যখন কেউ প্রতিকুল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে লক্ষে পৌঁছায় আমরা তখনই তাঁকে বলি মানুষের মতো মানুষ। এমন উদাহরণ সমাজে একাধিক নয়, তবে কেউ তার পারিবারিক অভাব, কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এড়িয়েও জয় ছিনিয়ে আনেন। তিনি বুঝিয়ে দেন কোনও বাধাই এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অত্যন্ত অভাবী পরিবারে জন্ম নিয়েও চিকিৎসক হয়ে তা প্রমান করলেন জলপাইগুড়ির সোনু।
এমবিবিএস উপাধি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন টিবি হসপিটাল পাড়ার সোনু। তাঁর এই কৃতিত্বে খুশির বাধ ভাঙলো এলাকায়। ঘরের ছেলে ঝটিকা সফরে বাড়িতে এলে তাঁকে ফুল ও মিষ্টি দিয়ে বরন করে নিলো এলাকাবাসীরা। জলপাইগুড়ি টিবি হসপিটাল রোড সংলগ্ন সারদাপল্লী এলাকার বাসিন্দা সোনু এখন থেকে ডাক্তার সোনু দাস। মা রিতা একজন অঙ্গনওয়ারি কর্মী। সোনুদের আরও একটা পরিচয় হল তাঁরা রাজবংশী।
সোনুর বয়স যখন মাত্র আট বছর বয়স তখন তার বাবা বাবন দাস তার স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করে অন্য একজনকে বিবাহ করে। তারপর স্ত্রী ও পুত্রকে অন্ধকারে রেখে অন্যত্র চলে যায়। তখন তাদের সংসার চালানোই ছিল বিরাট দায়।
ওই আচমকা বিপদের দিনে ভেঙে না পড়ে সোনুর মা রিতাদেবী সংসারের হাল শক্ত হাতেই সামাল দেন। অঙ্গনওয়ারী একজন কর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন। এরপর অত্যন্ত কষ্ট করে সোনুকে বড় করতে থাকেন। ধীরে ধীরে সোনু বড়ো হয়ে ওঠে। একদিন সে মাধ্যমিক তারপর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে। স্কুলের পড়াশুনার পাশাপাশি সে জয়েন এন্ট্রান্স এর প্রস্তুতিও নেয়। সোনুর স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে।

অভাবী সংসারের ছেলে হলেও মেধাবী সোনু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিল। সে খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছিল। এরপর জলপাইগুড়ি জেলাপরিষদ-সহ অন্যান্য সংস্থা তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
তারপর জয়েন এন্ট্রান্স-এর ফল বেরোলে দেখা যায় সোনু সরকারি মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। খবর চাউর হতে ফের এগিয়ে আসেন তার আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীরা। সোনু এমবিবিএস পড়ার জন্য ভর্তি হয় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে।
দীর্ঘ চার বছর পড়াশুনার পর অবশেষে এলো সাফল্য। এখন সোনু দাসের নামের আগে উঠে এলো ডাক্তার কথাটি। তবে সন্তুষ্ট নন সোনু। তিনি চান আরও পড়াশোনা করে একজন শল্য চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে। সোনুর মায়ের আজ গর্বের শেষ নেই। তাঁর ছেলে আজ তার সব কষ্ট দূর করে দিয়েছে।
অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও ডাক্তারী পাশ করে সোনু দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিকুলতাকে কিভাবে জয় করা যায়। মাত্র আট বছর বয়স থেকে জীবন সংগ্রাম শুরু করেছিল সোনু। যে বয়সে ছেলেমেয়েরা হেসে খেলে বেড়ায় মনের আনন্দে, সেই বয়স থেকে সোনু লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পড়ে। অবশেষে তাঁর লক্ষ পূর্ণ হয়েছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, সে আরও পড়তে চায়। চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেবা করতে চায় সাধারণ মানুষের। নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি সে দৃঢ়ভাবে প্রতিঙ্গাবদ্ধ, ইতিমধ্যেই সে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছে।
দারুন