একজন শিল্পী কি তাঁর সৃজনে পারিপার্শিক ঘটনাবলী বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রতি কোনও দায় বোধ করেন? যে সমাজ বৈষম্য-নির্যাতন-লাঞ্ছনায় গভীর থেকে গভীরতর অসুখে পর্যুদস্ত। সেই অসুখ যন্ত্রণায় শিল্পী কি নিজেকে সহমর্মী করতে পারেন? যদিও শিল্পীর হাতে কোনও আয়ুধ নেই, তার মানে এই নয় যে শিল্পীর কোনও দায় নেই। শিল্পীর দায় বোধই সামাজিক ক্ষয় প্রতিরোধের ভাষা অনুসন্ধান করে। শিল্পীস্বত্তা ও মানবস্বত্তার অনুধ্যান হল সেই ভাষা। শিল্পভাষাই আসলে শিল্পীর প্রতিবাদের ভাষা। যা শিল্পীর মধ্যে বারবার প্রশ্ন তোলে কেন গভীর থেকে গভীরতর অসুখে পৃথিবী আচ্ছন্ন?
এসব কথার অবতারণা যাকে ঘিরে তিনি চিত্রকর ও ভাস্কর সোমনাথ হোর। তেমনভাবে আলোচিত না হলেও তিনি আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলায় স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম দাবীদার, ভাস্কর্যের আঙ্গিক ও প্রকরণে স্বকীয়তার কারণেও স্মরণযোগ্য। এ বছর তাঁর শতবর্ষ। তবে কোনওদিনই যেমন তিনি কলাজগতের আলোঝলমল পাদপ্রদীপের শিখা ছিলেন না, তেমনি এ বছরও যে তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করার কোনও দায়বোধ আমাদের আছে তেমনও নয়। অবশ্য তিনি নিজেই চিরকাল সেই কোলাহল থেকে দূরেই থাকতে চেয়েছেন।
শিল্পকলায় তাঁর স্বতন্ত্র্যতা কিংবা ভাস্কর্যের আঙ্গিক ও প্রকরণে তিনি কেন আলাদা তা বুঝতে সোমনাথের শিল্পী হয়ে ওঠার কথা এসেই যায়। ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ত্রাণের কাজ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। থাকতেন পার্টির কমিউনে। এই সময়ে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছেন। প্রদর্শনীও করেছেন। তাঁর ড্রয়িং, পোস্টার কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা জনযুদ্ধ ও পিপলস ওয়ারে(মুম্বাই)ছাপা হয়। এরপর আসেন কলকাতা। সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট নেতা পিসি যোশির আগ্রহে ভর্তি হন কলকাতা আর্ট কলেজে।

তাঁর প্রেরণার রসদ শিক্ষক জয়নুল আবেদিনের সাহচর্য। ইতিমধ্যে মন্বন্তরের ছোবলে কলকাতার ফুটপাথে কঙ্কালসার মানুষের রেখাচিত্র এঁকে জয়নুল বিখ্যাত শিল্পী হয়ে গিয়েছেন। জয়নুলের রেখায় ফুটে ওঠা মন্বন্তরের ছবি সোমনাথকে প্রাণিত করে। জয়নুল ছাড়াও রয়েছেন চিত্তপ্রসাদ। মন্বন্তরের দুই শ্রেষ্ঠ রূপকার সোমনাথের রেখাচিত্রকে প্রভাবিত করে। এছাড়া চার বছর পার্টির কমিউনে পেয়েছিলেন মুজাফ্ফর আহমদ ও বঙ্কিম মুখার্জির সান্নিধ্য। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে সোমনাথ ছিলেন পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী, শিল্পকলায় রাজনৈতিক আদর্শকে রূপ দেওয়াই শিল্পীর কর্তব্য– এই ছিল তাঁর বিশ্বাস।
তবে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বৃহৎ দৃশ্যপট আর সমাজতান্ত্রিক পার্টির নিয়মবদ্ধ জগৎ কি এক? এই প্রশ্ন ক্রমশ প্রতীয়মান হয়ে উঠছিল যখন তিনি সৃজনের আরও গভীরে নিবিষ্ট হতে থাকলেন। ক্রমেই পার্টির গতে বাঁধা নির্দেশ আর শিল্পানুসন্ধানের আকুতির সঙ্গে তালমিল রাখা তাঁর পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত দিল্লি পলিটেকনিকের প্রিন্টমেকিং বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে কলকাতা ছেড়ে গেলেন এবং পার্টির সদস্যপদও আর রিনিউ করলেন না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা অটুট রইল। রাজনৈতিক বিশ্বাসকে শিল্পকর্মের পাশাপাশি জীবনচর্যাতেও আঁকড়ে ধরলেন।
সোমনাথ হোড় যে একজন ব্যতিক্রমী সৃজনশীল মানুষ তা-কি কেবলমাত্র তিনি রাজনীতির জমিমাটি থেকে উঠে এসেছিলেন বলেই! শিল্পী হয়ে-ওঠা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি রেখাচিত্র ও কাঠখোদাই চিত্রের নিয়মিত চর্চা করেছেন। সেও কেবল শিল্পসৃষ্টির তাগিদে নয়, রাজনৈতিক প্রচারের কারণেও। রীতি আনুগত্য তাঁর ওপর চেপে বসেনি বলেই কি রাজনৈতিক তাগিদ থেকে শিল্পসৃষ্টিতে তিনি মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন? কম বয়সে মার্কসবাদে দীক্ষা, কমিউনিস্ট পার্টির সান্নিধ্য তাঁর জীবনদৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করে দিয়েছিল। তার ওপর মন্বন্তরের অভিঙ্গতা, নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস এমন একটি দৃঢ় হয়ে ওঠে যে লম্বা পথের যাত্রায় অজস্র ঝড়-ঝাপটাতেও তিনি টলে যেতে পারেননি।

বরং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে শিল্পের যে চিরিকালীন দ্বন্দ্ব তা যুঝতে হয়েছে নিজস্ব সৃজনের প্রতিটি পর্বে। এই বোঝাপড়া চলেছে সারা জীবন। দলের সদস্যপদ রিনিউ না করলেও রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে একবিন্দু সরে আসেননি। সমগ্র জীবনের সমস্ত শিল্পকর্ম, চিত্র, রেখাঙ্কন, ছাপাই ছবি, ভাস্কর্য সব কিছুই উঠে এসেছে তাঁর তেতাল্লিশের অভিজ্ঞতা থেকে। যে কারণে তার প্রতিটি কাজের ভিতরে ও বাহিরে বৈষম্য-বঞ্চনা-নিপীড়নের-আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর। বোঝা যায় শিল্প নির্মাণে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিবাদ থেকেই গিয়েছিল।
কেবল অভিজ্ঞতা নয় নানা নিরীক্ষার পরিক্রমণের মধ্যে দিয়েই সোমনাথ হোড়ের শিল্পদৃষ্টি পরিণত হয়েছে, স্বতন্ত্র রূপে উন্নিত হয়েছে।সমাজতান্ত্রীক রাজনৈতিক দীক্ষায় শ্রেণি-বৈষম্য বিরোধী শিল্পগণ্ডির মধ্যে শুরু হলেও নানান চড়াই-উতরাই পথ পেরিয়ে একটা সময়ে তার শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক মানব দুনিয়ার শোষ্ণ-পীড়নের সমব্যথী হয়ে উঠল। যদিও সেই আঙ্গিকও তার রূপেছিল বিমূর্ততার অভিমুখ। তবু সেই বিমূর্ত শরীর-মুখ-হাত-পা আর অভিব্যক্তি নিষ্ঠুর আঘাত ও বেদনার আর্তিকেই সজোরে ফুটিয়ে তুলেছে। ‘উন্ডস’ বা ক্ষত নামে সমধিক পরিচিত সেই বিমূর্ত শিল্পকর্ম আঘাত ও যন্ত্রণার অনুভূতিকে যতটা প্রকাশ করে ততটাই নতুন এক শিল্প আঙ্গিকেরও জন্ম দেয়।
শতাব্দীর এই দুঃসময়ে চাবুকের মতো প্রতিবাদ ধ্বনিত হতো তাঁর ছবি।
লেখাটা খুব ভালো লাগলো, বর্ধমানের গুসকরার কাছে দরিয়াপুরে ওঁনার উদ্যোগে ডোকরা শিল্পীদের জন্য সংস্থা গড়ে
উঠেছিল তা সত্যি উল্লেখ যোগ্য।
খুব যুক্তি দিয়ে লিখেছেন।
একটি খুব ভাল লেখা।
সত্তিই কিন্তু তিনি আলোচিত নন, তাহলেও তিনি আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম নাম, ভাস্কর্যের আঙ্গিক ও
প্রকরণে তাঁর স্বকীয়তা স্মরণযোগ্য। এই ধাপ্পাবাজির দেশে শিল্পকলাও তো ফেরেব্বাজদের দখলে তাই অবাক হওয়ার কিছু
নেই।