বুঝতে শেখার পর থেকেই মানুষ বিবাহের জন্য আকুলি-বিকুলি করে। কেউ রোজগার করে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে বিবাহ করে, কেউ অপরিণামদর্শীতার পরিচয় দিয়ে সেসব কিছুই না করে বিবাহ করে ফেলে। বিবাহের পূর্বে বৌ প্রাপ্তির যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকে, বিবাহের পর নানা কারণে সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষাতে ভাটা পড়ে। বৌর ছেলেমি যেমন মিষ্টি লাগে, খুনশুটি যেমন মিষ্টি লাগে, বৌর অবুঝ সবুজ আচরণ আর রূপসুধা যেমন মিষ্টি লাগে, তেমনি বৌর অযাচিত চাওয়া, অনৈত কথাবার্তা, দ্বিচারিতা বা দ্ব্যর্থক আচরণ বিরক্তির চরমকে ছুঁয়ে যায়। একটু ভালোবাসার জন্য কখনো উদবেলিত হয়ে ধরা দেয়, একটু ভালোবাসা দিতে গেলেই কটাক্ষ উচ্চারণে জর্জর করে। স্পর্শাকাঙ্ক্ষা জাগলে স্পর্শ করতে গেলে অলঙ্ঘনীয় বাধা দেবে, অথচ অকারণে কাছে এসে উষ্ণ ওমে স্বর্গসুখে ভাসাবে। দূরে থাকে না কিন্তু দুর্লভ্য; ঠিক এতটুকু কাছে, কিন্তু অনতিক্রম্য; ছোঁয়ায় ছায়ায় রাখে, কিন্তু অস্পর্শনীয়। হাসি দিয়ে ভরিয়ে রাখে, কিন্তু হাসির কথা বলতে গেলেই জোকার বলে বসে। সুখ দেয়, সুখের অসুখে মরি, সুখাতীত। কল্পনাতীত সুখ। তার অধীনে থাকলে তুষ্ট, সমচিন্তা পোষণে সে শিষ্ট, দমন চিন্তাতে গেলে সে দুর্দমনীয়। পেশল শক্তি হেরেছে যুগে যুগে মহিমা শক্তির কাছে। পুরুষ যত বেশি থেকেছে পরাজিত, পুরুষ তত বেশি হয়েছে জয়ী। পুরুষ যত বেশি থেকেছে অবনত, পুরুষ তত বেশি থেকেছে সমুন্নত। প্রতিটি বৌ-ই যদি বুদ্ধির ঢেঁকি না হতো, তবে স্বামী বিলীন হয়ে যেতো ডাইনোসরের সাথে সাথে। সাংসারিক নানা সংকট, দ্বন্দ্ব সম্পর্কে টানাপোড়েন বাধায়। অসহিষ্ণু স্বামীরা সব সমস্যার অন্তমূলে বৌদেরই দায়ী করে থাকে।
বন্ধুদের মধ্যে আরজুই সফল ভাবে লেখাপড়া শেষ করে সম্মানীয় পেশায় আছে। এজন্যই এখনো তার প্রবল আকাঙ্ক্ষার বিবাহটা করা হয়ে উঠেনি। বিকাল থেকে রাত দশটা অবধি ওরা গ্রামের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়। যখনই বন্ধুরা শুনলো আরজুর পরিবার আরজুর জন্য মেয়ে দেখতে যাবে বান্না দাঁড়িয়ে বললো, মেয়ে একদিন দেখে কিচ্ছু বুঝবি না। দশদিন দেখেও কিচ্ছু বুঝবি না। আমি অর্ধযুগ সংসার করছি তাই কিচ্ছু বুঝলাম না। তুই শিক্ষিত, জ্ঞানী। বুঝে-শুনেও ভুল করিস না। তোর সাজানো সংসার মদমত্তহস্তীর মতো চটকিয়ে শেষ করে দেবে। বিবাহ করিস না।
চা দোকানদার সজীব বললো, খাবে যার গাবে না গীত তার। খাবে যার দৌড়ের উপর রাখবে তার। খাবে না যার সেই-ই বীরপুরুষ। সেই সংসারের সব কাজ করে। আর যে সংসারটাকে জোয়াল করে গোরুর মতো টেনে চলেছে সে বেবোধ, অকর্মণ্য।
সুমন আক্ষেপ করে বললো, আমরা বিপথে হেঁটে বিবাহ করে ফেলেছি। আমরা অশিক্ষিত বলে বিবাহ করেছি, তুই শিক্ষিত হয়ে বিবাহ ক-র-বি কেন? তুই ভালো পথে চলা মানুষ। এত আয়-রোজগার করেও বৌর মন পাই না। রোদ-বৃষ্টিতে এত কষ্ট করি তার কষ্টও লাগে না। আর তার খোরাক হাতির খোরাকের চেয়ে বেশি। আমরা না দেখে না জেনে ভুল করেছি; তুই দেখেও-জেনেও ভুল করবি কেন? বিবাহ করিস না।
সাইদুর অস্বস্তি প্রকাশ করে বললো, বিবাহের পূর্বে বৌ সম্বন্ধে খুব উত্তেজনা থাকে, কৌতূহল থাকে, বিয়ের পর বুঝবি কিচ্ছু না। পচা উচ্ছিষ্টের চেয়েও খারাপ কিছু। এখন তো একা থাকতে পারছিস না, তখন একা থাকার জন্য দূরে পালাবি। নিকৃষ্ট প্রাণীর দিকে তাকাতে ইচ্ছা হবে, কিন্তু বৌর দিকে তাকাতে ইচ্ছা হবে না। বিবাহ করিস না।
সজীব সাইদুরের কথার সাথে আরও কিছু কথা যুক্ত করলো, বললো, রূপে চমক, চড়ক; কথায় খড়গ। রূপজলে স্নান, কথার তীর্যক বাণে স্থান অথৈ অতল। দিতে দিতে রিক্ত হবি, তবুও তার চাওয়া কমবে না, বাড়বেই। আর মিলন তৃষ্ণায় পর্যাপ্ত জল না দিতে পারলে স্বামী ধরা তা কী ধরা, মরণ ধরা। দিনের ক্ষুধা রোজগার করে না হয় স্বামী মেটাতে সক্ষম, রাতের ক্ষুধা মেটাতে স্বামী অক্ষম হলে তার ইহজাগতিক সুখ শেষ।
আরজু বন্ধুদের থামিয়ে বললো, ভালো মানুষেরা খারাপ বলে না, খারাপ মানুষেরা ভালো বলে না। ভালো মানুষের বৌ ভালো হয়, খারাপ মানুষের বৌ খারাপ হয়। বোয়াল মাছের পেডি নরম, ভালো মানুষের বেডি নরম।
আবির ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, ও, আমরা ভালো না বলে আমাদের বৌ ভালো না? বৌয়ের চুলে চিরুনি করে দেই, বৌয়ের চুলে বেণি করে দেই, বৌর মাথার উঁকুন পর্যন্ত বেছে দেই। আর কী করলে বৌর চোখে ভালো হবো শুনি?
আরজু সুন্দর একটা ভঙ্গি করে বললো, অযত্নে লোহায় মরিচা পড়ে। অযত্নে-অবহেলায় সম্পর্কের বাঁধনে ঘূণপোকা ধরে। জীবনে সবটা সময় বর্ষা নয়, আবার সবটা সময় বসন্তও নয়। সম্পর্কে উত্থান-পতন থাকবে, মান-অভিমান থাকবে। বৌকে যত্ন করবি, বৌয়ের কাজের মূল্যায়ন করবি। বৌয়ের ছোটো ছোটো কাজেরও গুরুত্ব দিবি, তার মতের প্রাধান্য দিবি। বৌয়ের কথার মূল্য দিবি।
জাহিদ আবিরকে উত্তর দিতে না দিয়ে নিজে দিলো, বৌয়ের কথার মূল্য দেই না? বৌয়ের কথার আর বৌকে মূল্য দিতে দিতে সবার কাছে মূল্যহীন হয়ে গেলাম। বাবা-মা, ভাই-বোনকে ত্যাগ করলাম। তবুও তো সুখ পেলাম না। সংসারে আমার মতের কোনো মূল্য নেই। কিছু বলতে গেলেই বৌ শাশিয়ে বলে, তোমার নিয়মে সব চলবে না।
সজীব তুলনা টেনে বললো, ঘর-বাড়ি ছেড়ে জাহিদ রয়েছে শ্বশুরবাড়ি। হয়েছে ঘর-জামাই। সারা গ্রামের মানুষ বলে জামাই, মনে মনে বলে ঘর-জামাই। সমাজের মানুষের কাছে একজন নিকৃষ্ট মানুষ হয়ে গেলো ও। স্বামীর সম্মানে স্ত্রী সম্মানিত, স্ত্রীর গুণেও স্বামী সম্মানিত। তবে বেশির ক্ষেত্রে স্ত্রীর অহিতকাণ্ডে স্বামী অসম্মানিত। মাথায় ঘোমটা থাকে না, বুকে কাপড় থাকে না। অন্য পুরুষ দেখারও দেখবে, আবার শাশিয়ে বলবে, তোর বৌ বেলাল্লাপনা।
রিপন শিক্ষিত ভাষায় বললো, বৌয়ের সাথে পারেনি রাজা, পারেনি প্রজা। বৌয়ের সাথে পারেনি দশ খুনের দাগি আসামিও। বৌয়ের আপাত সৌন্দর্যে আছে বিস্ময়, তার রণ-কৌশল না বুঝলে ভাঙবে না তন্ময়। বৌয়ের রসের হাড়িতে মুখ দিলে স্বামী আর স্বামী থাকে না, হয়ে যায় হুকুমের গোলাম।
আরজু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো, বললো, সব কিছুতেই ভালো-মন্দ আছে। ভালো আরও ভালো হয়, মন্দও একদিন ভালো হয়ে উঠে। আদর-সোহাগ ভালোবাসার পাশাপাশি শাসনও করতে হবে। শাসন হবে আদর প্রাপ্তির জন্য। বৌকে শাসন করা আর চোরকে শাসন করা তো এক না। বৌ তো চোর না।
মাহাবুর তার অভিজ্ঞতার কথা বললো, একবার বৌকে একটা থাপ্পড় মেরেছিলাম। বৌ হাউমাউ করে কান্না শুরু করে, সন্তান মরলেও মা অত জোরে কান্না করে না। থাপ্পড় মেরেই হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েও পার পাইনি। বাবা এসে বকলো, মা এসে বকলো, শাশুড়ি ফোনে বকলেন, শ্বশুর দেখে নেবেন বললেন, আর শ্যালক তো জেলের ভয় দেখালো। সেদিনই কানে ধরেছি বৌর অত্যাচারে মরে যাবো, তবুও বৌর গায়ে হাত দেবো না। সবাই বৌর পক্ষে।
আরজু বললো, অন্যায় সবাই-ই করে, বৌর অন্যায় চোখে পড়ে বেশি। বোনও নানা কথা বলে, মেনে নিই। বৌ কোনো কথা বললেই বেঁঁধে যায়। নপুংসকরা বৌকে প্রহার করে। বৌ ভুল করলে ভালো ভাবে ভুল ধরিয়ে দিতে হবে। কাজ না হলে সর্বোচ্চ গরম দেওয়া যেতে পারে।
স্বজল বললো, বৌকে গরম দিলে বৌ কি বলে জানিস? বলে, তোমাকে আমার এমনিতেই ভালো লাগে না, পছন্দ হয় না; আবার দাও গরম? কী সাহস!
আরজু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললো, বৌর চোখে তুই ভালো না কেন? বৌ তোকে পছন্দ করে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবি আগে। সংসার শুধু জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য শরীর গরম করে উঁৎ পেতে থাকা না। বৌর হৃদয়ের খোঁজ রাখিস? কাজের সময় কাজ, ঘুমের সময় ঘুম, আর বাকি সময় শুধু ভালোবাসতে শিখতে হবে। টাকা-পয়সা, অলংকার, কাপড়-চোপড়ের চেয়ে নারী বেশি ভালোবাসাখোর। ধনীর দুলালীও গরীবের ঘরে থাকে, শুধু পর্যাপ্ত ভালোবাসার ওমে।
মহিন নড়েচড়ে বসে বললো, তুই লেকচারার, লেকচার দিয়ে পার পাচ্ছিস। সংসারে প্রবেশ কর্ বুঝবি সংসার একটা জঞ্জাল। কোনো হিসাব মেলে না। বৌকে ভালোবাসতে যাবি, বৌ ঐ টাকা-পয়সা, অলংকার, কাপড়-চোপড়ই চেয়ে বসবে। বৌকে ভালোবাসা যায় না। দুর্গন্ধকে যতই দূরে রাখা যায়, ততই সুগন্ধ পাওয়া যায়।
আরজু বললো, আমি সকল বাধাকে জয় করে একটা সুখী, সুন্দর আর অনুকরণীয় সংসার গড়বোই। তোরা দেখিস।
রিপন বললো, ওকে আমরা যতই বোঝাবো, ও বুঝবে না। আমরা বিবাহের পূর্বে এই বাধাটা পেলে আজ এত দুর্ভোগ ভোগ করতাম না। আমরা সব মল খাওয়া পাখি, মল আচ্ছামতো চোখে, মুখে, নাকে, ঠোঁটে, জিভে মাখবো; তারপরই আমাদের চোখে সব পরিষ্কার হবে। তার আগে কী করছি জ্ঞানেই আসবে না।
পরদিন আরজু এসে বললো, যাঁরা মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন তাঁরা মেয়ে পছন্দ করে বিবাহের তারিখ নির্ধারণ করে এসেছেন। শুনতেই আবির বললো, বিবাহ যখন করবিই, কর্। ঘোল আমরা একা খাবো কেন, তুই-ও খা। তবে বিবাহতে খবরদার খরচ করবি না। একটা গণ্ডমূর্খ, অপদার্থ, জ্ঞানহীনা, বুদ্ধিহীনা, জড়বস্তু, ভারবোঝা বৌকে ঘরে আনতে একটা টাকাও খরচ করা ঠিক না।
সবাই আবিরের কথাতে সমর্থন দিলো। আরজু মিষ্টি হেসে বললো, বিয়ের কথা একুশ-বাইশে, করছি তেত্রিশে, বৌ পাওয়া ভাগ্যের, অনেক সাধনায় মেলে বৌ। অনেক খরচ করবো বিবাহতে, তোরা পেট পুরে খাবি।
মহিন রেগে বললো, বান্নাকেও বিবাহতে বাধা দিয়েছিলাম। বান্না বলেছিলো, আমি তোদের মতো মেছো বাঘ না, বাঘা বাঘ। আমাদের বাধাকে অগ্রাহ্য করে বাঘা বাঘ বিবাহ করলো। বাঘা বাঘ সর্পিণী বৌর ছোবল খেয়ে মিনমিনে বিড়াল হয়ে গিয়েছে।
বান্না মহিনের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস কাটলো আর বললো, বৌর সাথে কেউ পারবে না। সুমনের বৌ সুমনকে জ্বালাতো বলে সুমনকে বলতাম, আমার বৌ হলে পিটিয়ে সোজা করে ফেলতাম। বৌ সোজা করবো কী! নিজেই সোজা হয়ে গিয়েছি। মাঝে মাঝে ভাবী, এই কালনাগিনী বিষধর গোখরা সাপ বৌর সাথে সারাটা জীবন সংসার করবো কী করে!
আরজু দ্বিমত প্রকাশ করে বললো, তুই ছিলি বাঁকা, বিবাহের পরেই সোজা হয়েছিস। এটাই তোর কপাল, বিবাহের সুফল। বিবাহের পর ঘাড়তেড়া, রগচটা, লম্পট, ডাকাত, বখাটে, ইভটিজার সব সোজা হয়ে যায়। অলস কর্মঠ হয়। কাজ উদাসী কাজ পাগল হয়। রোদ-ভীতু রোদে পোড়ে, বেহিসাবী হিসাবী হয়, অপচয়কারী সঞ্চয়ী হয়, বেহুদা আলাপী সদালাপী হয়, পরনারী আসক্তে চরিত্র চরিত্রবান হয়, শুদ্ধ হয়। এগুলো বিবাহের কুফল না, সুফল।
সজীব দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, সাইদুরের বড়ো ভাই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মানুষকে খাওয়ায়ে হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ করে বিবাহ করলো। বৌয়ের বুদ্ধিতে জমি বিক্রি করে কিনলো গাড়ি। জমিতে হতো বছরের ফসল। খাদ্য সংকটে সাইদুরের ভাই গেলো বিদেশ৷ বিদেশ থেকে সাইদুরের ভাই টাকা পাঠায়, সেই টাকা দুই হাতে উড়ায় তার ভাবি। শেষে কুদ্দুসের হাত ধরে গেলো চলে।
আরজু বিজ্ঞজনের মতো করে বললো, সম্পর্কের ভিত না থাকলে অঘটন ঘটেই। যে সম্পর্কে মমত্ব থাকে, আদর থাকে, মায়া থাকে, থাকে দায়িত্ব ও শ্রদ্ধা সে সম্পর্ক ভাঙে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী বিবাহ নামক বন্ধনের মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষ ঘর বেঁধে সুখের স্বপ্নে জীবধাত্রী ধরিত্রীর বুকে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রেখেছে। জীবন চলার পথে দ্বিবিধ ভাব, মতদ্বৈধ, মতানৈক্য থাকলেও জীবন ধারা থেমে থাকেনি। আমরা আপাত দৃশ্য দেখে মন্তব্য করি, গভীরের সৌন্দর্য দেখি না।
কেউ আরজুর কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করে আর কথা বাড়ালো না। কেউ হাসলো, নাক দিয়ে বায়ু বের হলো; কেউ ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে হাসলো। যার ভাবটা এমন, বিবাহের পর দেখবো এমন ভাবের কথা অটুট থাকে কিনা!
পরের দিন আবারও চায়ের দোকানে আড্ডা শুরু হলো। বিবাহ উপলক্ষ্যে আরজু ব্যস্ত, কেনাকাটা সারছে। আবির দোকানের এক কর্নারে চুপ করে বসে আছে। দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, আমি এত ঘরকুনো ছিলাম, বিবাহের পর ঘরেই থাকি না। থাকি না মানে থাকতে পারি না। সারাক্ষণ বৌ কানের কাছে ঘ্যানর-ঘ্যানর, প্যানর-প্যানর করে। এ নেই তা নেই, এ দাও কিনে তা দাও কিনে। এ করলে কেন, তা করলে না কেন? এত অতিষ্ঠ সহ্য হয়? বাইরে থাকলে বাড়ি গেলে কৈফিয়ত। স্বাধীনতা তুলোর মতো উড়ে গিয়েছে।
সুমন কষ্টঘনকণ্ঠে বললো, আমার বৌর কথা কী বলবো! প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া করবে; মায়ের সাথে, বাবার সাথে ঝগড়া করবে; আর পাশে যখন কেউ থাকবে না একা একা গলা বাজাবে। আমি বাড়ি ফিরলে সারাদিন যা যা করেছে বিরতিহীনভাবে বলতে থাকবে। অসহ্য যন্ত্রণা, ছুঁড়ে ফেলা গেলে ফেলেই দিতাম।
স্বজল বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে বললো, সপ্তাহে সপ্তাহে শাড়ি কিনে দেই তাও বৌয়ের হয় না, মন ভরে না। শপিংয়ে যাবে, সারাদিন বাজার ঘুরবে। বাড়ি এসে বলবে, আরও একটা শাড়ি পছন্দ হয়েছিলো, পেঁপে রঙের। টাকা তো দেওয়ার সময় হাত থেকে সরে না। আচ্ছা, বৌ এত বেহিসাবী হলে জীবনে উন্নতি সম্ভব? জীবনের কোকিল ভেবে যাকে ঘরে আনলাম, সেই কাকের মতো কাজ করে।
রিপন ক্ষোভ মিশিয়ে বললো, আমার বৌয়ের কথা তিন মিনিট শুনলেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যাবে। কোনো সোজা কথা বলবে না, কোনো ভালো কথা বলবে না। আমার সক্ষমতা নেই বিয়ে করেছি কেন! ঘুরতে নিয়ে যাই না বলে আমি বেরসিক। প্রতিদিন মাছ-মাংস কিনি না বলে আমি কৃপণ। দুপুরে খেয়ে কেন বিশ্রাম নিই, তাই আমি অলস।
আরজু মুখ খুললো, সংসার এমন সমস্যাপূর্ণ। মানিয়ে চলতে হয়।
তা শুনেই আবির ক্ষেপে গেলো, বললো, মানিয়ে চলি বলেই সংসার টেকে। নতুবা বৌর যে বুদ্ধি আর কথাবার্তা দুই দিন পরপর তার সংসার ত্যাগ করতে হতো। এত হালকা বুদ্ধি প্রাণীকূলে আর কারও নেই। নিজের ভুল নিজেই বোঝে না। সংসারে দুখের আগুন জ্বেলে ও কোন সুখের ঠিকানা খোঁজে? কী বলে, কী করে, বিরক্তিকর!
সুমন বললো, বৌয়ের সব অভিযোগ, আদেশ, আবদার মেনে নিতে নিতে প্রতিটি পরিবারে বীরপুরুষও গাধা হয়ে যাচ্ছে। আমি ভেবে পাই না, বৌটি কেবল চায়-ই, চায়-ই। চাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভাবনা নেই, কী চাচ্ছে! মাথা অবনত হবে বলে আমি কখনো কারও কাছে কিছু চাই না।
আরজু বললো, স্যাক্রিফাইজ করার মন-মানসিকতা উভয়ের মধ্যেই থাকতে হবে। ত্যাগের জোর অনেক। ত্যাগ শিখাবি।
স্বজল বললো, যতই স্যাক্রিফাইজ করি, একটা পর্যায়ে গিয়ে কেন যেন আর সহ্য করা যায় না। কোনো স্বামীই অযথা বৌকে প্রহার করে না। অনর্থক কথা বলে বলে মাথা আউলায়ে দেবে। যতই শিক্ষিত হোক, কাজ একই রকম। গাধা পালন করা যায়, বৌ পালা যায় না। অসহ্য রকমের মূর্খ।
আরজু বললো, সব সময় তো আর ঝগড়া মনোমালিন্য হয় না। হাজার অমিলের মধ্যেও কোথাও না কোথাও মিলের কারণে স্বামী-স্ত্রী আজও বেঁধে বেঁধে বাস করছে। সবটা সময় ভালো থাকা, মহব্বতে থাকা এটা আশা করাও ঠিক না। যে বৌ বকছে, সেই বৌ সেবাও দিচ্ছে, রান্না করে খাওয়াচ্ছে, বুকে মাথা রেখে দুটো স্বপ্নের কথাও বলছে। বিপদে সাহায্য করতে না পারলেও পাশ থেকে তো সরছে না। স্বামীর দুর্দিনে নিজ গহনা কি দিয়ে দেয় না? স্বামীর অসুস্থতায় নির্ভরতার হাত কি বাড়িয়ে দেয় না? স্ত্রীর শুশ্রূষাতেই স্বামী বাঁচে। স্বামীর অস্থিরতায় সান্ত্বনার হাত বাড়িয়ে দেয় কে? স্ত্রী।
রিপন বললো, দোস্ত, তুই বিয়ে করিসনি, এ জ্বালা বুঝবি না। বৌ তোর কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে, ভাবছিস খুব যত্নে রাখবে, আদরে রাখবে, যতই যত্নে রাখবি, যতই আদরে রাখবি সে ভাববে আমার খেয়ালই করছে না। তার মনের যত দাবি পূরণ করতে যেয়ে সঞ্চিত সঞ্চয় সব যাবে, মনের দাবি কমবে না, বাড়বেই। স্বামীর সম্পদকে বৌ যদি নিজের সম্পদ না ভাবে স্বামী তো পথে বসবেই।
আরজু আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, আমি তো জানি বৌয়ের কারণেই বখাটে স্বামী রত্ন স্বামী হয়ে উঠে। উড়নচণ্ডী স্বামী সংসারী স্বামী হয়ে উঠে। বিয়ে করলেই রুজি বাড়ে। বৌর আকর্ষণেই ঘর-বিমুখ স্বামীও ঘরমুখী হতে থাকে। বৌ তো আঁচল পেতে বসে থাকে অপেক্ষায়, মায়াবি কথা বলে মন ভুলায়, মান ভাঙায়।
সুমন নাক সিটকে বললো, স্বপ্নে আছিস। বিয়ে কর্ সব ভুল ভাঙবে।
আরজু বললো, মন বুঝে চললে সংসারে অশান্তি হবে না। বৌয়ের মন বুঝতে হবে, তাকেও বোঝাতে হবে, সেও যেন বোঝে।
শুনে স্বজল ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, বৌ-জাতি কী বোঝে! কী বোঝাবি? সে যা বোঝে তাই উত্তম। আর যে কী বোঝে বিবাহের পরে বুঝবি! সে নিজেরটা, নিজের শখটা, নিজের অধিকারটা বোঝে, আর কিছুই বোঝে না।
আরজু উপদেশ দিয়ে বললো, বৌয়ের মতামতের মূল্য দিতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে। বৌ পর না যে তার মতামতের অধিকার থাকবে না।
মাহাবুর এতক্ষণ চুপ করে ছিলো। পারলো না আর চুপ থাকতে। বললো, বৌয়ের কথা শুনে কাজ করলে দশ দিনে ফকির হতে হবে। বৌয়ের ভাবনা যে কত অপুষ্ট, সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে বোঝা যায়।
আরজু প্রশ্ন করলো, বৌয়ের প্রতি এত ক্ষোভ কেন? তার কি কিছুই ভালো না?
আবির তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, তার হাসিটা সুন্দর, তা কি অভাগা স্বামীর জন্য? তার কথা মিষ্টি, তা কি হতভাগা স্বামীর জন্য? সে সুন্দর, আরও সাজে, তা কি দুর্ভাগা স্বামীর জন্য? পাশের বাড়ির দেবরের জন্য।
আরজু বললো, তোদের পরিবারে অশান্তি, আমার মনে হচ্ছে ভালোবাসার দৌড়ে তোরা হেরে গিয়েছিস!
জাহিদ আক্ষেপ করে বললো, সংসারের জন্যই পুরুষ কাজ করে। বন-বাদাড়ে কাজ করে পরিবারে অন্ন যোগান দেয়। এরচেয়ে কীভাবে আর ভালোবাসা প্রকাশ করবে স্বামী?
আরজু বললো, বৌয়ের সাথে কখনোই দূরত্ব বাড়ানো ঠিক না। কাছে কাছে ঘেঁষে থাকলে সম্পর্ক কখনো নষ্ট হবে না।
রিপন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, বৌয়ের কাছে ঘেঁষে থাকবো? স্বপ্ন ভালো! বৌ যে কী তিক্ত যন্ত্র দেখবি তার পাশে ঘুমাতেও বিরক্ত আর অসহ্য লাগবে। যত শাসনে রাখা যাবে ততই শান্তি, প্রশ্রয় পেলে মানসিক রুগী বানিয়ে ছাড়বে।
আরজু সন্তুষ্টচিত্তে বললো, কেন যেন মনে হচ্ছে আমার বৌ ভালো হবে। না হলেও আমার মোহনীয় শক্তি আর তিতিক্ষা দিয়ে ঠিক করে নেবো।
সাইদুর রেগে বললো, এমন স্বপ্ন নিয়ে আমরাও সংসার পেতেছিলাম। বাইরে যা খেতাম বাড়িতেও নিয়ে আসতাম। এখন পথের কুকুরকে খেতে দেই, কুকুর যার খায় তাকে ঘেউ করে না।
পরদিন চায়ের দোকানদার সজীব চুলা জ্বালাচ্ছে আর বলছে, পাঁচ হাজার টাকা ইনকাম করলেও মা-বাবার সব চাহিদা পূরণ করা যায়, ত্রিশ হাজার টাকা ইনকাম করলেও বৌয়ের চাহিদা পূরণ করা যায় না।
দীর্ঘশ্বাস কেটে বান্না বললো, ভেবেছিলাম বিবাহ করলে সুখ-দুঃখ শেয়ার করার মানুষ পাবো, দুশ্চিন্তা লাঘব হবে। বিবাহের পর দেখি বৌ দুশ্চিন্তা তৈরির কারখানা! বড়ো ভাই আমার বন্ধু ছিলো, তাকেও শত্রু বানিয়ে ছেড়েছে, বোঝ্ বৌর কেরামতি!
সজীব বিজ্ঞজনের মতো করে বললো, সব পাওয়াতে কিছু না কিছু অতৃপ্তির পাশাপাশি তৃপ্তিও আছে। কিন্তু বৌ পাওয়াতে কোনো তৃপ্তি নেই। বৌর গুণগান যে পুরুষ করে বুঝতে হবে বৌর থেকে থেরাপি খাওয়ার ভয়ে।
সজীবের কথায় সহমত পোষণ করে মাহাবুর বললো, বৌ যখন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে ভালোবাসার গল্প করে তখন তো ভুলে যাই বৌ মায়ের সাথে কী অন্যায় করেছে, বাবার সাথে কী দুর্ব্যবহার করেছে। অন্ধকারে বৌয়ের শরীরের গন্ধ মাখলে ভুলে যাই দিনে যে সে আমার মরা মুখ দেখবে দশ বার বলেছিলো।
মহিন বিক্ষিপ্তচিত্তে বললো, পুরুষরা আসলেই সব দ্রুত ভুলে যায়। ঘরের কোনো জিনিসে হাত দিতে হলে আগে অনুমতি নিতে হবে বৌর থেকে। ঘরে আম পেকে পচছে, তাও অনুমতি নিয়ে খেতে হবে। কোথাকার কে সে! উড়ে এসে জুড়ে বসলো!
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে মহিনের গলা ধরে এলো। সাইদুর বললো, আমার বড়ো ভাই সারাটা জীবন বড়ো ভাবির পেছন পেছন হাঁটলো। বড়ো ভাবি গোসলে গিয়েছে তো বড়ো ভাই পেছন পেছন গোসলে গিয়েছে। এমন বৌ ঘেঁষে থাকা পুরুষ পৃথিবীতে আর জন্মাবে কিনা সন্দেহ। অথচ সেও বৌর শেলবাক্য হজম করছে।
জাহিদ কর্কশকণ্ঠে বললো, আর আলম কী করে? বৌয়ের ভয়ে এতই তটস্থ থাকে কোথাও গেলে বলে যেতে হয় বৌকে। ক্ষেতে গেলে বলে যাবে, কইগো, আমি ক্ষেতে গেলাম। বাজারে গেলে বলে যাবে, শুনছো, আমি বাজারে গেলাম। এমন কী পায়খানা করতে গেলেও বলে যাবে, হ্যাঁগো, আমি পায়খানা করতে গেলাম।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস কেটে রিপন বললো, বিবাহের আগে ভেবেছিলাম বৃষ্টি হলে বৌকে বুকে বেঁধে জানালায় বসে বৃষ্টি দেখবো। আর বিবাহের পর? বৃষ্টি হলে বৌ বলে গোরু ঘরে তোলো, জ্বালানি ঘরে তোলো। বৃষ্টি আর বজ্রপাতের মধ্যেও বৌ তরকারি কিনতে বাজারে পাঠায়। মৌচাকে মুখ দিয়ে প্রতি ঘরে শৌর্য-বীর্যের স্বামী শৌর্য-বীর্যহীন হয়ে গিয়েছে।
স্বজল গম্ভীর মুখে ক্ষোভের হাসি জাগিয়ে বললো, বৌ যখন আমার সাথে অকারণেই কথাতে কথাতে ঝগড়া লেগে যায় তখন বৌকে একটা রাস্তা দেখিয়ে দেই, পাশের বাড়ির সাকিনের বৌর সাথে ঝগড়া করো। আয়েশ মিটবে। ও পোড়ামুখী বৌ সাকিনের বৌর সাথে ঝগড়া না করে রাসেলের বৌর সাথে ঝগড়া করতে গিয়েছে। ইচ্ছামতো গাল-মন্দ খেয়ে বাড়ি এসে বসে আছে। ভেবেছিলো সাকিনের বৌর চেয়ে রাসেলের বৌ কম ঝগড়াটে, জিততে পারবে।
ঠিক এমন সময় আরজু এলো। মুখে লজ্জা লজ্জা হাসি। কাল দিন পর পরশু তার বিয়ে। সময় যেন কাটছে না। মহিন আরজুর এমন পুলকিত ভাব দেখে বললো, শীতের সময় মানুষ গরমের তৃষ্ণায় ভোগে, গরমের সময় মানুষ শীতের তৃষ্ণায় ভোগে। অবিবাহিত পুরুষও তাই, অবিবাহিত অবস্থায় প্রকাশ না করলেও বিয়ের তৃষ্ণায় ভোগে। বিয়ের পর কেন বিয়ে করলাম এই যন্ত্রণায় ভোগে। না বিয়ের পূর্বে শান্তি, না বিয়ের পরে শান্তি। না বিয়ের পূর্বে শান্তি পায় পুরুষ, না বিয়ের পর।
জাহিদ সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বললো, আঙুর ফল খেতে না পারলে টক, আর খেতে পারলে মিষ্টি না। আসলে অবিবাহিত পুরুষ ভাবে শীতের কাঁথা বৌ গরম করে রাখবে সে গিয়েই ঘুমাবে। বাস্তবতা হলো, কাঁথা বৌ নিজের দখলেই রাখে। আর বৌ গরমে পাখার বাতাস করে দেবে? আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দেবে? গালি দেবে আর বলবে, অক্ষম পুরুষ, ফ্যান কিনতে পারো না? পুুরুষ সব সহ্য করতে পারে, পুরুষত্ব নিয়ে কথা বললে সহ্য করতে পারে না। পুরুষ মানেই পুরুষত্বের অধিকারী।
আরজু একটু হেসে বললো, কী বলিস! আমি তো জানি বৌ গরম কালে পাখার বাতাস করে দেয়, আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দেয়, গরমে কাজে যেতে বাধা দেয়। শীতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে, উষ্ণতা দেয়। বৌ খুব আদর জানে, আর তা খাওয়ার জন্য পুরুষ বিবাহ করে স্বামী হয়। বৌ তো পরি, অপ্সরী, নেশাচ্ছন্ন করে রাখবে। শুধু ভালোবাসাটা শিখেনে, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
মাহাবুর আরজুকে শাশিয়ে বললো, বিবাহ করলেই বুঝবি এ ভুল কেন করলাম! এই পচা কাজ করার জন্য এত মুখিয়ে থাকতাম কেন! বিবাহের পূর্বে মনে হবে বৌ মধুর হাঁড়ি, বিবাহের পর বুঝবি বৌ যন্ত্রণা তৈরির মেশিন। বাজারে গেলে বলবে, বাজারে গেলে কেন? বাজারে না গেলে বলবে, বাজারে গেলে না কেন? পাশের বাড়ির ভাবির সাথে কথা বললে বলবে, আমাকে আর ভালো লাগে না? আর তার সাথে দুটো মিষ্টি কথা বলতে গেলেই বলবে, কাজ-কাম নেই, শুধু রসালাপ? তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে বলবে, শুধু বৌ দেখার জন্য উতলা? আর দেরি করে বাড়ি ফিরলে বলবে, কোন ভাবির ঘরে ঢুকেছিলে?
সাইদুর বিরক্তিভরে বললো, আরে আরও যন্ত্রণা আছে! টিভি নেই, টিভি কিনবে কবে? ফ্রিজ নেই, ফ্রিজ কিনবে কবে? ঘরটা পাকা করবে কবে? বৌ যদি সীমাবদ্ধতা বুঝতে চেষ্টা না করে সংসার কি ভাল লাগে? ঘরে ঘরে কত স্বামী সহ্য না করতে পেরে গলায় দড়ি দিচ্ছে, স্ট্রোক করছে। নতুবা গলায় বাঁধা কাটার জ্বালা সহ্য করে মরার মতো বেঁচে থাকছে।
আরজু বৈজ্ঞানিক চোখে চেয়ে বিজ্ঞজনের মতো করে বললো, আমি তো জানি স্বামী-স্ত্রীর সম্মিলিত প্রয়াসেই একটি সংসার দাঁড়িয়ে থাকে। অভাবে সহমর্মী, দুঃখে-কষ্টে সমব্যথী হয়ে সংসার সাগর পাড়ি দেয়। এক প্লেট অন্ন ভাগ করে খায়। অনেক সময় নিজে না খেয়ে একে অন্যকে খাওয়ায়। মনের চাওয়া পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সংসারকে দাঁড় করায়। পরস্পর শক্ত হাতে ঝঞ্ঝা সাগর পাড়ি দেয়।
মহিন একগাল হেসে বললো, বিবাহ কর বুঝবি কী ধারণা নিয়ে বড়ো হয়েছিস, ঘটছে কী! বইয়ের গল্প, সিনেমার গল্পের সাথে বাস্তবের গল্পের কত অমিল! বৌকে শাসন করে দমন করা যায়, কিন্তু ভালোবেসে জয় করা যায় না। বৌর চোখে তাকালে বজ্রাঘাত পেতে হয়, বৌর হাতে হাত রাখলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে হয়, বৌর কাঁধে কাঁধ রাখতে গেলে ভূ-কম্পনে কম্পিত হতে হয়।
বান্না ক্ষিপ্তকণ্ঠে বললো, বৌকে যত ভালোবাসবি বৌ বলবে ভ্যাবলা পুরুষ, বৌর পিছু ছাড়ে না। প্রতিবেশী বলবে কাপুরুষ, বৌর আঁচল তলে থাকে। বৌকে ভালবাসলে বৌ সেই ভালোবাসাকে অস্ত্র বানিয়ে নেয়, প্রশ্রয় ভেবে নেয়; আর বৌ প্রশ্রয় পেলে কী করে সবার জানা। তারচেয়ে বৌকে শাসনে রাখতে হবে, বৌ দৌড়ের উপর থাকবে। গোরু-ছাগল কিনে দিতে হবে, হাঁস-মুরগি কিনে দিতে হবে, খাওয়া তাদের।
খুব কষ্ট পেয়ে আরজু বললো, বৌ একজন মানুষ, তাকে সম্মান দিতে হবে। বৌকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার কথা আসছে কেন? বৌকে নানা কাজে ব্যস্ত করে সুখ পাবি? মিলেমিশে কাজ করলে কাজে বরকত বাড়ে। হীন চিন্তা বাদ দে।
বান্না হঠাৎ রেগে গিয়ে বললো, কাকে সম্মান দেবো আরজু? বৌকে? সম্মানের বোঝে কী! বুদ্ধিই তো হাঁটুতে। শাড়ি, ব্লাউজ, শায়া ম্যাচিং করতে করতে দিন শেষ। কুঁচিয়ে শাড়ি পরতে, চোখে-ভ্রূতে কাজল, ঠোঁটে লিপিস্টিক দিতে দিতেই জীবন পার। ভ্রূও প্লাগ করা লাগে। গাধার মতো খেটে রোজগার করবি, গাধার জ্ঞানে বৌ সব খরচ করে উড়িয়ে দেবে।
আরজু বললো, বৌ কখনো খরচপ্রিয় না। বরং সেই সংসারের বাড়তি খরচের লাগাম টানে।
সবাই মিলে ক্ষিপ্ত হলো আরজুর প্রতি বৌ পক্ষের হয়ে কথা বলছে বলে। আরজু আর কথা বাড়ালো না, বুঝলো শুধু বৌয়ের কারণেই সংসার জীবন ওদের ভালো যাচ্ছে না।
“মানুষ স্বপ্নে ডোবে, স্বপ্নে ভাসে, স্বপ্নে রাঙায় মনের মানুষকে। প্রত্যাশার ঢেউ বুকের মাঝে কল্লোল করে। হাজার উপচারে সাজায় তাকে যে হবে হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী। আমিও কল্পনার ডানায় ভর করে একটি প্রিয় মুখের চিত্র এঁকেছিলাম মানসপটে। কিন্তু স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর মানুষ যে পায় এ আমার বিশ্বাসে ছিলো না। আমি এখন যার চোখে চোখ রাখি, যার বুকে মুখ লুকাই, যার কাঁধে মাথা ঠেকাই সে আমাকে যত্ন করে, খুব যত্ন করে; ভালোবাসে, খুব ভালোবাসে। আমাকে সুখে রাখার তার প্রচেষ্টার শেষ নেই। একজন চিরসুন্দর, চিরসবুজ মানুষকে চিরজীবনের জন্য পেয়েছি। আর কিছু চাই না জীবনে! আমি আমার পরম পাওয়া পেয়ে গিয়েছি।”
স্টাটাসটা পড়ে আরজু চোখ বুঝে থাকলো তিন মিনিট। ভাবলো, ওর ভাবনা জুড়ে কত বেশি স্থান করে নিয়েছি! কত আপন ভাবে আমায় ও! কত আপন করে নিয়েছে ও! মানুষ অযথা বলে, বৌ স্বামীর কাছে অধরা থাকে। মানুষ অযথা বলে, বৌ স্বামীকে বুঝতে চায় না।
আরজু খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়লো। মনের মুকুলে কখনো কেউ এভাবে ধরা দেয়নি। মায়ার বাঁধনে কেউ কখনো এভাবে আবদ্ধ করেনি। সব যেন মধুময় মনে হচ্ছে। সব কথা সুর হয়ে যাচ্ছে। একি সমস্যা! মধুময় সমস্যা!
বাজার শেষে বাড়ি আসতেই আয়মান বাচ্চা শিশুর মতো হাত-পা ছুঁড়ে আদরে আদরে আরজুর হাত ধরে ঘরে নিয়ে এলো। বাজারের থলে খুলেই বললো, পটোল এনেছো, ডাঁটাশাক কই? পেয়াজ এনেছো, রসুন কই?
আরজু ডাঁটাশাক আর রসুন আনতে আবার বাজারের দিকে যাচ্ছে। সাইদুর দেখে বললো, তুই তো মাত্র বাজার থেকে ফিরলি। আবার তাও এত রাতে বাজারে যাচ্ছিস কেন?
আরজু বাজারে যাওয়ার কারণ বলতেই সাইদুর হেসে বললো, বাজার-সদাই আনতে ভুল হলে মা কখনো আবার বাজারে পাঠিয়েছিলো? পড়েছিস বৌয়ের পাল্লায়, ভুল হলে ক্ষমা নেই। দেখবো বিবাহের আগের বৌ-পাগল বিবাহের পর কত দিন বৌ-পাগল থাকে! সংসারের লাটিম বৌর হাতে দিয়েছিস, ঘুড়ি হয়ে উড়্, উলোট-পালোট বাতাসেও স্বাভাবিক ভাবে উড়তে হবে কিন্তু!
বাজার শেষে আরজু বাড়ি এলো। আয়মান তরকারি কুটে বসে আছে। আরজুই আজ রান্না করতে উদগ্রীব হলো। আয়মান বাধা দিলো। আরজু অগ্রাহ্য করে বললো, পৃথিবীর বড়ো বড়ো রাধুনি সব পুরুষ। সব অনুষ্ঠানের রাধুনি পুরুষ। হোটেল, রেস্টুরেন্টের রাধুনিও পুরুষ।
আয়মান একগাল হেসে রান্নার দায়িত্ব স্বামীকে দিলো। মহিনের বৌ তা দেখতে পেয়ে কিছু না বলে হেসে বাড়ি চলে গেলো। খেতে বসে আরজু বললো, আচ্ছা, বৌর বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে থাকে, বৌর বুদ্ধি শুনলে নাকি স্বামী ঠকে?
আয়মান ভ্রূ ভাঁজ করে বললো, এসব যারা বলে মাথামোটা লোক তারা, তুমি তাদের সাথে মিশবে না। কিছু সম্পর্ক ত্যাগ করতে হয়, যে সম্পর্ক সম্পর্কে ভাঙন ধরায়। মূল্যহীন সম্পর্ক ত্যাগ করায় উত্তম, হোক যতই বন্ধুত্ব।
আরজু আবার বললো, বৌ নাকি স্বামীকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেয়? বিশ্রাম নিতে নাকি পারে না, দৌড়ের উপর রাখে?
আয়মান বললো, স্বামী-স্ত্রী মিলেই সংসার। সংসারের কাজ স্বামী-স্ত্রী মিলেই করবে। ওসব বন্ধুদের সাথে মিশবে না। ওরা কিন্তু আমাকে তোমার কাছে খারাপ করে উপস্থাপন করবে। আর আমি তখন তোমার চোখে খারাপ হয়ে উঠবো।
পরের দিন থেকে বন্ধুদের সাথে মেশা কমিয়ে দিলো আরজু। বান্না হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে বললো, কী, চায়ের দোকানে যে আসছিস না, বৌ মিশতে মানা করেছে? দেখলি তো বন্ধুত্বের মাঝে বৌ কীভাবে বিষক্রিয়া ছড়ায়? বৌর কথা শুনিস বলে আজ বন্ধু হারিয়ে ফেলছিস, একদিন সমাজ হারিয়ে ফেলবি। আর হয়ে যাবি বৌর কোল-ঘেঁষা পুরুষ।
আরজু না-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, আরে কী বলিস! বন্ধুত্বের বন্ধন কখনো কি পুরাতন হয়?
বান্না হেসে বললো, না বন্ধু, তুই বদলে যাচ্ছিস, বদলে যাওয়ার আগে ধরন বদলে যায়; যা ধরা যায়। তুই ভাই সোনাকে তামা ভেবে নিয়েছিস, আর তামাকে সোনা করে নিচ্ছিস।
আরজু কথার উত্তর দিয়ে কালক্ষেপণ না করে পা বাড়িয়ে চলতে লাগলো। সরল রেখার মতো শুয়ে আছে রাস্তা। সে রাস্তা দ্রুত মাড়িয়ে বাড়ি এলো ও। আরজুকে দেখে আলতো করে মুখটা তুলে আয়মান তাকালো। আরজু দেখলো, ওর দৃষ্টির পরিসীমা মাপা যায় না। চোখে অনেক স্বপ্নের মায়াঞ্জন আঁকা। চোখে চোখে হয়ে গেলো কত আলাপ। আয়মান আলতো করে হাসে, কপালের এলোকেশ সরায়। চোখে চোখে আলাপ শেষে ওরা ঘরে গেলো। আরজু বললো, আজ এত দেখছো কেন? আজকে কি নতুন কিছু পেলে?
আয়মান মিষ্টি হেসে বললো, আমার দুটি চোখে একটি আকাশ। সেই আকাশে তুমি প্রেমের শুকতারা। তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে এক ফোঁটা ভালোবাসার বৃষ্টি তুমি। সব যেন মধুময় মনে হয়, তুমি কাছে তাই।
আরজু নিষ্পলক চেয়ে বললো, ঝিনুক মুক্তো রাখে বুকে, তুমি আমাকে কোথায় রাখবে?
আয়মান আরজুকে বুকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বললো, আমার বুকের মাঝে শুধু তুমি। তুমি কাছে না থাকলে মেটে না পিয়াস। আমি তোমার আদর সুধা পান করে করে বেঁচে থাকবো। তোমার বুকের সন্নিকটে না থাকলে আমার স্বপ্ন সত্য হতো না। আঁখি জুড়ে স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন তুমি কেন্দ্রীক। তোমাকে ভুল বোঝার সেই দুঃসাহস বিধাতা যেন আমাকে না দেন। মনের পুরোটা রাজ্য জুড়ে তোমার অবস্থান।
আরজু প্রাপ্তির উচ্ছ্বাসে উদবেলিত হয়ে বললো, কীভাবে এত ভালোবাসো! এভাবেই ভালোবেসো আজীবন! যারা ভালোবাসে তারা ভালো থাকে, কারণ ভালোবাসার মাঝে আলাদা একটা সুখ থাকে।
আয়মান মুখ তুলে চেয়ে বললো, কাউকে ঠকিয়ে কেউ জেতে না। নির্দিষ্টি কয়েকটি মুহূর্ত উপভোগ করার জন্য তো তোমার হাত ধরিনি। সেই মানুষটিকেই চেয়েছিলাম যেই মানুষটি আমাকে বুঝবে, আমি পেয়েছিও। আমার সুখের জন্য অন্য কিছুর আর প্রয়োজন নেই।
শুনে আরজুর বুকটা ভরে গেলো। আয়মানকে ঠোঁট-তুলি দিয়ে একটা উষ্ণ পরশ দিয়ে বললো, বাক্যকে শাসন করে বিরাম চিহ্ন। আমাকে শাসন করবে তুমি। মধুর শাসন।
আয়মান না-বোধক মাথা নেড়ে বললো, তোমার আমার মাঝে শাসন বলে কোনো শব্দ আসবে না। আমার মনের সাধনার যোগফল তুমি। তোমার মুখ নিঃসৃত এক একটি বাক্য আমার জীবনের সংলাপ। প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসে, প্রতি ক্ষণে-অনুক্ষণে, প্রতিটি অনুভব-অনুভূতিতে, অবচেতন-চেতন মনে, জীবন বীণার তন্দ্রীতে তুমি শুধু বিরাজ করবে।
আরজু আবেগে উদবেলিত হয়ে বললো, এত ভালোবেসে আমাকে ঋণী করো না। আমি যে তোমার মতো করে তোমাকে ভালোবাসতে পারি না। আমাকে শিখিয়ে দিও ভালোবাসার কৌশল।
আয়মানের ওষ্ঠপ্রান্তে এক মায়াবি হাসি। একবিন্দুও নেই তাতে চাতুরি। তার অনন্য চোখের মৃদু আকর্ষণে আরজুর মনে থাকা দুরাশা বাণের জলে খড়-কুটোর মতো ভেসে গেলো। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো। আরজু এবার বললো, তোমার অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে আমার দোদুল্য মনের দুর্ভাবনা হার মেনেছে। মনের কোণে লুকানো তিলকণা ভুলও ফুল হয়ে ফুটে গিয়েছে। আজ তোমার জন্য এই বেঁচে থাকা, আর তাই বেঁচে থাকাতে এত স্বাদ!
হঠাৎ আরজুর থেকে এক হাত সরে গেলো আয়মান। স্বামীর কথাতে অত বেশি আবেগতাড়িত না হয়ে বললো, আমাকে ভালোবাসার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। খাবার টেবিল মুছে ফেলো, আমি ভাত-তরকারি নিয়ে আসছি।
আরজু হেসে নিয়ে বললো, টেবিল মুছা আমার কাছে কোনো ব্যাপারই না। টেবিল মুছছি, ছোটো-বড়ো হোটেল-রেস্টুরেন্টের সব মেসিয়ার পুরুষই।
চলে যেতে যেতে পিছু ফিরে হেসে আবার চলে গেলো আয়মান। আরজু হাসলো আর ভাবলো, ওরা কেন বলেছিলো বৌ বিরক্তি তৈরির মেশিন? বৌ তো বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ওরা কেন বলেছিলো বৌর উত্যক্তে মাথার কাঁচা চুল দশ দিনে পেকে পনেরো দিনে পড়ে যাবে? কেন বলেছিলো বৌর বিরক্তিতে স্বামী স্ট্রোক পর্যন্তও করে? আমি তো দেখছি বৌ আছে বলেই মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কোষগুলো জাগ্রত হচ্ছে, চিন্তার দরজা খুলে যাচ্ছে।
আয়মান এসে বললো, এবার প্লেট, চামচ, গ্লাস একটু ধুয়ে ফেলো।
সবই আয়মান আদেশের সুরে বলছে, কিন্তু সবই মধুর লাগছে আরজুর কাছে। খাওয়া শেষে আরজু উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে, ময়লা তৈজসপত্র ধুতে টিউবওয়েলের দিকে যেতে গেলেই আয়মান বাধা দিলো। আরজু বললো, তুমি তো প্রতিদিন কাজগুলো করো। আমি কি একদিন সাহায্য করতে পারি না? তবে আমি তোমার কীসের সমব্যথী, সাথি?
আয়মান বাধা দিলো না আর। থালা-বাটি ধুতে গেলেই রিপনের বৌ তা দেখে ফেলেছে। কোনো শব্দটুকুও না করে বাড়ি চলে গেলো।
পরদিন আয়মান ঘরের যত ময়লা কাপড়-চোপড় বের করলো। দুই বালতি ভরে গেলো। এত কাপড়-চোপড় আয়মান কাচবে দেখে আর ভেবে আরজুর খুব কষ্ট লাগলো। আত্মার মানুষটার কষ্ট আত্মাকে কষ্ট দেয়। তাই আরজু নিজেই কাপড়-চোপড় কাচতে মনস্থির করলো। আয়মান বাধা দিলেও আরজু শুনলো না। বললো, কাপড়-চোপড় কাচা কোনো ব্যাপার? এতকাল তো নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই কেচেছি। লন্ড্রীর কাজ তো সব পুরুষরাই করে।
আরজু যে কাপড়-চোপড় কাচছিলো তা দেখে ফেলে আবিরের বৌ। দিন শেষে ইস্ত্রী মেশিন নিয়ে আরজু বসে গেলো কাপড় ইস্ত্রী করতে। আয়মান সন্তুষ্টচিত্তে বললো, সব শিখে রেখেছো দেখি! বৌয়ের এত কাজ করে দিলে বৌ আদর দিতে দিতে তো ফতুর হয়ে যাবে!
আরজু হাসি লুকিয়ে বললো, ইস্ত্রী করা কোনো ব্যাপার! দোকানে দোকানে সব ইস্ত্রীর কাজ তো পুরুষরাই করে!
কাপড় ইস্ত্রী করা দেখে ফেলেছে জাহিদের বৌ। পরদিন লুঙ্গি ছেঁড়া সেলাই করতে বসেছে আরজু। আয়মান বললো, দাও, আমি সেলাই করে দেই। পুরুষ কি সেলাইয়ের কাজ পারে? সুতোর বুনন সুন্দর হবে না।
আরজু না-বোধক মাথা নেড়ে বললো, ঘরে মেয়েরা যতই সেলাইয়ের কাজ করুক, দেশ-বিদেশে সবখানেই টেইলার্সে পুরুষই সর্বোত্তম সেলাইকর্মী।
আরজুর লুঙ্গি সেলাই করা দৃশ্য দেখে ফেলেছে সাইদুরের বৌ। পরদিন চায়ের দোকানে যেতেই মহিন বললো, তুই বাসায় নাকি রান্না করিস? আমার বৌ দেখেছে। বাসায় আমার বৌ এই কাজটিই করতো, এখন তোকে উদাহরণ টেনে আমার বৌ আমাকে রান্না করতে বলছে। তুই একটা মাদী-পুরুষ। সবাইকে মাদী-পুরুষ বানাবি?
আরজুর উত্তর করার আগে আবির বললো, বিয়ের আগে কাপড়-চোপড় ধৌত করেছিস, ভালো। এখন ধৌত করিস কেন? তোর কাপড় কাচা আমার বৌ দেখেছে। এখন সে আমাকে কাপড় কাচতে বাধ্য করছে।
জাহিদ বিরক্ত হয়ে বললো, ও তো কাপড় ইস্ত্রীও করে। ওর কাপড় ইস্ত্রী করা দেখে গতকাল আমার বৌ আমাকে দিয়ে কাপড় ইস্ত্রী করিয়েছে।
সাইদুর খুব রেগে বললো, ও লুঙ্গিও সেলাই করে। আমার বৌ দেখেছে। আমার বৌ আমাকে দিয়ে কবে না জানি কাঁথাও সেলাই করিয়ে নেয়।
রিপন ক্ষিপ্ত হয়ে বললো, ও থালা-বাটিও ধৌত করে। আমার বৌ আমাকে বকেছে আর বলেছে, আরজু ভাইয়ের মতো তো আর থালা-বাটি ধৌও না।
সবাই মিলে আরজুকে ইচ্ছামতো বকলো, গালি দিলো, অপমান করলো। আরজু সবাইকে শান্ত করে বললো, যে বৌ নিজের বাবা-মাকে, ভাই-বোনকে, আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে আমার কাছে এসে সুখ খুঁজছে; আমার পরিবারকে নিজের করে নিচ্ছে, আমি তার হাতের কাজে সাহায্য করবো না?
মাহাবুর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো, বৌ কি জাদু করেছে? এমনিভাবে তোকে খাটাচ্ছে, তোর পুরুষত্বকে অপদলিত করছে, তবুও রাগ করিস না! চোখে কাজল আর কপালে টিপ দেওয়া উচিত তোর।
সাইদুর হেসে বললো, ওর বৌ যদি ওর চোখে কাজল, কপালে টিপ দিয়ে দেয় ও তাও গ্রহণ করবে। কাজল, টিপ গ্রহণ যদি করিস হাতে চুড়িও পরিস, পায়ে নূপুরও পরিস। তুই আর কত নিচে নামাবি সুউচ্চ শিরের প্রতাপ স্বামী জাতিটাকে? পুরুষ মানেই ঝাঁজালো, বীর্যবান। শাণিত তেজীয়ান পুরুষের বৈশিষ্ট্য। তুই একটা মেন্দামার্কা স্বামী।
কথাগুলো শুনে আরজুর মন খারাপ হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবলো, বৌকে সাহায্য করা অন্যায়? ঘরের সব কাজ বৌ করবে? ঘরের কাজ করলে পুরুষের পৌরুষ জলাঞ্জলি হয়?
ভাবতে ভাবতে বাজারটা সেরে বাড়ি এলো। ফিরতে দেরি হওয়াতে আয়মান বললো, রাত করে মাছ এনেছো। যাও, মাছ কুঁটে পরিষ্কার করো।
কথাটি আরজুর কোথায় গিয়ে যেন বাঁধলো ও বিঁধলো। বললো, বাজার করার দায়িত্ব আমার, মাছ-তরকারি কুঁটার দায়িত্ব তোমার।
আয়মান রাগ দেখিয়ে বললো, এত রাতে আমি মাছ কুঁটবো না। সময়জ্ঞান থাকতে তো হবে।
ঘরে চলে গেলো আয়মান। আরজু বেশক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একবার মাছ একবার তরকারির দিকে তাকিয়ে থেকে মাছ কুঁটতে লেগে গেলো। পেছন দিয়ে আয়মান এসে সবজি কুটতে লাগলো আর বললো, তোমার উপরে রাগ করে থাকা যায় না। রাগ চলে গিয়েছে, যাও আমি কুঁটছি।
আয়মানের দিকে তাকিয়ে আরজু ভুলে গেলো সব দ্বেষ-ক্ষোভ। তবুও বললো, চাপ দাও কেন আমায়? বাইরে শত চাপ সহ্য করি, আমি তো তোমার কাছে প্রশান্তি খুঁজি।
আয়মান বললো, তোমার তিন ঘণ্টা আগে আসার কথা। এতক্ষণে আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে যেতো। যাও, মাছ ধুয়ে আনো।
আরজু বললো, মাছ ধুয়ে আনবো মানে? কুঁটে দিয়েছি এই বেশি।
আয়মান বললো, কানের কাছে গুণগুণিয়ে অনেক বলেছো পড়াশোনাকালীন রান্না-বান্না করে খেয়েছো। যাও, মাছ ধুয়ে আনো।
আরজু মাছ ধুতে যেতে বাধ্য হলো। মাছ ধুতে ধুতে গান ধরলো, সংসার আমার ভাল্ লাগে না, সংসার বিষে মরি…
শুনে আয়মান হাসতে থাকে। রান্না শুরু করলো ও। আর কেঁকিয়ে বললো, তুমি কইগো? পানি আনো।
আরজু খুব বিরক্তিভরে পানি এনে দিয়ে বললো, আমাকে আর কিছু আনতে বলবে না। আমাকে বসতে দেখলে তোমার ভালো লাগে না!
আয়মান চামচটা আরজুকে ধরিয়ে দিয়ে বললো, তরকারি নাড়তে থাকো, ঘেমে গিয়েছি, একটু বাতাস খেয়ে আসি।
আয়মান সত্য সত্য রান্না ফেলে চলে গেলো। বাধ্য হয়ে তরকারি নাড়তে ব্যস্ত হলো আরজু। মাঝে দুই বার উঁকি মেরে দেখে গিয়েছে আয়মান। তৃতীয় বার আর উঁকি মেরে গেলো না। পেছন থেকে আরজুকে জড়িয়ে ধরে বললো, তোমার রান্না খুব সুস্বাদু। পরিবেশন করেও খাওয়াবে।
আরজু বিরক্তির স্বরে বললো, ছাড়ো তো। শরীরে ঘাম। ঘাম শরীরে এভাবে কেউ জড়ায়?
আয়মান কথা শুনলো না। বললো, মনে মনে আমাকে বকা দিচ্ছো, না?
আরজু অন্যমনস্ক হয়েই জবাব দিলো, আমি কি কখনো তোমাকে বকেছি? আমি কি তোমাকে বকতে পারি? তবে তুমি যে আমার উপর রুষ্ট এটা পরিষ্কার। নতুবা এত খাটাচ্ছো কেন?
আয়মান আদরমাখা কণ্ঠে বললো, গালে তুলে খাওয়ায়ে দেবে।
আরজু রাগতস্বরে বললো, বাজার করবো, তরকারি কুঁটবো, রান্না করবো, গালে তুলে খাওয়ায়ে দেবো। পেয়েছো কী? সরে যাও। খুব রাগ হচ্ছে, ছাড়ো!
আয়মান আরজুর পিঠে প্রেমদাগ এঁকে দিয়ে বললো, খাওয়া শেষে থালা-বাটিও ধুয়ে দেবে।
রান্না ফেলে আরজু দুপদাপ পা ফেলে চলে গেলো। আয়মান স্বর বাড়িয়ে বললো, টেবিলটা মুছে রাখো।
আরজু ফিরে এসে রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, টেবিল মুছবো মানে?
আয়মান বললো, তুমিই তো বলেছো, ছোটো-বড়ো সব হোটেল-রেস্টুরেন্টের মেসিয়ার পুরুষ। যাও, কথা না বলে টেবিল মুছো, যেতে-আসতে মেঝেটাও নোংরা হয়ে গিয়েছে। মেঝেটাও মুছে ফেলো।
আরজু বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে চলে গেলো। খাওয়ার সময় আয়মান প্লেট নিয়ে বসে বললো, চামচ ধরো, ভাত দাও, তরকারি দাও, গ্লাসে পানি ঢালো।
আরজু বিরক্তস্বরে বললো, এত অত্যাচার কোনো একদিন সহ্যের বাইরে চলে যাবে।
আয়মান দৃঢ়মনে বললো, অত্যাচার মানে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছো। হলে থেকেছো। ডাইনিংয়ে খেয়েছো। বলেছো, আঙ্কেলরা তরকারি কোঁটেন, রান্না করেন, পরিবেশন করেন। দেখে দেখে বড়ো হয়েছো। এপ্লাই করো।
আরজু শুনে চামচ ছুঁড়ে মেরে ঘরে চলে গেলো। ভাত, তরকারি নিয়ে আয়মান বেডরুমে এলো। একবার গালে ভাত তুলে দিতে গেলো, আরজু হাত সরিয়ে দিলো। দ্বিতীয় বার গালে তুলে দিতে গেলো, আরজু এবারও হাত সরিয়ে দিলো।
তখন আয়মান বললো, তোমাকে দুই একটা ঘরের কাজ করতে বলি ভালোবাসার অধিকার থেকে, আর তুমি রাগ করো সম্পূর্ণ হিংসা থেকে।
বলে আয়মান উঠে যাচ্ছিলো। আরজু তার হাত ধরে থামালো আর ভাত খাওয়ার জন্য হা করলো। আয়মান হেসে একগাল ভাত তুলে দিয়ে বললো, দারুণ না? তোমার রান্না।
আরজু খেয়ে বললো, হ্যাঁ দারুণ। তবে আমার রান্না বলে না, তুমি গালে তুলে খাওয়ায়ে দিচ্ছো তাই।
আয়মান ভালো সেলাইয়ের কাজ পারে। আপন মাধুরী মিশিয়ে রুমালে আল্পনা এঁকে সেলাই করে সেই রুমাল আরজুকে দিয়েছে। রুমাল ব্যবহার করার অভ্যাস না থাকা সত্ত্বেও আরজু এখন পকেটে রুমাল রাখে। মানুষের সামনে রুমাল বের করে না, তবে যখনই একা থাকে রুমাল বের করে নির্বাক চোখে আয়মানের নিপুণ সেলাই কর্ম দেখে। ওদিন আয়মান কাঁথা সেলাই করছিলো। আরজু একটা শার্ট এনে বললো, একটা বোতাম ঢিল হয়ে গিয়েছে। কখন ছিঁড়ে পড়ে যাবে। সেলাই করে দাও তো।
আয়মান সুচ-সুতা আরজুর হাতে দিয়ে বললো, নিজের কাজ নিজে করাতেই বেশি আনন্দ। তাছাড়া তুমি সেলাই পারো। নাও, সেলাই করো।
আরজু রেগে গিয়ে বললো, সেলাই করবো মানে? সেলাই কি আমার কাজ?
আয়মান নির্ভারচিত্তে বললো, তুমিই বলেছো ছোটো-বড়ো সব টেইলার্সের সেলাইকর্মী পুরুষ। সুচ-সুতা ধরো, কথা কম।
আরজু সুচ-সুতা দিয়ে শার্টের বোতাম সেলাই করতে লাগলো। আয়মান আরজুর কাঁধে চিবুক ঠেকিয়ে বললো, সেলাই পারো। তা আমার উপর অত নির্ভর করো কেন?
আরজু বললো, সবই পারি। শুধু পারি না তোমার সাথে। তুমি আমাকে যেভাবে খাটাচ্ছো রীতিমত স্বামী নির্যাতন। প্রকৃত পুরুষ পুরুষ নির্যাতন কখনো মেনে নেবে না।
আয়মান আরজুর গলা দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো, ভালোবাসি না?
আরজু বললো, ঘরে ঘরে স্বামী নির্যাতিত, কেউ কেউ ভালোবেসে ভুলিয়ে ভালিয়ে নির্যাতন করছে, কেউ কেউ শাসন বা তীর্যক বাণে নির্যাতন করছে। আগে বিশ্বাসই করতাম না।
সেলাইকর্মটি শেষ না হতেই এবার আয়মান বললো, এবার কাঁথা সেলাই করো। কাঁথা কী আমি একা গায়ে দেবো? সেলাই করে আমার তোমার নাম লেখো। আমার জন্য তোমার উপহার।
একথা শুনে আরজু গরম চোখে আয়মানের দিকে চেয়ে থাকলো। আয়মান না ডরিয়ে বললো, চোখ গরম দিচ্ছো কেন? বলিহারি রাতে তুমিই বলেছিলে আমরা আমাদের কাজ ভাগে-যোগে, মিলেমিশে করবো।
আরজু কাঁথা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। এত রাগ জীবনে কখনো ওর ওঠেনি।
পরদিন সকালে কাপড়-চোপড় বালতি মাঝে রেখে বললো, কাচবে না?
আরজু মনে মনে ভাবলো, আয়মান তো রীতিমত নির্যাতন শুরু করেছে।
তীর্যক চোখে চেয়ে আরজু উচ্চারণ করে বললো, কাপড় কাচবো মানে? আমি চুড়ি পরা পুরুষ?
আয়মান বললো, কথা কম, কাজ বেশি। তুমিই বলেছো, লন্ড্রীর সব কর্মী পুরুষ।
আরজু তদাপেক্ষা রেগে বললো, কাপড়-চোপড় কাচা আমার কাজ?
আয়মান বললো, তুমিই বলেছো, কোনো কাজ ঘৃণা করা উচিত না। কার না কার কাজ না ভেবে কাজে মন দাও। সব কাজ সমান।
আরজু ফুঁসতে ফুঁসতে কাপড়-চোপড়ের বালতি নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো। আর গান ধরলো, বৌয়ের জ্বালায় ইচ্ছে করে গাড়ির নিচে মারি ঝাপ, কেন যে বিয়ে করলাম বাপরে বাপ…
হাসতে হাসতে পেছনে এসে দাঁড়ালো আয়মান। আরজু দেখে বললো, চোখের সামনে থেকে যাও, তোমাকে সহ্য হচ্ছে না।
আয়মান কর্ণপাত না করে বললো, জামার কলার আর হাতা ভালো করে ঘঁষো।
আরজু বললো, শিখাতে হবে না। নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই কেচেছি। ভেবেছিলাম, বিয়ে করেছি এসব থেকে বাঁচবো। আসলে কাজ কখনো কমে না, বাড়েই।
আয়মান বললো, তোমরা পুরুষরা বিয়ে করো অনেক কিছু থেকে বাঁচবে বলে। এ চিন্তাটা দূষিত। কাপড় শুকাবে নেড়েনেড়ে। ইস্ত্রী করবে। তুমিই বলেছো, দোকানে দোকানে যারাই ইস্ত্রী করে সব পুরুষ।
আরজু রেগে গেলেও নিজেকে শান্ত রাখলো। চায়ের দোকানে গেলেও বৌয়ের বদনাম ঢেকে গুণগান করে কটাক্ষ ভোজনের ভয়ে। একা একা ও ভাবলো, নিজের বলা বুলিতে নিজেই আটকে যাচ্ছি। ঘরের কাজ করলে বাইরে সম্মানহানী হচ্ছে। বাইরে অপমানিত হচ্ছি, ঘরেও সহ্য হচ্ছে না। আয়মান অর্থনৈতিক চাপ দেয় না, বাবা-মায়ের আভিজাত্য প্রকাশ করে না। কিন্তু তাও তাকে সহ্য হচ্ছে না। না জানি কোন মূহুর্তে কোন কাজ করতে বলে বসে। বিশ্রাম নিলে ডেকে তুলে কাজ ধরিয়ে দিচ্ছে। এক কাজ করতে বলে, সে কাজ শেষ না হতেই অন্য কাজে যেতে বলছে। বেশ মুশকিলে পড়লাম যে!
ঘরের কথা বাইরে না বললেও বন্ধুরা কেমন করে যেন ধরে ফেলে। মহিন রেগে চোখ বড়ো বড়ো করে বললো, বানর খেলায় যে লোক সে তার বানরদের জীবদ্দশায় যত না নাচায় তোর বৌ তারচেয়ে তোকে বেশি নাচাবে। বৌকে দিয়েছিস প্রশ্রয়। ওরা প্রশ্রয়ের মানে বোঝে? কিল-লাথির উপর রেখেও তাই দমাতে পারি না।
আরজু বললো, কীভাবে বুঝলি আমার বৌ আমাকে নাচাচ্ছে? সংসারে তোরাই আগুন জ্বালাচ্ছিস। দোষ দিচ্ছিস বৌয়ের। বনের দাবানল নিভলেও তোদের সংসারের দাবানল নিভবে না। বাড়ি যাবার সময় মাত্র দশ টাকার বাদাম নিয়ে যাবো, আমার বৌ দশ লক্ষ টাকার স্বর্ণালঙ্কারের চেয়েও বেশি খুশি হবে। অসহযোগী হলে সুখ পাবি না।
চাপা মেরে আরজু বাড়ি এলো। আগের মতো সব বিষয়ে অতি আগ্রহ দেখায় না। আয়মান তা লক্ষ্য করে। তাই বললো, ইদানীং তোমাকে উদাসীন লাগছে। নিষ্প্রাণ আর স্পন্দনহীন দেখাচ্ছে। মন খারাপ করে থাকো কেন? তোমার মন খারাপ থাকলে আমার কি ভালো লাগে?
আরজু নিষ্প্রভতার কারণ এড়িয়ে জবাব দিলো, তুমি যে এত ভালোবাসো আমায় এতকাল মানুষ সহ্য করতে পারতো না, এখন আমি সহ্য করতে পারছি না। আমাকে এত ভালোবাসো কেন?
আরজুর ক্ষোভের উত্তরে আয়মান বললো, তুমি তো আর দশটা পুরুষের মতো আমাকে দাসি করে রাখোনি। সংসারের আবর্জনা ভেবে ঘরের কোণে ফেলে রাখোনি। বৌয়ের বুদ্ধিকে তো তুমি গাধার বুদ্ধি ভাবো না। বৌকে সাথে রাখো সংসারের উন্নয়নের অন্যতম সঙ্গী হিসেবে। অন্যদের মতো বৌ সন্তান উৎপাদনের ফ্যাক্টরি সে হীনজ্ঞান তোমার নেই। শুধু উষ্ণতা প্রাপ্তির জন্য বৌর কাছে আসো না; ভালোবাসো, সম্মান করো। চোখে চোখে রাখো, মনের চাহিদা বোঝো। তুমি ভালোবাসার যোগ্য, আমি সারাক্ষণ ভাবী তোমাকে কত উপায়ে ভালোবাসবো। কত উপায়ে তোমার মন রাঙাবো। তোমাকে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়েও আমি তৃপ্ত না। তোমাকে ভালোবেসে মন ভরে না। তোমাকে সংসারের টুকটাক কাজ করতে বলি তা নিতান্ত মনের খেয়ালে, অন্য রকম ভালোবাসা থেকে। আমি তো জানি পেশা জীবনে তুমি কত কষ্ট করো, আমি তো সেসব কাজে তোমার সঙ্গী হতে পারি না। বাড়ির দুই চারটে ছোটো ছোটো কাজ তোমাকে আর করতে দেবো না। আমি বুঝতে পারছি এতে তুমি বন্ধু সমাজে, বন্ধুদের বৌদের মাঝে ছোটো হচ্ছো, অসম্মানিত হচ্ছো। তোমার সম্মান রক্ষা করা আমার প্রথম কাজ। দয়া করে তুমি আমার উপর রাগ করো না। তুমি যদি আমার উপর রাগ করো, আমি তবে বাঁচি কী করে!
আরজু নির্বাক হয়ে গেলো কথাগুলো শুনে। নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। আবেগে গদগদ হয়ে বললো, তুমি সম্মুখে থাকলেই সুখ পাই, তুমি আছো ঘরময়, ঘর জুড়ে তোমার পদধ্বনি আমার ব্যাখ্যাতীত ভালো লাগা। তুমি এ ঘর ও ঘর কাজ করো, কাজের ব্যস্ততায় আমায় না দেখার ভান করো, আমার দৃষ্টিতে সব ধরা পড়ে। তুমি আছো তাই আমাদের ঘর-বাইর পরিচ্ছন্ন, তুমি নিশ্চিন্ত রেখেছো, নির্ভরতায় থাকি তাই। একমাত্র তোমাতেই আমার যত লাভ, একমাত্র তোমাতেই আমার যত লোভ, একমাত্র তোমাতেই আমার যত মোহ, একমাত্র তোমাতেই আমার যত নেশা। প্রস্তুতি নিয়ে আমি তোমায় দেখি, খুব করে দেখি আমি, খুব করে ভাবী। ভাবী সুন্দর তুমি, ভারি মিষ্টি তোমার মমতা। যত না ভাবিনি, তুমি তার চেয়ে বেশি ভালো, ভাবনার পরিসীমা দিয়েছো বাড়িয়ে। কেউ এতটা আপন হবে, কেউ এতটা আপন করবে, কাউকে এতটা আপন করে পাবো ভাবনাতেও ছিলো না। শুধু তোমার জন্য আমার সব কিছুতেই ভালো লাগা, সব কিছুতেই সফলতা। সব কিছুই রঙিন, সব কিছুই রংময়, বাঙময়, চিন্ময়, হিরন্ময়। সুখপাখি হয়ে এভাবে উড়ো, আমার বুক জমিনটা সম্পূর্ণই তোমার।
আয়মান আরজুর চোখ বরাবর চেয়ে বললো, পুরুষ তো কখনো এতটা দরদি পুরুষ হয় না, পুরুষ তো কখনো এতটা প্রেমিক পুরুষও হয় না। বুক-পিঠ প্রাচীর করে সব দায়িত্বের ঝঞ্ঝা একা থেকালেও ভালোবাসাটা অপ্রকাশই রাখে। হাত দুটো শক্ত আর কড়া পড়া হলেও যত্ন-আত্তিতে কত না নরম আর কোমল। শুনেছি পুরুষের মন শক্ত, অথচ তুমি কত অনায়াসেই তোমার বুকে আমার ঠাঁই দাও; জেনেছি নানা প্রলোভন দেখিয়ে পুরুষ নারীর সান্নিধ্যে আসে, প্রয়োজনটুকুর পর অপ্রয়োজনীয় করে দূরে রাখে। অথচ তুমি কত সুন্দর, স্পর্শে আসো, স্পর্শে ডাকো, স্পর্শে রাখো, স্বপ্ন দেখাও, স্বপ্নের সারথি করে ধরে রাখো, আদরে রাখো, নজরে রাখো, মনেতে গেঁথে রাখো, মনের কথা শোনো। প্রয়োজনটুকুর জন্য উষ্ণ করো না, প্রয়োজনীয় করে রাখো, কখনোই হেয় করো না, অপ্রয়োজনীয় ভাবো না, অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাবো। মন-মননে তুমি অনেক উঁচু, সুস্থ চিন্তার মানুষ তুমি। তোমাকে পেয়ে আমি ঠকিনি। তোমাকে ভালোবেসেও আমি কোনোদিন ঠকবো না। মৃত্যু অবধি তোমার সান্নিধ্যে থেকেও আমি ঠকবো না। যত বেশি ভালোবাসার পর আর ভালোবাসা যায় না, আমি তার থেকেও তোমাকে ভালোবাসি।
আয়মানের কথা শুনে আরজুর চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন হয়ে গেলো। কিন্তু তৎক্ষণাৎ রূপ বদলে হাসতে হাসতে আয়মান বললো, গাছের পাতা পড়ে উঠান দেখো ময়লা হয়ে আছে, উঠানটা ঝাড়ু দাও।
কথাটি শুনে রাগ হলেও আরজু সে কথাতে কর্ণপাত না করে দোকানে গেলো। দোকানের এক পাশে বসে চা খেতে লাগলো। মহিন লক্ষ্য করে বললো, কি মন খারাপ? এক কোণে বসলি যে!
আরজুকে উত্তর দিতে না দিয়ে সজীব বললো, বৌ ঘরে। মন ভালো থাকার প্রশ্নই আসে না। ভালোবাসার সম্পর্কগুলোতে একবিন্দুও আর ভালোবাসা নেই এখন। শূন্যতা অনুভব হৃদয়ের মানুষটিকে পাওয়ার পরও পূর্ণতা পায় নারে! প্রিয় পেয়ে মুগ্ধ হবি সেই প্রিয় আর নেই জগতে। যতই ভালোবাসা দিস, পাবি না কোনোক্রমেই হৃদয় কোঠরে। যতই মুখে বলিস ভালো আছি ভালো আছি, ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছাই। তোর বিবাহে সবাই বাধা দিয়েছিলাম। বোঝ্ এবার বিবাহের জ্বালা। দিল্লিকা লাড্ডু, না খাইলেও পস্তাবেন, খাইলেও পস্তাবেন।
আরজু এবার জবাব দিলো, বৌ দিল্লিকা লাড্ডু নয়, না খাওয়ারও কিছু নেই, খাওয়ারও কিছু নেই। বৌ হৃদয়ের কাছ ঘেঁষে থাকা হৃদয়ের খোরাক। বৌ অন্তরে বাস করা ছোট্ট পাখি, বৌ অন্তর, অন্তরের মানুষ। বৌ মনের প্রশান্তির রসদ, বাঁচার অন্য নাম। বৌকে শাসন করলে বৌ শাসন করবে। বৌয়ের শাসন খুব মিষ্টি না। বৌকে ভালোবাসতে হয়, বৌ ভালোবাসা পাওয়ার কাঙাল। বৌকে যতটুকু ভালোবাসবি, ততোধিক বৌ ভালোবাসা প্রতিদানে দেবে। বৌকে অবজ্ঞা করলে বৌ অবজ্ঞা করবে। বৌয়ের অবজ্ঞার ওজন অনেক। বৌকে গাধার মতো খাটানোর অর্থ নেই, বৌকে গাধার মতো খাটালে বৌ গাধার মতো খাটাবে। বৌ গাধার মতো খাটালে মাজা আর উঁচু হবে না। বৌকে সময় দিতে হয়, বৌ সময় চায়, সময় চায়ের দোকানে দিলে সময় হাত থেকে চলে যাবে। বৌকে সময় দিলে সংসার মধুর হবে, তখন চায়ের দোকানে আসতেও ইচ্ছা করবে না। বৌয়ের কাজে সাহায্য করা মানে বৌকেই সাহায্য করা না, নিজের সংসারকেও টানা। বৌয়ের সাথে মিলেমিশে থাকলে বৌয়ের আঁচল তলে থাকা বলা ঠিক না, বৌর সাথে যদি শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি না করতে পারিস, সংসারের মধ্যে যদি শান্তি আনয়ন না করতে পারিস, পৃথিবীর এত এত সুখ কোনো প্রশান্তি দেবে না।
আরজুর টানা কথা বলা দেখে মহিনসহ অন্যান্যরাও চুপ হয়ে গেলো। আরজু চা খেয়ে বাড়ি চলে এলো। আয়মানকে নিজের ভেতরে জমা ক্ষোভ বিলীনের জন্য বললো, আমার বন্ধুগুলো সংসারে খুব অশান্তিতে। বৌদের সহ্যই করতে পারে না। তোমার আমার মিলও ওরা সহ্য করতে পারে না।
আয়মান বুদ্ধি দিলো, বললো, বন্ধুদের সাথে বৌর প্রশংসা করবে না। বৌর প্রশংসা শুধু বন্ধুরা নয়, পৃথিবীর কেউ সহ্য করতে পারে না। তোমার বন্ধুরা তাঁদের বৌকে চায়ের দোকানে যেভাবে উপস্থাপন করে তুমিও আমাকে ঠিক তেমনি করে তাঁদের সামনে উপস্থাপন করবে। দেখবে তোমার বন্ধুরা আগের মতো আবার তোমার সাথে সুন্দর ব্যবহার করছেন। এই সমাজ এমন, যে যত তার বৌকে শাসন-দমন করতে পারবে সেই তত সুপুরুষ। কালকে গিয়ে বন্ধুদের বলবে বৌকে কনুই দিয়ে মেরেছি। আর বলবে, বৌ বেকুবই, বৌর বুদ্ধি হাঁটুতেই, বৌ বাড়তি ভারবোঝা, বৌ যন্ত্রণা তৈরির ফ্যাক্টরিই, বৌ ঝগড়াটেই, বৌ কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানরই করে, বৌর অত্যাচারে কাঁচা চুলে পাকই ধরে, বৌয়ের কাজ আবার কাজ হলো, বৌয়ের কাজের কোনো মূল্যই নেই, সংসারের কাজ আবার কাজ হলো!
আয়মানকে থামালো আরজু। আর বললো, শিরধার্য। এখন বলো ঘর ঝাড়ু দেবো, না টেবিল মুছবো, না থালা-বাটি ধৌত করবো, না…
আয়মান আরজুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো, ঘরের কাজ করবে, পর যেন না জানে। যা করবে জানালা-দরজা বন্ধ করে…
জানালা-দরজা বন্ধের কথা বলেই আয়মান লজ্জায় জিহ্বা কাটলো। আরজু আয়মানের কাছে সরে এলো। আয়মান আদেশের সুরে বললো, কাছে আসবে না। ঘোরো।
আরজু ঘুরতেই আয়মান আরজুর গলা জড়িয়ে পিঠে চড়ে বসে বললো, বৌ তো বাদর। পিঠে চড়বে, মাথায় উঠবে। এখন আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে চলো।
আরজু বললো, তুমি জীবনে এসেছো বলেই আমি ভালোবাসা বুঝতে শিখেছি। এভাবে তোমায় নিয়ে চলবো আমি হাজার বছর হাজার মাইল জীবনের পথ।
আয়মান নেমে আরজুর হাত ধরে বললো, সহযাত্রী ঘাড়ে চড়ে না, সমব্যথী ঘাড়ে চড়ে না। স্বামীর ঘাড়ে চড়ে হাজার বছর হাজার মাইল চলা যায় না। স্বামীর হাত ধরে পাশাপাশি হাজার বছর হাজার মাইল চলা সম্ভব। যে সত্যিকারেই ভালোবাসে সে কখনো লাভ দেখে না, টাকা-পয়সা খোঁজে না, ভারবোঝা হয় না। সুন্দর একটা মন আর সুন্দর একটা মনের মানুষ মনে বিরাজ থাকলে আর কিচ্ছু লাগে না।
আরজু বললো, তুমি অনেক জ্ঞানী, জানো অনেক। তোমাতে আমার মুগ্ধতার শেষ নেই।
আয়মান বললো, মানুষ তো তখনই মুগ্ধ হয় যখন মুগ্ধ নয়নে চায়। জোরাজুরি, পীড়াপীড়ি, বলপ্রদর্শন, ক্ষিপ্রতা, দমন-শাসন সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। তোমার আমার সম্পর্ক একটা শিল্প, একটা সৌন্দর্য। সুখের জন্য তো অঢেল কিছু দরকার না, দরকার হয় এক চিমটি হলেও ভালোবাসা। এক চিমটি ভালোবাসা দিয়েও সুখ পাওয়া যায় যদি সে ভালোবাসাটা খাঁটি হয়।
তখন রিপন এসে হাঁক দিলো, স্যার, আপনি কই? ডিমে তা দিচ্ছেন?
বন্ধু যখন নাম না ধরে ডেকে স্যার ডাকে আর তুই স্থলে আপনি বলে তখন বোঝায় যায় ইচ্ছাপূর্বক অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই নয়। আরজু বাইরে এসে বললো, আরে দূর ডিমে তা দেবো কেন? আজ ভেবেছি, বৌ জ্বালালেই পিটাবো, বাড়তি কথা বললেই পিটাবো, পাশের বাড়ির কারও সাথে ঝগড়া করলেই পিটাবো, জ্ঞান দিতে গেলেই পিটাবো, সক্ষমতা নিয়ে কথা বললেই পিটাবো, অতি অভিরুচি দেখালেই পিটাবো, রান্না করতে দেরি করলেই পিটাবো, খেতে দিতে দেরি করলেই পিটাবো, ঘুরতে নিয়ে যাও বায়না ধরলেই পিটাবো।
রিপন খুব খুশি হলো আরজুর আজকের কথা শুনে। সে আরজুর সাথে করমর্দন করে বললো, এত দিনে তোর মুখে বীরপুরুষের মতো কথা শোনা গেলো।
আর ধীরস্বরে বললো, শোন্, স্বামীকে প্রেমিক হলে চলে না, স্বামী কামুকের মতো কাম সেরেই স্ত্রীকে পাঁচ হাত দূরে সরিয়ে রাখবে।
এ কথা বলে রিপন আরজুকে বুকে চেপে ধরে সান্ত্বনা খুঁজলো। নিজ ঘরে অশান্তিতে বাস করা মানুষ অন্যের ঘরে একই রকম অশান্তি দেখলে তাকে সমব্যথী ভেবে বুকে টেনে কী সুন্দর সান্ত্বনার আশ্রয় খোঁজে! বৌ-শাসিত নতুন কেউ বৌ-শাসিত দলে ভিড়লে বৌ-শাসিতদের মনে কী যে দক্ষিণা পবন বয় বলা দুষ্কর।
টাকা ধার চাইতে এসে ধার করার কথা আনন্দের কারণে রিপন ভুলেই গেলো। সে দ্রুত দোকানে গেলো। আর আরজু ঘরে এলো। আরজুকে শাবাশ বলে আয়মান বললো, অভিনয় সুদক্ষতার সাথে করেছো। পাকা অভিনেতা যেন তুমি। পাক্কা।
আরজু বললো, তোমায় নিয়ে খারাপ কথা বলতেই দেখলে ও কী খুশি হলো! লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ঘর করে, কিন্তু ঘরের মানুষটিকে অগুরুত্বপূর্ণ ভেবে ঘরকে নরক করে তুলেছে ওরা। ঘর হয়, ঘরনিও হয়, ওদের সুখ আর হয় না।
বৌ দ্বারা জ্বালাতনে অতিষ্ঠ আরজু, একথা রিপন বন্ধু সমাজে জানিয়ে দিলো। ঘোলা জল খেয়ে তাদের বন্ধু তাদের মাঝে ফিরে আসছে একথা কেউ কেউ বিশ্বাস করলেও কেউ কেউ করলো না। আরজু আসতেই সুমন বললো, তুই বৌয়ের পেছন ছাড়া পুরুষ না। বৌর বুদ্ধিতে চলা মানুষ তুই। নিশ্চয় তোর বৌ বলেছে, বন্ধুদের কাছে বৌর বদনাম করবে, বন্ধুরা তবে তোমাকে সাদরে গ্রহণ করবে। মাহাবুর, আরজুকে খবরদার আমাদের দলে নেওয়া ঠিক হবে না।
মাহাবুর বললো, আমি জানি ও বৌর কথায় উঠে, বৌর কথায় বসে। বৌকে ভয় পায়, বৌর গরম খায়, বৌর দাসত্ব করে। ও বৌ ভক্ত, পুরুষ নামের কলঙ্ক।
আরজু কিছু বলতে চাচ্ছিলো। স্বজল, জাহিদ দুইজন মিলে ওকে কোনো কথায় বলতে দিলো না। আরজু বন্ধু সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাড়ি এলো। বাড়িতে আরজুকে দেখতেই আয়মান বললো, কোথায় যাও, বলে যাও না কেন? আমার শাড়ি, শায়া, ব্লাউজ শুকাতে দেওয়া আছে ছাদে, নিয়ে এসো তো।
কথাটি শুনতেই আরজুর রাগ হয়ে গেলো। হাতে ছিলো ডিমের থলি। ছুঁড়ে মেরে আবার দোকানে গেলো। জাহিদ দেখে বললো, ও মনে হয় সত্যিই বাড়ি আর টিকতে পারছে না। ওকে দলে নিয়েই নিই।
স্বজল প্রতিবাদ করে বললো, ও পর্যবেক্ষণে থাকবে, দেখি সত্যিই অত্যাচারিত হচ্ছে কিনা! অত্যাচারিত হলে তার মাত্রা মৃদু, না তীব্র তাও জানা দরকার। ও অত্যাচার মেনেই নেবে, না সহ্য করবে না তাও বুঝতে হবে।
আরজু সবাইকে কষ্ট করে থামিয়ে বললো, দেখ্, তোরা সংসারে শুধু শাসিত হচ্ছিস। আমি শাসিতও হচ্ছি, ভালোবাসাও পাচ্ছি। অমৃতে ভেসে যাচ্ছি, তো গরলে ডুবে যাচ্ছি। না মধু, না বিষ; না মানতে পারছি, না দূরে ঠেলতে পারছি। অন্ধ পতঙ্গের মতো ঘুরপাক খাচ্ছি, না পাচ্ছি কূল, না পারছি শূল জ্বালা সয়তে, সেই জ্বালা না চাচ্ছিস তোরা শুনতে, না পারছি বুকে চেপে রাখতে।
বান্না কটাক্ষ হেসে বললো, ও আচ্ছা, বৌ দ্বারা যত হচ্ছিস প্রভাবিত, তত হচ্ছিস প্রতারিত!
আবির বিজ্ঞজনের মতো করে বললো, গলার কাঁটা, না যায় ফেলা, না যায় জ্বালা সওয়া।
মহিন নড়ে চড়ে বসে তীর্যক চোখে চেয়ে কটাক্ষের গুঁড়ো মিশিয়ে বললো, রূপমাধুর্যে হচ্ছিস বিভোর, কথাচাতুর্যে কাটছে ঘোর। না পাচ্ছিস রাস্তা, না পাচ্ছিস পালাতে।
আরজু বললো, যত না দেয় রাগ উঠিয়ে, তারচেয়ে বেশি দেয় মন ভরিয়ে; মন তার রসদ পেলে রাগ যায় ভুলে। যত না দেয় জ্বালা, তারচেয়ে বেশি দেয় মায়া, মায়া পেলে জ্বালা যাই ভুলে। অম্ল-মধুর এই সম্পর্ক না পারি প্রত্যাখ্যান করতে, না পারি আশ্বাদন করতে।
বান্না বললো, বৌর হাতে নির্যাতিত হলেও থাকছিস হয়ে প্রিত, বৌ-জালে ধৃত তুই ইচ্ছাকৃত, বৌয়ের আঁচল আবৃত তুই, তুই একটা মৃত।
সাইদুর বললো, বুঝেছি, শাসন করতে গিয়ে সোহাগ দিয়ে ফেলছিস; সোহাগ দিতে গিয়ে ছোবল খেয়ে বসছিস। হাত তুলিস মারতে, সে হাত দিয়ে ফেলে আদর। আর আদর দিতে গেলেই হাত হচ্ছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। তোর পাওয়ার আকুলতা প্রবল, তাই হারানোর ভয়ও প্রবল। উপসংহার, তুই বৌ ভক্ত।
বন্ধুরা মিলে আরজুকে দোকান থেকে আবারও বিতাড়িত করে দিলো। বৌ-শাসিত দলে একটি মাত্র বৌ-শাসিত প্রাণীর ঠাঁই হলো না।
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ থেকে