সংবিধানের আত্মা? হ্যাঁ, সেই রকমই বলেছিলেন বাবা সাহেব আম্বেদকর। বলেছিলেন সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারা সম্বন্ধে। এই ধারায় মৌলিক অধিকার ভঙ্গের প্রতিকারের ব্যবস্থার কথা আছে। আছে চারটি বিধান।
১] বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ (হেবিয়াস কর্পাস) বা সশরীরে হাজির করা। এই আদেশ বলে আদালতে হাজির করতে হবে আটক ব্যক্তিকে। আটক যদি বিধিসম্মত না হয় তাহলে আদালত আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেয়।
২] পরমাদেশ বা ম্যাডামাস। সরকার, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে আইনানুগ কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেয় আদালত। ব্যতিক্রম শুধু রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপাল।
৩] প্রতিষেধ। নিম্নতন আদালতকে নিজ সীমার মধ্যে কাজ করার নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। ন্যায় বিচার বিরোধী কাজ না করার জন্যই প্রতিষেধ জারি করা হয়।
৪] অধিকার পৃচ্ছা। আইন সঙ্গতভাবে কোন বিশেষ পদে নিযুক্ত না হলেও কোন ব্যক্তি সেই পদ দাবি করলে তার বৈধতা বিচারের জন্য এই লেখ জারি করা হয়।
কি হল সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারার, যা নিয়ে এই নিবন্ধের অবতারণা? শকুনিরা চারিদিকে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে না, তারা সংবিধানের আত্মাকে ঠুকরে ঠুকরে শেষ করে দিতে চাইছে। কথাটা উঠল প্রখ্যাত আইনজীবী কপিল সিব্বলের ভাষণের জন্য। এই সেদিন তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বলেছিলেন ক্ষোভের সঙ্গে। সিব্বল ছিলেন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের আইনজীবী। ১৬ বছর আগের এক জমির বিবাদে হেমন্ত সোরেনকে জড়িয়ে দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে মোদি সরকারের ইডি। সোরেনের বিচার চেয়েছিলেন সিব্বল। ৩ বিচারকের বেঞ্চ গঠিত হয়েছিল। কিন্তু বিচারকেরা বক্তব্য না শুনে বলে দিলেন হাইকোর্টে যেতে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার কি এড়িয়ে গেলেন সুপ্রিম কোর্ট? তাহলে তো সংবিধানের আত্মাকে অপমানিত করা হল। তাহলে বিচার চাইতে কোথায় যাবেন মানুষ?
আর বিচার! বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
মহারাষ্ট্রে, কর্নাটকে, মধ্যপ্রদেশে, বিহারে, ঝাড়খণ্ডে টপাটপ সরকার ফেলে দেওয়া হল। খপাখপ করে জেলে পুরতে লাগল বিরোধী নেতা ও কর্মীদের। যে যে রাজ্যে বিরোধী সরকার আছে, তাদের ভয় দেখাত লাগল ক্রমাগত। না, ঘোমটার ভেতর খ্যামটা নাচ নয়; বুক ফুলিয়ে গা-জোয়ারি। অন্ধ ভক্তরা বলে বুকের পাটার কথা। লজ্জা? আরে, লজ্জা ঘৃণা ভয়/তিন থাকতে নয়। যারা এক কান কাটা তারা সংকোচে গাঁয়ের সীমা দিয়ে হাঁটে, আর যারা দু কান কাটা তারা গাঁয়ের মাঝ দিয়ে যায় বুক ফুলিয়ে। দেখলেন না চণ্ডীগড়ের ঘটনা। মেয়র নির্বাচনের ফল কি হল? কংগ্রেস আর আপ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের কয়েকজনের ভোটপত্র বাতিল করে দিলেন যে অফিসার, তিনি নিশ্চয়ই গ্যাঁড়াকলতন্ত্রের দক্ষ প্রফেসার।
ইভিএম মেশিনে ঘোটালা হচ্ছে বলে সুপ্রিম কোর্টের উকিলরা রাস্তায় নেমে সেই ঘোটালার ডেমো দিচ্ছেন। প্রকাশ্যে বলছেন : ইভিএম যদ্দিন মোদি তদ্দিন। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ৫০টা মেশিন চেয়েছেন ঘোটালা প্রমাণের জন্য। এসবে বয়েই গেছে নির্বাচন কমিশনের। বয়েই গেছে সরকার বাহাদুরের। চোখে বেঁধেছি কুলো আর কানে দিয়েছি তুলো। উকিল মোক্তাররা বাড়াবাড়ি করলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে তাদের কারান্তরালে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পাপ্পু ওরফে রাহুল বাবাজীবন ন্যায় যাত্রায় বেরিয়েছেন পথে। লাফিয়ে উঠে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর পথরোধ করে দাঁড়ালেন, আর আমাদের রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তাঁকে হরিদাস বলে সম্বোধন করলেন। না মশাই, এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়। সত্তায় যাঁরা আছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যাওয়াটাই মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই যে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা, এই যে একনাথ শিণ্ডে, এই যে অজিত পাওয়ার, এই যে শুভেন্দু অধিকারী, এঁদের বিরুদ্ধে ভ্রষ্টাচারের অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে আন্দোলন করলে সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে।
আপনি কি ভেবেছিলেন সিব্বল মশাই? সুপ্রিম কোর্টে গেলেই সুরক্ষিত হবে মানবাধিকার? সংবিধানের আত্মাকে শকুনের থাবা থেকে বাঁচানো যাবে? না মশাই, তা হয় না। গণতন্ত্রের চারটে স্তম্ভই শাসকের করতলে। নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিগরে / নাচাও তেমতি তুমি অর্বাচীন নরে। মহারাজার অঙ্গুলি হেলনে নাচছে তারা। নাচ মেরে বুলবুল পয়সা মিলেগা।
এটাই কি ভবিতব্য?
ভবিতব্যকে পাল্টে দিতে পারে মানুষ। না, না, শুধু মানুষ নয়। রাগী মানুষ, অসহিষ্ণু মানুষ, উত্তেজিত মানুষ, মুখর মানুষ, অকুতোভয় মানুষ।
কত দিন, কত দীর্ঘ দিন সেই মানুষকে দেখি নি পথে। আন্দোলনের মূকাভিনয় দেখছি, তার আন্তরিক রাগী মুখটা দেখছি না।