বিজ্ঞানী থেকে শিক্ষাবিদ সকলেই বলছেন স্কুল খুলে দিতে! অতিমারি সময়ে এরা যে কখন কি বলছেন সেটাই গবেষণার বিষয় হতে পারে। প্রত্যেকদিন পরস্পর বিরোধী রিপোর্ট নজরে আসছে। সকলে খেয়াল করেন সেসব! বেশ মনে পড়ছে গতবছর এরাই কেরল মডেল এর কথা বলে পাড়া পাগল করে তুলেছিলেন। সেই কেরলের করোনা পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক তাও মিডিয়ায় আসছে!
যারা করোনা মোকাবিলায় প্রকৃতই সামনের সারিতে কাজ করছেন সেই চিকিৎসকরা কি বলছেন? আই এম এ কিন্তু বলছে সামনের দিন আরো ভয়ানক হতে পারে। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হতে পারে শিক্ষার্থীদের, কারণ এরা অনেকেই এখনো ভ্যাকসিন এর আওতায় আসেনি। স্কুলের সঙ্গে যুক্ত আর সকলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান কাউনসিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ এর চতুর্থ সেরো পরীক্ষায় আবার বলা হয়েছে ছয় বছরের বেশী বয়সের শিশুদের মধ্যে ৬৭.৬ শতাংশের শরীরে কোভিডের বিরুদ্ধে লড়ার অ্যান্টিবডির সন্ধান পাওয়া গেছে! এই রিপোর্ট সামনে রেখেও কেউ কেউ সমাজ মাধ্যমে ট্রোল করছেন। কেন স্কুল খোলা হচ্ছেনা! এদিকে আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ানক তথ্য। বলা হচ্ছে’ এখন করোনার যে ভেরিয়েন্ট ছড়াচ্ছে, সেটি বাচ্চাদের গুরুতর ভাবে কাবু করতে সক্ষম’ (আনন্দবাজার, ৫/৮)। তাহলে কাদের কথা ঠিক? প্রত্যেকটি সংস্থাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত!
এবছর ১২ ফেব্রুয়ারী স্কুল খুলেছিল। একমাস পরেই স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়। কেন? ভুলে যাবো সে কথা। এত তাড়াতাড়ি সেটা ভুললে হবে!
শিক্ষকরা সকলেই চান স্কুল খুলে দেওয়া হোক। কারণ লোকমত মতো, শিক্ষকরা ঘরে বসে বেতন পাচ্ছেন। আনাচে কানাচে এ রব এখন বেশ খাচ্ছে। বাজার হাটে যারা প্রতিনিয়ত কথার ফুলঝুরি ওড়ান তারা মনে রাখেন না শিক্ষকরা স্কুল বন্ধ করেননি, স্কুল খোলার মালিকও তারা নন! এ সিদ্ধান্ত সরকারের, সরকারের পরামর্শ দাতাদের মধ্যে শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানীরাও পড়েন। সরকার যেদিন নির্দেশ দেবেন সেদিন থেকেই সকলে স্কুলে যেতে বাধ্য থাকবেন। এবছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছিল তখন শিক্ষকরা কেউ বাড়ি বসে ছিলেন না। সমালোচনা করার সময় বেমালুম সে সব ভুলে যান তারা।
অনেকেই বলছেন স্কুল বন্ধ থাকার কারণে স্কুল- ছুট বাড়ছে। করোনা অতিমারি সারা পৃথিবীর যাপন-মানচিত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও স্কুল খুলে দিয়েও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কেরলের উদাহরণ টেনে যারা করোনা মোকাবিলায় স্বাভাবিক জনজীবন চালু রাখার এক ঐতিহাসিক সাফল্যের কল্প-কাহিনী জনসমক্ষে আনতে চেয়েছিলেন, তারা এখন মুখ বন্ধ রেখেছেন। কারণ দেশের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি সবচেয়ে বিপজ্জনক এখন কেরলেই (আনন্দবাজার, ৪ আগস্ট)। একটা বড় অংশের মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সরকারি স্কুলগুলিতে এইসব পরিবারের ছেলেমেয়েরাই বেশী আসে। স্কুল খুলে দিলেই এই সব পরিবারের ছেলেমেয়েরা দলে দলে এসে স্কুল ভরিয়ে দেবে! অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম কি তাই বলে?

স্কুল শিক্ষকরা সমাজের সফট টার্গেট, এদের যা খুশী বলা যায়। অথচ এই অতিমারি সময়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ। কই এ নিয়ে কোন ট্রোল হয়না তো? স্কুল শিক্ষকরা পাশের বাড়ির লোক বলেই, ধরাছোঁয়ার মধ্যে আছেন বলেই সাধারনের এত উষ্মা! নাকি শিক্ষকরা ‘বড্ড বেশী বেতন’ পাচ্ছেন বলে নির্বিকল্প বিরাগ পোষণ করেন অনেকে? ভাঙা ছাতা, ছেঁড়া ধুতি, মলিন পাঞ্জাবি পরিহিত শিক্ষকদের দেখতে মাইন্ড সেট হয়ে যাওয়া বাঙালির মানসিকতার পরিবর্তন কবে হবে!
একটি স্কুলে কত কাজ থাকে, শিক্ষকদের কিভাবে সে সব কাজে অংশ নিতে হয়, অনেকেই জানেন না। একা প্রধান শিক্ষক-এর পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব! অতিমারি সময়ে শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাস করতে হয়, কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, বিভিন্ন স্কলারশিপ দেওয়ার কাজ, মিড ডে মিল এর কাজ, স্টুডেন্টস পোর্টাল তৈরি করা ইত্যকার অসংখ্য কাজ থাকে। অন্যান্য সরকারি কর্মীদের মত নির্দিষ্ট রোস্টার মেনে শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন। আর সম্প্রতি মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষার যে বিকল্প ব্যবস্থা সরকার করেছে সেগুলো প্রস্তুত করার কাজ শিক্ষকদের হয়ে অন্য কেউ করে দিয়ে যান নি। মাধ্যমিক-এর ফল প্রকাশের পর শুরু হয়েছে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি। অন্য কেউ নয়, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদেরকেই এই কাজ করতে হচ্ছে। নিজের নিজের সন্তানদের স্কুলের কাজ বকেয়া পড়ে থাকছে, এমন কত কত উদাহরণ সমালোচকদের আস্তিনে আছে?
জিজ্ঞাসা করাই যায়— স্কুল খুলে দিলে যদি শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা শিক্ষাকর্মীরা করোনায় নজর কাড়ারকম আক্রান্ত হন তখন এই বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদরা ভোল পালটে ফেলবেন না তো?
শুধু স্কুল কেন— কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ক্ষেত্রে এরা একদমই সোচ্চার হন না কেন?