আজ ভারতীয় সংগীতের মাইলস্টোন সলিল চৌধুরীর “সেই মেয়ে” গানটির লিরিক্সে প্রচ্ছন্ন থাকা ঐতিহাসিকতা, আন্তর্জাতিকতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও গভীর মনস্তত্বের দিকগুলো ব্যক্ত করবো। পূর্বেই বলেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, পঞ্চাশের মন্বন্তর, বিশ্বব্যাপী দারিদ্রতার মতো বিষয়গুলি প্রত্যক্ষ করে সৃষ্টিশীল মননে “beauty is truth, truth is beauty” বা “সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য” দর্শনের যৌক্তিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। চিরাচরিত কাঠামোর মূলে এসেছিল আঘাত, জন্মলাভ করেছিল পুরাতনতন্ত্র কে ধ্বংস করে এক নূতন অধ্যায় রচনা করার উন্মাদনা এবং চারিদিকে ধ্বনিত হয়েছিল রবীন্দ্র বিরোধিতার সুর।
সে যাই হোক, সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে জনপ্রিয় গানটির নানা দিক আলোচনার পূর্বে একটু ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। ১৯৩৯ সালে বাজারে ছিল ২৩০ কোটি টাকার নোট এবং ১৯৪৫ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১,২১০ কোটি (আধুনিক ভারত : সুমিত সরকার)। অর্থনীতিবিদরা এরূপ মুদ্রাস্ফীতির (inflation) মূল কারণ হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই নির্দিষ্ট করেছেন। মুদ্রাস্ফীতি বলতে অর্থনীতিতে এমন একটা অবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে বাজারে চাহিদা ও বন্টনের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে না, বাজারে টাকার দাম বেড়ে যায়, মানুষের হাতে প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা থাকে এবং নিত্যপ্রয়োজোনীয় দ্রব্যের দাম অসম্ভব ভাবে বৃদ্ধি পায়। সেজন্য মুদ্রাস্ফীতি যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাঁর দেশের অর্থনীতিকে স্বচ্ছ ও সুগঠিত রাখতে সর্বদা মুদ্রাস্ফীতির হার টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। কারণ যেকোনো দেশেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দুর্নীতি, কালোবাজারি কে স্বাগত জানায় এবং একটি দেশের সর্বাত্বক উন্নয়নের গতিকে স্তব্ধ করে দেয়।
সে যাই হোক, সেদিন এই সর্বাত্মক দুর্নীতি ও কালোবাজারির ফলস্বরূপ সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষের করালময়তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বাংলাদেশে।
বর্মা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর অন্নসংস্থানের জন্য সর্বত্র এক তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এই সুযোগ কে হাতিয়ার করে এক শ্রেনির ব্যক্তিরা চূড়ান্ত কালোবাজারির পথ ধরে এবং সমাজজীবন কে জটিল ও সংকটময় করে তোলে।
১৯৪৩-এর সেই গ্রীষ্ম ও শরতে লক্ষ লক্ষ মানুষ পায়ে হেঁটে কলকাতা শহরে আসতে শুরু করেন। ভাত নয়, একটুকু ফ্যানের জন্য তারা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে থাকেন। মানুষের দ্বারা সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে সেদিন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির হাত ধরে আগমন ঘটেছিল ম্যালেরিয়া, গুটি বসন্ত এবং কলেরার। ফলস্বরূপ ১৯৪৩ পরবর্তী বেশ কয়েকবছর বাংলাদেশে স্বাভাবিক হারের চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দুর্ভিক্ষের সর্বাধিক প্রভাব ছিল তমলুক, কাঁথি, ডায়মন্ড হারবার, ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালী জেলায়। সেদিন শুধুমাত্র বাংলার ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধাক্কা খায়নি, ১০ লক্ষ রায়ত তাদের জমি হারিয়েছিল, মানুষের গবাদি পশু সম্পদ অত্যধিক হারে কমেছিল এবং মৃত্যু হার ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আশা করি, উপরিউক্ত আলোচনাতে আমি প্রেক্ষাপটটি নিয়ে অবগত করতে সক্ষম হয়েছি। এবার “সেই মেয়ে” গানটির সুর টিকে দূরে সরিয়ে রেখে একটি আধুনিক গদ্য কবিতা রূপে আলোচনা করার চেষ্টা করলাম।
“সেই মেয়ে” কবিতাটির কেন্দ্রে আছেন একজন মেয়ে, যিনি গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন। কবির ভাষায় এই হরিণ নয়না কন্যা কবিগুরুর স্বপ্নের ক্যানভাসে অঙ্কিতা ময়না পাড়ের কালো মেয়ে, কৃষ্ণকলি। তিনি অন্নের জন্য শহরের রাস্তায় উন্মাদগ্রস্থা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন—
‘হয়তো তাকে দেখোনি কেউ/কিংবা দেখেছিলে,/ছিন্ন শত আঁচল ঢেকে/শীর্ণ দেহখানি/ক্লান্ত পায়ে পায়ে যেতে পথে/কি জানি কি ঝড়ে/গেছে বুঝি ঝরে/জীবনেও তরুথেকে।
মেয়েটির দীর্ঘপথ অতিক্রম করে শীর্ণ দেহে শহরে আসা, অন্নের সংস্থান করতে ব্যর্থ হওয়া এবং ক্ষুধায় শারীরিক সক্ষমতা হারানোর চিত্র অঙ্কনটা সলিল চৌধুরীর অনন্য সৃষ্টি হলেও পাঠক মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। পূর্বে গুরুদেব বা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীকে স্বর্গলোকের কল্পনা মিশ্রিত প্রেয়সী ও প্রেমিকা রূপে উপস্থাপিত করেছেন কিন্তু সলিল চৌধুরীদের হাতে সেই নারীর বিপিন্নতা, বিষণ্ণতা ও সর্বহারা হওয়ার চিত্রটা প্রকাশ পেয়েছে। একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, বাংলাগানে নারীকে কেন্দ্র করে একটি সমাজ ও সময়ের এরূপ ভয়াবহতার প্রকাশ পূর্ববর্তী কোনো শিল্পীর কলমে প্রকাশ পায়নি।
তৃতীয় স্তবকে ময়নাপাড়ের কালো মেয়ের খরস্রোতা জীবন-নদীর স্রোতে স্বপ্ন বিসর্জনের প্রসঙ্গ টি স্থান পেয়েছে—”হয়তো বা/জীবন নদীর খরস্রোতে ভাসা/ মহাকালের জ্বলন্ত জিজ্ঞাসা/কেন কবের স্বপ্ন কুসুম বিফল হয়ে ঝরে”
কবিতাটিতে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ। কবিতা টি রচিত হয়েছে ১৯৪৩ সালে, অর্থাৎ মাত্র দুই বৎসর কবিগুরু দেহত্যাগ করেছেন এবং অমৃতলোকের বাসিন্দা হয়েছেন। কিন্তু চরম উৎকণ্ঠার সময়ে যখন চারিদিকে রবীন্দ্র বিরোধিতার সুর ধ্বনিত হচ্ছে, তখন সলিল চৌধুরী হয়তো বিশ্বাস করেছেন— “মাথার উপর জ্বলছেন রবি, রয়েছে সোনার শতছেলে” কিংবা ‘এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি/প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি’।
কবি সলিল চৌধুরী লিখেছেন—“হয়তো তাকে কৃষ্ণকলি বলে/কবিগুরু তুমি বলেছিলে/কল্পলোকের মধুরিমায়/কুসুমকে হায় গেলো দোলে।”
কবি মেয়েটির বিবরণ প্রসঙ্গে আবার গুরুদেবকেই স্মরণ করেছেন— তুমি চিনেছিলে/তার তুমি কালো হরিণ চোখে চোখে/শুধু বেদনার দহন ঝলকে/বাঁকা দুটি ভুরু ধনুর টঙ্কারে/আমি দেখেছি মরণ শঙ্কারে/ফিরেছে নিঃসহায়ে।
কবি সলিল চৌধুরী তাঁর কবিতায় কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ এনেছিলেন, সে বিষয়ে কোনো বিশেষ তথ্য আমার কাছে নেই। তবে সমাজ সচেতন এবং শিল্পী হিসাবে দায়বদ্ধ এই মহান ব্যক্তিত্ব কবিগুরুর কৃষ্ণকলির এরূপ অসহায় ও বিপন্ন অবস্থা দেখে যেমন মর্মাহত হয়েছেন এবং তেমনি চরম সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময়েও শান্তির অন্বেষণ করেছেন এবং অভিভাবক রূপে তাঁকেই প্রার্থনা করেছেন।
কবি শেষে সেই মেয়েকে গ্রামে ফিরে যেতে বলেছেন এবং দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ের সমৃদ্ধির দিকটিকে ইঙ্গিত করেছেন— সেখানে গাছে গাছে রাঙা ফুল ফুটে আছে/রাঙা মেঘের রাঙায় কন্যার আশা/পৌষালি মাঠে মাঠে/সোনালী ফসল কাটে/গড়বে নূতন জীবনের বাসা।
রাঙা ফুল ফুটে থাকা, পৌষালির মাঠে সোনালী ধান এবং নূতন জীবনের বাসা গড়ার প্রসঙ্গ টি অতীতের অন্ধকারময় জীবন কে অতিক্রম করে সমৃদ্ধির এক নূতন অধ্যায়ে প্রত্যাবর্তনের দিকটিকে ইঙ্গিত করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরায় পুনঃজাগরিত হওয়ার দিকটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিশেষে ‘সেই মেয়ে’ কবিতা বা গানটি অন্য যেকোনো গান থেকে স্বতন্ত্র হওয়ার কারণ গুলো নিম্নে আলোচনা করার চেষ্টা করলাম—
১) কবিতা টিতে আমরা তদানীন্তন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পাই।
২) দুর্ভিক্ষের কারণ অন্বেষণ করলে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ এসে ভীড় করে।
৩)গ্রামীণ অর্থনীতির বিপর্যয় সম্পর্কে অবগত হই।
৪) গ্রাম থেকে মানুষ শহরে আসছেন শুধু একটুকু ফ্যানের আশায়, সেই মর্মান্তিক ছবি দেখেছি।
৫) বহুদূর অতিক্রম করা এক নারী যেন বাংলাদেশের সর্বত্র দুর্ভিক্ষের আগ্রাসী মনোভাবের কাছে পরাজিত মানবসমাজ কে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
৬) কবিতায় অতীতের রোমান্টিকতার বাঁধন ত্যাগ করে চরম বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছি।
৭) একটু নারী কে কেন্দ্র করে কবি দুর্ভিক্ষের চিত্র টি অঙ্কিত হতে দেখেছি, যা সলিল চৌধুরী পূর্ববর্তী কোনো গানে বা কবিতায় উপস্থাপিত হয়নি।
৮) চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও কবির শান্তি অন্বেষণ এবং কবিগুরু স্মরণ তদানীন্তন রবীন্দ্র চেতনার বিরোধিতার যুগেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
৯) তিনি পরিশেষে গ্রাম্য অর্থনীতির আবার ইতিবাচক প্রবাহ কে দেখিয়েছেন।
১০) কবিতার শুরুতে চরম নিরাশার সঞ্চার হলেও কবি সলিল চৌধুরী পরিশেষে আশার সঞ্চার করেছেন ।
পরবর্তী সংখ্যায় ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে’ গানটির স্বরূপ আলোচনা করবো।