| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌমেন দেবনাথ-এর ছোটগল্প ‘শ্রেয়াঙ্কা’

Reporter
সৌমেন দেবনাথ / ৬৭৫ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৩

সেই হঠাৎ দেখা, হঠাৎ দেখে চমকে যাওয়া; তারপর তার পেছনে লেগে থাকা তার অগোচরে। তাকে ঘিরে ভাবতে থাকা, তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখা, তাকে পাওয়ার ভেতর থেকে প্রবল তৃষ্ণা জাগা নিত্য দিনের ঘটনার মতো। প্রেমে পড়ার জন্য অনন্তকালের প্রয়োজন নেই, একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। সেদিনের পর থেকে শ্রেয়াঙ্কা কখন কলেজে যায়, কখন ফেরে, কে তার বন্ধু, কে তার বান্ধবী সব মুখস্ত হয়ে যায় ঐষিকের। শেয়াঙ্কা শ্রেয় নয় আর পাঁচজন থেকে, কিন্তু আর পাঁচজন থেকে আলাদা। একটু শান্ত প্রকৃতির বলে চোখ আলাদা করে চলে যায়। সভ্যে আর শালীনতায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে বলে ভালো লাগাটা তার দিকেই ধাবিত হয়। তাছাড়া কে যে কার চোখে বিশেষ হয়ে ধরা দেবে কেউ তো তা বলতে পারে না। শ্রেয়াঙ্কাকে লুকিয়ে দেখা এখন তার নিয়মিত রুটিনের অংশ। শ্রেয়াঙ্কার হাসি তার হাসির কারণ, শ্রেয়াঙ্কার উচ্ছলতা তার উচ্ছলতার কারণ। যার সাথে হলো না পরিচয় সেই হয়ে গিয়েছে হৃদয়ের একাংশ। যাকে দেখলেই হৃদয়ে মায়া জাগে, নিশ্চয় সে ভালো হৃদয়ের। ছায়া হাঁটে মানুষের পিছনে, মানুষ হাঁটে মায়ার পিছনে। কিন্তু এই অনুসরণ কখনো কি দেবে সফলতা?

মানুষ বাঘের আত্মা নিয়ে বাঘের সামনে দাঁড়ালে বাঘও হার মানে। মানুষ হৃদয়ালুতা নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়ালে মানুষ কঠিন থাকতে পারে না। চাওয়ার মতো চাইতে জানলে মানুষ খালি হাতে ফেরে না। ইচ্ছেগুলো পবিত্র হলে, স্বপ্নগুলো সত্য হলে চাওয়া কখনো বৃথা যায় না। শ্রেয়াঙ্কা হেরে গিয়েছে ঐষিকের চাওয়ার কাছে, আবদারের কাছে। কেউ মন থেকে চাইলে আর তা যদি উপলব্ধি দিয়ে বোঝা যায়, তবে তার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে হয়, কারণ তার কাছেই সুখ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ছিনতাই করে দখলে নেওয়া যায়, কিন্তু নিজের করে পাওয়া যায় না। হৃদয়াবেগ দিয়ে হৃদয়স্থ করা যায়, নিজের করেও পাওয়া যায়। হৃদয় বিনিময়ে যে জয় তা হৃদয়ে গেঁথে যায়, ছোটে না তা সংকটেও।

দুজনের ভেতরই সংকোচ। কেউ কারও চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পায়। কেউ কারও হাতে হাত রাখতে দ্বিধান্বিত হয়। পাশাপাশি হাটতে গিয়েও লজ্জা পায়। পাশাপাশি বসতেও দ্বিধান্বিত হয়। হয় না কথা বেশি, তবুও নিয়ম করে দুজন দেখা করে দুজনের সাথে। দেখা হলেই দুজনেই লজ্জার হাসি হাসে। যা হয় কথা হ্যাঁ-না-কী-ও-ঠিক আছে এইসব শব্দের উত্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দুটি মানুষ যদি দুটি মানুষের জন্যই সঠিক হয় তবে এই সংকোচ আর দ্বিধা থাকবেই। মন থেকে কেউ কাউকে চাইলে অতি কথা বলে না, নিজেকে প্রকাশ করে না, মিথ্যা বুলি আওড়ায় না।

দ্বিধার দেয়াল ভাঙতে থাকে আর আরও মধুর মুহূর্তের উদয় ঘটে। অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করতে আর সংকোচ এসে বাধা দেয় না। মনের কথা খুলে বলে মনের মানুষের সাথে। আসার কথা যখন তার এক ঘণ্টা আগে এসেছে ঐষিক, জেনেছে শ্রেয়াঙ্কা। তাই শ্রেয়াঙ্কা বলে, এত আগে চলে আসো কেন?

ঐষিক বলে, সময় ধরে মাঠের খেলা হয়, সময় ধরে অন্তরের খেলা বাঁধা যায় না। এসে অপেক্ষা করি৷ তোমার জন্য অপেক্ষা বড়ো মধুর। অপেক্ষার পর তোমাকে দেখতে পাওয়া তৃষিতের জন্য অমিয় সুধা।

একথা শুনে শ্রেয়াঙ্কা উৎফুল্ল হয়। তার জন্য কেউ একজন অপেক্ষা করে ভাবতেই তার ভালো লাগছে। কিন্তু মিষ্টি কথাতে সে খুব বেশি আত্মহারা হলো না। ভেতরে ভেতরে একটু ভাবলো, প্রথম প্রথম ভালোবাসা দেখায়, পরে অবহেলা, অনাদার, অজুহাত দেখাবে।

ঐষিক শ্রেয়াঙ্কার চোখ বরাবর চেয়ে বললো, সত্যই আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার মায়ায়, তোমার ভালোবাসায়, তোমার হাসিতে, তোমার সবটাতে।

শ্রেয়াঙ্কা শুনে হাসে আর বলে, যেভাবে বলো লজ্জা লাগে। পাওয়ার আনন্দে এত বিগলিত হতে নেই। পাওয়ার আনন্দও এত প্রকাশ করতে নেই। বাস্তবতার গল্প হয়ে পাশে থেকো, কল্পনার রং মিশিয়ে বলতে হবে না। যার প্রতি আমিও মুগ্ধ হয়েছি, সে যেন কষ্ট না দেয়।

ঐষিক বলে, জীবনে সমঝোতা ছাড়া কোনো সম্পর্কই টেকে না। ভুল করলে মানিয়ে নিও, ভুল বুঝো না কভু নতুন করে। কষ্ট দিয়ে ফেললেও ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করে দিও। তোমার শূন্যতা আমি কিন্তু কাটিয়ে উঠতে পারবো না।

শ্রেয়াঙ্কা ঐষিকের চোখের পানে তাকায়। ভীষণ ভালো লাগার একটা মানুষ, ভীষণ আপন লাগার একটা মানুষ। কিন্তু প্রচণ্ডরূপে বিশ্বাস করে উঠতে ওর ভয় হয়। বিশ্বাসহীনতার এই যুগে বিশ্বাসীদের প্রতিও বিশ্বাস করা যায় না। একান্ত বিশ্বাস করার পথে দ্বিধা এসে ভর করে। মানুষ চেনার চেয়ে কঠিন কাজ আর নেই। মুখোশের আড়ালের রূপটা চেনা বড়ো দায়।

ঐষিক শ্রেয়াঙ্কার নিষ্প্রভতা দেখে বললো, আমার সান্নিধ্য কি তোমায় আনন্দ দেয় না?

শ্রেয়াঙ্কা চমকে উঠে বলে, কী বলো! তোমার উপস্থিতিই তো আমার প্রাণ।

ঐষিক বললো, নেতিবাচক চিন্তা মনে ভর করলে দ্বিধাও বাড়বে, ঝামেলাও বাড়বে। ভালোবাসো যাকে অহেতুক সন্দেহ করো না কখনো তাকে। আমাকে অপরাধী করো না। মনে দ্বিধা থাকলে একসাথে চলা যায় না। মনে সংকোচকে ঠাঁই দিলে ভালোবাসা ক্ষীণ হয়ে যায়।

এরপর ওরা দুজন হাঁটতে থাকে। বেশক্ষণ হাঁটার পর ঐষিক বললো, তুমি কিন্তু নিষ্প্রভ! কথা বলছো না!

শ্রেয়াঙ্কা বললো, তুমি হয়তো আমাকে উচ্ছল দেখতে চাইছো। কিন্তু আমি তেমন না, এমনই। যেমন ভাবনাতে আঁকছো তেমন না, এমনই। যেমনটা চাইছো, যেমনটা ভাবছো তেমনটা না, এমনই। আমার এমনটাকে পছন্দের তালিকায়, ভালো লাগার তালিকায় নিয়ে নাও।

ঐষিক নিজের অবস্থান থেকে সরে শ্রেয়াঙ্কার মতেই সায় দিয়ে বললো, তুমিটাই আমার সম্পদ। তোমার তুমিত্বই আমার আমিত্ব। আমার প্রত্যাশার শেষ তোমাতেই। শান্তশ্রী তোমার নিজস্বতা। তোমার নিজস্বতাতেই নিজেকে আমি লীন করে দেবো। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি আমার জন্য সহজ না। সহজে পেয়েছি, কিন্তু সহজে বুঝছি না। দুর্বোধ্য লাগে তোমাকে।

শ্রেয়াঙ্কা বললো, বোঝো না তাই বলো এমন, কী দেইনি তাই খোঁজো, কী পেয়েছো বোঝো না। চোখের শান্তি খুঁজতে গিয়ে মনের শান্তি ভুলে গিয়েছো। চোখের শান্তি দুষ্প্রাপ্যে মেলে, মনের শান্তি মেলে সহজপ্রাপ্যে। মন মেলে দেখো দেখবে আমি দূরান্তের কেউ নই, একান্তের কেউ। ভালো না বাসলে কেউ সাথে থাকে?

ঐষিক থমকে গেলো শ্রেয়াঙ্কার কথা শুনে। ভেতরকে আরও সে শুদ্ধ করতে থাকলো। মন প্রাপ্তির সাথে সাথে মনের ভেতর জাগ্রত আরও অন্যায্য কিছু প্রত্যাশাকে সে হত্যা করে দিলো। হৃদয় পেলে হৃদয়বান হতে হয়, কামুকতার ঠাঁই সেখানে নেই। হৃদয়বতীর হৃদয়ে ঠাঁই পেলে মোহ ভুলে, নেশা ভুলে আরও বেশি বিশ্বস্ত হতে হয়। হৃদয়ালুতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিতে হয়। স্নিগ্ধতার সাথে চলার পথ দীর্ঘ করতে হলে স্নিগ্ধ হতে হয়। ভালোবাসা কোনো পাকা ফল নয়, পেলেই খাওয়া।  ভালোবাসা মানেই নিঃশ্বাস দূরত্বে থেকে উষ্ণ হওয়া নয়, শরীরী খেলা নয়। ভালোবাসা তো সেটাই- অনতি দূরে থেকেও একে অপরকে হৃদয়ঙ্গম করা। ছুঁয়ে থাকা মানেই সবটা নয়। একে অপরের স্পর্শে ঘর্মাক্ত হওয়া ভালোবাসার সৌন্দর্য নয়।

এভাবেই ওদের দেখা সাক্ষাৎ চলতে থাকে। কিন্তু মনকে বুঝ দিয়ে থাকতে পারে না ঐষিক। বুঝে উঠতে পারে না শ্রেয়াঙ্কাকে। দেখা হয়, কথা হয়। আসে হৃদয়ের টানে, যেতে বিলম্ব করে সেও হৃদয়াবেগের কারণে। কিন্তু নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস ফেলা হয় না। ঠোঁটে-গালে সংঘর্ষ হয় না। হাতে-পিঠে সংযোগ হয় না। চোখে চোখে কথা হয়, ঠোঁটে ঠোঁটে ক্রিয়া হয় না। পাশাপাশি হাঁটা হয়, হাতে হাত রাখাটা হয় না। মনে মনে রেষারেষি হয়, শরীরে শরীরে ঘেঁষাঘেঁষি হয় না। বেশ রাগ করেই ঐষিক বললো, তোমার ভালোবাসা বুঝি না। ভালোবাসা মানে কি হাতে হাত রাখা নয়? ভালোবাসা মানে কি পাশাপাশি বসে কাঁধে কাঁধ রাখা নয়? আমাকে ভালোবাসো তুমি, তোমাকে ধরবো না কেন আমি? কেন আসো আমার কাছে, একটু কি উষ্ণ হতে মন চায় না?

কথা শেষ না হতেই শ্রেয়াঙ্কা ঐষিকের হাত ধরলো। ঐষিকও শ্রেয়াঙ্কাকে টেনে বুকে চেপে ধরলো। শ্রেয়াঙ্কা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও ঐষিক ছাড়েনি। সে বললো, তুমি আমার বুকের খোরাক। বুকে থাকো। সুখ পেতে চাই বলেই তো তোমার কাছে আসি।

শ্রেয়াঙ্কা বললো, তোমার জন্য মনে যদি টান না থাকে আমার আসার কারণ কী?

ঐষিক বলে, তবে কেন দাও না ধরা, হও না আমার তৃষ্ণার জল? শীতল হওয়ার মন্ত্র তুমি, যন্ত্রণা দেওয়ার যন্ত্র কেন হবে তুমি?

শ্রেয়াঙ্কা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, ধরা দেই না তুমি যদি নিজেকে ভুলে যাও! ধরা দেই না তোমার হুশকে অক্ষত রাখতে। ধরা দেই না তুমি যেন তুমি থাকো। শিহরিত যদি করে দাও, আমার শিহরিত হওয়ার শখ থাকলেও অভ্যাস নেই।

ঐষিক আত্মতৃপ্তস্বরে বলে, ঠিক আছে, প্রতিদিন একবার আমার হাত ধরবে। একবার বুকে বুক ঠেকাবে। একবার কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে বসবে। একদিন অভ্যস্থ হয়ে যাবে। দেখবে একদিন এই অভ্যস্থতা জীবনের জন্য কত মায়াময় সৌন্দর্য।

এভাবে চলতে থাকে ওদের মনের লেনাদেনা। দুজনের বোঝাপড়াটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। কেউ কাউকে অবিশ্বাস করে না। কেউ কারও কাছে আর ইতস্তত বিষয় না। কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচে না। সান্নিধ্য আকাঙ্ক্ষায় দুজনই সমান কাতর। দূরত্ব নেই দুই মনে যেমন, দূরত্ব নেই দুজনের অবস্থানেও। নিকট, সন্নিকট বলতে কত কাছের বোঝায় তারা জানে না, তারা লেপ্টে থাকে, ঘেঁষে থাকে পরস্পরে। স্পর্শে স্পর্শে থাকে, সংস্পর্শ ছাড়া আর বোঝে না কিছু। দুটি মনের সংযোগ সঠিক হলে সংকোচ থাকে না। বাচালও বধির হয়ে যায়, অবাধ্যও বাধ্য হয়ে যায়, উদ্ধতও সত্যশ্রী হয়ে উঠে। ঐষিক আবেগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে বলে, একটা নিঃশেষিত প্রাণে তুমি প্রাণ সঞ্চার করেছো। প্রাণের রশদ তুমি; প্রাণাপেক্ষা প্রাণ। প্রাণবায়ু তুমি, প্রাণভ্রমরা; প্রাণ পাখি তুমি, প্রাণের মাঝে সারাক্ষণ বিরাজ করো।

শ্রেয়াঙ্কা ঐষিকের কথার উল্টো পিঠ নিয়ে এখন আর ভাবে না। যে মানুষটা বিশ্বাসে উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে তার কথায় দ্বিধান্বিত হওয়ার চেয়ে উৎফুল্ল হওয়ায় শ্রেয়। তাই সে ঐষিকের কথার উত্তরে বলে, কী লক্ষ্মী কথা, লক্ষ্মী পুরুষের! লক্ষ্যে লক্ষ্যে রাখো, অলক্ষ্যে গেলে লক্ষ চিন্তা করো। তুমি একটি রত্ন, সম্পর্কের করো যত্ন, সম্পর্কের শিকড়ে দাও অঢেল মায়া, সুদৃঢ় হয় সম্পর্ক বাগিচা।

ঐষিক সন্তুষ্টির হাসি হেসে বলে, তোমার অনুপস্থিতিতে থাকি অস্বস্তিতে, বাঁচি বিরূপ পরিস্থিতিতে; বাঁচি না না দেখতে পেলে, না দেখতে পেলে থাকি না স্থিতিতে।

শ্রেয়াঙ্কাও আবেগের ঢলে ভাসিয়ে শরীর বলে, কেন এত ভালোবাসলে, না চিনতে, না জানতে, না বুঝতে। মনের প্রতি প্রান্তে অজান্তে কত দারুণ নিয়েছো অবস্থান।

ঐষিক বলে, চিনতে যেয়েই চিনেছি, তুমি অচেনা নও, চিরচেনা। অজানা নও, চিরজানা। তোমাকে না বোঝার আর কিছু নেই, তোমার হৃদয় সহজপাঠের মতো সহজ।

শ্রেয়াঙ্কা বলে, তুমি যে সুখ দাও আমায় দামে অমূল্য, তুলনায় অতুল্য। অমূল্যও যে সহজপ্রাপ্য, তোমায় না পেলে জানা হতো না। সুখের পবন তুমি জীবন জুড়ে।

ঐষিক শুনে অত্যানন্দে বললো, তুমিহীন আমি আমিহীন। তুমিহীন আমার থাকা সে শুধু বাঁচার জন্য বেঁচে থাকা। তুমি আমার বেঁচে থাকা, বাঁচার মতো বাঁচা।

শ্রেয়াঙ্কা শুনে আপ্লুত হয়ে বলে, তোমাতে নেই প্রচ্ছন্নতা, তুমি স্বচ্ছ নির্মল আলোকের মতো। তোমাকে বুঝতে আর বেগ পেতে হয় না; তোমাকে পড়তেও আর দুর্বোধ্য লাগে না। তোমার মনের ভূমে তাই আমার দখলদারিত্ব।

ঐষিক আদরকণ্ঠে বললো, তুমি যে বোঝো, তোমার বোধশক্তি তীক্ষ্ণ। তুমি শুধু দেখো না, আপাতত চোখে সব দেখা যায় না। দৃষ্টি তোমার অনিন্দ্য, চোখ তো সবারই আছে, দৃষ্টি কজনের প্রখর!

শ্রেয়াঙ্কা বললো, যে কাজই করি কর্ম মাঝে তুমি৷ প্রতিচ্ছবি হয়ে ভাসো, ভাসাও; হাসো, হাসাও; ভাবি তোমাকে, ভাবাও যে!

ঐষিক বললো, তাই তো তোমার মাঝেই খুঁজে নেবো আমার সুখ। তোমার মাঝেই লুকিয়ে আছে আমার যত সুখ। তোমাকে সুখে রাখায় হোক আমার ব্রত। তোমার সুখ আমার সুখ। তোমার হাসিতেই হাসবো, না হাসিতে হাসবো না।

শ্রেয়াঙ্কা আবেগে গদগদকণ্ঠে বললো, এইজন্যই তোমাকে করেছি এত নিকটতম প্রিয়জন। কত আপন সংজ্ঞাতীত, আপনেরও আপন, স্বজন, সজ্জন। তারপর তুমি। তারপরের পর তারপরও তুমি। আমাতে তুমি, আমিত্বে তুমি, আর আমার তুমি।

শুনে ঐষিক বলে, আমার প্রশান্তি তুমি, শখের তুমি, স্বাধের তুমি। তোমাতে মিশে থাকতে আমার প্রশান্তি। তোমার দ্বিধাহীন উষ্ণ কোমল স্পর্শ আমার পরম স্বাদের।

শ্রেয়াঙ্কা পূর্বাপেক্ষা নরম সুরে বললো, তোমার কথার ধারায় হারিয়েছি নিজেকে। তুমি তো দূরত্বের কেউ নও, তোমাকে অকপটে সব দিতেও নেই আজ দ্বিধা। তোমাকে অদেয়ও আমার কিছু নেই। তুমিহীন আমি নিঃস্ব, চলাচলের চরাচর হবে দুঃসহ, দূর্বিষহ।

এই কথা শুনে বিস্ময় ভরা চোখে ঐষিক শ্রেয়াঙ্কার দিকে তাকায়। কাঁধে হাত দিয়ে নির্ভরতার জানান দেয়। এখন ধরতে অনুমতি লাগে না। ধরলে হাত বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কথা বলতে থাকে ওরা, ফেরার কথা ভুলে গিয়েছে। দুজনের পথ একস্রোতে বইলে ফেরার তাগিদ থাকে না। ফেরার পথ ভুলও হয়ে যায়। সময় যায়, স্বাদ বাড়ে। সময় যায়, শখ বাড়ে।

এভাবে দিন যায়, মাস আসে। দেখা হয় না এখন নিয়মিত। সময় দেওয়া থাকলে তার এক ঘণ্টা পরে আসে ঐষিক। গুরুত্ব কমে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণের প্রতি। টান কমে গিয়েছে প্রাণের প্রতি। সময় হয় না প্রিয় মানুষটার জন্য আর। এক মুখের চেনা হাসি আগের মতো আর উৎফুল্ল করে না। এক কথা শুনতে আর আগ্রহ জাগে না। সেই চেনা মানুষের একই গন্ধ আর নেশা ধরায় না। দেখতে দেখতে দেখতে থাকা একই মানুষকে আর আগের মতো আবেদনময়ী লাগে না। আগ্রহের সাথে তাই অনাগ্রহও বাড়ছে, পছন্দের সাথে অপছন্দের সংমিশ্রণ ঘটছে। ভালো দেখতে থাকা চোখেও তাই মন্দ ধরা পড়ছে। সহ্যের সাথে অসহ্যও বিরাজ করছে। অনুরক্ত না হয়ে তাই সময়ে বিরক্তও লাগছে। ভালো লাগার ধারায় এখন দোষ-ত্রুটিও যুক্ত হচ্ছে। চোখে পড়ছে খুঁত। নতুন কখনো নতুন থাকে না। অপরূপও একদিন বৈচিত্র্য হারায়। ঐষিকের উদাসীনতা শ্রেয়াঙ্কা বুঝতে পারে। সে বুঝতে পারছে তার ভেতরও নতুনত্ব আনা দরকার। একটু সাজগোছ করে, নতুন নতুন সালোয়ার কামিজ পরে আসে। কিন্তু ঐষিকের আকর্ষণে পড়ে না আর সে। প্রশংসা পায় না আর। আর তাই শ্রেয়াঙ্কা বললো, তোমার কাছে সম্পূর্ণরূপে ধরা দিয়ে আজ আমি সম্পূর্ণরূপে ধরা।

ঐষিক বলে, নিজেকে সস্তা ভাবো বলেই সস্তা হয়ে যাচ্ছো। আমার জীবনে তুমি নেহাত নও, কিন্তু কথা-বার্তায় নিজেকে নেহাত করে তুলছো।

শ্রেয়াঙ্কা আক্ষেপ করে বলে, ব্যক্তিত্ব হারালে আর তা ফিরে পাওয়া যায় না। তাই ব্যক্তিত্বকে সহজ করে তুলে ধরতে নেই।

ঐষিক বিরক্ত হয়ে বললো, হৃদয় লেনাদেনায় ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে মহীয়সী হওয়া যায় না। ভালোবাসলে মানুষের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন হয় তোমার থেকেই শুনলাম। তোমার ব্যক্তিত্বকে অসম্মান কখনো করিনি, করবোও না। তুমি সম্পর্কটা নিয়ে অধৈর্য। বদলে গিয়েছো তুমি। মানুষ বদলে গেলে ধরা খুব কঠিন না।

শ্রেয়াঙ্কা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো, নগণ্য ভাবো যাকে তার বদলে যাওয়ায় কী আসে যায়! বলতে পারো কেন আমার মনে হচ্ছে আমার প্রতি টানটা আর আগের মতো নেই?

ঐষিক বললো, তোমার মন তোমাকে অনেক কিছুই বলতে পারে, কারণ তোমার মন তোমার বশে নেই। বিশ্বাস অটুট থাকলে মন বশে থাকে। দিন দিন আমাকে হালকা করে ভাবছো, আমার ভেতর সৌন্দর্য না দেখে দেখছো কদর্য। অন্যের সাথে আমায় তুলনা করছো। কেউ কারো মতো নয়। অন্যকে শুদ্ধ ভেবে আমায় মন্দজ্ঞান করছো।

শ্রেয়াঙ্কা বললো, নিজেকে পুরোটা জানাতে চাইনি তোমার কৌতূহল ধরে রাখতে। নিজেকে উজাড় করে ঢেলে দিয়েই আজ ভুল বুঝতে পারছি। একেবারে মূল্যহীন হয়ে গিয়েছি।

ঐষিক গম্ভীর হয়ে বললো, তুমি কখনোই আমার কাছে মূল্যহীন ছিলে না। অমূল্যকে মূল্য দিতে আমি জানি। প্রাপ্তি থেকে তোমার আনন্দ উঠে গিয়েছে, তাই এভাবে বলতে পারছো।

এভাবে দুজন তর্ক করতেই থাকে। তর্ক চলতেই থাকে। চোখে চোখে তাকিয়ে হারিয়ে যাওয়ার দিন গত হয়েছে। হাতে হাত রেখে হাঁটার সেই সুদিন গত হয়েছে। একজনের ভালো আর অন্যজনের চোখে পড়ে না, একজনের সমস্যা অন্যজনের চোখে বেশি পড়ে। পরদিন শ্রেয়াঙ্কা এলেই ঐষিক বললো, অনাগ্রহ নিয়ে আসার দরকার নেই। মলিন মুখ দেখানোর জন্য আসতে হবে না।

শ্রেয়াঙ্কা বললো, প্রত্যাশিত কথা কখনোই তোমার থেকে শুনতে পাই না।

ঐষিক বললো, রিক্সা থেকে নেমে আমাকে দেখে তোমার ঠোঁটে কি সত্যই হাসি আসে না? আমাকে দেখলে কেন তোমার আগের সেই তৃপ্তি দেখি না?

শ্রেয়াঙ্কা বললো, কড়া ভাষায়ই তো কথা বলবে, মিষ্টি কথা পুরাতনকে ঘিরে আর কত থাকে!

ঐষিক বললো, যেটা ভাবো সেটাই বলো। সে বলাতে কে কষ্ট পায় বোঝো না। কাছে ডেকেও কাছে পাই না, কাছে পেয়েও অন্তরে পাই না। শত বুঝ দিলেও বুঝ মানো না। আমি ঠকাচ্ছি, আমি কাঁদাচ্ছি, আমি ভাবাচ্ছি এই বিশ্বাস তোমার ভেতর। তোমাকে আমি ঠকাবো কেন? অন্তরে ধারণ করেছি তোমায়, তোমাকে ঠকাবো কোন দুঃখে? অন্তরকে কি কেউ ঠকায়?

শ্রেয়াঙ্কা খেদোক্তি করে বললো, মুখে শুধু শংসাদি, মনে শুধুই নষ্টামি। দেখা দিলেই ডাকো বিজনে, দেখা হলেই টানো নির্জনে, দুটো কথা না বলতেই ডাকো নিরালায়। সাড়া না দিলেই হয়ে পড়ি খারাপ, পুরাতন, হৃদয়হীনা।

দুজনের মধ্যের এই মতানৈক্য ঐষিকের ভালো লাগে না। সে রাগ করে চলে গেলো। কিন্তু বাসায় যাওয়ার পরই আর ভালো লাগে না। সে তো হৃদয়ের জন্য নিশ্চয় কেউ, নতুবা ভাবনা জুড়ে এত বিরাজ করবে কেন? অনুভূতি জুড়ে যে বিরাজ করে সেই তো প্রিয়জন। অনুভূতি সত্য হলে সম্পর্ক টিকবে। ক্ষুধা পেটে ঘুমানো যায়, খারাপ মন নিয়ে ঘুমানো যায় না। শ্রেয়াঙ্কার সাথে সে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হলো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শ্রেয়াঙ্কার চলার পথে দাঁড়ালো। কিন্তু দেখা মিললো না। রাখতে জানলে মানুষ থাকে। নিজেকেই সে দোষারোপ করলো। ভালোবাসলে অবহেলা করতে নেই। সে বোধ তার ভেতর জাগ্রত হলো। সে শ্রেয়াঙ্কাদের বাসার সামনে গেলো। কিন্তু তার দেখা নেই। মানুষ ব্যবহারে হৃদয়ে আসে, ব্যবহারের কারণেই হৃদয় থেকে চলে যায়। নিজেকে শুধরে নেওয়ার শপথ নিলো সে। শ্রেয়াঙ্কার দোষ না দেখে নিজের দোষ দেখতে চাইলো সে। কারোর বদলে যাওয়া দেখতে নেই, বদলে যাওয়ার কারণ খুঁজতে হয়।

বেশ কয়েকদিন চেষ্টা করেও শ্রেয়াঙ্কার সাথে সে সাক্ষাৎ করতে পারলো না। অবহেলায় হারালে বেলায়-অবেলায় কান্না করতে হয়। পাওয়ার মধ্যে চাওয়ার চেয়ে বেশি কিছু চাইলে অবহেলা আসে। অবহেলায় সম্পর্কের পতন ডাকে। ভালোবাসার মানুষের খেয়াল না রেখে খেয়ালে খেয়ালে মনের দেয়ালে আঘাত করলে শূন্যতায় সঙ্গী হয়।

এক মাস হয়ে গেলো ঐষিক শ্রেয়াঙ্কার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারলো না। প্রিয়জনের মোহমাখা কণ্ঠ সে শুনতে পায় না। প্রিয়জনের পিপাসিত চোখে সে আর তাকাতে পারে না। কারও পছন্দের হয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু পছন্দের হয়ে থাকাটা বড্ড কঠিন। হৃদয়ে বিশাল জায়গা, সেখানে প্রিয় মানুষটাকে সে জায়গা দিয়ে রাখতে পারলো না। রাগ ভাঙানোর সুযোগটুকুও শ্রেয়াঙ্কা দিলো না। অভিমানের বহর এত বেশি হলে কোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব না।

ঐষিকের মনে ভীষণ জেদ জাগলো। বাবা-মাকে জানিয়ে দিলো সে বিয়ে করবে। বাবা-মা মেয়ে দেখতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু শ্রেয়াঙ্কার জন্য ঐষিকের মন কাঁদে। যে মানুষটার জন্য হৃদয়ে একটা মায়ার সাগর জন্মেছে তাকে ভুলে থাকাটা খুব কঠিন। ওদিকে তার বাবা একজন মেয়ের সন্ধান পেয়েছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে সেই মেয়েটিকে দেখতে গেলো। দেখতে সুন্দর, পছন্দ না করার কারণ পেলো না পরিবারের অন্য সদস্যরা। ঐষিক মেয়েটির সাথে একান্তে কথা বলতে গেলেই মেয়েটি দৃঢ়চিত্তে জানিয়ে দিলো, তার সম্পর্ক আছে। সে বিয়ে করবে না।

ঐষিক বাবা-মাকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। কিন্তু বাসায় ফিরে তার ভালো লাগে না। রুটিনহীন যার সাথে কথা বলতো তার ফোনটা বন্ধ। ভীষণ অস্থির লাগে। রাগ শ্রেয়াঙ্কা কী করে দীর্ঘায়িত করতে জানে সে ভাবতেও পারছে না। মনের মধ্যে যাকে সে সারাক্ষণ রাখে সেই মনে রাখলো না। গেলো তো গেলোই, ভুলেই গেলো। সে এখন বুঝতে পারে, প্রথম দিনের মতো গুরুত্ব দিলে এই বিচ্ছেদ জ্বালা সহ্য করতে হতো না। মনে ধরা মানুষ ভাগ্যে ধরে না।

মামার দেখা মেয়েকে সবাই মিলে দেখতে গেলো। লম্বাটে আছে। দেখতেও সুন্দর। ঐষিকের সাথে মানাবে ভালো। পছন্দ না করার কারণ নেই। কিন্তু ঐষিকের সাথে একান্তে কথা বলার সময় মেয়েটি বললো, তার সম্পর্ক আছে। সে বিয়ে করবে না।

এবারও ঐষিক ফিরে এলো। শ্রেয়াঙ্কাকে পাওয়ার আরও একটু সময় পেলো। সে আবারও বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শ্রেয়াঙ্কার কাছে তার বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু প্রতিউত্তর ফিরে এলো না। এতেই জেদ আরও বেড়ে গেলো ঐষিকের। সে আবারও আর এক মেয়ে দেখতে গেলো। সেই মেয়েটিও প্রেম করে, সেও ঐষিককে ফিরিয়ে দিলো।

ঐষিক ফিরে ফিরে এলেও একটা বিষয় তাকে মন্দের ভালো আনন্দ দিয়েছে, তা হলো- ভালোবাসার মানুষের কারণে বাবা-মায়ের পছন্দ করা সত্ত্বেও বিয়ে করছে না মেয়ে। ভালোবাসার মানুষের জন্য এই বাজি ও ত্যাগ ভালো লাগারই। অপ্রতিষ্ঠিত ভালোবাসার মানুষের কাছেই যাবে বলে প্রতিষ্ঠিত অপরিচিত ছেলেকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ভালোবাসার মানুষের জন্য এই ভূমিকা ভীষণ ভালো লাগার।

অনেক ভেবে ভেবে ঐষিক সিদ্ধান্ত নিলো শ্রেয়াঙ্কার কাছে যাবেই যাবে সে। ক্ষমার ঝুলি নিয়ে গেলে শ্রেয়াঙ্কা তাকে ফেরাবে না এই বিশ্বাস তার ভেতর প্রবলতর হয়েছে। কিন্তু ভয় লাগছে শ্রেয়াঙ্কার বাবা-মাকে। ভয়টা জয় না করলে হৃদয়টা যে দ্বিখণ্ডিত হয়েই যাবে।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের একদিন পরেই ঐষিক শ্রেয়াঙ্কাদের বাড়ি গেলো। বাড়িটা আলো আর পুষ্পে সাজানো। বাজছে গান, বাচ্চাদের আনন্দ-উল্লাস, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা। জানতে পারলো আজ রাতে শ্রেয়াঙ্কার বিয়ে।

পাত্রপক্ষ দেখতে এলে শ্রেয়াঙ্কা একান্তে আলাপের সময় পাত্রকে বলেনি তার সম্পর্কের কথা।

মুড়াপাড়া, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ থেকে

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev