বেশ লম্বা আর চওড়া উচ্ছ্বাসের স্বপ্নগুলো। অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্নরা ওর চোখে আহ্লাদী মেয়ের মতো খেলা করে৷ ওর স্বপ্নীল ভাবনাগুলো কখনো কখনো ডানা মেলে উড়ে যায়, আবার সেই ডানায় ভর করে ফিরে আসতে ভুল করে না। স্বপ্ন রাগিনীর অপূর্ব সব সুর মূর্ছনায় মিশে থাকে ও।
শোক, তাপ, ক্ষুধা, ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে স্বপ্নের নকশিকাঁথায় বুনন তোলে গ্রাম্য বধূর মতো ও। আলো থেকে আলো নিয়ে আলোকিত করেছে জীবন। ঝড়ের শক্তির মতো বিশ্বাসের জোর ওর। কল্পনার আজগুবি ডানায় উড়ে বেড়ালেও কেউ বলতে পারবে না কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যেই সে আজ এই পর্যায়ে উপনীত হলো। সুখ-শান্তির চাদরে মোড়া আজ তার গৃহ।
মনের আবহাওয়ায় দিন বদলের চিঠি। বাতাস যেন উন্মাতাল। কেন? ঘরে পটে আঁকা ছবির মতো লাল সিঁদুরে রঙিন বধূ এসেছে। শব্দহীন আনন্দ মনের অলিন্দে পোনা মাছের মতো কিলবিল করছে। মনে মনে কিছুটা ক্ষণ ভেবে কাটালো। ভাবায় ওর কাজ। আগামী দিনের পথ চলার মানচিত্রটা ধীরে ধীরে মনের কোঠরে আঁকলো। আকাশের দিকে তাকালো, জোনাকিরা যেন হাসছে।
বধূর দিকে তাকাতে কীসের বাধা? অদ্যাবধি কোনো নারীর দিকে এক পলকে যতটুকু দেখা যায় তার বেশি তো দেখা হয়ে উঠেনি। অদ্ভুত রকমের সুন্দর মেয়ে। কল্পনার চেয়েও সুন্দরী মেয়ে। এত সুন্দর হওয়া ভারি অন্যায়। দেখে তার মনে হলো শঙ্খের মতো দুই হাতে গলা ধরে ঠোঁটের কাজটা শুরু করে দিলে ভালো হতো। সংযত হলো। মনের কুটিল রিপুকে যে যত সংযত করতে পেরেছে ভবিষ্যতের বন্ধুর পথ হাঁটা তার তত সহজ হয়েছে। শুধু ভাবলো, তোমায় অপলকে দেখবো, তোমার কণ্ঠ শুনবো এই আমার লোভ। শুধু তুমি মানুষটি যেন সহজ মানুষ হও, আমার জীবনগল্পে সেরা হয়ে যাও। শুধু পাশে পাশে থেকো, আমার খারাপ থাকার কোনো কারণ থাকবে না। তোমাকে আমার সুখের কারণ করে নেবো, শুধু হাসির কারণ হয়ে থেকো। তোমাকে বরণ করে নেওয়ার পর থেকেই তুমি হয়ে গিয়েছো জীবন জুড়ে গুরুত্ববহ মানুষ। আর তাই তুমি কারও কাছে বিশেষ না হতে পারো, আমার কাছে খুব বিশেষ।
দূর থেকেই দেখছে। তাতেই এই অদ্ভুত অনুভূতি মনে জাগছে। রূপ থেকে খসে পড়ছে মায়াবি আলো। ঝলমলে হিরার আংটির ঝিলিক এসে চোখকে ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। মনে মনে একরাশ ভাবনা আক্রমণ করলো মৌমাছির মতো, মন বললো, লোভাতুর সুখ কোনো দূরের বিষয় নয়, যদি তোমার সাথে পথ চলতে পারি। জীবন চলার পথে তুমি যোগ হলে, তোমায় নিয়ে চলবো পথ অনন্তকাল। তোমাকে চিনিই না, তুমিই হয়ে উঠছো হৃদয়ের একাংশ। খুব প্রার্থনা, তুমি যেন হও মায়া জাগানিয়া।
অদৃশ্য সুখের এক কাব্য উচ্ছ্বাসের বুকে হলি খেলছে। নির্বোধ বালকের মতো হয়ে গিয়েছে ও। হঠাৎ কেমন একটা সংকোচবোধ জাগ্রত হলো তার মধ্যে। যেন ঘোর কেটেছে। ওর রূপ যদি এমনি করে ঘোরের মধ্যে রেখে দেয় সেটি অস্বাভাবিক এবং অবশ্যই ব্যধি হয়ে পড়বে। আবার তাকালো। যেন চোখের বিরতি শেষে পুনরায় দর্শন ক্রিয়ায় মনোনিবেশ। ভাবলো, দেখছি তো আমার প্রিয়জনকে, দোষ কেন তবে? প্রিয়জনকে দেখার জন্যও অনেক সাহস প্রয়োজন, নতুবা বুকে ধুকধুক করবে কেন? তুমি সুগোল চাঁদের মতো যৌবনবতী, নতুবা তোমার থেকে এত আলো বিচ্ছুরিত হবে কেন? হাজার সৌন্দর্যের ভিড়ে তুমি এক অদৃশ্য অনুভূতির নাম আমার।
অপূর্ব রূপের মোহময়ী ঝর্ণাধারায় সুস্নাত উচ্ছ্বাস। হঠাৎ নেতিবাচক চিন্তা মস্তিষ্কে কুণ্ডলী পাকালো, ভাবলো, তোমায় ঘিরে আমার যে স্বপ্নচাষের সূচনা তা ঝলসে যাবে নাতো? ভাবনা-চিন্তার বহর কুঁচকে যাবে নাতো? কেমন তুমি, যেমন মন চায় তেমন তো! না, রূপসৌন্দর্যপ্রবল, গুণসৌন্দর্যশূন্য? আমার সাথে চলার পথের পথিক হবে, না চলার পথে বাগড়া দেবে? ভালোবাসবে তো? ভালো না বাসলেও যেন ঘৃণা করো না।
অর্নিমা এতক্ষণ অনড় ছিলো পাথরের মতো। কাজল কালো চোখের দুই কোণে হাসির ভাঁজ পড়লো। মায়াবি মুখে অনাবিল আনন্দ। উচ্ছ্বাস বাস্তবে, না স্বপ্নের জগতে বুঝতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলো। ও জেগে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পটু, ঘুমের স্বপ্নে বিশ্বাসী নয়। ঘুমের স্বপ্নে আছে হৃদয়কে ক্ষত করার মতো অতর্কিত হানা।
উচ্ছ্বাসের সাহসে কুলাচ্ছে না, অর্নিমাও কথা বলছে না। উচ্ছ্বাস তো সাহস আর মনোবলের কারণে উঠে আসতে পেরেছে, সেতো জানতো সাহসের সীমাবদ্ধতা বলে কিছু নেই। তবে নিজের স্ত্রীর সাথে প্রথম কথা বলতে এত বুক কাঁপছে কেন? ভাষা হারিয়ে ফেলছে কেন? কোনো একটার নিশ্চয় অভাব। আর অভাবটা বোধ হয় তেমন কিছুই নয়, প্রথমে কী বলবে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই আটকা পড়ে গিয়েছে। দ্বিধার দেয়াল, সংকোচের প্রাচীর সহজে ভাঙে না; ইতস্ততের জড়তা-জঞ্জাল সহজে কাটে না। মন বুঝতে না চেয়ে যদি ভুল বোঝে এই দ্বিধাও মনকে ভাবাচ্ছে। কারণ সে জানে পৃথিবীতে মন বোঝার চেয়ে ভুল বোঝা মানুষের সংখ্যা বেশি। ছোটো ছোটো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সাথে নেবে তো সে? ছোটো ছোটো অনুভূতিগুলোই জীবনকে সুন্দর করে সে জানে তো? বলবে তো সে সব কথা প্রাণ খুলে, না লুকাবে সব সম্মুখে থেকেও?
এত প্রশ্ন মনের মধ্যে থাকার পরও উচ্ছ্বাসের মনে অদ্ভুত এক পুলক। এটা যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। আসলে মনের মতো হয়েছে বলেই মনে এত আকুলি-বিকুলি কিলবিল করছে। মনের মতো একজন মানুষ মনটা পেলে মন আর কিছু চায় না। সব প্রাপ্তিতেই মনের প্রশান্তি মেলে না। মন যখন আনন্দিত হয় বুঝতে হবে প্রাপ্তিটা মনের মতোই হয়েছে। দুটি চোখ তুলে তাকালো অর্নিমা। দোলনচাঁপার পাপড়ির মতো কোমল দুটি গাল। অদ্ভুত এক মোহ তাতে আঠার মতো লেগে আছে। দেখে বিহ্বল হয়ে গেলো উচ্ছ্বাস। ভাবলো, রংধনুর কোনো রংই রং নয় তোমার পানে যদি চাই। তোমার জন্য আকাশ থেকে চাঁদ না এনে দিতে পারলেও পদ্মা-মেঘনা সেচন করে মুক্তো এনে দিতে পারবো। আমি বেঁচে থাকার জন্য যে কারণ খুঁজি, সেই কারণ তুমিই। তুমি আমার জীবনে সেই গল্পটি হয়ে যাও, যেই গল্পটির বাস্তবতা আছে। তুমি শুধু তুমিটি হয়ে পাশে থেকো; দুঃখ, কষ্ট, অভাব, সংকট মানিয়ে নেবো। প্রিয় মানুষটি সার্বক্ষণিক পাশে থাকলে সব পরিস্থিতিই মানিয়ে নেওয়া যায়। মানুষটি তুমি আমার হও, একান্তই আমার।
রাত বাড়ছে। চাঁদ দ্রুততর ছড়িয়ে দিচ্ছে তার জ্যোৎস্নার চাদর। সময়ের অগ্রগতির সংকেত পাচ্ছে তারা, অথচ তাদের মধ্যের সংকোচ থাকলো সেভাবেই। উভয়ই মুখ তুলছে, কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। উচ্ছ্বাস অর্নিমার দিকে নড়েচড়ে তাকালো, এবার একটা কিছু বলবেই। দেখলো, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিকন নদীটির মতো অর্নিমার কপালে সিঁথি। রক্তরঙা সিঁদুরে চিকমিক করছে সিঁথিটি। আয়নায় দীর্ঘ সময় অপব্যয় করে সে তার সুন্দর মুখটাকে আরও সুন্দর করে সাজিয়েছে উচ্ছ্বাসের জন্য, আজকের এই রাত্রির জন্য।
মাথার উপর থেকে ঘোমটাটা খসে গেলো চৈত্রের ঝরা পাতার মতো। নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়ে পুনরায় সেটি তুললো না আর অর্নিমা, ঢাকলো না লক্ষ্মীর কেশপুঞ্জের ন্যায় কেশ, ঢাকলো না কপাল কিংবা কপোল। দেখে সর্ব শরীরে শিহরণ জাগলো উচ্ছ্বাসের, মনে মনে জন্ম নিলো তীব্র অভীপ্সার, ভাবলো, তুমি মানবী, না সৌদামিনী? একটু যদি তোমায় স্পর্শ করতে পারতাম! দাও নাগো ধরা ধরার আগে! তোমার রূপের কবলে পড়েছি আমি চরম ধরা, নও তো তুমি অধরা মাধুরী কিংবা প্রহেলিকা?
জীবন যুদ্ধের দীক্ষা প্রকৃতি থেকেই পাই। প্রলয় ঝড়ে সকল জীর্ণ দূর হয়। আষাঢ়ের বারিধারায় ঊষর ভূমি প্রাণ পায়। নতুন ছন্দে জীবন সজীব হয়। বৈশাখী ঝড়ের শক্তি নিয়ে পার হয়েছে উচ্ছ্বাস দুঃখ-দারিদ্র্যের সাগর। প্রকৃতি এখন হাসছে, মৃদু বাতাস এসে এগালে ওগালে চুমু দিয়ে চোরের মতো পালাচ্ছে। নেই আকাশে মেঘের চিহ্ন। এত সত্ত্বেও মন কেন বল পাচ্ছে না? মনে অনেক কথা জমা, বলবে বলে সাজিয়েছে স্তরে স্তরে। অব্যক্তই কি থেকে যাবে সব? অনুভব বাড়ছে, অথচ সাহস কমছে। স্বপ্নকে স্বাধ করে নাম দিয়েছে স্বপন, স্বপন আজীবন মনকে উস্কানি দিয়েছে, স্বপ্ন না দেখলে মনের বয়স বেড়ে যায়, তাই স্বপ্ন দেখেছে উচ্ছ্বাস, স্বপ্নপুঞ্জ তার বুকে জমা। অদ্যাবধি মনের কোণে এমনি তো একটি নারীকে জীবনের দেবী রূপে কল্পনা করেছে, তাকেই যদি বলতে এত দ্বিধা, তবে কি স্বপ্নসৌধ ধূলিসাৎ হবে?
অর্নিমা ঠোঁট দুটো একদিকে বাঁকিয়ে বলেই ফেললো, শৌর্য-বীর্য পুরুষের বোঝা শেষ, বৌয়ের সাথে কথা বলার শক্তিটুকুও নেই।
জীবন দেবীর কাছ থেকে এমন কটাক্ষ উচ্চারণ শুনেই যে তার জীবন তরণীর চলা শুরু হবে ও ভাবতেও পারেনি। মাথাটা নিচু হয়ে গেলো। স্বপ্নের রেণুগুলো যেন আছাড় খেলো এবং রক্তাক্ত হলো। স্বপ্নের পাখি স্বপ্নের চারণভূমিতে উড়ে বেড়াবে ডানা মেলে অষ্টপ্রহর, সে বলে কী এ! পুরুষত্ব নিয়ে কটাক্ষ করা তো দৃঢ় নারীরও দুঃসাহসিকতা। স্বামীকে নিয়ে স্ত্রীর এহেন উচ্চারণ তো কখনো ঘটে না। উচ্ছ্বাসের উচ্ছ্বাস মাখা মুখে নেমে এলো চিন্তা ও লজ্জার রক্তিম আভা। স্বপ্ন যদি স্বপ্নই থেকে যাবে তবে স্বপ্নের মালা সে কাকে পরাবে আর কবে?
অর্নিমা কিঞ্চিৎ নাকে হেসে আবার বললো, সব অর্জন করতে পেরেছেন, স্ত্রীকে স্পর্শ করার যোগ্যতা আজও হয়নি। আমি নলক আর চুড়ি খুলে দিচ্ছি আপনি পরেন, নারী বৈ কী আপনি?
উচ্ছ্বাস কপাল কুঁচকালো। মনে মনে বললো, ও আপনি করে বলছে কেন? আজও যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি? জীবনের অর্ধেক বয়সই তো পড়াশোনার পেছনে গিয়েছে। ভালো চাকরি না পাওয়া অবধি বিবাহের কথা মুখেই আনিনি। চাকরি পাওয়ার পর জাঁকজমক একটি বাড়ি করেছি। তারপর বিবাহ করলাম। যাতে যে বৌ হয়ে আসবে সে কোনো ঘাটতিতে না পড়ে। আর তার মুখ থেকেই তীব্র কটাক্ষাঘাত শুনতে হলো? সব যে ধূলো ঝড়ে ধূলিসাৎ হলো! এলোমেলো হয়ে গেলো চিন্তা-চেতনা।
নিজের কাছে নিজের এত সব প্রশ্ন। অর্নিমা ওকে নিয়ে বিদ্রূপ করছে আর ও মনে মনে বিলাপ করছে। উচ্ছ্বাস ভাবলো, ওর চোখেতো বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া নেই। তবে ও এভাবে বলছে কেন বারবার? ওর অমল হাসিতে কেন নির্জীব হয়ে যাচ্ছি? কেন ওর দুই ঠোঁটের আলোকরশ্মি সূচের মতো বুকে বিঁধছে?
অর্নিমা আবারও বললো, ওহ কী ভীরু পুরুষ! নির্লজ্জের মতো দেখছেন আর দেখেই মুখ নামিয়ে নিচ্ছেন। এত কুণ্ঠাহীন, বেহায়া লোক জন্মে দেখিনি।
এমন কথার প্রতিউত্তরে উচ্ছ্বাস কিছু বলতে পারলো না। ভাবলো, এ মেয়ে বেশ দুষ্ট। গলায় আঙুল দিয়ে, পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার অভ্যাস আছে। কথা তো না তোমার, ছারপোকার কুটকুটানি। পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। সামনে তুমি অথচ তোমাকে চিনতে পারছি না। যেন স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের ঐ পাশে তুমি। একটু দেখতেও কেন মানা? খোলা চোখ দুটোকে তো আর আলোকে ঢেকে রাখতে পারি না। তোমার দিকে তাকালে কি তোমার গায়ে ঘা হবে? খবরদার এমন মেয়ের হাতে হাত রাখবো না, আঙুলগুলো তো আঙুল না, ঈগলের নখের মতো, হৃদয়টা উপড়িয়ে নিয়ে নিতে উদ্যত যেন!
উচ্ছ্বাসের উচ্ছ্বাস কুঁকড়ে গেলো। নিমীলিত হলো দৃষ্টি। কী চেয়েছিলো জীবনে ও, আর কী হলো, সুখ বড়ো চঞ্চল পাখি। ধরাই দেয় না, ধরা দিলেও সোনার খাঁচায় বন্দি হয় না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। স্বপ্নের কোলাহল নিঃশব্দ হয়ে গেলো।
অর্নিমা হেসে উঠলো, হাসি না বর্শার ফলা, হৃদয়টা উপড়িয়ে ফেলছে। বললো, এত বলার পরও একটি কথারও উত্তর করলেন না। যতটুকু জেনেছি আপনি বোবা নন, তবে কথা বলছেন না কেন? আচ্ছা, প্রশ্ন করছি উত্তর দেন, নয়নে নয়ন ফেলতে ইতস্তত নন, তবে বদনে কেন ইতস্তততা? নয়ন চলে বদন চলে না কেন? নয়ন তো নির্লজ্জ, বদন আড়ষ্ট কেন?
বিস্ফোরিত চোখ। দেখে উচ্ছ্বাস যেন তলিয়ে যাচ্ছে, তল পাচ্ছে না, বল পাচ্ছে না, ভাষা গিয়েছে উড়ে বলাকার ডানায় ভর করে দূর তেপান্তরে। সংসার করার স্বপ্নটা যদি বীজ হয় তবে তা আর অঙ্কুরিত হবে না, মেলবে না ডানা, পাবে না যৌবন। এক লহমায় সব যেন কীভাবে বিনাশের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলো। জীবনে জীবন যোগের অভীপ্সা করা বাতুলতা বৈ আর কিছুই নয়, ভাবলো, এলে আমার ঘরে আমার বধূ হয়ে, নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও থেকে গেলে বেদখলে।
অর্নিমা মাথা তুলে দেখলো উচ্ছ্বাসের কপালে, দুই গালে ঘামবিন্দু হিরার কুচির মতো চিকমিক করছে। তবুও বললো, আমার কোনো কথায় তো আপনার গায়ে মাখে না, অদ্ভুত লোক বটে। বলি কানে কি কম শোনেন?
পবিত্র জ্যোৎস্নায় ভাসছে দিক দিগন্ত। অপ্সরী অশরীরীরা হয়তো নৃত্য করছে। অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। অথচ উচ্ছ্বাসের মুখটায় বিষণ্নতা। চড়াই-উৎরাই মাড়িয়ে কোথায় উপনীত হলো ও! অর্নিমার কথায় বিদগ্ধ হয়ে গিয়েছে, কথাগুলো মনে বড়ো বড়ো রেখাপাত করেছে। দেখে প্রথমে যে মুগ্ধতা পেয়েছিলো কথাগুলো শুনে বুঝলো মনে কুটিলতা, পঙ্কিলতা ঘর করছে। উচ্ছ্বাসের মনে একটি বাক্য নড়েচড়ে বাজছে, সুন্দর অনেক সময় ভয়ংকর হয়। প্রথম মুগ্ধ হয়েও বুঝতে পারেনি মুগ্ধ হওয়ার আরও কিছু বাকি। প্রত্যাশাগুলো প্রতারিত হয়ে পথ হারালো।
অনেক সময় দিলো অর্নিমা। মুচড়ে যাওয়া শিমপাতার সোজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তীক্ষ্ণ স্বরে বললো, আমার দিকে তাকান।
উচ্ছ্বাস তাকালো মুগ্ধ নয়নে, সতৃষ্ণ নয়নে। প্রিয়তনুটির দিকে তাকালো, তাকালো মোহমায়া মাখা বদনে। রক্তরঙা শাড়ি পরে আছে একটি পাতাবাহার গাছ। সুদৃশ্য পাতাবাহার গাছ। পাতাবাহার গাছের অত্যন্ত সৌন্দর্য পাতাবাহার গাছের অগোচরে উচ্ছ্বাসের গোচরে এলো। প্রাপ্তির এক বন্যায় মন-প্রাণ ভরে গেলো।
অর্নিমা সব বিবেচনা সাপেক্ষে বললো, আপনার নজর কামুকতাপ্রবল। আপনি সৌন্দর্যের আড়ালে বিবেক বিসর্জন দিয়ে কামনা রস খোঁজেন। আপনি পুরুষ, তবে কাপুরুষ। যে আত্মা ধারণ করছেন তা কৈয়ের না, পুঁটির।
কথাগুলো খুব লাগলো উচ্ছ্বাসের। না ভালোবাসতে জানা মানুষ মূল্য খোঁজে, মূল্য বোঝে না। ও আর ঘরে থাকবে না। দপ করে উঠেই প্রস্তুত হলো বাইরে যেতে। অর্নিমা বললো, এত রাতে বাঘ পর্যন্ত তার গুহা ছাড়ে না। খবরদার বাইরে যাবেন না।
এ কথা শুনে উচ্ছ্বাসের জেদ আরও বেড়ে গেলো। সে বাইরে যেতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে প্রচণ্ড জোরে আঘাত খেলো। কপালটা যেন ফেটে গেলো। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে স্বামীকে ধরলো অর্নিমা । রক্ত পড়া দেখে কান্না করতে শুরু করলো। আর খুব বিচলিত হলো। তা দেখে উচ্ছ্বাস বিশেষ আনন্দিত হলো। একজন মানুষ তখনই ভাগ্যবান হয় যখন তার জন্য একজন মেয়ে কান্না করে। জীবনের জন্য সঠিক মানুষটি এভাবেই ছুটে আসে, ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে।
উচ্ছ্বাস অর্নিমার কান্না দেখে মুখ না খুলে আর পারলো না, বললো, আমাকে জীবনে কখনো দেখোনি, একজন অচেনা-অজানা মানুষের জন্য কান্না করছো কেন? ব্যথা তো লেগেছে আমার, আমার জন্য তোমার চোখে জল কেন? এত উদ্বিগ্ন কেন? এত উৎকণ্ঠিত কেন? একজন চেনা-জানা মানুষের জন্য বুকে ভালোবাসা জন্মে, দরদ জন্মে, তার কিছু হলে না হয় এত উদবেলিত হওয়া মানায়। সম্পূর্ণ একজন অপরিচিত মানুষের জন্য এত বেশি আর্তনাদটাই বা কেন?
অর্নিমা স্বামীর কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনবে কল্পনাও করিনি। আসলেই তো সম্পর্ক যেমনই হোক না কেন আত্মার সাথে আত্মার তো সম্পর্ক হয়নি যে চোখে এভাবে জল আসবে। অর্নিমা উচ্ছ্বাসকে ছেড়ে দিলো। কপালটা ফেঁটে ওর রক্ত বের হতে লাগলো। একবার তাকিয়ে সেদিক আর সে তাকাতে পারলো না। চোখ বুঝে বললো, যেভাবে রক্ত ঝরছে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে, আমি সহ্য করতে পারছি না।
আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে, আর তাতেই উচ্ছ্বাস হতবাক হলো। সে স্থির দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, বিবাহ কী এক বন্ধন! দুজন মানুষকে কত কাছের করে দেয়, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জন্য মনে কত মায়া-মমতার উদ্রেক করে। আমার ব্যথায় কত বেশি ব্যথিত ও।
দুইজন ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকলো। ততক্ষণে কপালের রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছে। অর্নিমার সামনে এলো উচ্ছ্বাস। অর্নিমা চোখ তুলে চেয়ে আদরকণ্ঠে বললো, খুব যন্ত্রণা করছে বুঝি!
উচ্ছ্বাস অর্নিমার চোখ বরাবর চেয়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না। সৌন্দর্যভীতি তার ভেতর প্রবল। তবুও সাহস সঞ্চার করে বললো, আমি বুঝেছি, কপালের যন্ত্রণার চেয়ে তোমার মনে যন্ত্রণা বেশি। একরাতে একজন মানুষকে তুমি আর কত আপন করে নেবে বলো? বিভেদের প্রাচীর ভেঙে সুসম্পর্কের কত মজবুত সেতু গড়ে তুলবে তুমি?
অর্নিমা বললো, যেদিন থেকে তোমার আমার বিয়ের কথা চলছে সেদিন থেকে তোমাকে আমি মনে-প্রাণে ভালোবাসতে শুরু করেছি, তোমার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেছি। আর আজ রাতেই তোমার কপাল থেকে রক্ত ঝরলো, দেখে সহ্য করতে পারছি না। মন ছটফট করছে, সুযোগ থাকলে হাউমাউ করে কান্নাও করতাম।
বলে সে স্বামীর খুব সন্নিকটে গেলো, ইতস্তত করে উচ্ছ্বাস সরে গিয়ে বললো, দেখো, ভয় লাগছে, কাছে এসো না। তোমাকে দেখে আমার সাহস মরে গিয়েছে, দূরে থাকো।
অর্নিমা স্বামীর কথায় আর পিছালো না, দেখলো এ খুব লাজুক, একে শিখিয়ে নিতে হবে। একেবারে বুকে গিয়ে মাথা রাখলো। উচ্ছ্বাস নিজেকে মুহূর্তেই ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, তাই বলে একেবারে বুকে?
অর্নিমা মৃদু হেসে বললো, স্বামীর ছোঁয়া ছাড়া স্ত্রী বাঁচে? তুমিই তো আমার সব!
উচ্ছ্বাস বললো, তুমিটাই একদিন জীবনের সব কিছু কেড়ে নেয়।
দ্বিমত পোষণ করে অর্নিমা বললো, তুমিটাই একদিন জীবনের সব কিছু হয়ে যায়।
উচ্ছ্বাস আবার বলে, কেউ জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসলেও পরে আবার অভিশাপ হয়ে উঠে।
অর্নিমা আবারও দ্বিমত পোষণ করে বললো, বিশ্বাসে ভালোবাসা অটল থাকে, অবহেলায় হারিয়ে যায়।
উচ্ছ্বাস উত্তর শুনে বিস্মিত হয়। আবার বলে, সময় গেলে সবাই বদলে যায়। ভুলে যায় ভালোবাসাও। যোগ্য মানুষটিকেও অকর্মণ্য আখ্যা দেয়।
অর্নিমা বলে, বহুরূপীরা বদলে যায়, বদলে গিয়ে জেতে না, আফসোস করে।
উচ্ছ্বাস অবাক হয়ে বলে, অনেক জানো, অনেক বোঝ। বাস্তববাদিনী হয়েই থেকো। বেশি আবেগপ্রবণ হয়ো না, সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারবে না।
অর্নিমা হেসে বলে, ব্যথা-বেদনা ব্যক্ত করার মানুষ পেয়েছি, কষ্ট কর্পূরের মতো বাতাসে বিলীন হয়ে যাবে। আর আবেগের প্রাবল্য না দেখালে কি তোমায় বাঁধতে পারবো? শুধু সম্মানটুকু দিও, যেখানে সম্মান থাকে না, সেখানে ভালোবাসাও অচল। তিলে তিলে গড়া ভালোবাসা একজন রূপসীকে দেখলেই ভুলে যায় কেউ কেউ।
উচ্ছ্বাস সন্তুষ্টচিত্তে বলে, খুব ভালো বলেছো। সত্য বলেছো। বিশ্বস্ততা দামি শব্দ, দাম দিয়ে কেনা যায় না। অমূল্য শব্দ বিশ্বস্ততার মর্যাদা রক্ষা জীবনের ব্রত করে নিলাম।
অর্নিমা মিহিস্বরে বলে, জীবনটা আসলেই অনেক সুখের, আনন্দে থাকতে জানলে। অল্পে আনন্দে থাকতে জানলে।
উচ্ছ্বাস বলে, তৃপ্তির তো শেষ নেই। অপ্রাপ্তি নামক যন্ত্র মনস্তত্ত্বে ক্ষত করে দুঃখ সৃষ্টি করে। দুঃখ-কষ্ট না থাকলে জীবনের প্রকৃত রং জানা যায় না। তবে হ্যাঁ, জীবনটা অনেক সুন্দর যদি সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।
অর্নিমা মুখ তুলে উচ্ছ্বাসকে দেখলো। চকচকে নকলের ভিড়ে এমন আসল মানুষ জীবনে পাবে সে ভাবেনি কখনো। এমন মানুষ হাত ধরলে পৃথিবী উল্টে গেলেও হাত ছাড়বে না। এমন মানুষের কাছে নিজেকে ভেঙেচুরে প্রকাশ করলেও ঠকতে হয় না। মাঝের দুই হাত দূরত্ব কমানোর জন্য সে এগিয়ে এলো। তা দেখে আরও দুই হাত সরে গেলো উচ্ছ্বাস লাজে। অর্নিমা ভাবলো, কথার জড়তা কেটে গিয়েছে ওর, কথাতে আর ইতস্তততা নেই। এখন ছুঁয়ে থাকায় আনন্দ কত স্পর্শ দিয়ে বুঝিয়ে এই সলাজের দূরত্বও কমিয়ে আনতে হবে। সে উচ্ছ্বাসকে জড়িয়ে ধরলো, উচ্ছ্বাস বিহ্বলিত হলেও শান্তস্বরে বললো, নিজেকে এত তাড়াতাড়ি সমর্পণ করে দিলে? আমার কাছে নিজেকে মূল্যহীন করে তুলছো নাতো?
অর্নিমা স্বামীর বুকের ঘ্রাণ খেয়ে বলে, হাত-পা বাঁধা যায়, মন তো বাঁধা যায় না। তুমি আছো সন্নিকটে, তোমার বুকে না ঠাঁই নিয়ে দূরে থাকা নয় সহজ। আমার কোনো সংকট ছিলো না, সংকট ছিলো প্রিয় মানুষের। আজ থেকে আমার আর কোনো সংকট নেই। কোনো মানুষের যেন প্রিয়জনের সংকট না থাকে। শূন্য হৃদয় নিয়ে থাকা কি যায়?
উচ্ছ্বাস প্রাপ্তির উচ্ছ্বাসে হত-বিহ্বল। একজন মানুষকে আপন করে পাওয়ার অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। যে এভাবে আপন করতে জানে সে দুঃসময়েও সাথে থাকতে জানবে, যে আপন করতে জানে না সে সুসময়েও থাকবে না সাথে। তবুও সে অর্নিমাকে বুঝতে বললো, সময় মানুষকে চিনতে সাহায্য করে।
কথাটি শুনতেই অর্নিমা চার হাত দূরে সরে গেলো। কিছু কথা সময়ে এক সাগর সমান গভীর দুঃখের খাদ তৈরি করতে পারে। কথাটির কারণে অনুতপ্ত হয়ে দুই কদম সামনে এলো উচ্ছ্বাস। তা দেখে অর্নিমা মনে মনে আনন্দিত হয়ে ভাবলো, এই তো দূরত্ব কমানো শিখে যাচ্ছে।
উচ্ছাস আরও সরে আরও কাছে এলো। অর্নিমার রাগ রাগ মুখ দেখে বললো, রাগ হোক অনুরাগের জন্য, হিংসার জন্য যেন না হয়।
গাল ফুলিয়ে থাকলো তবুও অর্নিমা। এমন অভিমান না থাকলে জীবনের প্রকৃত রং জানা যায় না। উচ্ছ্বাস বিচলিত হলো, একজন অপরিচিত মানুষ কত সহজে পরিচত হলো; পরিচিত হয়েই অপরিচিতের মতো আচরণ করছে, খুব খারাপ লাগছে। সে আরেকটু কাছে এসে ঘ্রাণ দূরত্বে দাঁড়ালো। অর্নিমা মনে মনে পুলকিত হয়ে ভাবলো, জানে জানে দূরত্ব কমাতে জানে। ভরসার মানুষটি সহজ হয়ে যাবে সহজেই।
উচ্ছ্বাস উচ্ছ্বাস হারানো অর্নিমার মুখাবয়বে চেয়ে বললো, ভুল ধরে দূরে থাকলে দূরত্ব যে বাড়ে…
অর্নিমা বলে, দূরত্ব কমাতে জানলে সদূরও দূর থাকে না।
উচ্ছ্বাস বলে, দূরত্ব কমানোর কৌশল তবে আগে থেকেই শিখিয়ে দিও। কখন কোন কথা বলে ফেলি, কোন কথাটি তোমাকে আঘাত দিয়ে দেয় বুঝতে হয়তো পারবো না।
অর্নিমা বলে, তুমি খুব সহজ আর সুন্দর। তুমি ভুল করলে বাঁচবে না বুঝে গিয়েছি। তোমাকে পেয়েছি আমার আর চাওয়া নেই। প্রিয় মানুষটিকে আপন করে পাওয়ার সৌভাগ্য সবার থাকে না। সময় না ক্ষেপণ করে আপন যে মানুষটি তাকে আপনা ডোরে আপন করে নিতে জানতে হয়।
উচ্ছ্বাস আবার বেফাঁস কথা বললো, সরল মনের কোনো গুরুত্ব নেই, মূল্য নেই।
এই কথা শুনতেই অর্নিমা তিন হাত পিছিয়ে গেলো। গাল ফুলিয়ে থাকলো। উচ্ছ্বাস এবার সম্পূর্ণ দূরত্ব কমিয়ে অর্নিমাকে বুকে চেপে নিলো আর বললো, ভালোবাসা শিখে নেবো তোমার পাঠশালাতে। ভালোবাসা শিখে গেলে ভালো ও সুখী থাকা শিখে যাবো।
এমন কথা। কথা আর কথা। কথা আর থামে না। গুটিগুটি পায়ে রাত গিয়েছে চলে, কেউ টের পায়নি।
অচেনা পাকপাখালিরা ঘুম থেকে জেগে কূজনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ থেকে।