২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ সোমবার ধাপায় সিএনজি গ্যাসের প্ল্যান্ট উদ্বোধন করলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিধায়ক তথা কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, বিধায়ক তথা মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার, মেয়র পারিষদ জীবন সাহা, বরো চেয়ারপার্সন সুস্মিতা ভট্টাচার্য, তারকেশ্বর চক্রবর্তী, কাউন্সিলর অসীম কুমার বোস সহ একাধিক বিশিষ্টব্যক্তি ও আধিকারিকগণ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিধায়ক তথা কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবব্রত মজুমদার। এর মাধ্যমে খুলে গেল এক নতুন দিগন্ত। রাজ্যের মধ্যে কলকাতা থেকেই প্রথম উৎপন্ন হবে সিএনজি গ্যাস (কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস)। ধাপায় জমা আবর্জনাকে ‘রিসাইকেল’ করে তার থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি হবে। এই গ্যাস গাড়ি চালাবার জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে জ্বালানির খরচ যেমন কমবে, একই সঙ্গে বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব হবে। এই গ্যাস তৈরি করতে বাজারের জৈব আবর্জনাকে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে আনাজ থেকে উৎপন্ন হওয়া গ্যাস পরিবেশবান্ধব হবে। প্রত্যেকদিন ৫ টন আবর্জনা থেকে ১৫০ কেজি গ্যাস উৎপন্ন হবে। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দিনে প্রায় ৯টি সিলিন্ডার ভরা সম্ভব হবে। পরবর্তীকালে রিসাইকিলিংয়ের পরিমাণ বাড়ানো হলে আরও বেশি সিলিন্ডার একদিনে প্রস্তুত করা সম্ভবপর হবে।

এদিন মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, ‘বর্তমানে কলকাতা পুরসভার ২৭টি ওয়ার্ডে জঞ্জাল পৃথকীকরণের ব্যবস্থা আছে। আগামী দিনে আমরা ১৪৪টি ওয়ার্ডেই এই পদ্ধতি শুরু করতে চাই। কলকাতার মহানাগরিক হিসেবে আমি গর্ব অনুভব করি। কলকাতায় ঘোরাফেরা করার সময় অধিকাংশ জায়গায় কোনো ভ্যাট এখন দেখি না। কিছু কিছু জায়গায় মানুষের সচেতনতার অভাবে কিছু জঞ্জাল জমা হয়। তবে সার্বিক ভাবে কলকাতাকে পরিচ্ছন্ন ও ভ্যাটমুক্ত শহর বলা যায়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে ধাপার মাঠ তৈরি করা হচ্ছে দখল করার জন্য নয়। অনেকেই ধাপায় এসে বসে যাচ্ছেন। এ ভাবে ধাপা দখল করা যাবে না।’

দেবব্রত মজুমদার জানান, ‘কলকাতার ইতিহাসে এই ঘটনাটি একটি মাইলস্টোন। দেবী পক্ষের সূচনায় কলকাতাবাসীকে আমরা এই উপহারটি দিতে চাই। সারা পূর্ব ভারতের মধ্যে প্রথম কলকাতায় এই পদ্ধতিতে জঞ্জাল থেকে সিএনজি গ্যাস তৈরী হচ্ছে। একসময় কলকাতাকে জঞ্জাল নগরী বলে ডাকা হতো। আজ সেই কলকাতার রূপ বদলে গেছে। যে কোনও কাজের একটা দূরদৃষ্টি বা লক্ষ্য দরকার। রাজ্যের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, কলকাতাকে ভ্যাট মুক্ত করতে হবে। ভারতের মধ্যে কলকাতা একমাত্র ভ্যাট-ফ্রি শহর। কলকাতা একমাত্র শহর যেখানে ২৪ ঘণ্টা জঞ্জাল অপসারণ করা হয়। দিনে চার বার কলকাতা শহর পরিষ্কার করা হয়। ভারতের মধ্যে কলকাতা অন্যতম পরিচ্ছন্ন শহর।’

প্রসঙ্গত, ১৮৬৫ সালে সল্টলেকের পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে প্রায় সাড়ে চার মাইল জুড়ে এই রকম ভ্যাট ছিল। ১৮৬৭ সালে প্রথম রেলের মাধ্যমে শহরের জঞ্জাল অপসারণ করা শুরু হয়। এই সময় ১ লক্ষ ১১ হাজার মেট্রিকটন পরিমাণ জঞ্জাল অপসারিত করা সম্ভব হয়েছে ওয়াগানে করে। তারপর ১৯২০ সালে বর্তমানের ধাপা মেন-রোডটি চালু হয়। ১৯৭৪ সালে এই রাস্তা দিয়ে লড়ির মাধ্যমে শহরের জঞ্জল ধাপায় আনা শুরু হয়। অ্যাডমিনিস্টেটার মেটক্যাফের আমলে ভবনাথ সেন এই সিস্টেমটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পান। ‘সেন’ কম্প্যানির সহযোগিতায় কলকাতা কর্পোরেশন তখন থেকে জঞ্জাল অপসারণ শুরু করে। ১৯৮৭ সালে জঞ্জাল অপসারণের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার মেট্রিকটন জঞ্জাল। আজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধাপার জঞ্জাল থেকে রিসাইকেলিং-এর মাধ্যমে একাধিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরী করতে আগ্রহী হয়েছে কলকাতা পুরসভা। তবে শহরের সর্বত্র এই জঞ্জালের প্রকার ভেদ আলাদা। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মধ্য কলকাতার জঞ্জালের থেকে উত্তর বা দক্ষিণ কলকাতার জঞ্জালের চরিত্র আলাদা। তাই এক পদ্ধতিতে সমগ্র জঞ্জাল কে রিসাইকিলিং করা যায় না। এমন কী বিদেশী টেকনোলজির সাহায্যে রিসাইকিলিং করার ক্ষেত্রে সফলতা নাও আসতে পারে। তাই এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ পদ্ধতির, যা ধাপার জঞ্জালের চরিত্রের সঙ্গে ম্যাচিং হবে। বর্তমানে ধাপা থেকে যে বায়ো গ্যাস তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে মিথেন আছে ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশ ও কার্বন ডাই অক্সাইডের ভাগ শতকরা ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। এই গ্যাসটি রান্নার কাজে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ সেক্ষেত্রে মিথেনের পরিমাণ হতে হবে ৯০ শতাংশের বেশি। আগামী দিনে এই গ্যাসের সাহায্যে কলকাতা পুরসভার গাড়ি চালানো হবে।