সবজি কাটার ছয় ইঞ্চি ফলার ছুরিটা আচমকাই মায়ের পেটে ঠিক নাভির ওপরে সটান ঢুকিয়ে দিলো সোহিনী।
মা প্রথমে বিকৃত একটা শব্দ করল। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। ওই বিস্ফারিত চোখেই তাকিয়ে থাকল সোহিনীর দিকে। আসলে তৃণা হয়তো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি ওর বরাবরের শান্তশিষ্ট মেয়েটা এমন করতে পারে! সোহিনী স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকল মায়ের দিকে। গেঁথে থাকা ছুরির মুখ থেকে এবার গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। মা কিছু একটা বলতে চাইল, পারল না, কয়েক বার হিক্কা তুলল তারপর টলমল করে কয়েক পা পিছিয়ে চিৎ হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল মেঝেতে। হাতদুটো দুই দিকে টান টান করে ছড়িয়ে তৃণা কয়েক বার খিঁচুনি দিলো শরীরে তারপর স্থির হয়ে গেল।
একটু আগেই, একই কথা বার বার কেন জিজ্ঞাসা করো তুমি? বলে কড়াভাবে সোহিনীকে ধমক দিয়েছিল তৃণা।
সোহিনী তবু মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, পুলিশ কি দাদার কোনও খোঁজই পায়নি?
পেলে কি আমাদের জানাতো না? আশ্চর্য কথা বলিস! রাগে গজগজ করে উঠেছিল তৃণা।
মায়ের দিকে তাকিয়েছিল সোহিনী। দাদার হারিয়ে যাওয়ার জন্য মা কতটা চিন্তিত, কতটা ব্যথিত সেটা আবার বুঝতে চেষ্টা করেছিল। ঠিক বুঝতে পারেনি।
আজ আঠেরো দিন হয়ে গেল দাদা নিখোঁজ অথচ বাবা, মা কেউই যেন খুব চিন্তিত নয়।
তৃণা সোহিনীর সামনে থেকে উঠে যেতে চেয়েছিল। দাদার প্রসঙ্গ উঠলেই মা কেমন যেন খিটখিট করে ওঠে। আর বাবা তো পুরো চুপ। সোহিনী মাথা নিচু করে ভাত খাচ্ছিল। স্কুল যেতে হবে। কন্যাশ্রীর নীল সাইকেল চেপে বাড়ি থেকে পুরো দুইমাইল দূরে রত্নেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। ক্লাস নাইনের সোহিনী স্কুলের সকলের কাছে গর্বের। পড়াশোনায় যেমন ভালো তেমনই নরম স্বভাব। খুব শান্ত, বেশ ভীতু প্রকৃতির। দিদিমণিরা খুব ভালোবাসে ওকে। বন্ধুরাও।
আর সোহিনী ভালোবাসে ওর দাদাকে। দাদা সোহম। ছোটোবেলা থেকেই একটু অস্বাভাবিক। সোহিনী যেমন মেয়ে হয়েও শরীরের যে কোনও পুরুষের থেকে বেশি শক্তি রাখে, অক্লান্ত পরিশ্রম করতে পারে, দাদা সোহম ঠিক উলটো, খুব দুর্বল, হাত-পাগুলো লিকপিকে, সারা বছর কোনও না কোনও অসুখে ভুগতে থাকা একটা মানুষ, কিন্তু দাদাকে দেখতে এত সুন্দর! একমাথা কোঁকড়া চুল, ফর্সা টুকটুকে গায়ের রঙ, চোখদুটো কী মায়াময়! গোঁফ-দাড়ির আড়ালে পুরু ঠোঁটের আড়ালে দাদা যখন ছেলেমানুষের মতো হেসে ওঠে তা দেখতে কী যে ভালো লাগে। ওই চোখের দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যায় সোহিনীর। দাদার থেকে ওর বয়েসের পার্থক্য এগারো বছরের। তবু দাদা যখন ওকে বোন বলে ডাক দেয় তখন সোহিনীর মনে হয়, বোন নয়, দাদা আসলে ওকে মা বলে ডাকছে। হ্যাঁ, নিজের ছেলের মতোই মনে হয় দাদাকে। খুব বেশিদিন স্কুলে যেতে পারেনি দাদা, অসুস্থতার জন্য বাড়িতেই বসে গিয়েছিল। একটা ধুঁকতে থাকা কাচকলের সুপারভাইজার বাবা ভেবেছিল ছেলে বড়ো হয়ে সংসারের হাল ধরবে। মা-ও ভেবেছিল অনেক কিছু, যেমনটা কোন নিম্ন কিংবা এমনি মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকেরা ভাবে। কিন্তু তাদের আশায় ছাই দিয়ে এমন ছেলে জন্মালো যে তারই দেখভালো করতে হবে আজীবন। বুদ্ধি, শরীর সবদিক থেকেই দূর্বল একটি সন্তান কতটা অবাঞ্ছিত হতে পারে তা সোহিনী বুঝতে পারত ওর কিছুটা জ্ঞান হওয়ার পর। আর এটাও বুঝতে পারত দাদা জন্ম নেওয়ার এগারো বছর পর বাবা আর মা কেন আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরেকটি ইস্যু নেওয়ার। তাদের ইচ্ছে ছিল আরেকটি সুস্থ ছেলে হোক যে বড়ো হয়ে বাপ-মাকে দেখবে। কিন্তু ছেলে হলো না, সোহিনী হলো। বিকাশ, মানে সোহিনীর বাবা আর তৃণার যথেষ্ট দুঃখ ছিল মেয়ে জন্মানোর জন্য। এ কথা তৃণার কাছে কয়েক বার শুনেওছে সোহিনী। অতবার শুনত মনে হতো দাদার মতো ও আসলে অবাঞ্ছিত সন্তান। কেননা ওকে তো বাবা-মা চায়নি। চেয়েছিল আরেকটা ছেলেকে।
ছোটোবেলা থেকে সোহিনী দেখে এসেছে এই সংসারে সারাদিন শুধু অশান্তি, বাবা-মায়ের মধ্যে কুৎসিত গালিগালাজ, মাঝে মাঝে হাতাহাতি, কারখানার অবস্থা দিনে দিনে যত খারাপ হচ্ছিল বাবার মদ খাওয়া বেড়ে যাচ্ছিল। আর বেড়ে যাচ্ছিল মায়ের চিৎকার। মাঝে মাঝে সোহিনীর ইচ্ছে হতো এই বাড়িটা থেকে দৌড়ে অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যেতে। কিন্তু ভয় হতো, পালিয়ে গেলেই যে একা থাকতে হবে। ছোটোবেলায় বাবা-মা যতবার ওকে বলত, তোকে দূর করে দেবো ততবারই প্রচণ্ড ভয়ে কেঁপে উঠত ও। একাকীত্বের একটা দমবন্ধ করা ভয় ওকে ছেঁকে ধরত। বাবা- মায়ের আদর, কোলে ঘেঁসে বসে থাকার সুযোগ পায়নি সোহিনী, একমাত্র আশ্রয় ছিল দাদা, ছোটোবেলায় কোনওকিছুতে ভয় পেলেই দৌড়ে এসে দাদার কোলের ভেতর ঢুকে পড়ত সোহিনী। দাদার বুকের ওমে নিশ্চিন্ত হতো, সোহম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, ভয় কীসের? এই তো আমি রয়েছি। বোকা মেয়ে! দাদাকে আরও আঁকড়ে ধরত। কিন্তু সোহম মাঝে মাঝেই ঘর ছেড়ে পালাতো, দুই-তিন দিন কোথাও একটা চলে যেত, আবার ফিরে আসত। ওই সময়টায় কী ভীষণ যে ভয় করত সোহিনীর। ও এটাও খেয়াল করত দাদা চলে গেলে বাবা কিংবা মা কেউই তেমন চিন্তা করত না, যেন আপদ গিয়েছে, আবার ফিরে এলে বরং তাদের চোখে-মুখে একটা বিরক্তিই প্রকাশ পেত। এবার হারিয়ে যাওয়ার আগের দিকে দাদার এই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াটা খুব ঘনঘন হয়ে যাচ্ছিল। এর আগের বার দাদা যখন প্রায় সাত-আট দিন পর ফিরে এলো তখন সোহিনী দাদার ঘামের দুর্গন্ধ, চিটচিটে ময়লা গেঞ্জি আর পায়জামাটা জোর করে ছাড়িয়ে কাচতে নিয়ে বলেছিল, তুই কেন এমন করিস রে দাদা?
সোহম বোনের কথায় শুধু ছোটোদের মতো হেসে বলেছিল, ভালো লাগে।
আসলে ভালো লাগা নয়, দাদা মুক্তি পেতে চাইত, এই বাড়িটায় পোকামাকড়ের মতো বেঁচে থাকার জীবন থেকে দাদা আসলে মুক্তি পেতে চাইত। আজীবনের এই হিউমিলিয়েশনের থেকে অসহায় দাদা পালাতে চাইত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারত না, পেটের জ্বালাতেই হোক কিংবা নিরাপত্তাহীনতার জন্য একদিন ফিরে আসত, আর ফিরে এসে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সোহিনীর দিকে। সোহিনীর মনে হতো, দাদা কি ওর জন্যই ফিরে এসেছে তাহলে? হয়তো…
মাস কয়েক আগে থেকে বাবা-মায়ের অশান্তি বাড়ছিল। বাবার ফ্যাক্টরিতে ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছাঁটাই শুরু। দিন গুনছিল বাবা, আর আকণ্ঠ বাংলা খেয়ে ঘরে ঢুকে কখনও মাকে আর কখনও দাদার ওপর নিস্ফল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ত। দাদার ওই ঘন চুলগুলোকে টেনে ছিঁড়ে দিতে চাইত বাবা, সঙ্গে অশ্রাব্য গালাগাল। দাদা বাচ্চাদের মতো কাঁদত, ওই কান্না সহ্য করতে পারত না সোহিনী। কখনও বাবাকে জাপটে ধরত থামানোর জন্য, কখনও দাদাকে আগলানোর চেষ্টা করত। সোহিনীর পিঠে, মুখেও এলোপাথারি মার এসে পড়ত বাবার। কেমন যেন ক্ষুধার্ত শ্বাপদের মতো হিংস্র, নির্মম হয়ে যেত বাবা, দাদা যে ওরই সন্তান সেটা যেন ভুলেই যেত। এমনকী পরের দিন সকালে নেশা কেটে যাওয়ার পরেও সোহিনী দেখত বাবার দাদার জন্য কোনও অনুতাপ নেই। এমনকী মা-ও উঠতে বসতে অভিশাপ দিত দাদাকে। যেন দাদার এই অবস্থার জন্য দাদা নিজেই দায়ী।
সোহিনীর এক এক সময় ইচ্ছে করত ভয়ংকর চিৎকার করে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে। পারত না। ও অপেক্ষা করছিল। আপ্রাণ নিজের পড়শোনায় মন দেওয়ার চেষ্টা করত। দাদা বোধহয় মানসিকভাবেও অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। এর আগের বার যখন প্রায় পাঁচ-ছয় দিন দাদা কোথাও একটা কাটিয়ে আবার বাড়িতে ফিরেছিল, বাবাও বাড়ি ছিল সেদিন, দাদাকে দেখামাত্র চিৎকার করে বলে উঠেছিল, আবার ফিরেছিস কেন হারামজাদা…একবারে চলে যেতে পারিস না, শুধু গেলানোর জন্য জন্ম দিয়েছিলাম তোকে! চলে যাওয়া শব্দটা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত সোহিনী। ওকে ছেড়ে কেউ চলে যাবে সেটা ভাবতেই পারত না।
দাদা কোনও কথা না বলে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ঘর ঠিক নয়, বারান্দার এককোণে টিন দিয়ে ঢাকা খানিকটা অংশ, ওটাই দাদার ঘর, ভেতরে শুধু একটা কাঠের চৌকি, একটা বালিশ, ময়লা শতচ্ছিন্ন মশারি, জলের বোতল, দুই-তিনটে বহু পুরোনো জামা-প্যান্ট—ব্যাস। এই বাড়িতে ঘর একটাই। ঘরে একটা খাট, সেটায় বাবা আর মা শোয়, সোহিনী শোয় পাশে আলাদা একটা চৌকিতে। খুব সামান্য কিছু পুরোনো আসবাব ছাড়া আর কিছু নেই। সোহিনী জন্মানোর আগে বাবা এই বাড়িটা বানিয়েছিল। দোতলার ভিত। তখন ফ্যাক্টরির অবস্থা ভালো ছিল। বাবার ইচ্ছে ছিল পরে দোতলা করবে। সে আর হলো না, ফ্যাক্টরি খাবি খেতে শুরু করল, এমনকী বাড়ির বাইরেটায় প্লাস্টারও করতে পারল না বিকাশ। ওইভাবেই পড়ে থেকে দেওয়ালের ইট কালো হয়ে গিয়ে ছ্যাতলা পড়তে শুরু করল। সোহিনীদের বাড়িটা বোসপাড়ার একেবারে শেষ মাথায়। একেবারে ছাপোষা মফসসল পাড়া। বাড়ির পিছনে কুয়োতলা তারপর কয়েক কদম এগোলেই খেড়োর ডোবা। ডোবার ওইপ্রান্তে ঘন কচু বন। তারপরেই বাঁশ বাগান। অনেক দিন আগে এই ডোবাতে পাড়ার মেয়ে-বউরা স্নান করতে, জামাকাপড় কাচতে আসত। তৃণাও যেত মাঝে মাঝে। তারপর পাড়ায় টাইমকল এসে পড়ায় ডোবায় স্নান করা বন্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘদিন অব্যবহারে কচুরিপানায় ভর্তি। ডোবার দিকটায় আর কারও যাতায়াত না থাকায় চারদিক আগাছায় ভরে গিয়েছে।
শেষবার দাদা যখন উধাও হয়েছিল। প্রায় দিন আষ্টেক পর ফিরে আসার পর সোহিনীর কাছে খুব বকা খেয়েছিল, তুই এমন কেন করিস দাদা? চিন্তা হয় না আমাদের বল?
শুনে ফিক করে হেসেছিল সোহম।
আবার হাসছিস! কোথায় চলে যাস তুই? কোথায় থাকিস?
সোহিনীর প্রশ্নে ভারি অদ্ভুত একটা উত্তর দিয়েছিল সোহম। আমি অনেক দূরে একটা জায়গায় গিয়ে থাকি, অনেক দূর। সেখানে আমার অনেক বন্ধু। আমরা সবাই মিলে সেখানে গল্প করি, খেলি, অনেক মজা করি। ফিরতে ইচ্ছেই করে না আর।
শুনে অবাক হয়েছিল সোহিনী। এ আবার কেমন জায়গা! দাদা সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেছিল ও।
তাহলে ফিরিস কেন? ওখানেই থেকে যেতে পারিস। কিছুটা অভিমান মেশানো গলাতেই মুখ ঝামটে বলেছিল সোহিনী।
দাদা উত্তরে কিছু বলেনি, শুধু সোহিনীর মাথায় আলতো করে একবার হাত রেখেছিল।
আর একবার তুই পালানোর চেষ্টা করে দ্যাখ। কিছুতেই যেতে দেবো না তোকে। আমার কষ্ট হয় বুঝিস না কেন?
সেবার কালীতলার মেলা থেকে অনেক দরাদরি করে ত্রিশ টাকা দিয়ে একটা নবগ্রহের তামার আঙটি কিনেছিল সোহিনী। দাদার ডান হাতের আঙুলে পরিয়ে দিয়ে বলেছিল, খবরদার, এটা খুলবি না বলে দিচ্ছি। খুললে আমার সঙ্গে আর কথা বলবি না। সোহম খোলেনি।
কিন্তু এবার পনেরো দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও দাদা ফিরছিল না। মা-বাবা দুজনেই নিরুত্তাপ। বাবার বক্তব্য, ও হতোভাগা যাবে কোন চুলোয় আজ না হোক কাল ঠিক পেটের টানে ফিরে আসবে। মায়েরও একই রা ছিল। সোহিনী হাঁ করে তাকিয়েছিল বাবা আর মায়ের দিকে।
এইরকম করে তোমরা কেন বলো দাদাকে? ও চলে গেলে তোমাদের কষ্ট হবে না?
উহু দাদার জন্য দরদ একেবারে উথলে উঠছে। তুইও তো চলে যেতে পারতিস, সব আপদ একসঙ্গে চুকত।
বাবাও ঝাঁঝিয়ে বলেছিল, একটা পাগল আরেক জন আবার পড়াশোনায় দিগগজ হওয়ার শখ! আমি আর পড়াতে পারব না বলে দিচ্ছি, নিজের খরচ এবার নিজে তুলতে পারলে তোলো আর না হয় আমি এবার তোমার বিয়ে দিয়ে দেবো।
বিয়ে! মানে মা-বাবা-দাদাকে ছেড়ে একা হয়ে যাওয়া! আবার ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল সোহিনী।
প্রায় কুড়ি দিন পেরোতে চলছিল এবার দাদা ফিরছিল না। আজ সকালে স্কুল যাওয়ার আগে খেতে বসে সেই কথাটাই মাকে বলেছিল সোহিনী।
শুনেই হাউমাউ করে উঠেছিল মা। আসছে না আসছে না। আপদ গিয়েছে…
এইভাবে বলছ কেন? তোমাদেরই তো ছেলে।
হুঁহু ছেলে! অপদার্থ একটা!
তুইও যা না দাদা যেখানে গিয়েছে। দুটোই গেলে আমি রেহাই পাই।
দাদা কোথায় গিয়েছে মা?
আমি কী করে জানব? বলে চোখ সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল তৃণা, সোহিনী সরাতে দেয়নি। আবার জিজ্ঞাসা করেছিল, কেউ জানো না তোমরা?
তৃণা থমকে গিয়ে হাঁ করে তাকিয়েছিল সোহিনীর দিকে। মেয়ের চোখমুখ কেমন অস্বাভাবিক লাগছিল। প্রথমে গা সিরসির করে উঠেছিল তারপরই কুৎসিত গলায় বলে উঠেছিল, তুইও হয়েছিস তোর দাদার মতো, পাগল একটা! তোকেও আমাদের সুস্থ মনে হয় না। তুই যাবি দাদার কাছে? বল যাবি? যা না যা। বলে সোহিনীর মাথাটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল তৃণা। তারপর নিজেই ঢুকরে কেঁদে উঠেছিল। আমি আর পারি না, চিরটা কাল শুধু অশান্তি আর অশান্তি…শেষ হয়ে গেলাম এবার আমিও একদিন দেখবি চলে যাব…আর পারছি না…বলে সোহিনীর সামনে থেকে চলে যেতে চেয়েছিল কিন্তু সেই সুযোগ পেল না, টেবিলের ওপর প্লাস্টিকের লম্বা গ্লাসে গোছ করে রাখা চামচ, ছোটো হাতা, ইত্যাদির মধ্যে রাখা লম্বা ছুরিটা নিয়ে সটান মায়ের পেটে ঠিক নাভির ওপরে সটান ঢুকিয়ে দিলো সোহিনী।
তৃণা মেঝেতে পড়ে একেবারে স্থির হয়ে যাওয়ার পরেও সোহিনী মৃগী রুগির মতো থরথর করে কাঁপছিল, ওর হাঁ করা মুখ থেকে আঠালো লালা গড়িয়ে পড়ছিল, মাথার ভেতরে ছাদ পেটানোর মতো শব্দ করছিল কারা। মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসতে গেল, নিজেরই মুখ চেপে ধরে থামালো, তারপর দুই হাতে নিজেকে কিছুক্ষণ আঁকড়ে ধরে বসে রইল। তারপর উঠল, ভীষণ ভীষণ ভয় করছে অথচ সেই ভয়েরই ফাঁক দিয়ে পুঁজের মতো সাদা সাদা থকথকে আনন্দ বেরিয়ে আসছে, এক অচেনা আরাম। মা আর কোথাও যাবে না, ইচ্ছে হলেও সোহিনীকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। খুব নিশ্চিন্ত লাগছে। বেশ কিছুক্ষণ এই অবিমিশ্র অনুভূতি আর আর মায়ের মৃতদেহের সামনে বসে থাকার পর চেয়ার থেকে উঠল সোহিনী। মায়ের ঈষৎ হাঁ করা মুখটার দিকে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে পেটে গেঁথে থাকা ছুরিটা টেনে বার করার চেষ্টা করল। খুব আঁট হয়ে গেঁথে রয়েছে, দুই হাত দিয়ে বেশ কয়েক বার টানাটানির পর ফস করে বেরিয়ে এলো আরও কিছু রক্ত সমেত। মায়ের শাড়ি দিয়ে মেঝের রক্ত মুছে দিয়ে ও আগে বাথরুমে গেল। বালতির জলে ভালো করে ছুরিটা ধুয়ে স্কুলের ইউনিফর্মে মুছে নিয়ে আবার যত্ন করে রাখল টেবিলে। তারপর ঘরের পিছন দিকের দরজাটা খুলল। মায়ের পা দুটো ধরে টানতে টানতে হিঁচড়ে নিয়ে এলো কচু বনে ঘেরা ডোবার পাশে। এখানের মাটি থ্যাসথেসে নরম। সারা বছরই ভিজে। ঘেমে স্নান হয়ে যাচ্ছে সোহিনী। দুই চোখ দিয়েও অনবরত জল গড়িয়ে নামছে। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সব কিছু। অথচ আশ্চর্য এক শক্তিতে মাথা স্থির রেখে পরপর কাজগুলো করে যাচ্ছে। তৃণার শরীরটাকে ওখানে রেখে দিয়ে আবার ঘরে ফিরে এলো। রান্নাঘরের পাশে রাখা কোদালটা টেনে বার করল। দীর্ঘদিন অব্যবহারে জং ধরে গিয়েছ। ডোবার একেবারে সামনে প্যাচপেচে পাঁক। পা গেঁথে যায়। এখানে বেশ কিছুটা অংশ কচু গাছ নেই। ন্যাড়া জমি। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকল সোহিনী। কোদালে কাদামাটি আটকে যাচ্ছিল বারবার, দম বেরিয়ে আসছিল পরিশ্রমে। দুশো মিটার রানের থেকে অনেক কঠিন কোদাল চালানো। একটা মানুষকে পুরো চাপা দিতে অনেকটা খুঁড়তে হয়। জামায়, হাতে-পায়ে কাদামাটিতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিল সোহিনী। মায়ের জন্য কষ্ট আর আনন্দ হচ্ছিল খুব। বেশ কিছুটা গর্ত খোঁড়ার পরই ও হাত থেকে আচমকা কোদালটা ছেড়ে দিলো, মাটির তলা থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসেছে। মানুষের হাত। দুই হাত দিয়েই ভেজা মাটির সরাতে ওই হাতের সঙ্গে শরীরের কিছুটা অংশও দেখা গেল। দিন কুড়ি আগে চাপা দেওয়া শরীরের অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মুখটা দেখার আর ইচ্ছে হলো না সোহিনীর। দাদার অমন সুন্দর মুখটা যে আর আগের মতো নেই…শুধু হাতের আঙুলে আংটিটা এখনও একইরকম রয়েছে। দ্যাখ দাদা মাকেও নিয়ে এসেছি। তোর মতো মাকেও আর কোথাও যেতে দেবো না। তোরা সবাই খালি আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা কেন বলিস? বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে থাকল সোহিনী। কাদার মধ্যে থেবড়ে রইল কয়েক মিনিট। তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়ে ওই জায়গাটায় মাটি চাপা দিয়ে তার পাশে গর্ত খুঁড়তে থাকল দ্রুত হাতে।
রাত নটা নাগাদ বিকাশ বাড়িতে এলো। দরজায় বেশ কয়েক বার ধাক্কা দেওয়ার পর খুলল সোহিনী। বাবার মুখ থেকে ভকভক করছে মদের গন্ধ।
তৃণা তৃণা…আরে কী হলো? জড়ানো গলায় জোরগলায় বলল বিকাশ। সাড়া না পেয়ে আবার হাঁক পাড়ল।
মা ঘরে নেই। বলল সোহিনী।
নেই! কোথায় গেল? পিছনে না ফিরেই পালটা জিজ্ঞাসা করল বিকাশ।
উত্তর না দিয়ে খুব ধীরে ধীরে জামার পিছনে লুকিয়ে গুঁজে রাখা ছুরিটা শক্ত হাতে ধরল সোহিনী। একটা থিরথিরে আনন্দ আবার জড়িয়ে ধরতে থাকল ওকে।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৭ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত