আমরা প্রথম খণ্ডে দেখেছি স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতী তাঁর বইতে বলেছেন যে “১৯৩৯ সালের প্রধান ঘটনা ত্রিপুরী কংগ্রেস।” এবং “১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেস ভারতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা।”
তারপর তিনি বলেছেন : —
“ত্রিপুরী কংগ্রেস থেকে ফেরবার পথে সুভাষচন্দ্র বিশ্রাম নেবার জন্য জিয়লগড়িয়া এলেন কোলিয়ারীতে তাঁর দাদার বাসায়। কোলকাতায় যাবার দিন লিখলেন, “আমি আজ কোলকাতায় রওনা হচ্ছি। জরুরী দরকার। চিঠি পেয়েই কোলকাতা রওনা হবে।” চিঠি পেয়েই আমি কোলকাতায় রওনা হ’লাম। তখন চারদিকের আবহাওয়া খুব গরম। ভারতের সকল প্রদেশ থেকেই সুভাষচন্দ্রের অনুরাগী ভক্তরা এসে পৌঁছেছেন কোলকাতায়। পাটনা থেকে সেইদিনই এসে পৌঁছালেন শ্রীমান শীলভদ্র যাজী। কংগ্রেস কর্ত্তৃপক্ষের ব্যবহারে পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল যে, সুভাষচন্দ্রের পক্ষে ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা সম্ভব হবে না, গান্ধীজির অনুমোদিত লোক নিয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে সুভাষচন্দ্র রাজী হ’লেন না। আবার সুভাষচন্দ্রের মনোনীত ব্যক্তিদের সঙ্গে সহযোগিতা করতেও গান্ধীবাদীরা রাজী হলেন না। বাংলার মুকুটমণি সুভাষচন্দ্রকে পরে বাংলাদেশের বুকের ওপরই বসে কোলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে দিতে হল। অহিংসার নামে জঘন্য হিংসার হ’ল জয়! এই সময় কলিকাতায় যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল তাতে নেতৃবৃন্দকে নিরাপদে ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে স্ব স্ব স্থানে পৌঁছে দিতে সুভাষচন্দ্র যে মহানুভবতা দেখিয়েছিলেন তা অপূর্ব। সুভাষচন্দ্রকে বাধ্য হয়ে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করতে হ’ল।”
সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে একটা মধুর ঘটনা
সুভাষচন্দ্রের চিঠি পেয়ে যেদিন আমরা কোলকাতা পৌঁছলাম, সেইদিনই মোটামুটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল ফরওয়ার্ড ব্লক গঠনের। আমার ওপর ভার দেওয়া হয়েছিল ছোটনাগপুরে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠনকার্যের। শ্রীমান শীলভদ্র যাজী, বন্ধুবর বসন্তচন্দ্র ঘোষ ও সুনীত মল্লিক এ বিষয়ে আমাকে আপ্রাণ সাহায্য ক’রেছিলেন। যেদিন আমরা কোলকাতা পৌঁছেছিলাম সেদিনের একটা মধুর ঘটনা এখানে উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। সুভাষচন্দ্রের স্থান কেন এত উচ্চে এই ঘটনা তাঁর জীবনের সহস্র ঘটনার অন্যতম। আমাদের কয়েকজন পুরাতন কর্মী সুভাষচন্দ্র কোলকাতায় ফিরেছেন শুনে তাঁকে শুধু একটু দেখার আশা নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর দরজায়। কিন্তু তাঁর কাছে যাবার সুযোগ তাঁরা পাননি। ঘণ্টার ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে আছেন, সুভাষচন্দ্রের শয়নকক্ষে একলা আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের কথাবার্তা শেষ হলে আমি বল্লাম – “আপনি যদি একটু জানলার পাশে দাঁড়ান।” সুভাষবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন?” আমি ছেলেদের কথা তাঁকে বল্লাম। অসুস্থ সুভাষচন্দ্র শুয়ে শুয়েই কথা বলছিলেন আমার সংগে। শুনেই তিনি সোজা হয়ে উঠে বসলেন আর বল্লেন, “সত্য বক্সীকে ডাক।” সত্যদার সংগে সংগে আরও কয়েকজন এলেন। সুভাষচন্দ্র বল্লেন – “দেখ, আমি আজ কংগ্রেসের সভাপতি। আমার কত মান-সম্মান। বড়লোকের ছেলে পয়সার অভাব ছিল না। বিলেতে গেলাম I.C.S. পাশ ক’রলাম, চাকরী নিলাম না। হু হু করে আমার নাম বেরিয়ে গেল। আর এই ছেলেরা গ্রামে বাস করে। কারো হয়তো খাবারও জোটে না। আমাদের ডাকে এরা বেরিয়ে আসে। পুলিশের গুঁতো খায়, জেলে যায়, ফিরে এসে দেখে হয়তো কারো মা মারা গেছে, স্ত্রী মারা গেছে, কারো হয়তো জমিজমা বিক্রী হয়ে গেছে। কিন্তু অভিযোগ করে না, একটি কথা বলে না। আবার যখন আমরা ডাক দি হাসিমুখে বেরিয়ে আসে, ‘না’ বলতে জানে না, এদেরই জন্য আমাদের নেতৃত্ব। এরাই আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সংগে দেখা করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এর চেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরা ভাল ছিল। এখুনি এদের আমার কাছে নিয়ে এস, সত্যদাদা সকলকে ডেকে নিয়ে এলেন। সুভাষচন্দ্র সকলকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করলেন, করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন আর বল্লেন – “তোমরা আমার অপরাধ ক্ষমা কর।” জীবনে কারো পায়ে মাথা ঠেকাইনি আজ এই প্রথম সুভাষচন্দ্রের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ক’রলাম।”

“মনে পড়ল আর একদিনের কথা।
“দেশবন্ধুর দেহরক্ষার পর গান্ধীজি এসেছেন সেনগুপ্তকে মেয়রের গদীতে বসাবার জন্য দেশবন্ধুর বাড়ীতে। গান্ধীজির সংগে আগের চিঠিপত্র অনুযায়ী কোন বিষয়ে একটি উত্তর দেবার ছিল, হ্যাঁ অথবা না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য্যন্ত বসেও ব্যুহ ভেদ ক’রতে পারলাম না। পরে কোনরকমে উপরে উঠে গেলাম ও একরকম জোর ক’রেই গান্ধীজির সামনে উপস্থিত হ’লাম। তিনি আসতে বলেছিলেন এবং এভাবে সারাদিন অপেক্ষা ক’রতে হয়েছে শুনেও তিনি কিছু বল্লেন না। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে শুধু বল্লেন — “পরে জানাব।” ত্রিপুরী কংগ্রেসের পর ভারতের এই দুই বিরাট ব্যক্তিত্বের দুইরূপ আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হ’ল। আমার অন্তর বলে উঠল – সুভাষচন্দ্রই ভবিষ্যৎ ভারতের একমাত্র স্রষ্টা। কথাবার্তা শেষ কোরে সুভাষচন্দ্রের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তিনি সস্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর বল্লেন, — “তুমি আমায় কি দিতে পার?” আমি বল্লাম “আপনি কি চান?” সুভাষচন্দ্র বল্লেন — “তোমার জীবনাহুতি।” কৃতার্থ হয়ে গেলাম আমি। বল্লাম — “তাই দিলাম।” বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম।”
বিশেষ দ্রষ্টব্য : —
১) “আমার জীবন” গ্রন্থটি স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতী মহারাজের স্ব-কথিত আত্মজীবনী। তাঁর এই স্ব-কথিত আত্মজীবনী লিখিয়ে নেবার এবং প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বামী অসীমানন্দের কন্যা শ্রীমতি ভারতী দেবী। শ্রীমতি ভারতী দেবীর আগ্রহেই অসীমানন্দ মহারাজ তাঁর কন্যাকে বলেছিলেন, “রাত্রে শোবার পর বসিস, রোজ কিছু কিছু লিখে নিস।” সেমতই ভারতী দেবী এই কথাগুলো লিখে নিয়েছিলেন তাঁর পিতৃদেবের কাছ থেকে শুনে শুনে।
২) আমার কাছে ‘আমার জীবন’ গ্রন্থের ১৪২৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত যে দ্বিতীয় অখণ্ড সংস্করণটি রয়েছে, তাতে যে পুরাতন বানান রয়েছে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেই বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
৩) আমরা জানি যে সুভাষচন্দ্র বসু জামাডোবা থেকে কোলকাতায় এলগিন রোডের বাড়ীতে ফিরে এসেছিলেন ২১শে এপ্রিল ১৯৩৯ তারিখে, খুব সম্ভব সন্ধ্যায় বা রাত্রে; আর তিনি কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন কোলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের এ-আই-সি-সি–র ২৯শে এপ্রিল ১৯৩৯ তারিখের সন্ধ্যার সভাতে। কাজেই উপরে বর্ণিত ‘মধুর ঘটনা’-টা এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ থেকে ২৮ তারিখের কোন একদিনের কথা। [সমাপ্ত]