মোদী ও বিজেপি সরকারের অভিযোগ শান্ত লাদাখ অশান্ত হয়েছে সোনম ওয়াংচুকের উসকানিতে। যদিও তাঁর আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীত। লাদাখে হিংসা ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি অনশন তুলে নেন এবং শান্তির আহ্বান জানান। কিন্তু পুলিশ ম্যাগসেসে-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করে, তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে তাঁর লাইসেন্স বাতিল করে, তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তও শুরু করে। লেহ এপেক্স বডির সদস্য ওয়াংচুক দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রশাসিত লাদাখে ষষ্ঠ তফসিল ও রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছেন। সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং শিল্প ও খনির লবি থেকে পরিবেশগতভাবে ভঙ্গুর লাদাখের বাস্তুতন্ত্র এবং আদিবাসী সংস্কৃতি রক্ষার জন্য কেন্দ্রের উপর চাপ দিয়ে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে লাদাখবাসি। স্বভাবতই কেন্দ্র তাঁর উপর কোনোভাবেই সন্তুষ্ট ছিল না। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা, লাদাখের জন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, সেই সঙ্গে লেহ্ এবং কার্গিল জেলার জন্য পৃথক পৃথক লোকসভা আসন- এমন নানা দাবি নিয়ে বার বার সরব সোনম বেশ কয়েক বার অনশনেও বসেছেন। ফলত অশান্ত লাদাখ শান্ত করতে মোদী ও তার সরকার ফ্যাসিস্ট কায়দাতেই হেঁটেছে। সোনমকে যোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যিনি কৃষি ও পরিবেশ নিয়ে কাজের জন্য রোলেক্স থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সংঘের পুরস্কার এনে দেশকে সম্মানিত করেছেন কোনো শুনানি এবং কারণ ছাড়াই অপরাধীর মতো গ্রেপ্তার গণতন্ত্রের নিকৃষ্টতম রূপ কিন্তু মোদী ও বিজেপি সরকারের এটাই প্রকৃত পরিচয়।
উল্লেখ্য, জম্মু–কাশ্মীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও লাদাখে অশান্তির কোনো বাতাবরণ ছিল না। ১৯৮৯ সালে মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরি আধিপত্য থেকে বৌদ্ধদের মুক্তিলাভের জন্য কিছুদিন সংঘর্ষ হয়েছিল তাছাড়া লাদাখে অশান্তির আগুন আর তেমন জ্বলেনি। ১৯৮৯ সালেই অশান্ত হতে শুরু করে কাশ্মীর। সেই অশান্তি শুরু হয়েছিল উপত্যকা থেকে হিন্দু পণ্ডিতদের বিতাড়নে। পরে তা জম্মুতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যএর বিষয় হল লাদাখের শিয়া মুসলিম অথবা বৌদ্ধ অধ্যুষিত অঞ্চলে তার প্রভাব পড়েনি। এমনকি মুসলিম অধ্যুষিত কারগিল, দ্রাস, মাতাইন, কাঁকসার, বাতালিক, জানস্কার মতো বৌদ্ধপ্রধান লেহতেও আঁচ পড়েনি। কিন্তু এবার কারগিলের মুসলমানেরাও লাদাখের বৌদ্ধদের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। পৃথক রাজ্য ও সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার দাবিতেও তারা সরব। অর্থাৎ দাবি আদায়ে একজোট হয়েছিল লাদাখের মুসলিম ও বৌদ্ধরা। মোদী সরকার জম্মু–কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নিয়ে, রাজ্য ভেঙে কেন্দ্রশাসিত জম্মু–কাশ্মীর ও লাদাখ- দুটি রাজ্য গড়ে জম্মু–কাশ্মীরের বিধানসভা জিইয়ে রেখে জানিয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জম্মু–কাশ্মীরকে ফের পূর্ণাঙ্গ রাজ্য করে দেওয়া হবে কিন্তু লাদাখ থাকবে কেন্দ্রশাসিত। লাদাখের জনগণ অবশ্য সরকারের সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল কারণ তারা জম্মু ও কাশ্মীরের আধিপত্যমুক্ত হয়েছিল। তারা চাইছিল, আঞ্চলিক সত্ত্বা রক্ষা করতে সরকার তাদের স্বশাসন দিক। সংবিধানের ২৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য স্বশাসিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা বন্দোবস্ত করা যায়। আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এই ব্যবস্থা জারি আছে।
ইতিমধ্যে বিজেপি প্রথমবার লাদাখ লোকসভা আসন জেতে ২০১৪ সালে এবং পরে ২০১৯ সালেও। কিন্তু রাজ্য ভাগের পরের বছরই পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে ভারত–চীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। বিজেপির সংসদ সদস্য চীনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জমি দখলের অভিযোগ তোলে। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, কেউ এক ইঞ্চি জমিও দখল করেনি। কিন্তু লাদাখ যে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৪ সালে লোকসভায়। বিজেপি ও কংগ্রেসকে হারিয়ে জয়ী হন ন্যাশনাল কনফারেন্স ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ হানিফা। লাদাখবাসী বুঝতে পারে কেন্দ্র তাদের স্বশাসন দিতে চায় না বরং লাদাখ মুঠোবন্দি রাখতে চায়। সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে গত বুধবার। কেন্দ্রশাসিত লাদাখে ষষ্ঠ তফসিল ও রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন চালাছিল, সোনম কয়েকদিনের অনশনও করেছিলেন, যদিও বুধবার হিংসা ছড়াতেই ওয়াংচুক অনশন তুলে নেন এবং শান্তির আহ্বান জানান। কিন্তু মোদী সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে যোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে গিয়েছে। কারণ লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে যে আন্দোলন চলছে তার অন্যতম মুখ হলেন সোনম ওয়াংচুক। যিনি কৃত্রিম হিমবাহ তৈরি ছাড়াও লাদাখ, সিকিম এবং নেপালের মতো পাহাড়ি অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত বাড়ির নকশা তৈরি করে তার তত্ত্বাবধানেও সহায়তা করে আসছেন। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সৌরশক্তিচালিত তাঁবুও তৈরি করেন। লাদাখ থেকে পাথর এবং প্রাকৃতিক সম্পদ তুলতে নির্বিচারে ডিনামাইট ফাটিয়ে লাদাখের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন পাশাপাশি জনজাতি অধ্যুষিত এই অঞ্চল কেন সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের মর্যাদা পাবে না সে প্রশ্নও তোলেন। ফলে বিজেপি সরকার তাঁকে অভিযুক্ত করবেই। জম্মু–কাশ্মীরের পাশাপাশি লাদাখও যদি অশান্ত হয় তবে তো সোনম ওয়াংচুককে কোণঠাসা করতে বিজেপি সরকার বাধ্য হবেই।