সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কি বিজেপির দিকে ঝুঁকে? এই চর্চা জারি। তিনি নিজে বারেবারেই বলেন, আমি মাঠের লোক, মাঠেই থাকতে চাই, রাজনীতিতে নামার প্রশ্ন নেই। সত্যি তো, তাঁর বর্ণময় ক্রিকেট কেরিয়ার তো বাংলা ও বাঙালির গর্ব। বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের সঙ্গে সৌরভের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অশোক ভট্টাচার্য-সহ অনেক বাম নেতার সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক। সৌরভ বলেন, দিদির সঙ্গেও তাঁর ভালো সম্পর্ক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু কেন, মা-মাটি-মানুষ মন্ত্রিসভার অনেকের সঙ্গেই তাঁর ভালো সম্পর্ক। এতে আপত্তির কী-ই বা থাকতে পারে? এটাই তো স্বাভাবিক। দিলীপ ঘোষদের সঙ্গে দেখা না গেলেও নরেন্দ্র মোদী বা আজকাল অমিত শাহ- র সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। মোদী ২০১৪ সালেও নিজের কেন্দ্র থেকে সৌরভকে জিতিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। সৌরভ সবিনয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু তারপরও বিজেপির একাংশ চায় সৌরভ ২০২১-এ মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হোন। পরিস্থিতি কি সেদিকে যাচ্ছে? চর্চা জোরালো হয়েছে বৃহস্পতিবারের পর।
বিশ্বরূপ দে-গোষ্ঠীকে ঠেকাতে জগমোহন ডালমিয়ার প্রয়াণের পর অভিষেক ডালমিয়াকে নিয়ে নবান্নে গিয়েছিলেন সৌরভ। মুখ্যমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে বাংলার ক্রিকেটের ভালোর জন্য কাজ করতে বলেন। এরপর সৌরভ সভাপতি হন সিএবি-র, অভিষেক সচিব। নিঃসন্দেহে যোগ্য। ভালো কাজ করেছেন। যে কোনও খেলা আয়োজনে পেয়েছেন রাজ্য সরকারের সহযোগিতা। আবার বোর্ড সভাপতি হওয়ার আগে তিনি ছুটলেন অমিত শাহের কাছে। তারপরই সব হিসেব উল্টে গেল। সৌরভ বসলেন বিসিসিআই মসনদে, অমিত-পুত্র জয় শাহ হলেন সচিব। তখন চর্চা শুরু হতে সৌরভ বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যখন গিয়েছিলাম বলা হলো আমি তৃণমূল! অমিত শাহের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা না হলেও অনেকে বিজেপি-যোগ দেখছেন। এ সব কিছু না। ক্রিকেটের লোক, ক্রিকেট নিয়েই থাকতে চাই। কিন্তু বোর্ডে রাজনৈতিক প্রভাব নেই এ কথা পাগলেও বিশ্বাস করে না। তাতেই প্রশ্ন, মাঠে মাথা উঁচু করে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া সৌরভকে কি পদ আঁকড়ে থাকতে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে গুডবয় থাকতে মাথা নোয়াতে হচ্ছে? অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকে কি সত্যিই কোনও ডিল হয়েছিল? বিসিসিআই বা সৌরভ ব্যক্তিগতভাবে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সরকারের থেকে এ কারণেই দূরত্ব বাড়াচ্ছেন? দিল্লিতে গণহত্যা চলাকালীন মোদী-শাহের ট্রাম্প বন্দনায় সাক্ষী হতে সৌরভ জয় শাহ, অনুরাগ ঠাকুরদের সঙ্গে ছিলেন মোতেরায়। থাকতেই পারেন স্টেডিয়াম উদ্বোধনে বোর্ড সভাপতি হিসেবে। কিন্তু যে সৌরভ বিশ্বকাপে ভারত-পাক ম্যাচ আয়োজন বা ক্রিকেট পরিকাঠামো উন্নয়নে বারবার বৈঠক করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ছুটতেন, সেই সৌরভ বা তাঁর বিসিসিআই ইডেনে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ আয়োজন নিয়ে সরকারকে অন্ধকারেই রেখেছিল বলে জানান খোদ মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, সৌরভের অন্তত নবান্ন বা কলকাতা পুলিশকে জানানো উচিত ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর জানতে পেরেছি, আগে নয়। পাঠকদের মনে আছে, টি ২০ বিশ্বকাপে ভারত-পাক ম্যাচ আয়োজনে রাজ্য সরকারের সবুজ সংকেত পেতে বৈঠক থেকেই মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন তৎকালীন সিএবি সভাপতি, নিরাশ হননি। সরকার সহযোগিতা করায় অন্য রাজ্যে আপত্তিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়া ভারত-পাক ম্যাচ সফলভাবেই হয়, সব হুমকি ভোঁতা করে। করোনা-পরিস্থিতিতে তাই সৌরভ তো সৌজন্যের খাতিরেও ফোন করতেই পারতেন তাঁর দিদি, বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে। প্রয়োজন বোধ করেননি।
এবার আসা যাক জল্পনা জোরালো হওয়া প্রসঙ্গে। সৌরভ বৃহস্পতিবার রিটুইট করেছেন করোনা নিয়ে মোদীর ভাষণ। যে ভাষণকে দিশাহীন, গিমিক বলে মনে করছে তৃণমূল কংগ্রেস। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রহণযোগ্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিতেই পারেননি মোদী, রাজ্যকেও সাহায্য করেনি কেন্দ্র। তাও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, সৌরভের রিটুইট করায় কোনও বাধা বা অন্যায় নেই। কিন্তু মহারাজ তো নিরপেক্ষ। কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় সাধ্য অনুযায়ী অনেক বেশি তৎপরতা দেখিয়ে একাধিক পদক্ষেপ করেছেন। করোনা মোকাবিলায় সব বৈঠক লাইভ হয়েছে। না, ইডেনে ম্যাচ বাতিলের কথা জানাতেও দিদিকে ফোন করার সৌজন্য দেখাননি সৌরভ। বৈঠকের মাঝেই টুইটার দেখে মুখ্যমন্ত্রীকে খেলা বাতিলের খবর দেন মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বোস! মুখ্যমন্ত্রী বা নিদেনপক্ষে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জনসচেতনতায় যে বার্তা দিয়েছেন তাও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার বা রিটুইট করেননি সৌরভ। করেছেন মোদীর ভিডিও। তাতেই সৌরভকে নিয়ে চর্চা চলছে। তৃণমূল কর্মী তাঁর অনুরাগীরা অবাক। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, দাদা কি বদলে গেলেন? প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শেয়ার করে তো নিরপেক্ষতা দেখাতেই পারতেন। কিছুদিন আগে সৌরভ-কন্যা সানা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন, যাতে বিজেপির নীতির সমালোচনা ছিল। সৌরভ বিতর্ক, জল্পনা বাড়তে না দিয়ে বলেছিলেন, এ সব বোঝার বয়স সানার হয়নি। পোস্টে রাজনীতি না খোঁজাই ভালো। দক্ষিণ কলকাতার এক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বললেন, আমরা দিদিকে দেখে রাজনীতি করি। সৌরভকেও সম্মান করি। কিন্তু বিজেপির পাল্লায় পড়ে সৌরভ ভোটে দাঁড়ালে বড়ো ভুল করবেন। সৌরভের জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। সৌরভ কেন, মোদী দাঁড়ালেও হারবেন। বাংলা দিদিকেই চায়। আমরা চাই, সৌরভ চাপে পড়ে নিজেকে না বদলে নিরপেক্ষতাই বজায় রাখুন।