১৯৩৮ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে একটি চিঠি লিখছিলেন সোমেন চন্দ কলকাতায়, ১২ বছরের অগ্রজ সুহৃদ নির্মলকুমার ঘোষকে। সোমেন পড়ছিলেন যোশেফ ম্যাজিনির Duties of Man, এই বই পড়ে এক আশ্চর্য ভয়ে শিহরিত সোমেন। সেই ভয়ের কথা বলেছেন নির্মলকুমার ঘোষ মহাশয়কে :
ম্যাজিনি (Mazzini) যখন বেঁচে ছিলেন, সে আজকের কথা নয়, তিনি এবং তাঁর মতো অনেক লোককে পেয়েও ইটালী তাঁদের কন্যাকেও বরণ করে নিতে পারল না, অর্থাৎ সমাজব্যবস্থায় ভারতের অনুরূপ হয়েও এবং অত আগেও অনেক চিন্তাশীল লোকদের বক্তৃতায় সোস্যালিজমের আভাস পেয়েও, সেখানে আজ ফ্যাসিজম। এই দেখে মনে হয়, ভারতেও তাই হবে, শেষ পর্যন্ত সেই বহু নিন্দিত ডেমোক্রেসী-রায় বা ভারতের অগণিত দরিদ্র আধিবাসীর আশা সফল হবে না, কাল নয় বৃটিশের হাত থেকে ছাড়া পেল, পরশু গিয়ে পড়বে ধনীদের হাতে।
সোমেন চন্দের জন্ম ১৯২০ সালে ২৪ মে, সুতরাং এই চিঠি যখন লিখছেন তখনও তিনি আঠারোর কোঠায়। এবং এই চিঠি যখন লেখা হচ্ছে ততদিনে হিটলার আস্ট্রিয়া দখলে নিয়েছেন (১৫ মার্চ ১৯৩৮); থাবা বসিয়েছেন চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলে (১০ নভেম্বর ১৯৩৮) এবং জাপান হানা দিচ্ছে চিনে। ফ্যাসিস্ট শক্তি পূর্ণত বেপরোয়া। এসব খবরের আঁচ ১৮ পার হওয়া এক কিশোর যথাযথ জানতেন বলেই তাঁর চিঠির একটি অংশ জুড়ে থাকছে বিপদ সংকেত-কথা। আমাদের কথা ঠিক সেখানে নয়। ফ্যাসিবাদ ও তার উত্থান নিয়ে পরবর্তীকালে একাধিক তত্ত্ব জন্ম নেয় : ফুয়েরার রাষ্ট্র, বিশেষ জাতীয় মানসিকতা, গণহত্যার কেন্দ্রিকতা … ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শেষ অবধি যা দাঁড়ায় তা হল, ফ্যাসিবাদের উত্থানে অতি-ধনিক শ্রেণির স্পষ্ট মদত।
লক্ষ করার মতো, সোমেন ওই সবে আঠারো পার করা বয়সে ফ্যাসিবাদের মূল চরিত্রিট অব্যর্থ অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাঁর ওই চিঠি লেখার পর এক দশকও পার হয়নি। ভারত ব্রিটিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিল এবং ধনীদের হাতে পড়ার যে নিয়তি তার জন্যে অপেক্ষা করছিল তার ভয়ানক পরিণতি এই একুশ শতকের দুটি দশক পার করে আরও যেন দগদগে হয়ে উঠেছে। আজ এদেশের পরিকাঠামো থেকে গণতন্ত্র, সবটাই বণিক-হাঙরের দাঁতের তলায় আটক হয়ে আছে, ৯০ বছরের বেশি সময় আগেই তা আন্দাজ করেছিলেন ১৮ বছরের এই কিশোর।
সোমেন চন্দ নিয়ে লিখতে বসে এই কথাটি বারংবার পথ আগলে দাঁড়াবেই, তারুণ্যের সূচনাতেই তাঁর অকাল প্রয়াণ এবং হতভাগ্য প্রয়াণ। জন কিটস কিংবা সুকান্ত ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে, কুড়ির ঘরেই তাঁদের চলে যেতে হয়েছিল তৎকালে দুরারোগ্য শারীরিক ব্যাধির কারণে। সে মৃত্যুর জন্যে খানিকটা প্রস্তুতি ছিল তাঁদের নিজেদের, তাঁদের পরিজনদের। কুড়ির ঘরের প্রথম দিকেই সোমেনকে চলে যেতে হয়েছিল ঠিক সেই সময়ে দুরারোগ্য রাষ্ট্রিক ব্যাধির কারণে যার নাম ফ্যাসিজম। যাওয়ার জন্যে নিজের মধ্যে, তাঁর পরিজনদের মধ্যে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। এই প্রথম যৌবনে, এই তিন বছরের সাহিত্য জীবনে যা অবাক করে দেয় সাহিত্যকৃতিতে, পাঠকৃতিতে এবং সাংগঠনিক কৃতিত্বে আশ্চর্যরকমের দ্রুত পরিণতি।
এই তিন কৃতি সোমেনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কিছু নয়, পরস্পরকে সমৃদ্ধ করা সহযাত্রা।
সাহিত্য করবেন, এই লক্ষ্যে সোমেন চন্দ কৈশোর থেকেই একাগ্র। সেই লক্ষ্যে নিজেকে তিনি জরিপ করেছেন বারংবার। নির্মলকুমার ঘোষকেই তিনি লিখছেন : “গ্রাম্য অভিজ্ঞতা আমার প্রচুর — এমনকি, যা কেন্দ্র করে শরৎচন্দ্র থেকে আরম্ভ করে অনেকেই কতকগুলো Sweet উপন্যাস রচনা করেছেন বৈষ্ণবদের সেই আখড়ার সাথেও ঘনিষ্টভাবে পরিচিত আমি, কিন্তু এতদিন সেসব সম্বন্ধে কিছু লিখিনি এই ভেবে যে ওসব পুরনো হয়ে গেছে, এখন নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর দরকার।”
সোমেন চন্দের পরম সুহৃদ এবং তাঁর জীবনীকার কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত লিখেছেন : “গ্রামজীবনকে যে তিনি গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন তার মূলে বিভূতিভূষণের রচনার বিশেষ করে পথের পাঁচালী এবং অপরাজিত-র প্রভাব বড় অল্প নয়। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে সোমেনের আদর্শ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানিকের পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, শহরতলী এই তরুণ লেখককে যেন দেখিয়ে দিয়েছেন সেই পথ, যে-পথে একজন প্রগতি লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু করবার জন্যেই তিনি অপেক্ষায় ছিলেন। এই মন্তব্যের গুরুত্বের অন্ত নেই। কারণ সোমেনের সাহিত্য সৃজনের বিবর্তনকে কিরণশঙ্করের মতো এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ কেউই অর্জন করেননি। লক্ষণীয়, যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সোমেন চন্দের আদর্শ মান্য করা হচ্ছে, তাঁকে গ্রহণের ক্ষেত্রেও কতটা সতর্ক বিচারনিষ্ঠ এই তরুণ। মাণিকের গুণাবলীর প্রশংসা করেও সোমেনের দ্বিধা, ” … … কিন্তু পড়াশোনা কম বলে মনে হয়।” সোমেনের এই মাণিক-নিরূপণ নিয়ে বর্তমান লিখিয়ের স্পষ্ট দ্বি-মত আছে। কিন্তু এই লিখনই স্পষ্ট করে দেয় সোমেনের সেই বিশ্বাস — লেখক হয়ে উঠতে হলে পাঠের সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানো ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
এ বিশ্বাস নিয়েই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন তিনি, প্রস্তুত করেছেন তিনি। কৈশোর থেকে শুরু করেছেন দানবের ক্ষুধা নিয়ে বিশ্বসাহিত্য পাঠ। শুধু সাহিত্য নয় সমাজবিজ্ঞান। একাগ্র হয়ে অধ্যয়ন করেছেন মার্কসবাদ, পাশাপাশি প্রগতি সাহিত্য। সমকালের বাঙালি লেখকদের উল্লেখযোগ্য লেখাগুলি পড়েছেন, তারই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাহিত্য। কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্তই উল্লেখ করেছেন, একটি নোটবইয়ে সোমেন লিখে রেখেছিলেন তাঁর প্রিয় লেখকদের নাম : ই.এম.ফর্স্টার, স্টিফেন স্পেন্ডার, ড্রন কর্নফোর্ড, সি ডে লুইস, ইগনাৎ দিয়ো সিলোনে এবং আঁদ্রে মালরো।
পাঠের এই বিস্তার প্রস্তুতি পর্বের এই শ্রম ও সাধনা বিমোহিত করে আমাদের। পাশাপাশি ১৯৩৭ থেকে তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছে ঢাকা এবং কলকাতার উল্লেখযোগ্য পত্রপত্রিকায়। এবং এই তিরিশের দশকের শেষ দিক থেকে ঢাকা শহরের সাহিত্য-আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সোমেনের ভূমিকা। ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘ এবং সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি — এই দুই সংঘশক্তিকে আশ্রয় করে তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতা, সাহিত্য তৎপরতাও।
সোমেন চন্দের গল্প নিয়ে অথবা বন্যার মতো উপন্যাস নিয়ে আলোচনার পরিসর এখানে সংগ্রহ করে নেওয়ার কথা নয়। আমরা বেশ কিছু গল্প থেকে একটি গল্প বেছে নেয়ে তাঁর দুটি প্রবণতার দিকে চকিতে চোখ রাখতে পারি। গল্পটির নাম “একটি রাত”। এ গল্পে হয়তো নিজের একটি alter ego দাঁড় করিয়ে নেন সোমেন — সে চরিত্রের নাম সুকুমার। সেই সুকুমার তাঁর শ্রমিক সহযোদ্ধাদের কাছে নিজের মায়ের পরিচয় প্রদান করে এইভাবে :
সুকুমার বলেল, “বুঝলে না! আপনারা পাভেলকে জানেন?”
—”পাভেল?”
—”সে কী, গোর্কির “মা” পড়েননি?”
—”হুঁ, পড়েছি, পড়েছি।”
—”ইনিও সেই পাভেলের মা, সেই মা!” সুকুমার মা-র দিকে চেয়ে হাসতে লাগল।
কিন্তু সোমেনের এই সাংগঠনিক জীবনের আভাসই এ গল্পের একমাত্র কথা নয়। দুরন্ত আর এক কথা হল কুড়ি না পার-হওয়া এক যুবা মানুষ জরিপ করতে বসে কী দক্ষতায় তুলে আনছেন মানুষের যৌন-বিকার ও মনো বিকারের আঁধার দলাগুলি : এখন সমস্ত বাড়িটাই বিদেশে প্রথম আসা কোনো মূঢ় বালকের মতো স্তব্ধ। অন্যান্য ভাড়াটেদের তো অর্ধেক রাতের ঘুম হয়ে গিয়েছে। তারা সারাদিন একমুষ্টি অপ্রচুর অন্নের জন্যে দেহের রক্ত জল করে বাড়ি ফেরে, তারপর সন্ধ্যার পরেই খেয়ে দেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়, সবগুলো ছেলেমেয়েকে ঘুমিয়ে পড়তে দেয়ার অবসরও তাদের নেই, তার আগেই তাদের নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। তারপর, সেদিন যা একটা কাণ্ড ঘটল, তা যেমন হাস্যকর, তেমনি করুণ। সকলের শেষে কলতলার দক্ষিণদিকের ঘরটিতে থাকে নকুল, সে কোনো এক বইয়ের দোকানে কাজ করে। তার শরীরটা এত মোটা, ভারী আর লম্বা যে হঠাৎ দেখলে কোনো কাল্পনিক দৈত্যর কথা মনে হয়। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কিন্তু ঘরে একপাল ছেলেমেয়ে, তার বউ চিরটাকাল কেবল ছেলেমেয়ে প্রসব করে, তারপর একদিন হঠাৎ বলা-নেই কওয়া নেই মরে গেল। নকুল তখন আর কী করবে? এক দরজা দিয়ে স্ত্রীর শবদেহ শ্মশানে পাঠিয়ে আর এক দরজা দিয়ে কোনো এক গাঁয়ে মেয়ে দেখতে চলে গেল। যখন ফিরে এল, তখন তার গায়ে সিল্কের জামা, পরনে নকশি পাড়ের ধুতি, পায়ে চকচকে পাম্প শু, মুখে সিগারেট আর একরাশ পান, আর তার পেছনে দুই হাত লম্বা একটি বউ, তার আড়াই হাত ঘোমটা। কাপড়টুকুও ভালো করে পরতে জানে না, কোমরের নীচে দেহের প্রস্থটুকু কাঠির মতো সরু। সেদিন রাত্রে এই বউটিই হঠাৎ ভীষণ চিৎকার করে কেঁদে উঠল, তারপর বাকি রাতটুকুও শূকরের মতো চিঁ চিঁ করে কেঁদেছিল। বাস্তবিক এমন কাণ্ড কমই দেখা যায়। তখন এই গল্প নিয়ে বাড়ির অন্যান্য বধূ আর মেয়েদের ভিতরও একটা খোরাক জুটেছিল মন্দ নয়, তারা এই নিয়ে অনেক বলাবলি অনেক ফিসফাস করেছে।
একুশ বছর পার করতেই, সোমেন চন্দ যেদিন খুন হন, তখন তিনি ই.বি রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক। বাংলা গল্পের আধুনিকতম প্রগতির প্রথম সারির পথিক।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার রাজপথে লুটিয়ে পড়ে মিছিলের প্রথমেই থাকা সোমেন চন্দের পদাতিক জীবন।
ঘাতকের ছোরা জানতে চায় নাকি সাহিত্য, সংগঠন, পাঠের এই সম্মিলন! জানলেও সে অনুকম্পা দেখাত না। সে সৃষ্টি জানে না। সাধন জানে না। বিনাশ জানে।