১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর (১২২৭ বঙ্গাব্দের ১২ই আশ্বিন) বিদ্যাসাগরের জন্ম হয়। বিদ্যাসাগরের পিতৃপুরুষের আদি বাসস্থান ছিল হুগলি জেলার আরামবাগের বনমালীপুর। তাঁর পিতামহী দুর্গামণি দেবী স্বামী রামজয় তর্কভূষণের তীর্থ ভ্রমণকালে আপন পিতৃগৃহে বীরসিংহ গ্রামে পুত্র ঠাকুরদাস ও অন্যান্য সন্তান-সহ বাস করতে শুরু করেন। ঠাকুরদাস ও ভগবতী দেবীর প্রথম সন্তান হলেন বিদ্যাসাগর।
উল্লেখ্য, বিদ্যাসাগর যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন বীরসিংহ গ্রাম হুগলি জেলার ক্ষীরপাই মহকুমার অন্তর্গত ছিল। পরে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রকোণা ও ঘাটাল থানা মেদিনীপুর জেলায় অন্তর্ভুক্ত হলে বীরসিংহ মেদিনীপুর জেলায় চলে আসে।
সেই থেকেই মেদিনীপুর আর হুগলির মধ্যে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে টাগ অফ ওয়ার চলছে।
বিদ্যাসাগরের ডাকনাম যে যশুরে কই, সেটি সকলেই জানেন। যশোর জেলার কইমাছ যে হেঁড়েমাথা হত, তা যেন স্বতঃসিদ্ধ। আসলে এটি একটি বহুযুগব্যাপী ভুল ধারণা। বিদ্যাসাগরের মেজো ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ‘বিদ্যাসাগরচরিত ও ভ্রমনিরাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, যশোর থেকে কইমাছ নৌকাযোগে কলকাতার বাজারে আসতে সময় লাগত আট-দশ দিন। তাই খাবার না পেয়ে জিয়োনো কইমাছগুলোর শরীর কৃশ হয়ে যেত, কিন্তু মাথার সাইজ একই থাকত। ফলে মাছগুলিকে হেঁড়েমাথা লাগত। কিন্তু অনেক মানুষেরই বদ্ধমূল ধারণা, যশোর শহরের কইমাছই আকারে হেঁড়েমাথা হয়। কইমাছের এমন কোনও বৈজ্ঞানিক রূপ নেই যে যশোরেই সেটি অন্য জায়গার তুলনায় ‘মাথামোটা’ হয়ে যাবে! অথচ খুলনা, সিলেট, রাজশাহীতে তার মাথা আবার স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসবে!
এতো গেল, একদিক। অন্যদিক দিয়ে চিন্তা করলে যশুরে কইয়ের আর একটি ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
বিদ্যাসাগরের চরিত্রের দৃঢ়তা বোঝাতে গিয়ে যেটা বলা হত, তা হল, ‘বজ্রাদপি কঠোরাণি, মৃদুনি কুসুমাদপি’। বজ্র যেন তাঁর চরিত্রের সঙ্গে একেবারে মানানসই। ‘জসুরি’ শব্দটির অর্থ হল বজ্র, ক্ষেত্রবিশেষে ‘ইন্দ্রের বজ্র’ বলা হয়। ‘জসুরিকায়’ মানে বজ্রের মত শরীর যার। হীনযান বৌদ্ধদের মতে বুদ্ধদেবের একটি রূপ হল বজ্রকায়। হনুমানের নামও বজ্রকায়। তাই বজ্রকায় বা জসুরিকায় শব্দের অর্থ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের জানার কথা। বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে এই বিশেষণটি তাঁর সম্বন্ধে পূর্ণমাত্রায় খেটে যায়। সংস্কৃত কলেজে তাঁর শিক্ষকরা যে এরকম একটি তৎসম নাম তাঁকে দিতেই পারেন, তা বলাই বাহুল্য। একরত্তি ছেলের মনের জোর, দৃঢ় সংকল্প আর প্রতিজ্ঞা দেখে তাঁর শিক্ষকরা এই নাম দেন। জশুরিকায় শব্দটি ছাত্রমহলে চাউর হয়ে যায়। এটিই সুকুমারমতি অথচ চপল বালকদের মুখে যশুরে কই হয়ে যাবে। যশুরে কই যে সহপাঠীদের মুখে ক্রমে ক্রমে কসুরে জৈ হয়ে গিয়েছিল, তাও আমরা জানি। পরিবর্তন একটি হচ্ছিলই মুখে মুখে। আদিতে শব্দটি ছিল জসুরিকায়। ‘জসুরিকায়’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ছাত্রদের মুখে ‘যশুরে কই’ হয়ে যেতেই পারে।
অর্থাৎ সংস্কৃতজ্ঞ শিক্ষকদের একটি নিষ্পাপ, নিরীহ বিশেষণ ছাত্রদের মুখে একটি মজার লব্জে পরিণত হল। বিদ্যাসাগরের অপবাদ পাওয়ার লিখন খণ্ডাবে কে?
বিদ্যাসাগরের আর একটি ডাকনামও যে ছিল, সেকথা অনেকেরই জানা নেই। সংস্কৃত কলেজে তাঁর উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা তাঁকে ‘ঢিপলে’ নামে ডাকত। তারানাথ তর্কবাচস্পতি এই দলের মাতব্বর ছিলেন। এই তারানাথই বিধবাবিবাহের খসড়া তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর মতান্তর হয়। সে তো পরের কথা। ঢিপলে শব্দটির অর্থ কোথাও মেলে না। তবে পুরনো লেখাপত্রে শব্দটি আছে। অর্থ, কানে গুঁজে দেওয়ার তুলো বা কাপড়ের পাকানো দলা। মূলত যাদের সর্দিকাশির ধাত থাকে, তাদের এই ধরনের দলা কানে দেওয়ার রীতি। আগেকার দিনে ওষুধপত্র যখন বিশেষ ছিল না, তখন এই ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করা বিচিত্র নয়। বিদ্যাসাগর যে স্কুলজীবনে সর্দিকাশি ও হাঁপানিতে ভুগতেন তা তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন জোর দিয়ে বলে গেছেন তাঁর বইয়ে। বড়বাজারের ভাড়াবাড়ি থেকে হেঁটে তিনি সংস্কৃত কলেজে যেতেন। সর্দিকাশি ধুলোধোঁয়ায় বেড়ে যেত মাঝে মাঝেই। তাই তাঁর পক্ষে কানে তুলোর ‘ঢিপলে’ ব্যবহার করা বিচিত্র নয়। পিতা ঠাকুরদাস এই সতর্কতা অবলম্বন করে মেধাবী পুত্রের কানের চিকিৎসার খরচ বাঁচাতেন, এটা অনুমান করা দুঃসাধ্য নয়। তবে যশুরে কই নিকনেমটি যেমন সর্বত্রগামী হয়ে উঠেছিল, ঢিপলে নামটি একটি বিশেষ গোষ্টীতে ঘোরাফেরা করত।
চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিদ্যাসাগরজীবনী ”বিদ্যাসাগর’-এ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিদ্যাসাগরের দামোদর সাঁতরে পার হওয়ার কথা লিখেছেন। বিদ্যাসাগর-ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন এই ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করেছেন। উত্তাল দামোদর সাঁতরে পার হওয়া ট্রেনিংপ্রাপ্ত বা প্রশিক্ষিত সাঁতারুর পক্ষে সম্ভব হতে পারে। তবে বিদ্যাসাগরের সহযাত্রী ভাই শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন, বৌবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হেঁটে বাগবাজার যেতেন তাঁরা। বাগবাজার ঘাট থেকে খেয়া ধরে সালকিয়া (শালিখা) যেতেন। পাকা সড়ক ধরে মশাট যেতেন। পুরো বীরসিংহ পর্যন্ত পদব্রজে যেতেন তাঁরা। মাঝে চণ্ডীতলায় রাত্রিযাপন করতেন সরাইখানায়। পরদিন রাজবল্লভহাট দিয়ে খেয়ায় দামোদর পার হতেন। ইন্দ্রমিত্র তাঁর করুণাসাগর বিদ্যাসাগর বইটিতে চণ্ডীচরণের মতকে সমর্থন করেননি। তিনিও লিখেছেন দামোদর তখন অতি ভয়ঙ্কর ছিল। সাঁতরে পার হওয়ার চিন্তাই করা যেত না। সুতরাং বিদ্যাসাগরের পক্ষে সাঁতরে দামোদর পার হওয়া আষাঢ়ে গল্প ছাড়া কিছুই নয়।
তবে এই দামোদরের গল্পের একটি গোড়া থাকলেও থাকতে পারে। দামোদরের এপারে ‘দামোদর নদীর চর’ বলে একটি গ্রাম আছে। সেখানেই একটি জলে ডোবা রাস্তা সাঁতরে পার হতে হত। তা থেকেই হয় তো সাঁতরে দামোদর পার হওয়ার মিথটি তৈরি হয়।
আসল দামোদর পার হয়েছিলেন অবশ্যই, তবে সাঁতার দিয়ে নয়, খেয়ানৌকায়। দামোদরের এখনকার চেহারার সঙ্গে উনিশ শতকের দামোদরকে মেলানো যাবে না। তখনও দামোদরকে কোনও বাঁধের সাহায্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হয়নি। ফলত দামোদর ছিল দুর্দম, বাঁধনহারা। জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিত দু-পাশের গ্রামের পর গ্রাম। আক্ষরিক অর্থেই দামোদর তখন বাংলার হোয়াংহো।