে পারি।’ তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে উদ্যোগ নিয়ে চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি তৈরি করতে হবে।চলমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন সময়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠদানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য “সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন”-এ বিষয়ভিত্তিক ক্লাস শুরু করে। এ প্রসঙ্গেও শিক্ষামন্ত্রী কথা বলেছেন। সংসদ টিভির ক্লাসগুলো প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের জরিপে আমরা জানতে পেরেছি- সংসদ টিভির ক্লাসগুলো মোবাইল ফোনসহ প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। তবে এখনও ১০ ভাগ শিক্ষার্থীর কাছে সংসদ টিভির ক্লাসগুলো পৌঁছায়নি। কিন্তু এই দশভাগকে পিছনে ফেলে আমরা সামনে এগিয়ে যাব না। তাই ইতোমধ্যেই আমরা টোল ফ্রি মোবাইল সুবিধা দেব যা খুবই দ্রুত সেটা চালু করতে যাচ্ছি যার মাধ্যমে সেই ১০ ভাগ শিক্ষার্থীও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে পাঠের সুযোগ পাবে। এছাড়া ইন্টারনেটের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে বাজেটে প্রস্তাবনা থাকলেও শুধু শিক্ষাক্ষেত্রকে এর বাইরে রেখে বা নাম মাত্র মূল্যে কিভাবে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া যায় সেটা নিয়েও আমরা ভাবছি। এ ছাড়াও কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমেও তাদের কাছে শিক্ষা পৌঁছানোর বিষয়ে আমাদের কাজ চলছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের তথ্য সেবা কেন্দ্র ও ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রগুলোকে শিক্ষার জন্য ব্যবহার করা পরিকল্পনা রয়েছে।’ ২০২০-২০২১ ও ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তির কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয় শিক্ষামন্ত্রীর সার্বক্ষণিক তদারকিতে।
ছয়
স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি, শিশু হত্যাকাণ্ড, ব্লগার এবং হিন্দু-খ্রিস্টান পুরোহিত খুন, বিদেশি হত্যাকাণ্ড, লেখক ও প্রকাশক খুন, জঙ্গিবাদীদের অপতৎপরতাসহ বড় ধরনের অপরাধ আমাদের সমাজে নানা কারণেই বেড়েছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজটি চলছে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে। ইতোমধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকর করায়; যদিও কয়েকজন অপরাধীকে এখনো ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব হয়নি।
অবশ্য ৫২ বছরের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ‘শিক্ষানীতি ২০১০’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, প্রায় ১২ বছর আগে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তাই এখন শিক্ষানীতিকে সংশোধন, পরিমার্জন ও সংযোজন করা প্রয়োজন। এজন্য সরকার শিক্ষানীতি সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
মহামারীর মধ্যে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘ডিজিটালাইজেশন এর মাধ্যমে সরকারি সেবা সমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হয়।’ তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৩০টি সেবা একই প্ল্যাটফর্ম এর মাধ্যমে প্রদানের কার্যক্রম myGov-এর উদ্বোধন করেন। ২০২০ সালের ৭ আগস্ট এ সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হবে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এর বিপ্লব। যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সাথে একান্ত সঙ্গী হয়ে যাবে প্রযুক্তি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এই শিল্প বিপ্লবের ফলে গতানুগতিক অনেক চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আবার চাকরি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এই চ্যালেঞ্জকে সরকার সম্ভাবনায় পরিণত করতে চায়। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। আর এ লক্ষ্যে ২০৫০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
সাত
অনলাইনে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন — ‘অনলাইনে বিজ্ঞান শিক্ষা কোনোভাবেই করা যাবে না তা নয়। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরি রয়েছে। এটি অসম্ভব তা নয়। যত রকমের চ্যালেঞ্জ থাকুক আমরা তা মোকাবিলা করবো। আওয়ামী লীগ ও সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও এটি রয়েছে। আমাদের কোথাও আটকে রাখার সুযোগ নেই। আমাদের আটকে রাখতে পারে আমাদের মাইন্ড সেট। তাই আমাদের মাইন্ড সেট পরিবর্তন করতে হবে।’ করোনাকালে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন দীপু মনি। তিনি বলেছিলেন, অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এতে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই ইন্টারনেটের ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট দিতে অথবা স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ দেওয়ার আহ্বান জানান।সেসময় তিনি আরও বলেন, ‘কোভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই হয়তো ভর্তির ফি একসাথে দিতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তারা যেন কিস্তিতে ভর্তি ফি দিতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ডিজিটাল শিক্ষার যুগে বাচ্চাদের শেখার উপকরণগুলো সহজেই বোধগম্য এবং উপভোগ্য করে তৈরি করা দরকার।তাঁর মতে, পড়াশোনা সবসময় পরীক্ষাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়, বরং নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল মানুষ গড়তে যেসব শিক্ষা দরকার তার প্রয়োজনীয়তা অনেক। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এ স্টপ মোশন অ্যানিমেশনটি শিশুদের জন্য উপযোগী মাধ্যম, ভাষা এবং স্টাইল ব্যবহার করে সংবিধানের চারটি স্তম্ভকে তুলে ধরেছে। যেসব মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশের সংবিধানের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে, এ অ্যানিমেশন তরুণ প্রজন্মকে সেসব সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলবে।’
উল্লেখ্য, শিশুদের উপযোগী রঙিন রূপক এবং প্রতীক দিয়ে অ্যানিমেশনটি তুলে ধরেছে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির চারটি মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, এবং জাতীয়তাবাদ। যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান একটি ছোট মেয়েকে পাখির বাসা তৈরি শেখান, সাথে তিনি বলে যান সেসব পেছনের গল্প যা জাতির জন্য একটি কাঠামো পরিকল্পনায় তার নীতি-আদর্শকে প্রভাবিত করেছিল।
২০২০ থেকে ২০২২ সালের মে মাসের মধ্যে ইউজিসি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অনিয়ম তদন্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছে। সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ অদ্যাবধি দেখা যায়নি।অনিয়মের কারণে পদে না রাখার সুপারিশও মানা হয়নি। তবে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি ভালো দিকে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সততা এবং ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহর দক্ষতা এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।৫৪টি পাবলিক, ১১০টি বেসরকারি এবং ৩টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার বিশাল দায়িত্ব এখন ইউজিসির কাঁধে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী এবং ১৫ হাজার শিক্ষক রয়েছেন।
ওয়েবসাইটে বর্ণিত ইউজিসি’র ইতিহাস ও কার্যক্রম হলো এরকম- ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার গুরুত্বকে অনুধাবন করেছিলেন। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১০ এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিধিবদ্ধ হয়। সেই সময়ে ইউজিসির কার্যক্রম ছিল তৎকালীন ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা নিরূপণ। সময়ের সাথে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিধি ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করায় বর্তমানে ইউজিসির কার্যক্রমগুলো হলো- সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান, উচ্চ স্তরের শিখন-শেখানো পদ্ধতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা প্রদান, সর্বোচ্চ উদ্ভাবনী গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়সমূহের উন্নয়ন ঘটানো। এছাড়াও ইউজিসি উচ্চশিক্ষার নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে মান নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী সরকারকে পরামর্শ প্রদান করে থাকে।’ গত ২ বছরে দেশের ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কাজ করেছে ইউজিসি। ২০২০ সালের নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস হালনাগাদ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের তাগাদা দেয় ইউজিসি। উল্লেখ্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে প্রোগ্রম অনুমোদনের শর্ত মোতাবেক প্রতিটি প্রোগ্রাম অনুমোদনের তারিখ থেকে প্রতি ০৪ বছর অন্তর অন্তর অনুমোদিত সিলেবাসসমূহ কমিশন প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড সিলেবাসের গাইডলাইন অনুসরণে হালনাগাদ করার জন্য ২০১৯ সালে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের ক্ষেত্রে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন অপরিহার্য উপাদান। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও গুণগত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে জরুরি বলে কমিশন মনে করে। অনুমোদিত চলমান প্রোগ্রামসমূহ হালনাগাদ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এজন্যই আবশ্যক।
উপসংহার :
সব মিলে গত ৫২ বছরের মধ্যে করোনাকালে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার মিডিয়া ও শিক্ষা সেক্টর। করোনার কারণে চাকরি হারান অনেক সাংবাদিক। শিক্ষায় ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য শেখ হাসিনা সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা শিক্ষকদের সহযোগিতায় ঋদ্ধ হয়েছে বলে উত্তরণ সম্ভব হচ্ছে।অন্যদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের হতাশার হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়গুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। পাস করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য তাদের পথ দেখিয়ে দিতে পারলে স্বস্তি পাবে পরিবারগুলো।সকল প্রতিকূল অবস্থা জয় করে শিক্ষার পরিবেশ আশা জাগানিয়া সময়কে ফিরিয়ে আনবে বলে আমরা মনে করি।স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পেরিয়ে আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিচারে নয় বরং মানসম্পন্ন শিক্ষাদান কেন্দ্রের পক্ষে কথা বলছি। পত্রিকার সংখ্যা দিয়ে নয় সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠ আচরণের পক্ষে কথা বলছি।যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মান বজায় রাখতে পারবে কিংবা যেসব পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ ইতিবাচক বাংলাদেশের পাশে থাকবে তারাই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে উজ্জ্বল করে তুলতে পারবে।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com